
অপারেশন ‘সিঁদুর’ চলছে– ভারত পাকিস্তান সীমান্তের উভয় পারে মানুষের উন্মুখ চোখ টিভিতে, এই বুঝি ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ল! শত শত উড়ন্ত ড্রোনের দিকে চোখ রেখে মানুষ দেশপ্রেমের উ×ত্তেজনায় টগবগ করছে। টিভি অ্যাঙ্কররা গলা ফাটিয়ে প্রতি মুহূর্তে বিশ্লেষণ করে চলেছেন, কোন দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশি উন্নত তা নিয়ে। আপনি তখন ভাবছেন এইবার সন্ত্রাসবাদীরা আচ্ছা জব্দ হবে! এ দিকে পর্দার আড়ালে তখন হিসাব চলছে অন্য– বিশ্বের নানা দেশের অস্ত্র কোম্পানি, তাদের এজেন্ট এবং নানা দেশের প্রতিরক্ষা কর্তারা তখন মেপে চলেছেন কোন কোম্পানির কোন অস্ত্রটির বিধ্বংসী ক্ষমতা বেশি, কোনটা বেশি সংখ্যায় মানুষ মারে! যুদ্ধ, ধ্বংস, মৃত্যু, হাহাকার থেকে ফয়দা তোলার হিসাব কি শুধু বিদেশিরাই কষছিলেন? না, ছিলেন এ দেশের ধনকুবেররাও।
চাঙ্গা হল অস্ত্রের বাজার
অপারেশন সিঁদুর শেষ হতেই দেখা গেল ভারত-পাকিস্তান দুই দেশে অস্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কামান, ক্ষেপণাস্ত্র, নিখুঁতভাবে এমনকি চলমান লক্ষ্যেও আঘাত করতে সক্ষম অস্ত্র এবং অস্ত্র বহনকারী ড্রোন ইত্যাদির বাজার একেবারে তুঙ্গে। যুদ্ধ চলার সময়েই তাদের শেয়ার বাজারের দর তর তর করে উপরে উঠছে। এমনকি যে চিনের তৈরি পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যাকে ভারত ব্যর্থ বলেছে, সেই চিনা সংস্থার শেয়ার দরও চড়ছিল অবিশ্বাস্য গতিতে। যুদ্ধ শেষ হতেই ভারত ফোর্জ, আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড এরোস্পেস, প্রিমিয়ার এক্সপ্লোসিভস, মিউনিশনস ইন্ডিয়া, রিলায়েন্স ডিফেন্স, টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস, কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইয়ন্ত্রা ইত্যাদি ভারতীয় কোম্পানিগুলির ব্যস্ততা তুঙ্গে। ভারত সরকার তাদের একের পর এক অস্তে্রর অর্ডার দিচ্ছে, আসছে বিদেশি অর্ডারও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপারেশন সিঁদুরে তাদের অস্ত্রের ‘ডেমো’ দেওয়ার কাজটা সেরে রেখেছে কোম্পানিগুলো। ফলে এখন অর্ডারের জোয়ার এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, কোম্পানিগুলি যাতে অতি দ্রুত বিপুল হারে অস্ত্র উৎপাদন করতে পারে এবং ভবিষ্যতেও অর্ডারের অভাবে না ভোগে তা দেখার দায়িত্ব সরকারের। অর্ডারের অভাব হলে ভারত সরকারই নিয়মিত এদের অস্ত্র এবং যুদ্ধোপকরণ কিনে নেবে। কোম্পানির কর্তারা আশা করছেন, বিদেশে অস্ত্র রফতানির সুযোগও বাড়বে। একই সাথে বাড়বে বিদেশি কোম্পানির সাথে যৌথ উদ্যোগে ভারতের মাটিতে অস্ত্র নির্মাণও। যেমন পহেলগাম হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরে পরেই নতুন করে ফ্রান্স থেকে নৌবহরের উপযুক্ত রাফাল বিমান কেনার চুক্তি এমনভাবে হয়েছে যাতে এর থেকে আম্বানি এবং টাটা গোষ্ঠী লাভবান হয়। এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, এখন থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জামের উৎপাদন মূলত বেসরকারি কোম্পানির হাতেই থাকবে এবং এ জন্য সরকারি কোষাগার থেকে টাকার জোগানের অভাব কখনওই হবে না। বাস্তবেও দেখা গেল, চলতি বছরের কেন্দ্রীয় বাজেটে দেশি কোম্পানির থেকে অস্ত্র ও সরঞ্জাম কেনার খাতে বরাদ্দ ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকার ১৪ শতাংশ অর্থাৎ ২৪,৭৩০ কোটি টাকা প্রথম তিন মাসেই খরচ হয়ে গেছে। ফলে দ্রুততার সাথে ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করতে হয়েছে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ৮ জুলাই ২০২৫)। প্রসঙ্গত, সামরিক খাতে মোট বরাদ্দ ৬ লক্ষ ৮১ হাজার কোটি টাকা। এতেও কম পড়লে অসুবিধা নেই, সরকার আরও টাকা জোগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জনকল্যাণের বরাদ্দে টান
অস্ত্র উৎপাদন খাতে যে যথেচ্ছ বরাদ্দ বাড়িয়ে চলেছে সরকার, তা আসছে কোথা থেকে? অস্ত্র এবং সামরিক খাতে টাকার জোগান দিতে গিয়ে এই বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে গ্রামীণ কর্মসংস্থান যোজনা (এনরেগা), শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য সংস্থান, মৌলিক গবেষণা, পরিবেশ রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক খাতে বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই হয়েছে ব্যাপক ভাবে। ভারতের জিডিপি-র (মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন) ২.৫ শতাংশই ব্যয় হয় সামরিক খাতে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপি-র মাত্র ১.৮ শতাংশ, শিক্ষা খাতে ১ শতাংশের কম। মনে হতে পারে, কী আর করা যাবে, দেশকে রক্ষা করতে এই রকম মরিয়া হয়ে অস্ত্র তৈরিতে যথেচ্ছ খরচ না করে উপায় কী? কিন্তু অস্ত্র উৎপাদকের লক্ষ্য যদি দেশের নিরাপত্তার রক্ষা হয়, তবে তো তা শুধু ভারতের প্রতিরক্ষার কাজেই লাগা উচিত! তা ইজরায়েলের হাতে গিয়ে প্যালেস্টাইনের গণহত্যায় কাজে লাগছে কেন, কেন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ভারতীয় কোম্পানির অস্ত্র যাচ্ছে, কেন নাগারনো-কারাবাখ এলাকা থেকে আর্মেনিয়দের তাড়াতে অজারবাইজানকে অস্ত্র দিচ্ছে ভারতীয় কোম্পানি! জনকল্যাণে টাকা ছাঁটাই করে অন্য দেশের নানা দ্বন্দ্ব বিরোধে অস্ত্র যোগান দেওয়ায় ভারতীয়দের কী লাভ? বিশ্বের নানা দেশে ভারতীয় অস্ত্র কোম্পানিগুলি বাজার ধরতে ঝাঁপাচ্ছে কেন? এই কি ভারতীয় ধনকুবেররদের দেশ রক্ষার নমুনা?
এ প্রসঙ্গে আর একটা ঐতিহাসিক তথ্য জেনে রাখা ভাল– টাটা কোম্পানি, যারা নাকি এখন ভারতের জন্য ‘দেশপ্রেমিক’ অস্ত্র বানাচ্ছে, তারা স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশের জন্য ট্যাঙ্ক বানিয়েছে, কামান, আর্মার্ড কার তৈরিতে হাত পাকিয়েছে। এর জন্য ব্রিটিশ ভাইসরয় টাটাদের বিশেষ প্রশংসা করেছিলেন (নিখিল সুরঃ মহাপ্রলয়ের সম্ভাবনা, দেশ, ২ মার্চ ২০২৫)। এই অস্ত্র ব্রিটিশ মিলিটারি ব্যবহার করেছেআজাদ হিন্দ ফৌজের বিরুদ্ধেও। টাটাদের তাতে আপত্তি ছিল না। কারণ, একচেটিয়া পুঁজির মালিক ধনকুবেরদের কাছেমুনাফাই প্রথম এবং শেষ কথা। দেশপ্রেম সেই মুনাফার কারবারে একটা হাতিয়ার মাত্র।
বিদেশি কোম্পানিগুলিরও অস্ত্রেরপ্রদর্শনী ‘সিঁদুরে’
ভারত পাক সংঘর্ষকে অস্ত্রের প্রদর্শনী হিসাবে ব্যবহার করেছে নানা দেশের অস্ত্র কোম্পানি। চিন উল্লসিত, কারণ তার অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান লড়েছে। ফ্রান্সের দাসো কোম্পানির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অন্তত একটা রাফাল বিমান অপারেশন সিঁদুরের সময় ধ্বংস হয়েছে (আনন্দবাজার পত্রিকা ৮ জুলাই ২০২৫)। চিনের দাবি, তাদের অস্ত্রের জোরেই পাকিস্তান রাফালের মতো বিমান ধ্বংস করতে পেরেছে। এ দিকে পাকিস্তানে ড্রোনের জোগানদার তুরস্ক, আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বেচা চিন, ভারতের ড্রোনের জোগানদার ইজরায়েল, ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার জোগানদার রাশিয়া ছাড়াও ফ্রান্স ইত্যাদি দেশও প্রবলভাবে অস্ত্র প্রদর্শনীর কাজে ‘সিঁদুর’-কে ব্যবহার করছে। চাপান উতোর চলছে কার অস্ত্র বেশি ক্ষমতাশালী তা নিয়ে। এই মারণাস্ত্র নির্মাণ প্রতিযোগিতার ডামাডোলে ভুলিয়ে দেওয়া হল কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ভারতীয় গ্রামগুলির বাসিন্দাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কথা। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও সে দেশের সরকার কিংবা এই মারণাস্ত্রে কারবারিদের কারও মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা তাদের একটা বিষয় নিয়েই, তা হল অস্ত্র বেচে মুনাফা।
যুদ্ধই আজ পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি
আজকের সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়ায় যুদ্ধই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্বজোড়া মন্দার এই সময়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে হলে বিশ্বের কোথাও না কোথাও ছোট হোক বা বড় হোক যুদ্ধ তাদের লাগিয়েই রাখতে হয়। এজন্য অন্তত আক্রান্ত হওয়ার ত্রাস বজায় রাখতে হবে, তবেই বজায় থাকবে অস্ত্র ব্যবসার রমরমা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার বড় ছোট সব অংশীদারের কাছেই আজ অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হল অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক পণ্যের অবাধ ব্যবসা এবং সেই কাজে সরকারের প্রত্যক্ষ মদত, অর্থাৎ অর্থনীতির সামরিকীকরণ।
সম্প্রতি মার্কিন যুদ্ধজোট ন্যাটোর বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপে সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রতিটি সদস্য দেশ তার জিডিপি-র অন্তত ৫ শতাংশ যুদ্ধ সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় করতে বাধ্য থাকবে। আমেরিকান শাসকরা জানে এই অর্থের সবচেয়ে বড় অংশ ঢুকবে অস্ত্র উৎপাদনে এগিয়ে থাকা মার্কিন অস্ত্র কোম্পানিগুলোর সিন্দুকেই। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে বিশ্ব জুড়ে সামরিক খাতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২.৭১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। গত এক বছরে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৪ শতাংশ। বিশ্বের মোট জিডিপি-র ২.৫ শতাংশ এখন সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে। সামরিক খাতে ব্যয়ে বিশ্বে ভারতের স্থান পঞ্চম (৮৬.১ বিলিয়ন ডলার)। প্রথম আমেরিকা, দ্বিতীয় চিন, তৃতীয় রাশিয়া, চতুর্থ জার্মানি। ন্যাটো গোষ্ঠীর ৩২টি দেশ সম্মিলিতভাবে সামরিক খাতে ব্যয় করে ১৫০৬ বিলিয়ন ডলার।
যে ট্রাম্প সাহেবকে নাকি শান্তির দূত হিসাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তিনি সাম্প্রতিক ইজরায়েল-আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধে মাত্র ১২ দিনে খরচ করেছেন ১ বিলিয়ন ডলার। তিনি অস্ত্র ব্যবসার জন্য জিডিপি-র ৫ শতাংশ ব্যয় করতে চাপ দিলেওদরিদ্র দেশগুলিতে মার্কিন সাহায্য প্রকল্প ‘ইউএসএড’-এর বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছেন। রাষ্ট্রসংঘের সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টের মাধ্যমে দারিদ্র দূরীকরণে যেটুকু সাহায্য আমেরিকা সহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো দিত, তা ক্রমাগত বন্ধ হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ন্যাটোর কর্তা থেকে শুরু করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বলে চলেছেন, যুদ্ধ ঠেকানোর জন্যই যুদ্ধাস্ত্রে আরও বিনিয়োগ দরকার। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ? কাকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ? ক্রমবর্ধমান অনাহার, অর্ধাহার, দারিদ্র যে বিশ্বের নিত্য সঙ্গী, যে বিশ্বে শরণার্থী সমস্যা ভয়াবহ আকার নিয়েছে, সেই দুনিয়ায় বসে মানুষকে রক্ষা করবে অস্ত্র! আজ লেবানন, সিরিয়া, সুদান, ঘানা, ইয়েমেন কিংবা ইউক্রেনের মতো নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলিতে হয় আমেরিকা অথবা অন্য কোনও সাম্রাজ্যবাদী জোটের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ অথবা গৃহযুদ্ধ সামলাতে জিডিপি-র বড় অংশ খরচ করতে হচ্ছে সামরিক খাতে। কিছু ক্ষেত্রে তা জিডিপি-র ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। তাদের কাছে অস্ত্র বেচছে ওই সাম্রাজ্যবাদীরাই। এ দিকে দেশগুলিতে খাদ্যাভাব, স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভাবে মানুষ মরছে দলে দলে। যুদ্ধ থেকে বাঁচতে শরণার্থী হিসাবে অনিশ্চিত সমুদ্রে ভেসে কত মানুষ প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে! অস্ত্র ব্যবসার বড় শরিক হয়ে ওঠা ভারতও ক্ষুধা সূচকে তলিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধ-আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে
যারা যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য অস্ত্র নির্মাণের কথা বলছেন, তারাও জানেন, আরও অস্ত্র মানে আরও বেশি যুদ্ধ। আরও যুদ্ধ মানে আরও উন্নত অস্ত্র। এর যেন শেষ নেই! আবার এই যুদ্ধের জন্য বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয় করতে হলে যুদ্ধে জনগণের সমর্থন প্রয়োজন। তার জন্য প্রয়োজন দেশের সামনে কোনও না কোনও শত্রু খাড়া করা। তাই দেখা যায় দুনিয়ার সমস্ত বড় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো হয় আমেরিকা বা অন্য কোনও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদতে তৈরি এবং পুষ্ট। আইসিস, আল-কায়দার মতো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর জন্ম যে মার্কিন কর্তাদেরই হাতে তা আজ বিশ্বের মানুষ জানে। এ দিকে এই সাম্রাজ্যবাদীদের মদতেই কোথাও আওয়াজ তোলা হয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কোথাও বা অন্য কোনও দেশকে শত্রু হিসাবে তুলে ধরে শাসকরা তৈরি করে আতঙ্ক। এ কথা শুধু মার্ক্সবাদীরা বলছেন না, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের একেবারে নিখাদ গবেষক সমাজবিজ্ঞানীরাই দেখাচ্ছেন, আজ নানা দেশের শাসকরা নিজের দেশের মানুষকে ভয় দেখাতে অন্য কোনও দেশ বা কোনও একটা পক্ষকে শত্রু সাজাচ্ছে (নিসসিম মান্নাথুক্কারেনঃ দ্য হিন্দু, ৯.৭.২০২৫)। যেমন ন্যাটো এবং মার্কিন সাম্রাজবাদের কর্তারা রাশিয়া, চিনের মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে তাদের দেশের মানুষের শত্রু বলে তুলে ধরে। বিপরীতে এই দুই শক্তিও তাই করে। ভারত এবং পাকিস্তান সরকার পরস্পরকে শত্রু বলে তুলে ধরে, মধ্য প্রাচ্যের এক একটা দেশ অন্য এক একটা গোষ্ঠীকে শত্রু সাজায়। অথচ এ ভীতির বড় অংশটাই বাস্তব নয়। কেউ কিন্তু এই সত্যি কাথাটা বলে না যে, শান্তির পথেই এই সমস্যাগুলোর বেশিরভাগই মিটে যেতে পারে। তার কারণ এই আতঙ্কের মানসিকতাকে ভর করেই জনগণের কাছ থেকে অস্ত্র ব্যবসার বা অস্ত্র বানানোর সমর্থন আদায় করে শাসকরা। ঠিক যেমন আমরা দেখলাম ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক যুদ্ধে শাসক বিজেপি এবং তার অনুগত বাহিনী কীভাবে সারা দেশে একটা উন্মাদনা তৈরি করে ফেলল। এই পথেই আজ সারা দুনিয়া জুড়ে কোনও না কোনও যুদ্ধ চলতে থাকে। এই সুযোগে অস্ত্র ব্যবসার বাজারটা আরও পোক্ত হয়। মনে পড়ে যায় ১৯৭০-এর দশকে মার্কিন স্বরাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঙ্গারের উক্তি– পিস ইন ভিয়েতনাম, ইজ ওয়ার এগেইনস্ট ইউএস (ভিয়েতনামে শান্তি মানে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ)।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিলিটারি ব্যুরোক্রেটিক কমপ্লেক্স
তা হলে পুঁজিবাদী শাসকদের কাছে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কী? প্রধান প্রয়োজন অস্ত্র ব্যবসায় লগ্নি এবং তা থেকে ধনকুবেরদের মুনাফা। সত্যটা এতই স্পষ্ট যে, এখনবিশ্ববিদ্যালয় স্তরের সমাজ বিজ্ঞানের গবেষণাপত্রে অহরহ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিলিটারি ব্যুরোক্রেটিক কমপ্লেক্স’ শব্দটা ব্যবহার হচ্ছে। সরকার আমলাতন্ত্র সামরিক কর্তা এবং পুঁজিপতিদের মিলিত চক্র যে কৃত্রিম ভাবে যুদ্ধ উত্তেজনা তৈরি করে অর্থনীতিকে সামরিকীকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে এই সত্যকে আজ তাদের স্বীকার করতে হচ্ছে। ফলে এটা মার্ক্সবাদীদের মনগড়া বলে আর কর্পোরেট সংবাদ ব্যবসায়ীরা উড়িয়ে দিতে পারছেন না। পুঁজিবাদী শোষণে রিক্ত সাধারণ মানুষের নিঃশেষিত ক্রয়-ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পুঁজিপতিদের বাজার আর তেজি রাখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের সামান্য কেনাকাটায় পুঁজিপতিদের সর্বোচ্চ মুনাফার লক্ষ্য চরিতার্থ হতে পারছে না।
ফলে সমস্ত পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশকেই আজ সামরিক অর্থনীতির ওপরই নির্ভর করে চলতে হচ্ছে। মহান স্ট্যালিন বহু আগেই দেখিয়েছেন, অর্থনীতির সামরিকীকরণের মাধ্যমেই পুঁজিবাদ তার ক্রমবর্দ্ধমান সংকট কাটাতে চাইছে। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়মেই তা একটা সংকট থেকে বেরোতে গিয়ে নতুন নতুন সংকটে পড়ছে। লেনিন-স্ট্যালিনের সুযোগ্য ছাত্র বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৬২-তে দেখিয়েছেন, ‘… (অর্থনীতির) সামরিকীকরণ পুঁজিবাদী দ্বন্দ্ব ও সংকটকে ক্রমাগত আরও বাড়িয়ে তুলছে। সংকট যত বাড়ছে, অর্থনীতিতেও তত সামরিকীকরণ ঘটছে। এইভাবে চক্রবৎ একটা অশুভ প্রক্রিয়া কাজ করে চলেছে এবং তার পরিণতিতে বল্গাহীনভাবে বেড়ে চলেছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ (সময়ের আহ্বান, নির্বাচিত রচনাবলি দ্বিতীয় খণ্ড)।
তিনি ভারতীয় পুঁজিবাদী শাসকদের চরিত্রকে তুলে ধরে দেখিয়েছেন, ‘শাসক বুর্জোয়াশ্রেণি সামরিকীকরণের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘জাতির বিপদ’ ‘বিদেশি আক্রমণের বিপদ’ এই ধরনের সহজে আকর্ষণকারী স্লোগান তুলে একটি জরুরিকালীন অবস্থা জারি করার অনুকূল মানসিকতার জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং বহুলাংশে সফলও হয়েছে। মিলিটারি খাতে ব্যয়বৃদ্ধি করে সঙ্কুচিত অভ্যন্তরীণ বাজারের কৃত্রিম তেজিভাব বজায় রাখার এবং ভারতবর্ষের সামরিক শক্তিকে বাড়িয়ে তোলার প্রয়োজনেই ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি যত দীর্ঘ সময় সম্ভব চিনের সাথে সীমান্ত সমস্যা, পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীর সমস্যা এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সাথে তার নানা বিতর্কিত বিষয়কে জিইয়ে রাখার পথে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক যে, অর্থনীতির সংকট যত তীব্র হবে, জনসাধারণের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে দিতে এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে শাসক শ্রেণি তত বেশি এই সমস্ত বিষয় নিয়ে হৈচৈ করবে।’ (ওই)
স্মরণ করা দরকার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন বারবার বিশ্ব জুড়ে নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক সমস্ত অস্ত্র ধ্বংসের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু শান্তির ভেকধারী কোনও পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তাতে সাড়া দেয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক শিবির ছিল শান্তির পক্ষে অতন্দ্র প্রহরীর মতো। তার অনুপস্থিতি আজ বিশ্বের ৬০০ কোটি মানুষের জীবনকে যুদ্ধবাজদের হাতের মুঠোয় ঠেলে দিয়েছে। শান্তি আজ পুঁজিবাদী শাসকদের কাছে মৃত্যুবাণ স্বরূপ। বিশ্ব জুড়ে তীব্র শক্তিশালী শান্তি আন্দোলনই আজ কিছুটা হলেও লাগামছাড়া অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। এটাই আজ সমস্ত দেশের যথার্থ দেশপ্রেমিক মানুষের কর্তব্য।