
২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বইমেলার ৪৯তম বাৎসরিক আয়োজন হয়ে গেল সল্টলেকের করুণাময়ীতে। ১৩টি দেশের স্টল সহ কমবেশি প্রায় ১৮০০-র উপর বুক স্টল ছিল এ বারের বইমেলায়।
এর মধ্যে গণদাবী স্টল ছিল ৫৬৩ নম্বরে। এখানে দশ দিন আট ঘণ্টা করে মানুষের আসা-যাওয়া দেখার সুযোগ আমি পেয়েছি। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের যে ভিড় প্রত্যক্ষ করলাম তা এক কথায় অনবদ্য। বই, যা কি না অজানাকে জানবার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, সেখানে ভিড় মানে তো অনুসন্ধিৎসু মানুষেরই ভিড়। আমার উপস্থিতির দিনগুলোয় দিনে দশ হাজার থেকে আঠেরো হাজার টাকার বই স্টল থেকে সংগ্রাহকদের হাতে পৌঁছেছে। যে বইগুলোর বিনিময় মূল্য মাত্র ১০ টাকা থেকে ৫০, ৬০ টাকার মধ্যে। ১০০ বা তার বেশি মূল্যের বইও ছিল, কিন্তু তার সংগ্রহকারীর সংখ্যা ততটা নয়। এ তো গেল মূল্যমান উপস্থাপনায় একটা বিষয়কে অনুমানে প্রতীয়মান করার চেষ্টা মাত্র। এর সঙ্গে আরও যা দেখেছি তা মনে রাখার মতো। লাল কাপড়ে সজ্জিত স্টল, ভিতরে ঢুকলেই মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে-তুঙ ও শিবদাস ঘোষের কোটেশন সংবলিত ছবি। এ সব দেখে সদ্য কলেজে পা রাখা ছাত্রছাত্রীর দল, এক একটা বই হাতে নিয়ে উপস্থিত কর্মীদের সাথে কথোপকথন, উজ্জ্বল চোখমুখে অনন্ত জিজ্ঞাসার ব্যাপ্তি, এ সবই নিবিড় ভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের যে ভলান্টিয়ার সংগ্রহকারীদের সহায়তা করছিলেন, তাঁরাও সংগ্রহকারীকে একের জায়গায় তিন বা চার-পাঁচটি বই সংগ্রহে অনুপ্রাণিত করেছেন। মনে মনে প্রশ্ন করেছি, এরা কারা? এই যে প্রচারের আলোয় মানুষকে বিভ্রান্তিতে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রচারমাধ্যমগুলো, তারা যে স্রোতটি সৃষ্টি করে, তার শক্তি তো কম নয়! তা হলে এরা কারা? এরাই কি সেই অনন্তশক্তিময় যৌবন, যাকে ‘যা ইচ্ছে তাই’ দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না? এরাই কি অন্ধকারের মাঝে বিদ্যুৎ ঝলকের রূপোলি রেখা? রাস্তার ধারে পুজো প্যান্ডেলের পাশে বইয়ের স্টলে থেকেছি, সেই ভিড়ে ভেসে যাওয়া যৌবনের কথোপকথনের শব্দচয়ন প্রত্যক্ষ করেছি। শ্লীলতার অপঘাত মৃত্যু দেখেছি। বইমেলার ভিড়ও দেখলাম। অযথা ঠেলাঠেলির বদলে সযত্নে একজন আর একজনকে পথ করে দিচ্ছেন দেখেছি। কোনও স্টলে কোনও একটা বই হয়তো বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রচারে এসেছে, তা সংগ্রহের জন্য লম্বা লাইন দেখেছি, কোথাও কোনও অসন্তোষ নজরে বা কানে আসেনি।
সর্বোপরি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ এবং তরুণ ছাত্রছাত্রীর এই ভিড় এক স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে প্রেরণা দিচ্ছে, এ কথা না ভাবার কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।
আশীস বসু, চেতলা, কলকাতা

২ জানুয়ারি, ইঞ্জিনিয়ারিং ফোর্থ ইয়ারের এক ছাত্র কমরেড শিবদাস ঘোষের বই এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) স্টলে তার বন্ধুকে দেখাচ্ছেন। ‘মার্ক্সবাদ ও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ বইটি হাতে নিলেন। ‘কেন ভারতবর্ষের মাটিতে এস ইউ সি আই (সি) একমাত্র সাম্যবাদী দল’ বইটি নিতে বলায় উত্তরে বললেন, ১৪ বছর বয়সে আমি তা পড়ে ফেলেছি। বাবার হাত ধরে আপনাদের স্টল থেকেই বইটি কিনেছিলাম। বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে আপনাদেরই সঠিক এবং আদর্শবাদী দল বলে আমার মনে হয়। তাই বন্ধুকেও নিতে বলছি। বই নিয়ে যাচ্ছি, পড়ব আপনাদের সাথে ভবিষ্যতে দেখা হবে।
এক ছাত্রী এস ইউ সি আই (সি)-র স্টলে এসে বলল, মার্ক্সবাদের উপর বই দিন। ভাই উচ্চমাধ্যমিক দেবে, আসতে পারেনি, আমাকে বই নিয়ে যেতে বলেছে। ভাইকে ফোনে ধরিয়ে দেয়। আমি বললাম এটা এসইউসিআই (সি) দলের স্টল। ছাত্রটি আমায় বলল, দেড়শো টাকার মধ্যে মার্ক্সবাদের উপর যা যা বই আছে আমায় দিন। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর আপনাদের সাথে এই বইগুলি নিয়ে আমার কথা হবে।