Breaking News

পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির নেপথ্যে, প্রসঙ্গঃ ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস

বিজেপি পশ্চিমবাংলার ক্ষমতায় বসেই ঘোষণা করেছে, তারা ২০ জুন দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে পালন করবে। বিজেপি নেতাদের ব্যাখ্যা, দেশ ভাগের সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সঙ্গে থাকবে কি না, তা ১৯৪৭ সালের এই দিনটিতেই স্থির হয়েছিল এবং হিন্দু মহাসভার তৎকালীন নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সঙ্গে থাকতেই পারত না। বাংলাভাগে শ্যামাপ্রসাদের ‘কৃতিত্ব’ তুলে ধরতে তাঁরা হঠাৎই ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘোষণা করেন। ইতিপূর্বে তাঁদের বশংবদ রাজ্যপাল ২০২৩ সালে ওই দিনটি রাজভবনে উদযাপন করেন। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারও ঠিক তার পাল্টা ১ বৈশাখ রাজ্য জুড়ে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করে।

কিন্তু বিজেপি হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে ২০ জুনকেই বেছে নিল কেন? এর সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীরই বা সম্পর্ক কোথায়? যে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যত দূর সম্ভব ধর্ম-ভাষা-আঞ্চলিকতা-প্রাদেশিকতার ঊর্ধ্বে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল, সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদর ভূমিকাটি জানা দরকার। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যে হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব দিয়েছেন এ ক্ষেত্রে তার ভূমিকাই বা কী?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ শিরোমণি ব্রিটিশ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্য দিকে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের বিচার, নৌবিদ্রোহ প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে ভারত জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভ তুঙ্গে ওঠে। ব্রিটেনের নবনিযুক্ত লেবার পার্টির সরকার বোঝে যে, ভারতে তাদের সাম্রাজ্যের পাট গোটানোর সময় এসে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটেন ভারতকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিমধ্যে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের যে দাবি তুলেছিল, ব্রিটিশ তা-ও মেনে নেয়। গান্ধীজির আপত্তি উপেক্ষা করে ক্ষমতার উদগ্র লোভে কংগ্রেস নেতারা দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নেন। জিন্নাও প্রস্তাবিত পাকিস্তানকে প্রথমে ‘খণ্ডিত ও পোকায় খাওয়া’ বলে আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত তাতে রাজি হন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের খুঁটিনাটি ও দিনক্ষণ স্থির হয়ে যাওয়ার পর তার আইনি রূপ দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় স্বাধীনতা- ১৯৪৭ নামে একটি আইন পাশ করে। তার তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়, নির্ধারিত দিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ভারত শাসন বিধি-১৯৩৫ অনুসারে গঠিত বঙ্গ প্রদেশের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না এবং তার জায়গায় দুটি ‘নতুন’ প্রদেশ গঠিত হবে। তাদের একটির নাম হবে পূর্ববঙ্গ, অপরটির পশ্চিমবঙ্গ।

বাংলার শেষ বিধানসভাতেই বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত

অনেক আলাপ-আলোচনা, দাঙ্গা, রক্তপাতের পর যখন স্থির হল, ভারতকে দু’ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি ‘ডমিনিয়ন’ তৈরি করা হবে এবং এই ডমিনিয়নের কাছে ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, তখন বাংলা ও পাঞ্জাবকেও দু’ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ভারত ভাগের সঙ্গে এই দুটি প্রদেশ ভাগের সিদ্ধান্তের তফাত ছিল। ভারত ভাগ, পাকিস্তান তৈরি, ক্ষমতা হস্তান্তর একসূত্রে গাঁথা থাকলেও বাংলা বা পাঞ্জাব ভাগের বিষয়টি তা ছিল না। বাংলা ও পাঞ্জাব দ্বিখণ্ডিত হবে কি না, তাদের একাংশ পাকিস্তানের ও অপরাংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, সে সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল দুই প্রদেশের অবিভক্ত বিধানসভার সদস্যদের উপর।

১৯৪৬ সালে নির্বাচিত অবিভক্ত বাংলার শেষ বিধানসভাকেই স্থির করতে হয়েছিল বাংলা ভাগ হবে কি না, বাংলার একাংশ ভারতের ও অপরাংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে কি না। এ সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ এর ৩ জুন এক বিবৃতিতে বলে, বাংলা ও পাঞ্জাব প্রাদেশিক বিধানসভা দুটির প্রত্যেককে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বৈঠকে বসতে হবে। একটিতে থাকবেন মুসলিম সংখ্যাধিক্যের জেলাগুলির প্রতিনিধিরা, অপরটিতে থাকবেন অবশিষ্ট জেলাগুলির প্রতিনিধিরা। দুই অংশের সদস্যরা আলাদা ভাবে বৈঠক করে, ভোট দিয়ে স্থির করবেন তাঁদের প্রদেশ ভাগ করা হবে কি না। যদি দুই অংশের কোনও এক ভাগের বিধায়করাও স্থির করেন যে, প্রদেশ ভাগ হবে, তবে প্রদেশ ভাগের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি প্রদেশ ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা হলে দুটি অংশের বিধায়কদেরই আলাদা ভাবে বসে স্থির করতে হবে যে তাদের অংশ দুটি সংবিধান সভার কোনটিতে যোগ দেবে।

১৯৪৬-এ যখন অবিভক্ত বাংলা বিধানসভার নির্বাচন হয়, তখন বাংলা ভাগের কথা ওঠেনি। ভারত ভাগ হবে কি না তা-ই ছিল ইস্যু। মুসলিম লিগ নির্বাচন লড়েছিল পাকিস্তানের দাবিতে, কংগ্রেসের নির্বাচনী স্লোগান ছিল অবিভক্ত ভারতের।

বঙ্গ বিভাগ হবে কি না তা স্থির করার জন্য বাংলা বিধানসভার অধিবেশন হয় ১৯৪৭-এর ২০ জুন। ব্রিটিশ সরকারের স্থির করে দেওয়া পদ্ধতি মেনে বিধানসভা প্রথমে ১২৬-৯০ ভোটে সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাংলা নতুন সংবিধান সভায় যোগ দেবে। যেহেতু বিধানসভায় মুসলিম লিগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, তাই বিধানসভার সব মুসলিম সদস্যই অবিভক্ত বাংলার নতুন সংবিধান সভায় যোগ দেওয়ার অর্থাৎ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সপক্ষে ভোট দেন। এর মধ্যে দিয়ে ভারত এবং পাকিস্তানের বাইরে স্বাধীন বা স্বায়ত্বশাসিত পৃথক বাংলা তৈরির যে প্রস্তাব কোনও কোনও মহল থেকে তোলা হচ্ছিল, তা-ও নাকচ হয়ে যায়। তারপর মুসলিম সংখ্যাধিক্য নেই যে সব জেলায় তার প্রতিনিধিরা পৃথক বৈঠকে বসে ৫৮-২১ ভোটে সিদ্ধান্ত নেন বাংলা প্রদেশকে ভাগ করতে হবে এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় সংবিধান সভায় যোগ দেবে। তেমনই যে জেলাগুলিতে মুসলিম সংখ্যাধিক্য তাদের প্রতিনিধিরা আলাদা বৈঠকে বসে ১০৬-৩৫ ভোটে প্রস্তাব পাশ করে যে, বঙ্গবিভাগ করা ঠিক হবে না। কিন্তু যদি বঙ্গবিভাগ হয় তা হলে পূর্ববঙ্গ নতুন সংবিধান সভায় অর্থাৎ পাকিস্তানে যোগ দেবে।

কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগই বাংলা ভাগ করেছিল

লক্ষ করার বিষয়, অবিভক্ত বাংলার বিধানসভায় ৫৮ জন সদস্য, যাঁরা বাংলা ভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে হিন্দু মহাসভার মাত্র একজনই প্রতিনিধি ছিলেন, তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। বুঝতে অসুবিধা হয় না, তাঁর একটি ভোটের দ্বারা কোনও কিছুই স্থির হয়নি, এবং হওয়া সম্ভবও ছিল না। মূলত কংগ্রেস ও অন্যান্য দলগুলির ভোটেই তা স্থির হয়েছিল। ইতিহাস থেকে স্পষ্ট, বাংলাভাগের পিছনে শ্যামাপ্রসাদের আলাদা কোনও ভূমিকা ছিল না এবং বিজেপি শ্যামাপ্রসাদকে হিন্দুদের ত্রাতা বানাতে যে প্রচার করছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অনৈতিহাসিক। ঠিক যেমন অবিভক্ত পাঞ্জাব দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পূর্ব পাঞ্জাব ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং সেখানে হিন্দু মহাসভার কোনও সদস্যই ছিল না। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভারতের সঙ্গে থাকা না থাকা নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে যে দাবি বিজেপি নেতারা আজ তুলছেন তা সত্য নয়। তা হলে বাংলা ভাগে শ্যামাপ্রসাদের কি কিছুই ভূমিকা ছিল না? দেখা যাক।

কংগ্রেস রাজনীতির মধ্যে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও তাঁর চিন্তার মধ্যে থাকা মুসলিম বিদ্বেষ তাঁকে ক্রমে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং তিনি হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে এসে তিনি হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার প্রধান চিন্তক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অবিভক্ত বাংলায় দেশভাগের পটভূমিকায় হিন্দু মানসিকতার ভিতরে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী চিন্তা-চেতনার প্রসার ঘটিয়ে সেই চিন্তাকে সাম্প্রদায়িক সাম্প্রদায়িক অভিমুখে পরিচালিত করেন এবং তাকে তীব্র মুসলিম বিদ্বেষে পর্যবসিত করে হিন্দুদের তথাকথিত ত্রাতা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেন। এ কাজে তিনি পূর্ণ সহায়তা পান সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের, অন্য দিকে রাজ্যের পুঁজিপতি-শিল্পপতি-বৃহৎ ব্যবসায়ীদের।

এখানে তৎকালীন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাটিরও উল্লেখ করা দরকার। বিধানসভায় তখন তাঁদের তিনজন সদস্য ছিলেন এবং তাঁরা বাংলা ভাগের পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। বাস্তবে সিপিআই একটি সঠিক কমিউনিস্ট পার্টি না হওয়ায়, মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভার মতো তারাও ‘ধর্মের ভিত্তিতে জাতি’র কথা বলে দ্বিজাতি তত্তে্বর নামে পাকিস্তান গঠনকে সমর্থন করেছিল। তাদের এই ধারণা ছিল সম্পূর্ণ অমার্ক্সবাদী ও অনৈতিহাসিক।

স্বাধীনতা আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদ এবং হিন্দু মহাসভার ভূমিকা

বাস্তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন তাতে শ্যামাপ্রসাদ বা তাঁর হিন্দু মহাসভা যোগ দেয়নি শুধু নয়, তার বিরোধিতা করেছিল। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যখন দেশ উত্তাল তখন হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ব্রিটিশ শাসকদের খুশি করতে চেয়েছিলেন। সুভাষচন্দে্রর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ যখন ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়ছে, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অকাতরে প্রাণ দিচ্ছেন তখন আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার নেতারা হিন্দু যুবকদের ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তখন ছাত্ররা ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাককে স্যালুট করেনি বলে তাদের বেত মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর ব্রিটিশপন্থী, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের রাজনীতির কারণেই ছাত্র সমাজ তো বটেই বাংলার মানুষ শ্যামাপ্রসাদকে কখনওই আইকন হিসাবে গ্রহণ করেনি। গ্রহণ করেছিল আপসহীন সংগ্রামী এবং ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার অনুসারী নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে।

কংগ্রেসও পরিচালিত হয়েছে হিন্দুত্ববাদী চিন্তার দ্বারা

নেতাজি সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালীন কংগ্রেসের সদস্যদের কোনও সাম্প্রদায়িক সংগঠন তথা হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লিগের সদস্য হওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। অত্যন্ত দুঃখের কথা, তাঁকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের পর এই নিষেধাজ্ঞা না উঠলেও কংগ্রেস রাজনীতিতে বিশেষত এ রাজ্যের কংগ্রেস নেতৃত্বের সেই সময়ের একটা বড় অংশই হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চিন্তার দ্বারা ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ যেহেতু তত দিনে প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র অর্জন করেছিল, তারই অংশ ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদের রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে কংগ্রেসও গোটা স্বাধীনতা আন্দোলনেই ধর্মের সঙ্গে আপস করে চলেছে। মুসলিম বিদ্বেষকে সম্বল করে হিন্দু ভাবাবেগকে শক্তিশালী করার ভেতর দিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী অংশটি। ১৯৪৬-এর প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস কার্যত হিন্দু মহাসভার স্লোগান এবং কর্মসূচিকে হাইজ্যাক করে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক প্রচার চালায় এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে হিন্দু মহাসভাকে টেক্কা দেয়।

একদিকে মুসলিম লিগের মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, অন্য দিকে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছিল ১৯৪৬-এর দাঙ্গায়। দুই পক্ষের নেতাদের তাল ঠোকাঠুকির পরিণতিতে কলকাতায় ভয়ঙ্কর দাঙ্গা বেধে যায়, যা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত। এর কিছু দিন পরেই নোয়াখালিতেও দাঙ্গা বাধে। দাঙ্গায় মৃত্যু হয়েছিল দুই ধর্মেরই নিরীহ সাধারণ নাগরিকদের এবং দুই পক্ষের সমাজবিরোধীদের। এই সময়ে কোনও পক্ষের নেতাদেরই দেখা যায়নি।

দেশভাগ অনিবার্য ছিল না

দুই পক্ষের নেতারা যতই পরস্পরের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উগরে দিন, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে এই বিদ্বেষ স্বাভাবিক ছিল না, তা বোঝা যায় সেই সময়ের অনেকগুলি ঘটনায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশের ভারত ছাড়া যখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কংগ্রেস এবং লিগ নেতারা যখন ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ কোন শর্তে হবে, কোন অংশ কোন দেশে যাবে তা খুঁজতে মাথার চুল ছিঁড়ছেন, তখন এই সাম্প্রদায়িক সমস্যার এক অভূতপূর্ব সমাধান নিয়ে হাজির হল আজাদ হিন্দ ফৌজ। শুরু হল আজাদ হিন্দ বাহিনীর তিন সেনানায়ক শাহ নওয়াজ খান, জি এস ধীলন ও পি কে সাইগল-এর বিচার। যথাক্রমে মুসলমান, শিখ ও হিন্দু। যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে কংগ্রেস নেতারা শেষ পর্যন্ত দেশ ভাগে ও বাংলা ভাগে রাজি হন সেই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধানে আজাদ হিন্দ ফৌজে ও সরকারে, আজাদ হিন্দ শাসিত অঞ্চলে যে সাফল্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র দেখিয়েছিলেন তা ততক্ষণে দেশের মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় এবং মানুষ তার মধ্যেই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান খুঁজে পান। আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনা ও অফিসারদের মুক্তির দাবিতে দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে।

গণআন্দোলনে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ ছিল না

আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দিদের মুক্তির দাবিতে গণবিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৪৫ এর ২১ নভেম্বর কলকাতায় সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট হয়। সে দিন ছাত্রদের শোভাযাত্রায় পুলিশ গুলি চালালে রামেশ্বর বন্দে্যাপাধ্যায় নামে এক ছাত্র এবং আবদুস সালাম নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পর দিন কলকাতা শহর অচল হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ, ট্রাম-বাস বন্ধ থাকে, বন্ধ থাকে বহু দোকান। রামেশ্বরের মৃতদেহ নিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষের শোকযাত্রা হয়। কয়েক মাস পরে আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলি খানের বিচার শুরু হলে আবার দেশজোড়া আলোড়ন শুরু হয়। রশিদ আলি দিবস উপলক্ষে কলকাতায় ছাত্র ধর্মঘট হয়। আন্দোলন কলকাতার বাইরে শিল্পাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। বহু জায়গায় জনতা স্টেশনে আগুন লাগায়। ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে। সরকারি হিসাব অনুসারে ১২ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি, তিন দিনে কলকাতায় মিলিটারির গুলিতে ৮৪ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন ৩০০ জন। দিল্লিতে ক্রুদ্ধ জনতা সরকারি অফিস ও বাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে ও সরকারি সম্পত্তির প্রভূত ক্ষতি হয়।

ওই বছরেই ২৯ জুলাই ডাক-তার কর্মীদের ধর্মঘটের সমর্থনে সারা দেশের সঙ্গে বাংলা প্রদেশে ধর্ম ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে যে ঐক্য দেখা দিয়েছিল তা কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও লিগ নেতাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অসারতাকেই প্রমাণ করেছিল। এমনকি আগস্টে সাম্প্রদায়িক দলগুলির প্রত্যক্ষ মদতে কলকাতায় এবং অক্টোবরে নোয়াখালিতে ভয়াবহ দাঙ্গায় হিন্দু-মুসলিম নিধনের ঠিক পরেই সারা বাংলা প্রদেশ জুড়েই তেভাগা আন্দোলনেও দেখা যায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। একের পর এই সব আন্দোলনে ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে এই দলগুলির নেতারা যদি আন্তরিকতার সাথে অসাম্প্রদায়িক তথা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির চর্চা করতেন এবং সেই পথে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতেন তবে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ অনিবার্য হত না।

শ্যামাপ্রসাদ কি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন

বিজেপি নেতারা হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন শ্যামাপ্রসাদকে যতই পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির কারিগর হিসাবে তুলে ধরুন, হিন্দু বাঙালির ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরুন, বাস্তবে তাঁর চিন্তা এবং কাজকর্ম সাম্প্রদায়িক ছিল। যদিও এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাই স্বাধীনতার পর জনসংঘে পরিণত হওয়া হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এ রাজ্যে খুব একটা জায়গা করতে পারেনি। শ্যামাপ্রসাদ এবং তাঁর সহযোগীরা যদি সত্যিই দেশ ভাগ করে, বাংলা ভাগ করে ভারতবাসীর, বাঙালির মঙ্গল করতেন তবে আজাদ হিন্দ বাহিনীর একজন সৈনিককেও দেশের মানুষ যে ভাবে নেতাজি সুভাষচন্দে্রর প্রতিনিধি হিসাবে মাথায় তুলে জয়ধ্বনি দিয়েছিল, শ্যামাপ্রসাদকেও সে ভাবে মাথায় তুলে নিত। নেয়নি। হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতা হিসাবেই তিনি পরিচিত থেকে গেছেন। কারণ, দেশভাগে জনগণের কোনও মঙ্গল ছিল না। দেশভাগ বাংলার দুই অংশে কয়েক যুগ ধরে বাস করা লাখ লাখ মানুষকে ভিটেমাটি, জমি, পরিচিত পরিবেশ, প্রতিবেশী, সব কিছু ছেড়ে অনিশ্চিত দিকে পাড়ি দিতে বাধ্য করেছিল। বিপুল পরিমাণ মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছিল। তাদের সব কিছু লুঠ হয়েছিল, অসংখ্য নারী ধর্ষিতা হয়েছিলেন। অর্থাৎ মৃত্যু, যন্ত্রণা, হাহাকারের মধ্য দিয়েই দেশভাগ হয়েছিল। তাই দেশভাগ কোনও কৃতিত্বের বিষয় নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদও শুরু থেকেই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ তথা ‘বিভাজন এবং শাসন’ নীতি নিয়ে দেশ শাসন করেছে, তেমনই ভারতের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল করতে দেশভাগ চেয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে খণ্ডিত ভারতের এক-একটি অংশকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিতে চেয়েছে। শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ব্রিটিশের এই সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাকেই কার্যকর করতে সাহায্য করেছে।

২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপনের ডাক সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত

দেশভাগের ভয়ঙ্কর পরিণতির শিকার ছিন্নমূল মানুষদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা হিন্দুত্ববাদীরা শুরু থেকেই করে আসছে। কিন্তু তারা সফল হয়নি। বিজেপি সরকারি ক্ষমতা পাওয়ার পর সেই চেষ্টা তারা আবার জোর কদমে শুরু করেছে। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে ২০ জুন দিনটিকে বের করে এনে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে চালানোর চেষ্টা সেই হীন উদ্দেশ্যেই।

দেশভাগের প্রবল যন্ত্রণাদায়ক ঘা, ছিন্নমূল হওয়া মানুষের মনের মধ্যে যা অনেকটাই শুকিয়ে এসেছে, তাকেই নতুন করে খুঁচিয়ে তোলাটাই আজ বিজেপির বিশেষ প্রয়োজন। বাংলার নবজাগরণ আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, বামপন্থী আন্দোলন সাধারণ মানুষের বড় অংশের মধ্যে যে চেতনার জন্ম দিয়েছিল, সেই সংগ্রামী চেতনার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার জায়গা ছিল না। সাম্প্রদায়িকতাকে সে ঘৃণা করেছে, প্রতিরোধ করেছে, প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বিজেপি নেতারা জানেন, আজ পশ্চিমবাংলায় বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে জায়গা করে দিতে হলে বাংলার এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ভোলাতে হবে। তার জন্যই সাম্প্রদায়িক অতীতকে খুঁচিয়ে তোলা, তার জন্যই ২০ জুন পালনের ডাক।

সাধারণ মানুষ যদি এই জঘন্য ষড়যন্তে্রর বিরুদ্ধে সক্রিয় না হয়, তবে শুধু ২০ জুনেই বিজেপি থামবে না, কাল অন্য একটা দিবস, পরের দিন আর একটা দিবস, যার গায়ে বিন্দুমাত্র সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ আছে তা খুঁজে বের করবে এবং তাকে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুত্বের, বিদ্বেষের, সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলবে। দিবস যদি পালন করতেই হয়, নেতাজি-ভগৎ সিং-ক্ষুদিরাম সহ বিপ্লবীদের স্মরণে তা পালন করা দরকার, যারা ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত শোষণহীন ভারত গড়ার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন।