
১১ জুন কলকাতার কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত স্লোগান গর্জনে পথ হাঁটল হাজার হাজার মানুষের এক বিশাল মিছিল। আহ্বান জানিয়েছিল এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)। এ মিছিল সোচ্চারে বলে গেল, ‘আছে, প্রাণ আছে’। যে শিশু মধ্যরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে দেখেছে এক দানবীয় বুলডোজার তার প্রিয় ঘরটিকে মুহূর্তে চুরমার করে দিচ্ছে, যন্ত্রণাবিদ্ধ সেই নিষ্পাপ অপলক চোখের ভাষা বুকে নিয়ে এ মিছিল পথ হাঁটছিল। সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কাছে এক অসহায় মায়ের নিষ্ফল আবেদন– ‘বাচ্চাটা ঘুমোচ্ছে, এখনই ঘরটা ভেঙে দেবেন না’– আঁচড় কেটেছিল মিছিলে হাঁটা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। মিছিল কিছুতেই ভুলতে পারছিল না, সেই নবতিপর বৃদ্ধকে যিনি বুলডোজারের আঘাতে গুঁড়িয়ে যাওয়া ঘরে ফিরে ফিরে আসছিলেন, যদি তাঁর জীবনদায়ী ওষুধ ও ইনহেলারগুলি কোনও মতে উদ্ধার করা যায়! এ মিছিলের হাজারো মানুষের বুকে জমে ছিল লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিকের ‘ডিলিটেড’ ভোটার হয়ে অনিশ্চিত জীবন কাটানোর গভীর দীর্ঘশ্বাস। যে কিশোরী কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে দুই দেশের মাঝের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ বসে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে অসহায় আর্তি জানায় তার পরিচয় খোঁজার, এ মিছিলের বুকে ছিল তার চোখের জলের ছবি। যে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ উদ্বিগ্ন তাঁর ঘরে বিদ্যুতের স্মার্ট মিটার বসিয়ে সরকারের লুঠের পরিকল্পনায়, শিক্ষা ধ্বংসের ব্লু প্রিন্ট জাতীয় শিক্ষানীতির কপি রাজ্যে চালুর সংবাদে সন্তানের ভবিষ্যত ধ্বংসের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন যাঁরা, তাঁদের কথাও বহন করে নিয়ে চলেছিল এই মিছিল।
সংগ্রামী বামপন্থী দল এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর স্বল্প সময়ের ডাকে তীব্র দাবদাহকে উপেক্ষা করে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে সে দিন জড়ো হওয়া মানুষের মধ্যে কে নেই–সব হারানো হকার-বস্তিবাসী, বৈধ নাগরিক হয়েও ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ভুক্তভোগী মানুষ, মহিলা, ছাত্র-যুব, কৃষক, কলকারখানার শ্রমিক, আইনজীবী, ডাক্তার, অধ্যাপক, শিক্ষক সহ সমাজের সব অংশের মানুষ। দৃষ্টিহীনদেরও দেখা গেল একে অপরের হাত ধরে হাঁটছেন। জেলা থেকে রওনা হয়ে এসেছেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, তবু পথশ্রমে দেহের ক্লান্তি তাঁদের চলার ছন্দকে থামিয়ে দিতে পারেনি। যেন টগবগ করে ফুটছিলেন ওঁরা। শিশু কোলে নিয়ে এসেছিলেন বহু মা। দুপুর রোদের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়া সন্তানের মাথাটা কাঁধে এলিয়ে দিয়ে ওঁরা মিছিলে হাঁটছিলেন। চোখে মুখে ফুটে উঠছিল সন্তানের জন্য শিক্ষা বাঁচানোর স্বপ্ন। নিজেদের জীবন-জীবিকা নাগরিক অধিকার রক্ষার তাগিদ। মিছিলে মুহুর্মুহু ধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিরোধের বার্তা– ‘উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া হকার ও বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা চলবে না’, ‘পেট্রল-ডিজেল-রান্নার গ্যাসের দাম কমাতে হবে’, ‘বিদ্যুতের স্মার্ট মিটার ও মাশুল বৃদ্ধি প্রত্যাহার করতে হবে’, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিল করতে হবে’, ‘তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের ট্রাইবুনালে দ্রুত নিষ্পত্তি করে বৈধ নাগরিকদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে’। কলেজ স্ট্রিট, নির্মলচন্দ্র স্ট্রিট, এস এন ব্যানার্জী রোড হয়ে মিছিল কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে পৌঁছতেই এগিয়ে এলেন চাঁদনি চকের ব্যবসায়ীরা, লেনিন সরণি, এস এন ব্যানার্জী রোডের হকাররাও এসে দাঁড়িয়েছেন। ফুলের তোড়া নিয়ে এগিয়ে এলেন তাঁরা। অনেকেই মিছিলে যোগ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। রাস্তার ধার থেকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগান তুলছিলেন অনেকেই। চোখে মুখে তাঁদের সোৎসাহ আগ্রহ।
মাত্র এক মাস বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকারি গদি দখল করেছে। তার মধ্যেই রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষের মনে ধিকি ধিকি জ্বলতে শুরু করেছে সরকার বিরোধী ক্ষোভের আগুন। জেলায় জেলায় ইতিমধ্যেই বিক্ষোভ, মিছিল, প্রতিবাদ প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। এই মিছিল ছিল তারই সম্মিলিত ফল। একই দিনে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে আলাদা মিছিল হয়েছে। পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুরেও ওই দিন হয়েছে উচ্ছেদ বিরোধী মিছিল। এত কম সময়ের ব্যবধানে মানুষকে যে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে শামিল হতে হবে, এপ্রিলের শেষে ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় সাধারণ মানুষ বোধহয় ভাবতেও পারেননি। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি স্লোগান তুলেছিল– ‘পাল্টানো দরকার’। কিন্তু কী পাল্টানো দরকার ছিল? শুধুই কি সরকারি দলের পরিবর্তন চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষ, নিজেদের কষ্টকর জীবনযাপনের পরিবর্তন নয়? ভোটের আগে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন– তাঁরা জিতলে সাড়ে চারশো টাকায় রান্নার গ্যাস পাওয়া যাবে। অথচ বর্তমানে গ্যাসের দাম প্রায় এক হাজার টাকা। সরকারের কোনও উচ্চবাচ্য নেই। বিরোধী আসনে থেকে যিনি ২৩ মার্চ ২০২৫ দাবি করেছিলেন দুশো ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দিতে হবে, এর সাত দিন পর দাবি করেছিলেন, স্মার্ট মিটার লাগানো চলবে না। বিজেপির সেই বিরোধী দলনেতাই মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসা মাত্র দু’কোটি বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। এ ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবাদ বিক্ষোভ যাতে গড়ে না ওঠে, তার কৌশল হিসাবে প্রথমেই প্রতি সরকারি কর্মচারীর বাড়িতে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক বলে নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ওপর ফতোয়া জারি হয়েছে কোনও সরকারি জনবিরোধী নীতি ও অন্যায়ের প্রতিবাদ তাঁরা করতে পারবেন না। মানুষ আশা করেছিলেন, নবনির্বাচিত ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার গণতন্ত্রের শর্ত মেনে তালিকা থেকে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভোটার তালিকা থেকে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের কৌশলে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে সেটাকেই এখন তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানোর হাতিয়ার করছে বিজেপি সরকার। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুযোগ থেকে তাঁদের বঞ্চিত করার কথা সাড়ম্বরে ঘোষণা করেছেন রাজ্যের এক মন্ত্রী। সরকারি প্রকল্পগুলির নকশা এমন ভাবেই তৈরি করা হচ্ছে যাতে যোগ্য বহু মানুষই এর থেকে বঞ্চিত হবেন। বেশিরভাগ অংশের গরিব সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙক্ষা যে আবারও পদদলিত হতে চলেছে এবং এই সরকার যে ডবল ইঞ্জিনের তীব্র গতিতে গরিব মানুষকে সর্বস্বান্ত করে পুঁজিপতিদের সেবাদাস হিসাবে ভূমিকা পালন করে চলেছে, এ কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আশাহত জনগণের সেই যন্ত্রণাই ব্যক্ত হতে চেয়ে মিছিলে মিলিত হয়েছে গত ১১ জুন।
মিছিলের শুরুতে কলেজ স্ট্রিটের সমাবেশে আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্য গভীর মনোযোগ শুনেছেন আশ-পাশের অসংখ্য মানুষও। বই বিক্রেতারা কান পেতে ছিলেন এই সমাবেশের কথা শুনতে। বক্তব্য রাখলেন নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেতা কমরেড গোপাল বিশ্বাস, হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা শান্তি ঘোষ, কল্পনা দত্ত, সংযুক্তা দত্ত, শিক্ষা আন্দোলনের নেতা বিকাশ কুমার, এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের নেতা সেলিম আখতার। রাজ্যব্যাপী আন্দোলনগুলিকে তীব্রতর করার পক্ষে এক প্রস্তাব পাঠ করেন এসইউসিআই(সি)-র রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও কলকাতা জেলা সম্পাদক কমরেড নভেন্দু পাল। সব শেষে বলেন দলের পলিটবুরো সদস্য এবং রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এ মিছিল নির্বাচনী প্রচারের নয়। ভোটের রাজনীতিতে দলের নাম সামনে আনার জন্য এ মিছিল নয়। এ মিছিল সদ্য-নির্বাচিত সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) সেই লড়াইয়ের শক্তি। তিনি বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা, মার্ক্সবাদী দার্শনিক সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের ছাত্র যাঁরা, তাঁরা সত্যের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে গরিব মেহনতি মানুষের পক্ষে বিপ্লবী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে লড়েন। সরকারি ক্ষমতায় থাকা বা না-থাকা দিয়ে আন্দোলনের শক্তি পরীক্ষা হয় না। আজও যারা লড়াইয়ের শক্তি, যারা অন্তর থেকে পুঁজিপতি শ্রেণির সেবাদাস সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চান, তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহTান জানান তিনি। বলেন, সংগ্রামী বামপন্থার সত্যিকারের জাগরণ হোক।
দুপুর আড়াইটে নাগাদ কলেজ স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে গিয়ে মিছিল শেষ হয়, তখন বিকেল প্রায় পাঁচটা বেজে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ানোর বার্তা নিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ফিরে গেলেন সংগ্রামী মেহনতি মানুষ।