
মোদিজির মুখে শহিদ ক্ষুদিরামের নাম শোনা গেল ২৭ জুলাই ‘মন কি বাতে’। মোদীজি ওই ভাষণে বলেন, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ওই বীর যুবক যে ভাবে হাসতে হাসতে ব্রিটিশের ফাঁসির দড়িতে আত্মাহুতি দিলেন তা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ রকম অসংখ্য দেশপ্রেমিকের আত্মবলিদানের মধ্যে দিয়েই আমরা ব্রিটিশকে তাড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা পেয়েছি। খুবই ভাল কথা, কথাটাও সত্যি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতার এত বছর বাদে প্রধানমন্ত্রীর হঠাৎ ক্ষুদিরামের নাম মনে এল কেন? সম্ভবত জীবনে প্রথম বার তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হল শহিদ ক্ষুদিরামের নাম। এত দিন পর্যন্ত শহিদ ক্ষুদিরাম থেকে ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, আশফাকউল্লাহ, মাস্টারদা, প্রীতিলতা সহ অসংখ্য বিপ্লবী শহিদদের তারা হিন্দু স্বার্থের বিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন। হঠাৎ কি তা হলে বিজেপি বা মোদিজিদের নতুন করে বোধোদয় ঘটেছে? আসলে ভোট এলে এই সমস্ত ভোটবাজ বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা নতুন নতুন ভেক ধারণ করেন। তাই সম্প্রতি দুর্গাপুরে জনসভায় ভাষণে জয় শ্রীরাম-এর পরিবর্তে জয় মা দুর্গা, জয় মা কালী স্লোগান দিয়েছেন বঙ্গভাষীদের মন জয় করবার জন্য। এদের সমস্ত ভক্তি শ্রদ্ধা আসলে ভোটের বেদিতেই নিবেদিত। তা হলে কি বিজেপি (পূর্বতন জনসংঘ), আরএসএস-এর ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ও বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শহিদদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেল? প্রতি বছরই ভোটের আগে তাদের দেশপ্রেম ও দেশভক্তি উথলে ওঠে। কাশ্মীরে কিছু না কিছু বিতর্কিত সন্ত্রাসবাদী ঘটনা বা মন্দির-মসজিদের বিবাদের ঘটনা ঘটিয়ে দেশের মানুষকে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয় যাতে ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ঘটে। এ বার কি তার ব্যত্যয় ঘটবে? দেশের মানুষের মনে কেমন খটকা লাগছে? হঠাৎ করে কেন তারা দেশের মানুষকে দেশপ্রেম ও দেশভক্তির পাঠ শেখানো শুরু করেছেন? মোদিজি দীর্ঘদিন আরএসএস এর প্রচারক ছিলেন। একটু ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যাক, ব্র্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ও নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভূমিকা কী ছিল?
স্বাধীনতা আন্দোলনে আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার কলঙ্কজনক ভূমিকা
১৯২৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠা হয় ডাক্তার বলিরাম হেডগেওয়ার এর নেতৃত্বে। হেডগেওয়ার এর পরে ১৯৪০ সালে দায়িত্ব নেন সংগঠনের দ্বিতীয় ব্যক্তি গুরু এম এস গোলওয়ালকর যিনি ছিলেন আরএসএসের মূল তাত্ত্বিক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হেডগেওয়ার ও গোলওয়ালকার দুজনেই ছিলেন হিটলারের ভক্ত ও ফ্যাসিবাদের সমর্থক। স্বাধীনতা আন্দোলনে সারা দেশে যখন অগণিত ছাত্র যুবক ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গাইছে, ওই উত্তাল দিনগুলোতে আরএসএসের কোনও কার্যকরী ভূমিকা ছিল না। এরা ছিলেন ব্রিটিশের পক্ষে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপক্ষে। স্বদেশি আন্দোলনের ওই যুগে গুরু গোলওয়ালকার বলেছিলেন, ‘দেশে যে স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে তা যথার্থ স্বাধীনতা আন্দোলন নয় এই স্বাধীনতা আন্দোলন প্রতিক্রিয়াশীল’, বলছেন, ‘ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ এবং সার্বজনীন বিপদের তত্ত্ব থেকে জাতিত্বের ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত হিন্দু জাতিতত্ত্বের সদর্থক অনুপ্রেরণা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। স্বাধীনতা আন্দোলনকে কার্যত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পর্যবসিত করা হয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধিতার সঙ্গে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদকে সমার্থক করে দেখা হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের উপরে এই প্রতিক্রিয়াশীল মতের প্রভাব সর্বনাশা হয়েছে। … তারাই একমাত্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক যারা অন্তরে হিন্দু জাতির গৌরব পোষণ করে, সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে। বাকি যারা দেশপ্রেম জাহির করে হিন্দু জাতির স্বার্থ হানি করছে তারা বিশ্বাসঘাতক ও দেশের শত্রু’।
অর্থাৎ আরএসএস-এর বিচারে স্বাধীনতা আন্দোলনের যারা প্রথম সারির নেতা বিপিনচন্দ্র পাল, বালগঙ্গাধর তিলক, লালা রাজপত রাই, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ থেকে শহিদ ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, আসফাকউল্লা, মাস্টারদা সূর্য সেন সহ নেতাজি সুভাষচন্দ্র পর্যন্ত সবাই বিশ্বাসঘাতক ও দেশের শত্রু। তাই গুরু গোলওয়ালকারের নির্দেশকে শিরোধার্য করে ১৯৪২-এর আগস্টের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতায় সংঘ পরিবারের সদস্যরা শুধু ব্রিটিশকে সমর্থন করেছে তাই নয়, বহু স্বদেশি আন্দোলনকারীকে গোপনে ধরিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার এবং নৌবিদ্রোহের সময় দেশ যখন উত্তাল তখন আরএসএস অদ্ভূত নীরবতা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে গোলওয়ালকারের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল, ‘Hindus don’t waste your energy fighting the British. Save your energy to fight our internal enemies that are Muslims Christians and Communists’. এ সব কথা পাওয়া যাবে গোলওয়ালকর লিখিত ‘Bunch of thoughts’ গ্রন্থে। আরএসএস এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছে এবং একে তাদের তত্ত্বগত ভিত্তি হিসেবে মানে। স্বাধীনতা আন্দোলনে এ এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই গুরু গোলওয়ালকরই হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি অমিত শাহ সহ আরএসএসের সমস্ত কর্মী ও প্রচারকদের চিন্তানায়ক। এই চিন্তার ভিত্তিতেই আজও আরএসএস পরিচালিত হয়। আরএসএস ও সংঘ পরিবারের এই জঘন্য রাজনীতির বিরুদ্ধে আপসহীন বিপ্লবী ধারার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী লোক ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থের লোভে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে … স্বাধীনতা সংগ্রামে এই শ্রেণির লোককেও শত্রুরূপে গণ্য করা প্রয়োজন। … হিন্দু ও মুসলমানের স্বার্থ পৃথক-এর চেয়ে মিথ্যা বাক্য আর কিছু হতে পারে না। হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে হিন্দু রাজের ধ্বনি শোনা যায়, এগুলো সর্বৈব অলস চিন্তা।’ নেতাজির মতে যারা দেশের শত্রু ছিলেন, তারা আজ বড় দেশপ্রেমী সেজেছে, দেশপ্রেমের ইজারা নিয়েছেন। অতীতের কলঙ্কজনক অধ্যায়কে চাপা দেবার জন্য এরা যা করছেন তা ধূর্তামি ছাড়া কিছু নয়।
ভোটের প্রয়োজন ও ক্ষুদিরাম
কয়েক মাস বাদেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। আগামী বছর পশ্চিমবাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। যে হেতু ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছিল মজফফরপুর জেলে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট এবং আজও প্রবীণদের মধ্যে ক্ষুদিরামের প্রতি শ্রদ্ধা ও আবেগ কাজ করে, তাই ক্ষুদিরামের নাম করে মোদিজির মরিয়া চেষ্টা এটা প্রমাণ করার জন্য যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা আছে। আর বাংলার মানুষের মেদিনীপুরের দামাল ছেলে শহিদ ক্ষুদিরামের প্রতি যে বিশেষ আবেগ আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আরএসএস ও সংঘ পরিবারের ইতিহাস–স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার ইতিহাস, বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। ইতিহা সাক্ষ্য দিচ্ছে, ঐতিহাসিক কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় যখন মহান বিপ্লবীদের ব্রিটিশ সরকার ফাঁসি দিচ্ছে, সব ক্ষেত্রেই আরএসএস অদ্ভূত নীরবতা পালন করেছে। এই আরএসএসেরই দীর্ঘদিনের প্রচারক ছিলেন মোদিজি। আরএসএস স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যে ভুল ছিল, তা কোথাও স্বীকার করেনি। তাই শহিদ ক্ষুদিরামের প্রতি এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন তার ‘মনের কথা’ নয়, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত কোনও শ্রদ্ধার প্রকাশও নয়। এ আসলে ভোটের দিকে তাকিয়ে একটা লোক ভোলানো কথামাত্র। নির্বাচনের প্রাক্কালে শহিদ ক্ষুদিরাম এর নাম নিয়ে ভোট পাওয়ার এই ভণ্ডামি মানুষ ক্ষমা করবে না। এর দ্বারা তাদের কলঙ্কিত ইতিহাসকেও মোছা যাবে না।