Breaking News

সর্বহারা শ্রেণিকে বন্ধু ও শত্রুর পার্থক্য চিনতে হবে—ভি আই লেনিন

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কী তার মধ্যেই আছে সংশোধনবাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রবণতার স্বাভাবিক পরিচয়। ‘আন্দোলনটাই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়’– সংশোধনবাদের মর্মবস্তুকে চেনাতে অনেক দীর্ঘ প্রবন্ধের চেয়ে বার্নস্টাইনের বহুল প্রচলিত এই বুলিটিই সবচেয়ে উপযুক্ত। এক এক ঘটনার প্রেক্ষিতে এক এক রকম আচরণ, প্রতিদিন পরিস্থিতি বুঝে সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে অবস্থান পাল্টানো, সর্বহারা শ্রেণির মূল স্বার্থ এবং সমগ্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ও পুঁজিবাদেরবিবর্তনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি ভুলে যাওয়া, তাৎক্ষণিক বাস্তবতা কিংবা সুবিধালাভের জন্য কপটতার রাস্তায় গিয়ে এইসব মূল স্বার্থ বলি দেওয়া– এটাই হল সংশোধনবাদের নীতি। এই নীতির চরিত্র থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে এটি অসংখ্য রূপ ধারণ করতে পারে। একেবারেই গুরুত্বহীনকোনও ‘নতুন’ প্রশ্ন, ঘটনার গতির অতি অকিঞ্চিৎকর পরিবর্তন, যা অপ্রত্যাশিত ও অদৃষ্টপূর্ব হলেও বিকাশের মূল ধারার ক্ষেত্রে একেবারেই তাৎপর্যহীন ও নিতান্তই ক্ষণিকের বিষয়, তার থেকেও অবশ্যম্ভাবী রূপে সংশোধনবাদের নানা রূপ জন্ম নেয়।

সংশোধনবাদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে কি না তা নির্ধারিত হয় আধুনিক সমাজের মধ্যে থাকা তার শ্রেণি ভিত্তির জোরে। সংশোধনবাদ একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা। …

পুঁজিবাদী সমাজে সংশোধনবাদের অবশ্যম্ভাবিতা কোথায় নিহিত? বিভিন্ন জাতীয় বৈশিষ্ট্য এবং পুঁজিবাদী বিকাশের বিভিন্ন মাত্রার মধ্যে পার্থক্যের চেয়েও এটা আরও বেশি গভীরে নিহিত কেন? তার কারণ, প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশে সর্বহারার পাশাপাশি সর্বদাই থাকে পেটি বুর্জোয়া, ক্ষুদ্র মালিকদের একটা বিরাটস্তর। ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন থেকেই পুঁজিবাদের উদ্ভব এবং এর মধ্য দিয়ে নিরন্তর তার জন্ম হয়ে চলেছে। পুঁজিবাদ অনিবার্য ভাবে বারবার নতুন কতগুলি ‘মধ্যবর্তী স্তরের’ উদ্ভব ঘটায় (কারখানার বিভিন্ন শাখা, বাড়িতে বসে কাজ, বৃহদায়তন শিল্পের চাহিদা মেটানোর জন্যে দেশের সর্বত্র ছড়ানো বাইসাইকেল, মোটরগাড়ি ইত্যাদির ছোট ছোট কারখানা)। নতুন নতুন এই ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা আবার অনিবার্য ভাবেই প্রলেতারিয়েতের সারিতে গিয়ে পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই ঢিলেঢালা ও উদার শ্রমিক পার্টিগুলির সদস্যদের মধ্যে পেটিবুর্জোয়া বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি বারবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এটাই হওয়ার কথা এবং এটা খুবই স্বাভাবিক যে এমনটা হতেই থাকবে যতক্ষণ না সর্বহারা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। কিন্তু জনসমষ্টির অধিকাংশের ‘সম্পূর্ণ’ সর্বহারায় পরিণত হওয়াকে সর্বহারা বিপ্লবের জন্য অত্যাবশ্যক মনে করলে বিরাট ভুল হবে। এখন আমরা কেবল মতাদর্শের জগতেই, মার্ক্সের চিন্তার নানা তত্ত্বগত সংশোধন নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে প্রায়শই একটা লড়াইয়ের সম্মুখীন হচ্ছি, শ্রমিক আন্দোলনের এক একটা তুচ্ছ প্রশ্নে সংশোধনবাদীদের সঙ্গে কৌশলগত পার্থক্য এবং তার ভিত্তিতে ভাঙন হিসেবেই শুধু এখন যা বাস্তবে মাথা চাড়া দিচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণিকে অনিবার্য ভাবেই এমন এক বৃহৎ পরিসরে এর মোকাবিলা করতে হবে, এখনকার সাথে যার কোনও তুলনা চলে না। যখন সর্বহারা বিপ্লব সমস্ত বিতর্কিত প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলবে এবং জনগণের ভূমিকা নির্ধারণের মতো অতি প্রয়োজনীয় ও তৎপরতার সাথে পালনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ওপর সমস্ত পার্থক্যকে কেন্দ্রীভূত করে তুলবে, তখন লড়াইয়ের উত্তাপের মধ্যে বন্ধুদের থেকে শত্রুকে পৃথক করতে পারা চাই এবং শত্রুর উপরে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্যে ক্ষতিকর সহযোগীদের বর্জন করা তখন অতিপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে।

মার্ক্সবাদ এবং সংশোধনবাদ