
মুন্সি প্রেমচন্দের ‘ঠাকুর কা কুঁয়া’ গল্পে অসুস্থ তথাকথিত নিচু জাতের মানুষ জোখু তেষ্টার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে পচা-দুর্গন্ধ জল খেয়েছিল। এ গল্প ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ ভারতে বসে লেখা। ভারতের গ্রামগুলোয় তো বটেই, শহরেও এই ছবি এখন কতখানি পাল্টেছে? মধ্যপ্রদেশে ছ’মাসের যে শিশুটি নতুন বছরের সূর্য দেখার আগেই দূষিত জল খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল, সে তথাকথিত ‘নীচ জাতের’ নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও জন্মায়নি। তার একমাত্র অপরাধ ছিল, সে এই আটাত্তর বছরের স্বাধীন দেশে এক সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিল।
ইন্দোর নাকি খাতায় কলমে ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর। অথচ সেখানেই দিনের পর দিন পানীয় জলে মিশছিল শৌচাগারের বর্জ্য। পুলিশ চেকপোস্টের জন্য শৌচাগার তৈরি হয়েছিল শহরের মূল পানীয় জলের লাইনের ওপরে এবং দিনের পর দিন সেই শৌচাগারের বর্জ্য জমা হচ্ছিল একটা গর্তে, কারণ সেপটিক ট্যাঙ্কের ব্যবস্থা করা হয়নি। সেই বর্জ্য গর্তের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে মিশছিল বহু বছরের পুরনো পানীয় জলের লাইনে, যেখানে আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল নানা ফুটো এবং ফাটল। ৬ মাসের ছেলে জ্বর, পেটখারাপ, বমি নিয়ে ভুগছে দেখে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলেন সাধনা সাহু। ভাবতেই পারেননি, সন্তানকে যে পানীয় জল দিচ্ছেন, সেটাই বিষাক্ত হয়ে আছে। ইন্দোরের ভগীরথপুরায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বাস, যার বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত, গরিব মানুষ। একের পর এক পরিবারের সদস্যরা যখন আন্ত্রিকের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে, তখনও সরকার-প্রশাসনের টনক নড়েনি। তারা যখন একটু নড়েচড়ে উঠতে বাধ্য হলেন, তত দিনে মৃতের সংখ্যা দশ ছুঁয়ে ফেলেছে।
স্বাস্থ্য দপ্তরের ৩১ ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ওই এলাকার ২৪৫৬ জন জ্বর-বমি-পেটখারাপে আক্রান্ত, যার মধ্যে ২১২ জনকে ভর্তি হতে হয়েছে হাসপাতালে, ৫০ জনের অবস্থা সংকটজনক, আইসিইউ-তে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন তারা। সময় যত এগিয়েছে তত মৃত ও অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। মৃতের সংখ্যা ২১ হয়ে গেছে, অসুস্থও বেড়েছে। এতগুলো প্রাণ চলে যাওয়ার পর সরকার আক্রান্তদের সামান্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করতে বাধ্য হলেও, সে টাকা কত দিনে কত জনের হাতে পৌঁছবে আর হাসপাতালের বিছানায় অসুস্থ প্রিয়জনেরা কবে সুস্থ হয়ে ফিরবে, জানেন না ওই অঞ্চলের মানুষ।
গত কয়েক মাস ধরে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা পানীয় জল পানের অযোগ্য বুঝতে পেরে বারে বারে কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছেন। জলের গুণগত মান নিয়ে ইন্দোরে ২০২৫ জুড়ে মোট ২৬৬টি অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। তা সত্ত্বেও পানীয় জলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ অবহেলাই করে গেছে। ফলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে এবং দিনের পর দিন ওই বর্জ্য মেশা জল পান করে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই সব তথ্যই সামনে এসেছে ভগীরথপুরার নিরপরাধ সাধারণ মানুষ নিজের জীবন দিয়ে সরকার-প্রশাসন-পৌরদপ্তরের মারাত্মক গাফিলতির মূল্য চোকানোর পর। পানীয় জলের মতো একটি গুরুতর বিষয় নিয়ে এই চূড়ান্ত ঢিলেঢালা মনোভাব এবং অবহেলা, খাবারে বিষ মিশিয়ে মানুষ মারার চাইতে কোনও অংশে কম অপরাধ নয়।
ভারপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার এবং আরও একজন আধিকারিককে সরকার সাসপেন্ড করেছে ঠিকই, কিন্তু মন্ত্রী, বিধায়ক ও পুরসভার ক্ষমতাসীন দলের কর্তারা নিশ্চিন্তে আছেন। আধিকারিকদের লোকদেখানো শাস্তি দিয়ে যারা নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে চান, সেই সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরা এর পরেও নির্লজ্জের মতো মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতির ঝুলি নিয়ে ভোট চাইতে আসবেন। ইন্দোরের বিজেপি বিধায়ক কৈলাস বিজয়বর্গীয় এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে মেজাজ হারিয়ে ‘তাতে আমার ঘন্টা’ বলে ফেলেছিলেন, পরে তুমুল নিন্দার ঝড় ওঠায় মামুলি দুঃখপ্রকাশও করেছেন।
যদিও এই ভয়ঙ্কর ঘটনার দায় স্বীকার দূরে থাক, বিজেপির বহুল প্রচারিত ডবল ইঞ্জিনের রাজ্য মধ্যপ্রদেশে এমনটা কী করে ঘটল, সে নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আসলে রাগের মাথায় যে কথা মন্ত্রীমহোদয়ের মুখ দিয়ে বেরিয়েছে, সেটাই দেশের মানুষের ভোটে জিতে ক্ষমতার গদি আঁকড়ে বসা নেতা-মন্ত্রীদের মনের কথা। দেশের মানুষ খেতে পেল কি না, কাজ পেল কি না, হাসপাতালে চিকিৎসা পেল কি না, এমনকি নিরাপদ তেষ্টার জলটুকু তাদের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, এ সবে তাদের কিছুই যায় আসে না। প্রধানমন্ত্রীর ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের হোর্ডিংয়ের আড়ালে দেশের প্রান্তে প্রত্যন্তে এমন কত দূষিত জলের লাইন রয়ে গেছে, তার খোঁজ পাওয়া যাবে আবারও কোথাও মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর। তত দিন গণতন্ত্রের স্বঘোষিত কাণ্ডারিরা মানুষের ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসে তাদের জীবন নিয়েই ছিনিমিনি খেলবেন।
নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ সহ বিজেপির নেতামন্ত্রীরা কথায় কথায় হিন্দুদের বিপদের জিগির তোলেন, হিন্দুদের জন্য তাদের প্রাণ নাকি কেঁদে ওঠে এবং তাদের আস্ফালন শুনলে মনে হয়, দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার যাবতীয় সমস্যার জন্য একমাত্র দায়ী হল মুসলমান, রোহিঙ্গা নয়তো বাইরের দেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীরা। ‘ডবল ইঞ্জিন’ মধ্যপ্রদেশে ঊর্মিলা যাদব, তারা কোরি, নন্দলাল পাল সহ এতগুলি প্রাণ জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেল, দেশ জুড়ে আসলে যাদের বেঁচে থাকার অধিকার বিপন্ন হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে– তারা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়, অনুপ্রবেশকারী নয়, এ দেশেরই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।