অনেক টালবাহানার পর বিরোধীদের লাগাতার দাবি মেনে বিজেপি সরকার রাজি হয়েছিল সংসদ অধিবেশনে সিঁদুর অভিযান নিয়ে আলোচনা করতে। কিন্তু কী পাওয়া গেল সেই আলোচনা থেকে?
পহেলগাম হামলায় গোয়েন্দা দফতর ব্যর্থ হল কেন, সিঁদুর অভিযানের সাফল্য নিয়ে যখন উচ্ছ্বসিত সরকারি নেতা-মন্ত্রীরা তখন হঠাৎ সংঘাত থেমে যাওয়ার পিছনে আসল রহস্যটা কী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে ২৮ বার দাবি করলেন তিনিই যুদ্ধ বন্ধ করেছেন এবং তা বাণিজ্যের শর্তে– তা সত্যি কি না, যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি কতখানি– এ সব প্রশ্নের একটিরও উত্তর পাওয়া গেল না সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা থেকে। এই সব প্রশ্নের উত্তর কি তা হলে দেশের মানুষের, এমনকি আইনসভার সদস্যদেরও জানার অধিকার নেই? নাকি শাসক দলই দেশের ভাল-মন্দ নির্ধারণের একমাত্র ঠিকাদার হিসাবে নিজেদের ভেবে নিয়েছে!
প্রধানমন্ত্রী সংসদে তাঁর দু’ঘণ্টার বক্তৃতায় দেশবাসীর একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন না শুধু নয়, পহেলগামে নিহত ২৬ জনের কথাও একবারের জন্য উচ্চারণ করলেন না। তবে কি এতগুলি মানুষের মৃত্যু সরকারি দল এবং তার নেতাদের কাছে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই নয়? পহেলগাম-সন্ত্রাসবাদীদের সরকার পাকিস্তানি নাগরিক বলে ঘোষণা করেছে। এতজন সন্ত্রাসবাদী সীমান্ত থেকে প্রায় কয়েক শত কিলোমিটার ভেতরে যে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারল, এটা তো চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতা। কাশ্মীরের মতো কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিশ্ছিদ্র প্রহরাবেষ্টিত জায়গায় এমন ঘটনা তো নিরাপত্তা বিভাগের গভীর দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে দিল। এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী কে বা কারা? সরকার কি এত দিনে তাদের চিহ্নিত করেছে? তাদের কী শাস্তি দেওয়া হয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর থেকে এ সব কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দেশের মানুষ জানতে পারলেন না। ঠিক যেমন আজও দেশের মানুষ সরকারের থেকে জানতে পারেনি, ২০১৯-এ পুলওয়ামায় ৪০ জন সেনার মৃত্যুর পিছনে সরকারের কোন গাফিলতি কাজ করেছিল? সেনা কনভয়ের মধ্যে আরডিএ’ ভর্তি গাড়ি কী করে ঢুকতে পেরেছিল?
হঠাৎ সংঘর্ষ বিরতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কোনও ভূমিকা ছিল কি না তার উত্তর প্রধানমন্ত্রী সংসদে দিলেন না। তা হলে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বার বার মিথ্যা বলে বিশ্বের মানুষকে যে বিভ্রান্ত করছেন, সে কথাটিও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে সংসদে বললেন না। স্বাভাবিক ভাবেই দেশবাসীর ধারণা যে প্রধানমন্ত্রী কিছু গোপন করছেন। তা কি সংঘষবিরতির শর্তগুলি? সেই শর্ত কি দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করছে? নাকি ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তা বলি দেওয়া হল? সেই শর্তের কথা তো সংসদকে জানানো প্রধানমন্ত্রী কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তিনি তা একান্ত তাঁর দলগত বিষয় করে রাখতে পারেন না।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধে পাঁচটি প্রথম শ্রেণির যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। দেশের চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ প্রমুখ সেনাপ্রধানরা তা স্বীকারও করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তা স্বীকার করতে পারলেন না কেন? তিনি হয়তো ভাবছেন, তাতে সরকারের প্রতি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাবে। সরকারের বিদেশ নীতির চরম ব্যর্থতায়, অভ্যন্তরীণ নীতির পরিণামে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি, ছাঁটাই, বেসরকারিকরণ, সাম্প্রদায়িকতার প্রসার প্রভৃতি কারণে ইতিমধ্যেই তো তা তলানিতে পৌঁছেছে। অপারেশন সিঁদুরের প্রশ্নে বিশ্বের প্রায় কোনও দেশের সমর্থন জোগাড় করতে না পারাটাও সরকারের আর এক চরম ব্যর্থতা। এত সবের পর দেশের মানুষের এই সরকারের উপর আস্থা না রাখতে পারাটাই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক পহেলগামের তিন সন্ত্রাসবাদীকে একেবারে বলিউডি ফিল্মের কায়দায় হত্যার ঘটনাটি। গত তিন মাসে যে হত্যাকারীদের সম্পর্কে সরকার কোনও হদিশ দিতে পারেনি, সেই তাদেরই একেবারে ঠিক সংসদে সিঁদুর নিয়ে আলোচনা শুরুর সময়েই খুঁজে পেল এবং একেবারে কপালে গুলি করে হত্যা করে ফেলল নিরাপত্তা বাহিনী! সরকার দেশের মানুষকে মূর্খ মনে করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা তা নন। তাই প্রশ্ন উঠছে, সন্ত্রাসবাদীরা তো সংখ্যায় ছিল তিন জন। সরকার বিশাল বাহিনী নিয়েও তাদের জীবন্ত গ্রেফতার করতে পারল না কেন? তাদের গ্রেফতার করতে পারলে তো বহু অজানা তথ্য সামনে আসত। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, সন্ত্রাসবাদীদের সম্পর্কে তথ্য জানার থেকে সেগুলি গোপন করাতেই তাঁদের আগ্রহ বেশি।
সংসদ বিতর্কে উত্তর এড়িয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়তো তাঁর ভক্তদের বাহবা পেয়েছেন, কিন্তু এর দ্বারা তিনি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তই লঙ্ঘন করলেন এবং নিজেকে সংসদের ঊর্ধ্বে বলে প্রমাণ করতে চাইলেন। প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের বিষয়ে প্রশ্নগুলিকে এড়িয়ে গিয়ে বাস্তবে তাঁর ছাতির সঠিক পরিমাপটাই যেমন দেশের মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিলেন, তেমনই বিশ্বের সামনে সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রশ্নে ভারত সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিলেন। উরি থেকে বালাকোট প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজেপি সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনে যে সাফল্যের দাবি করে এসেছে পহেলগামের ঘটনা সেগুলির অন্তঃসারশূন্যতাকে স্পষ্ট করে দিল। বাস্তবে পহেলগামের হত্যাকাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সরকারের নিরবচ্ছিন্ন ব্যর্থতার মূল্যই এই মানুষগুলিকে জীবন দিয়ে চোকাতে হল।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শুরু থেকেই বিজেপি নেতারা এটিকে প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য হিসাবে তুলে ধরার সমস্ত রকম চেষ্টা চালিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই এখন ব্যর্থতার সমস্ত দায় যে প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়েই চাপবে তা বলাবাহুল্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল সে দায় নিতে রাজি নন। তাই সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এমন ‘নীরব মোদি’র ভূমিকা। তাঁরা বোধহয় ধরেই নিয়েছেন, বোবার কোনও শত্রু নেই।
বিরোধী দলগুলি, যারা সরকারের প্রতিনিধি হয়ে দেশে দেশে ছুটেছিলেন সরকারের বেঁধে দেওয়া বয়ান আওড়াতে, তাঁদের যে শিক্ষা বাকি ছিল, বিজেপি বোধহয় পার্লামেন্টে তা পূরণ করে দিয়েছে। অবশ্য যদি তাদের শিক্ষা নেওয়ার কোনও মানসিকতা অবশিষ্ট থাকে! আসলে বিরোধী দলগুলির দুর্বলতাও বিজেপি নেতারা জানেন। তাঁরা বুঝে গেছেন যে, নীতিগত ভাবে কোনও পার্থক্য তাদের সাথে বিরোধীদের নেই। না হলে প্রধানমন্ত্রী এ ভাবে তাঁদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে পার পেতেন না। গত তিন মাসে দেশের মানুষের সামনে শাসক দলের সংকীর্ণ রাজনীতিকে তুলে ধরে তাদের আসল রূপটিও তাঁরা উন্মোচিত করতে পারতেন। তা-ও তাঁরা করেননি। শাসক দলকে এতখানি বেপরোয়া হতে কার্যত সাহায্যই করে চলেছে বিরোধী দলগুলি। মানুষকে ভোট-সর্বস্ব এই দলগুলির চরিত্রকে বুঝে নিয়ে বিকল্প রাজনীতি তথা জনস্বার্থের রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।