
পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী বিধানসভায় ৫ ফেব্রুয়ারি যে অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট বা ভোট অন অ্যাকাউন্টস পেশ করেছেন, তাতে আগামী এক বছরের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা না হোক, অন্তত রাজ্য সরকারের বিগত এক বছরের সাফল্য-ব্যর্থতা এবং আগামী সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়া পর্যন্ত একটা আর্থিক পরিকল্পনা থাকার কথা। পরিসংখ্যান সহ রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থার সামগ্রিক বিশ্লেষণ, জনসাধারণের উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা রূপায়ণে কত টাকা লাগবে ও তা কোন কোন ক্ষেত্র থেকে সরকার কি ভাবে সংগ্রহ করবে, সে সংক্রান্ত বিশদ বিশ্লেষণ বিধানসভায় বাজেট বক্তৃতার মধ্য দিয়ে রাজ্যবাসীর জানার কথা।
কিন্তু এ সব বাদ দিয়ে ইদানীং বাজেট বক্তৃতা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু ফাঁকা কথার ফুলঝুরি। সাম্প্রতিক রাজ্য বাজেটও এরই উদাহরণ হয়ে থাকল। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় পেশ হওয়া বাজেটে রাজ্যের অর্থনীতির হাল-হকিকতের তথ্যনিষ্ঠ কোনও ছবি দেখতে পাওয়া গেল না। শোনা গেল না পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির বেহাল দশা ঘোচানোর উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কোনও পরিকল্পনার কথা। তার বদলে অর্থ দফতরের প্রতিমন্ত্রী সরকারের সাফল্যের বেশ কিছু দাবি বিধানসভায় উপস্থিত করলেন যেগুলির বাস্তব ভিত্তি তো নেই-ই, নেই তথ্য কিংবা পরিসংখ্যানের কোনও সমর্থনও। দাবি করা হল রাজ্যে বিপুল কর্মসংস্থান হয়েছে, শিল্প পরিকাঠামোর বিকাশ ঘটানো হয়েছে দ্রুত গতিতে এবং কাজ পাওয়ার লক্ষে্য বেকারদের প্রশিক্ষণেও গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। এ সব যে নেহাত কথার কথা, বেকার সমস্যায় জর্জরিত রাজ্যের ভুক্তভোগী মানুষ মাত্রেই জানেন। দাবির পক্ষে তথ্য পরিবেশন করার প্রয়োজনও বোধ করেননি মন্ত্রী মহাশয়া। বেকার সমস্যা প্রসঙ্গে উঠে আসেনি স্কুল, হাসপাতাল সহ সরকারি দফতরগুলিতে শূন্য পড়ে থাকা অসংখ্য পদ পূরণের কোনও পরিকল্পনার কথাও।
আসন্ন বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে এবারের বাজেট বক্তৃতাকে সুচারু ভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার। ভোটবাক্সে সমর্থনের বন্যা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য ঢালাও অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে বাজেটে। মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা বাড়ানো থেকে শুরু করে বেকার যুবকদের জন্য অনুদান, খেতমজুরদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া, সিভিক ভলান্টিয়ার, পার্শ্বশিক্ষক, অঙ্গনওয়াড়ি ও আশাকর্মীদের ভাতা সামান্য হলেও বাড়িয়ে দিয়ে যেন সকলকেই খুশি করতে চেয়েছে সরকার।
কিন্তু এ যেন সরকারের দয়ার দান। এই সরকার যদি রাজ্যের খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনমান উন্নত করতে সত্যিই আগ্রহী হত, তা হলে বাজেটে তার ছাপ থাকত। তার বদলে মানুষের হাতে কিছু নগদ টাকা গুঁজে দেওয়ার ব্যবস্থা করল তারা, যার মধ্যে গরিব-মেহনতি মানুষের প্রতি দরদের চিহ্নমাত্র নেই। আশাকর্মীদের মতো স্কিমকর্মীদের কথাই ধরা যাক। রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে বলে বাজেট ভাষণে সাফল্য দাবি করেছেন মন্ত্রী। অথচ এই সাফল্যের কারিগর আশাকর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে ভাতা বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের মাত্র মাসিক এক হাজার টাকা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে বাজেটে। একই ভাবে মিড-ডে মিল, যা সরকারি স্কুলে পাঠরত রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের পেটভরা খাবারের একমাত্র ভরসা, সেই খাতেও রাজ্যের দেয় অংশে সামান্য টাকাও বাড়াল না তৃণমূল সরকার। এই বাজেটে মিড-ডে মিল কর্মীদের বিষয়ে কোনও উল্লেখই নেই।
তা ছাড়া ভোটের মরশুমে নতুন নানা প্রকল্প চালু করে ও পুরনো প্রকল্পে টাকা বাড়িয়ে জনমোহিনী সাজার যে চেষ্টা তৃণমূল সরকার করল, তার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা কোথা থেকে আসবে, সে সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ কোনও হিসেবই কিন্তু মন্ত্রী দাখিল করলেন না বিধানসভায়। গত বাজেটে টাকার অভাবে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছিল সরকার। এ কথাও প্রকাশ্যে এসেছে যে, গত বছর অধিকাংশ দফতরকেই তাদের বরাদ্দের একটা ছোট অংশ হাতে পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি ও রাজকোষ ঘাটতি দুটির চেহারাই আশঙ্কাজনক। মোট ধারের পরিমাণও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ধার শোধ করতেই আয়ের বিপুল অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে। মোট আয়ের তুলনায় খরচের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি। এই পরিস্থিতিতে এতগুলি নতুন ও পুরনো প্রকল্পের আর্থিক বোঝা সরকার কোন উপায়ে বহন করবে, সে সম্পর্কে বাজেট বক্তৃতায় একটি শব্দও নেই।
ফলে বুঝতে অসুবিধা নেই যে ভোটের মুখে এবারের বাজেট বক্তৃতা বাস্তবে গোটাটাই ফাঁকা বুলি। সাধারণ মানুষও আজ এ কথা বোঝেন। তাই বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আজ আর বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় না। এ কথা খুব ভালো করেই বোঝেন শাসক ও বিরোধী দলের নেতারাও। তাই বাজেট পেশের পরদিন বিধানসভায় বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা চাপা পড়ে গেল বিজেপি ও তৃণমূল বিধায়কদের হিন্দু-মুসলমান তরজায়।
এ দিন মাদ্রাসা শিক্ষায় বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে আপত্তি তুলে মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়, দুষ্কৃতী তৈরি হয় বলে গলা ফাটালেন এক বিজেপি বিধায়ক। শুরু হয়ে গেল ধুন্ধূমার কাণ্ড। শিকেয় উঠল বাজেট আলোচনা। ফলে বোঝা যায়, শাসক অথবা বিরোধী– কোনও সংসদীয় রাজনৈতিক দলের ভাবনাতেই বাজেট জনসাধারণের কল্যাণসাধনের উপায় হিসাবে গণ্য হয় না।
এ সব দলের নেতা-নেত্রীদের একমাত্র চিন্তার বিষয় হল ভোটে জেতা ও ক্ষমতা দখলে রাখা। তারই জন্য সমর্পিত তাঁদের যাবতীয় কার্যকলাপ। ফলে অন্যান্য বারের মতো এ বারের রাজ্য বাজেটের সঙ্গেও সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে-খাওয়া মানুষের দুর্দশা লাঘবের যথারীতি কোনও রকম সম্পর্ক নেই।