রাজনীতিবিমুখতা আজকের সমাজ-পরিবেশে প্রবল ভাবে আছে এবং নবীন প্রজন্মও তার দ্বারা প্রভাবিত, এ কথা অস্বীকার করা চলে না। কিন্তু অন্ধকারের বুকে জেগে থাকা আলোর রেখার মতো এর বিপরীত ছবিও যে এই সমাজেই আছে, তার সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল ৫ আগস্টের কলকাতা।
এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দলের প্রতিষ্ঠাতা মহান মার্ক্সবাদী দার্শনিক শিবদাস ঘোষের ৫০তম স্মরণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে সারা রাজ্য থেকে যে হাজার হাজার মানুষ এ দিন জড়ো হয়েছিলেন, তার একটা বিরাট অংশই ছাত্র-যুবক-তরুণ প্রজন্ম। কেউ কেউ বেশ কিছুদিন আছেন এই দলের সাথে, অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে। আবার অনেকে প্রথম পরিচিত হচ্ছেন শিবদাস ঘোষের চিন্তা এবং দলের আদর্শের সাথে। শুরু থেকেই চোখে পড়ছিল এক ঝাঁক তরুণ ছাত্রকর্মীর ব্যস্ততা। সভা শুরুর অনেক আগেই তারা চলে এসেছেন ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ের নির্দিষ্ট স্থানে, তাদের বুকে স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাজ। শ্রোতাদের জন্য চেয়ার পাতা, সবাইকে বসার জায়গা দেখিয়ে দেওয়া, শিশু ও বয়স্কদের সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখার মতো কাজগুলো তারা করছিলেন একাগ্র ভাবে, আনন্দের সাথে। মঞ্চে গণসঙ্গীতের দৃপ্ত সুরে দিনবদলের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন যারা, তাঁদেরও বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ বলতে সাধারণত যে উচ্ছৃঙ্খল ভিড়ের ছবি আমরা কাগজপত্রে দেখে থাকি এ দিনের সমাবেশ ছিল চরিত্রগতভাবেই তার চেয়ে আলাদা। এখানে এসেছিলেন সমাজের সেই মানুষগুলো, যারা চারপাশে ঘটে চলা শোষণ-অত্যাচার-অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করতে চান, জীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলো সমাধানের সত্যিকারের পথ পেতে চান। সেই স্বকীয়তার আভাস পাওয়া গেল সমাবেশে আসা ছাত্র-যুবদের কথাতেও।
দক্ষিণ কলকাতার একটি কলেজে কমিউনিকেটিভ ইংরাজি নিয়ে প্রথম বর্ষে পড়ছেন দ্যুতি ভট্টাচার্য। কেন এসেছেন এই সমাবেশে? উত্তরে দ্যুতি বললেন, এই দলের কর্মীদের দেখেছি,তাঁরা শুধু নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবেন না, বরং নিজেদের সুবিধা-অসুবিধার কথা না ভেবে নিঃস্বার্থভাবে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর কথা ভাবেন। অন্যান্য দলকে আমি এমন করে তাদের কথা ভাবতে দেখিনি। তাই এই দলের প্রতি আমারও একটা ভালোলাগা তৈরি হয়েছে, আরও ভালো করে জানব বলে এসেছি আজ। টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে সদ্য পদার্থবিদ্যার গবেষণা শেষ করে এসেছেন দিব্যশঙ্কর দাস। বললেন, আমার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে অনেককেই দেখেছি রাজনীতি নিয়ে, মার্ক্সবাদ নিয়ে আগ্রহী হচ্ছে, জানতে চাইছে। পৃথিবী জুড়ে জীবনের, পরিবেশের যে সংকট, তার সমাধান পেতে তারা মার্ক্সবাদের কথা জানতে চাইছে। কিন্তু অন্যান্য দলে এগুলো নিয়ে গভীর ভাবনা নেই। তাদের শুধু ভোটে জেতার কৌশল আর নানারকম প্রতিশ্রুতির কথা। এই দলের সমাবেশে, শিবদাস ঘোষের চিন্তার মধ্যে জীবনে মার্ক্সবাদী আদর্শকে প্রয়োগ করার কথা, বিপ্লবের পথ তৈরির কথা শুনতে পাই, যেটা খুব আকর্ষণ করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা স্নাতকোত্তরের ছাত্রী কৃষ্ণা রায় বললেন, এই দলের মধ্যে আমাদের দেশের মনীষীদের জীবনচর্চার যে ধারা, সেটাই প্রথম আকৃষ্ট করেছিল। আরেকটা জিনিস দেখেছি, গরিবদুঃখী মানুষকে সাহায্য করা তো নিশ্চয়ই দরকার, সেটা অনেকেই করেন। কিন্তু এই দলের কর্মসূচির মধ্যে, বক্তব্যের মধ্যে সবসময় সমাজের বঞ্চিত মানুষগুলোকে সচেতন করে তোলার একটা চেষ্টা থাকে, যাতে তারা নিজেদের দুঃখকষ্টের কারণটা বুঝতে পারে এবং সেই অবস্থাটা পাল্টানোর জন্য লড়তে পারে। এই চেষ্টাটা আমি আজ অন্য কোনও দলের মধ্যে দেখি না।
সমাবেশের শুরুতে ব্যান্ডের তালে তালে পা মিলিয়ে রক্তপতাকা হাতে মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের ছবিতে গার্ড অব অনার জানাচ্ছিল দলের কিশোর সংগঠন কমসোমলের সদস্যরা। লেনিনের রাশিয়ার কিশোর বিপ্লবী বাহিনীর অনুসরণে এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দলের এই আরেকটি অভিনব উদ্যোগ। নানারকম সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কমসোমলের সদস্যরা ছোটবেলা থেকেই বড় মানুষদের জীবন সংগ্রামের কথা শোনে, মানবিক মূল্যবোধের পাঠ নেয়, যৌথ জীবনের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেতে শেখে। মা-বাবারা সন্তানকে একজন ভালো মনের মানুষ করে তুলবেন বলে হাতে ধরে নিয়ে আসেন এই প্যারেডে যুক্ত করতে। এই প্যারেড দেখলে যেন গায়ে কাঁটা দেয়, বলছিলেন বরানগরের অনিন্দিতা মণ্ডল। দমদমের কপিলদেব সরকারের অনুভূতি, ‘মানুষের চোখেমুখে শুধু আবেগ নয়, বলিষ্ঠ বিশ্বাস দেখলাম। সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষের বক্তব্য শুনে সঠিক রাজনীতিকে চেনার ও বোঝার প্রয়োজন উপলব্ধি করলাম। এক তরুণ চিকিৎসকের কথায়, একজন ডাক্তার যেমন বিজ্ঞানের ভিত্তিতে রোগীর রোগ নির্ণয় করে ওষুধ দেয়, সারিয়ে তোলে, তেমনই আমাদের সমাজের রোগ নির্মূল করার জন্য এই দলের রাজনীতিই একমাত্র প্রতিষেধক বলে মনে হয় আমার। ইতিহাসের ছাত্রী এবং গবেষক শুভমিতা এসেছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগণা থেকে। নবজাগরণের কেন্দ্রভূমি এই বাংলার বুকেই আজ মহিলাদের নিরাপত্তা নেই। কোথায় কোন পথে এর সমাধান? কেন প্রশাসন বিচার করতে পারছে না এসব অন্যায়ের? মাথার মধ্যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়। গোটা দেশে এই যে হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি নিয়ে বিদ্বেষ আর হিংসা, এই ভারত কি চেয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা? আজ প্রভাস ঘোষের ভাষণ শুনে যেন অনেক প্রশ্নের উত্তর পেলাম, ভরসা পেলাম। মনে হচ্ছে, একদিনে না হলেও, একদিন এই দিন বদলাবেই। আর সেই দিনবদলের লড়াইতে একজন মানুষ হিসেবে আমারও সাধ্যমতো কিছু করা উচিত।
চারপাশের যে সমাজটা আমাদের চোখের সামনে পচে যাচ্ছে, মানুষ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া যেখানে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেই সমাজকে পাল্টানোর জন্য মানুষ হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের যে কিছু করার আছে, সেটাই যে প্রকৃত মর্যাদার ঠিকানা– কমরেড প্রভাস ঘোষের এই আহ্বান সেদিন এভাবেই ছুঁয়ে গেছে, উদ্দীপ্ত করেছে অসংখ্য ছাত্র, যুবককে।
ভোটসর্বস্ব রাজনীতি, একটি সুস্থ তরুণ মনকে আকর্ষণ করার মতো কিছু সেখানে আছে কি? ভোটের তরজা, কুকথার প্রতিযোগিতা, টাকা এবং নামযশের জন্য সকালে-বিকেলে দল-বদল, নেতা-মন্ত্রীদের চুরি দুর্নীতি– এই হচ্ছে এখন রাজনীতির চালু চেহারা। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় লালিত ছাত্র-যুবকদের কদর্য চেহারা দেখে মাঝে মাঝেই শিউরে উঠতে হয়। এই পাইয়ে দেওয়া এবং করে খাওয়ার রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে, আলোকস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে কমরেড শিবদাস ঘোষের হাতে গড়া এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দল, দাঁড়িয়ে আছে তার নীতি-আদর্শভিত্তিক বিপ্লবী রাজনীতির জোরেই। অন্যান্য দল প্রচুর টাকা, পেশিশক্তি, মিডিয়ার প্রচার দিয়ে যার নাগাল পায় না, সেই আদর্শের অমোঘ টানই আজও এ দলের প্রতি আকৃষ্ট করে যুবসমাজকে। কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, যার সম্মানবোধ আর মর্যাদাবোধ আছে, তাকেই তো যুবক বলে। প্রকৃত যুবক বলতে আমরা তাকেই বলি, যার মর্যাদাবোধ আছে, লড়বার তেজ আছে এবং যে অন্যায়ের মোকাবিলা করার সাহস রাখে। ৫ আগস্টের সমাবেশ থেকে সেই প্রকৃত যুবক হয়ে ওঠার স্বপ্ন আর অঙ্গীকার বুকে নিয়েই ফিরলেন ওঁরা।