
বহরমপুরঃ দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রচার-পর্ব পেরিয়ে ১২ ডিসেম্বর। কোচবিহার থেকে যাত্রা শুরু করে অঙ্গীকার যাত্রীরা এসে পৌঁছেছেন আমার জেলায়, আমার শহর বহরমপুরে। গত ৯ ডিসেম্বর এ দেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম-মৃত্যুদিনে বাংলার চার প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে যে ঐতিহাসিক পদযাত্রা, অভয়া-নির্ভয়া সহ অজস্র নির্যাতিতার কান্না বুকে নিয়ে শত-শত মহিলা প্রতিবাদের মশাল জ্বেলে সেই মিছিলকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র কলকাতা অভিমুখে। যুগ যুগ ধরে যাদের কণ্ঠস্বরকে চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, তাদের দৃপ্ত স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে এই শহরের রাজপথ। এ শহর ইতিপূর্বে এমন মিছিল কখনও দেখেনি। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য তাদের সহযাত্রী হতে পেরেছি, তাদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছি, জীবনের দীর্ঘ পথচলায় এই কিছুক্ষণের স্মৃতি বারবার মনে পড়বে। একদিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত শাসকের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে প্রশ্ন, অন্য দিকে হাতে হাত রেখে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভালোবাসার উষ্ণতা। ওদিকে মঞ্চ থেকে তখন ভেসে আসছে সমবেত কণ্ঠে ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’-র সুর। অঙ্গীকার যাত্রীদের সংবর্ধনা জানাচ্ছেন আইনজীবী থেকে আশাকর্মীরা, পত্রিকার সম্পাদক থেকে সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ছাত্রছাত্রীরা।
একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ঋষিলা কবীরের বক্তব্য আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ‘স্যার আপনি বলেছেন বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও। বেটি নে তো পড়ি, পর বাঁচি নেহি। ম্যাডাম আপনি কন্যাদের শ্রীময়ী করে তুলেছেন, কিন্তু কন্যার বিশ্রী বীভৎস লাশ আমাদের তাড়া করে বেড়ায়।’
প্রশ্ন তোলে, যে সমাজে সরোবরের পাশে শোভাবর্ধনকারী নোটিশ বোর্ডে লিখে দেওয়া হয় প্রকাশ্য ধর্ষণের হুমকি, সে সমাজে নারীর মূল্য কতখানি? তাই তো চোখের সামনে অসহায় গৃহবধূকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় এবং তারপর তারই চরিত্রে এঁকে দেওয়া হয় কলঙ্কের দাগ।
সমাজের চোখে সে কুলটা-দুশ্চরিত্রা নারী, কিন্তু সে আমার প্রতিবেশিনী, এক নিষ্পাপ কন্যাশিশুর অসহায় জননী, জীবনযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া এক যোদ্ধা। তার শিশুকন্যাটিকে আমি বহুদিন দেখিনি। ষোলো তারিখে কলকাতার সমাবেশে অংশ নিতে যাচ্ছি, সেখানে খুঁজে পাব কি সেই মেয়েটির মুখ?