
গাজা ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা সাম্রাজ্যবাদী হামলা নতুন মাত্রা পেল ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তামাম দুনিয়ার মানুষ জানে নিরীহ গাজাবাসীর ওপর ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর নিষ্ঠুরতার কথা। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কেরা নিজ স্বার্থে সামান্য কিছু মানবিক সহায়তা ভিন্ন প্রায় নীরব। সম্প্রতি গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও আরও কিছু সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক কর্মী, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মীদের একটি ত্রাণবহর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইজরায়েলি বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে। তাদের হাতে আটক ও বহিষ্কৃত কর্মীদের একাংশ ইজরায়েলি বাহিনীর দ্বারা গুরুতর নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং অমানবিক আচরণের অভিযোগ তুলেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গাজায় মানবিক সংকট ও ফ্লোটিলার উদ্দেশ্য
গাজা ভূখণ্ডের বর্তমান পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রসংঘ, রেড ক্রস এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অবরোধ, খাদ্য ও ওষুধ সংকট, পরিকাঠামো ধ্বংস এবং বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে গাজার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও বিদ্যুতের ঘাটতি, বিশুদ্ধ জলের সংকট এবং শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে মে মাসের শুরুতে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা তুরস্ক থেকে গাজার ওপর চাপানো সামুদ্রিক অবরোধ ভেঙে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। প্রায় ৫০টিরও বেশি নৌযানে বিভিন্ন দেশের কয়েকশো স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। ইজরায়েল সরকার এই উদ্যোগকে হামাসপন্থী প্রচারমূলক কৌশল বলে দাগিয়ে দিয়ে ফ্লোটিলার অগ্রযাত্রা থামাতে সামরিক অভিযান চালায়।
ফ্লোটিলা আন্দোলনের ইতিহাস
গাজা অবরোধ ভাঙার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ফ্লোটিলা আন্দোলন নতুন নয়। ২০০৬ সালে লেবাননে ইজরায়েলের যুদ্ধের সময় এই ফ্লোটিলা (ত্রাণবহর) আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এবং ২০০৭ সালে ইজরায়েল গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করার পর এটি আরও বিস্তৃত হয়। ২০০৮ সালে ফ্রি গাজা মুভমেন্ট-এর দুটি নৌকা সফল ভাবে গাজায় পৌঁছায়। এরপর ২০১০ সালে মাভি মারমারা জাহাজে ইজরায়েলি অভিযানে ১০ জন কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তার পর থেকে, আন্তর্জাতিক সংহতি গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা সংগঠিত শত শত জলযান গাজা উপত্যকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে, যা মানবিক সহায়তা এবং কর্মীদের বহন করত। কিন্তু প্রতিটি ফ্লোটিলা অভিযানই ইজরায়েলি বাহিনীর বাধার মুখে পড়েছে এবং আটক কর্মীদের কাছ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে গাজা অবরোধ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক অভিযান এবং মানবাধিকার প্রশ্নে ইজরায়েলের ভূমিকা বারবার আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।
আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট জায়নবাদী ইজরায়েল গত ১১ ও ১২ মে সাইপ্রাসের পশ্চিমে অবস্থানরত ফ্লোটিলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য কমান্ডো বাহিনীকে নির্দেশ দেয়। আটক ত্রাণকর্মীদের ইজরায়েলি জাহাজে তুলে আশদোদ বন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের একটি ইজরায়েলি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৪ মে ইজরায়েল ৪১টি দেশের মোট ৪২২ জন নাগরিককে বহিষ্কার করে। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে নিজের দেশে ফিরে গেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বেশ কয়েকজন ত্রাণকর্মী তাদের ওপর চলা নির্যাতনের বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
প্যারিসে ফিরে ফরাসি কর্মী মেরিয়েম হাদজাল সাংবাদিকদের কাছে তাঁর ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তিনি আরও বলেন, আমাকে আঘাত করা হয়েছে, চড় মারা হয়েছে, অশালীনভাবে স্পর্শ করা হয়েছে, পা দিয়ে পাঁজরে আঘাত করা হয়েছে এবং আমার চুল ধরে টানা হয়েছে। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মানসিক ট্রমার মধ্যে ছিলাম। দু’জন ইতালীয় ‘ইল ফাত্তো কোতিদিয়ানো’ সংবাদপত্রের সাংবাদিক আলেসান্দ্রো মানতোভানি এবং ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’-এর সংসদ সদস্য দারিও কারোতেনুতো রোমে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের কাছে তাঁদের উপর ইজরায়েলের কমান্ডোদের অত্যাচারের কথা তুলে ধরেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বন্দি ত্রাণকর্মীদের জামাকাপড় খুলে নিয়ে মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয়।
ত্রাণসামগ্রী পরিবহণের আয়োজক সংস্থা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ জানিয়েছে যে, তারা অন্তত ১৫টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটেছে একটি অস্থায়ী কারাগারে রূপান্তরিত জাহাজে। বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, বন্দিদের মালবাহী জাহাজের ভেতরে ছুঁড়ে ফেলে তাঁদের মাথায় ও পাঁজরে আঘাত করা হয়েছিল। খুব কাছ থেকে রাবার বুলেট দিয়ে গুলি করা হয়েছে। বহু মানুষের হাড় ভেঙে গেছে। তাঁরা একাধিক বার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে জামাকাপড় খুলে তল্লাশি, যৌন উস্কানিমূলক উপহাস, যৌনাঙ্গ চেপে ধরা ও টেনে ধরা এবং ধর্ষণের একাধিক ঘটনা ছিল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কেবল ওই একটি জাহাজেই অন্তত ১২টি যৌন নিপীড়নের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে পায়ুপথে ধর্ষর্ণ এবং হ্যান্ডগান (পিস্তল) জোর করে প্রবেশ করানোর ঘটনাও রয়েছে।
ত্রাণবহরে থাকা ইতালীয় অর্থনীতিবিদ লুকা পোগি রোমে পৌঁছে রয়টার্স নিউজ এজেন্সিকে বলেন, ‘আমাদের পোশাক খুলে মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয়েছিল। আমাদের অনেকের ওপর টেজার (লেজার গান) প্রয়োগ করা হয়েছিল, কেউ কেউ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং কাউকেই আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।’
ইলারিয়া মানকোসু নামে এক ইতালীয় কর্মী জানান, ত্রাণবহরের সদস্যদের একটি জাহাজে তুলে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং পাঁচজন সৈন্য তাদের মারধর করে, যার ফলে তাদের পাঁজর এবং হাত ভেঙে যায়। টেজারের কারণে কারও কারও চোখ ও কান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানকোসু আরও বলেন, তারা দুই দিন ওই কারাগার-জাহাজে কাটিয়েছেন যেখানে এমনকি নলবাহী পরিচ্ছন্ন জলের ব্যবস্থাটুকুও ছিল না।
বন্দিদের কাছে কম্বল ছিল না এবং তাঁদের বেশিরভাগ পোশাকই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে রাতে কার্ডবোর্ড এবং প্লাস্টিক ব্যবহার করে কোনও রকমে তাঁরা ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতেন। ডাঙায় নামানোর পর কয়েক ঘণ্টা ধরে তাঁদের হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়। নড়াচড়া করলে বা কথা বললে লাথি ও ধাক্কা মারা হত। এরপর তাঁদের একটি জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁরা যাতে ঘুমাতে না পারেন, সে জন্য বার বার তাঁদের এক ঘর থেকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হত। এই রকম অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কানাডা, ইতালি, জার্মানি, স্পেন সহ নানা দেশ তাদের নাগরিকদের ওপর এই বর্বর নির্যাতনের জন্য ইজরায়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি তুলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলিও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। একাধিক ইউরোপীয় দেশ এই ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে। ইউরোপীয় কমিশনও বন্দি ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহারকে চরম অন্যায় বলে মন্তব্য করেছে। রাষ্ট্রসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজ্যারিক বলেছেন, তাঁরাও এই ঘটনাগুলি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
ইজরায়েলের অবস্থান
ইজরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ এবং ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) যথারীতি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এদিকে ইজরায়েলি কারাগার ও পুলিশ বাহিনীর কর্তা ইতামার বেন গভিরের শেয়ার করা একটি ভিডিও সামনে এসে গেছে যার নিন্দায় মুখর হয়েছে ব্রিটেন সহ কুড়িটিরও বেশি দেশ।
ভিডিওটিতে দেখা গেছে যে অপহৃতদের তার দিয়ে বেঁধে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে এবং তাঁদের পিছনে চড়া সুরে ইজরায়েলের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছে। ভিডিওটি প্রকাশ পাওয়ার পর ত্রাণকর্মীদেরসঙ্গে এমন দুর্ব্যবহারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জায়নবাদী ইজরায়েল সরকার চাপের মুখে পড়েছে। এমনকি ইজরায়েলের বহু নাগরিকও এ ঘটনার নিন্দা করেছেন।
উপসংহার
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইজরায়েলি হামলা শুধুমাত্র একটি সামরিক বা কূটনৈতিক ঘটনা নয়। এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক সহায়তার অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। ত্রাণকর্মীদের ওপর আক্রমণের নিন্দা করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা জানিয়েছেন, মানবিক সহায়তায় বাধা দেওয়া এবং আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন আন্তর্জাতিক আইন লংঘন ছাড়া কিছু নয়।
এই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। গাজায় সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতায় একটা জাতি, একটা দেশ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে উধাও হতে বসেছে। সেখানে নারী, শিশু নির্বিশেষে মানবনিধন যজ্ঞ চলছে। মানবিকতা, সহমর্মিতার টানে কিছু অসমসাহসী মানুষ যখন চরম দুর্দশাগ্রস্ত গাজাবাসীর কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছতে গেলেন, বর্বর ইজরায়েলি সরকার, তাঁদের পর্যন্ত রেহাই দিল না, অকথ্য নির্যাতন চালাল। এর পরেও কি সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক জাগরিত হবে না! (তথ্যসূত্রঃ বিবিসি-র সাংবাদিক ডেভিড গ্রিটেন, আল জাজিরা ও রয়টার্সের সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদন)