Breaking News

আমৃত্যু বিপ্লবী কমরেড রবীন সমাজপতি –কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রদ্ধার্ঘ্য

এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটবুরোর প্রবীণ সদস্য এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্য সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক কমরেড রবীন সমাজপতি ৭৭ বছর বয়সে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে গত ২৬ জুন কলকাতার ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান কমরেড রবীন সমাজপতি কলকাতার চারুচন্দ্র কলেজে পড়াকালীন ছাত্র সংগঠন এআইডিএসও-র সংস্পর্শে আসেন এবং এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি এ যুগের অন্যতম অগ্রগণ্য মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক, সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের বৈপ্লবিক চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবীর জীবন বেছে নেন। পরিবার, পিতা-মাতার আশা-আকাঙক্ষা কোনও কিছুই তাঁকে পিছনে টেনে রাখতে পারেনি। জরুরি অবস্থার মধ্যে ১৯৭৬ সালে মহান মানবতাবাদী সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষর্ উদযাপন উপলক্ষে গঠিত ‘সারা বাংলা শরৎ শতবার্ষিকী কমিটি’র একজন সংগঠক হিসাবে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। শরৎচন্দ্র সম্পর্কে কমরেড শিবদাস ঘোষের অনন্য মূল্যায়ন তিনি রাজ্যের সর্বত্র বহন করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএম ক্ষমতায় আসার পর প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি ও পাশ-ফেল প্রথা বাতিল করার বিরুদ্ধে এবং ১৯৮৩ সালে বাসভাড়া বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলনে কমরেড রবীন সমাজপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কালক্রমে তিনি এআইডিএসও-র সর্বভারতীয় নেতায় পরিণত হন। ১৯৮৬ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এআইডিএসও-র সর্বভারতীয় সম্মেলনে তিনি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই সময় থেকেই দলের প্রয়োজনে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে অন্যান্য রাজ্যেও দায়িত্ব পালন করতেন।

১৯৯৪ সালে তিনি এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সদস্য হন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিহার পার্টি সংগঠনের কিছু সমস্যার কারণে দলের নির্দেশে কমরেড রবীন সমাজপতি বিহারে যান এবং তাঁর ভূমিকা অচিরেই তাঁকে কমরেডদের প্রিয় নেতায় পরিণত করে। এরপর বিহার রাজ্যকে প্রশাসনিকভাবে দু’ভাগ করার পর দল তাঁকে ঝাড়খণ্ডে পাঠায়। অশক্ত শরীর নিয়েও তিনি সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পালন করে গেছেন। ২০১২ সালে তিনি দলের ঝাড়খণ্ড রাজ্য সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক পদে মনোনীত হন। ২০১৮ সালে তিনি দলের স্টাফ সদস্য এবং ওই বছরেই পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে ২০২১ সালে তিনি দলের পলিটবুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি রাজস্থানেও যান সংগঠনের প্রয়োজনে।

শারীরিক নানা সমস্যার কারণে প্রায়ই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কিন্তু তা কখনও তাঁর পার্টির কোনও দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। ইতিহাস-জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে তাঁর গভীর আকর্ষর্ণ ছিল।

কমরেড রবীন সমাজপতি নিজের ত্রুটি সম্পর্কে বলতেন, আমার ত্রুটি জেনে যদি কেউ আমাকে ভালোবাসে তবে সে ভালোবাসা খাঁটি, আর না জেনে যদি ভালোবাসে তা হলে সেখানে ফাঁকি থাকবে। তাঁর ত্রুটি নিয়ে ছোটরা তাঁকে নির্দ্বিধায় সমালোচনা করতে পারত। কোনও কমরেডের কথাবার্তার মধ্যে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির অভাব দেখলে, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের অভাব দেখলে তিনি ধরতে পারতেন। তিনি আত্মপ্রচার বিমুখ ছিলেন। বিভিন্ন দায়িত্বে জুনিয়রদের সামনে আনার চেষ্টা করতেন।

শেষ কয়েক বছর নানা জটিল রোগে তাঁর শরীর ভেঙে যায়। বাইপাস সার্জারি, অ্যানজিওপ্লাস্টি ইত্যাদি বহু ধকল তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে গেছে। উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা তাঁর ছিলই, যার ফলে এবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এত বিপুল পরিমাণে ঘটে যে চিকিৎসকরা জানান অপারেশন করা সম্ভব নয়। এর দু’দিন পরেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী হিসাবে কমরেড রবীন সমাজপতি যখন যেটা সঠিক বলে বুঝেছেন, তা পালন করতে পিছপা হননি। কেন্দ্রীয় কমিটি গভীরভাবে আশা করে তাঁর মৃত্যুতে ভারতবর্ষের গণআন্দোলন ও বিপ্লবী আন্দোলনের যে ক্ষতি হল, তা পূরণ করতে পরবর্তী কমরেডরা এগিয়ে আসবেন।

কমরেড রবীন সমাজপতি লাল সেলাম