
শিলিগুড়িঃ ৯ ডিসেম্বর শীতের দুপুর। ব্যস্ততা ও প্রবল যানজটকে সঙ্গী করেই শিলিগুড়ি শহর যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। যেন বলতে চাইছে ‘এটাই তো দেখতে চেয়েছিলাম’। বেলা ১২টা ৩০-এর কিছু পর তেজোদীপ্ত দেড় হাজারেরও বেশি মহিলার স্লোগান-মুখরিত সুসজ্জিত মিছিলের দৃপ্ত পদচারণায় সচকিত হল রাজপথ। আছড়ে পড়ল শিলিগুড়ি শহরের বুকে। শুরু হল অঙ্গীকার যাত্রা। নারীদের মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অঙ্গীকার। শহরবাসীরাও কণ্ঠ মেলালেন এই অঙ্গীকারে। পথচারীরা পা মেলালেন মিছিলে।
অভয়ার ন্যায়বিচারের আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতে এ রাজ্যে গড়ে উঠেছে ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ প্ল্যাটফর্ম। তারা ডাক দিয়েছে অঙ্গীকার যাত্রার। অঅগের দিনই কোচবিহার থেকে অঙ্গীকার যাত্রীরা পৌঁছে গেছেন।
৯ ডিসেম্বর নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রপথিক মহীয়সী রোকেয়ার স্মরণ দিবস। তাঁর সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ দিন কর্মসূচির সূচনা। শিলিগুড়িবাসীরা তাঁদের থাকবার ও খাবার বন্দোবস্ত করেছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সব্জি-চাল-ডাল-তেল সহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। স্বেচ্ছাসেবকদের রাত জাগা পরিশ্রমে শহরের প্রান্তে-প্রত্যন্তে ফুটে ওঠে মনীষীদের উদ্ধ´তি, অঙ্গীকার-পতাকা। মহীয়সী বেগম রোকেয়া, নবজাগরণের আপসহীন ধারার মহান সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বীরাঙ্গনা শহিদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখের উদ্ধ´তি সম্বলিত ব্যানারে সেজে উঠেছিল শিলিগুড়ি।
শিলিগুড়ি জংশন থেকে মিছিল এয়ারভিউ মোড়, সেবক মোড়, ভেনাস মোড়, কোর্ট মোড় হয়ে বাঘাযতীন পার্কে উদ্বোধনী সমাবেশস্থলে পৌঁছায়। শিলিগুড়ি জংশন থেকে অঙ্গীকার যাত্রায় পা মেলান অভয়ার বাবা-মা। তাঁদের সংবর্ধিত করেন দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলা অভ্যর্থনা কমিটির সম্পাদক ডাঃ সুশ্রী সঙ্গীতা জেনা, ও ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’-র আহ্বায়ক অধ্যাপক ডাঃ নূপুর ব্যানার্জী।
পথের মোড়ে মোড়ে হৃদয়ের সমস্ত ভালবাসা ঢেলে অঙ্গীকারে শামিল অভিযাত্রীদের সংবর্ধিত করেন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। শিলিগুড়িতে ঐতিহাসিক ‘রাত দখল’ আন্দোলনের মঞ্চ ‘দ্য নাইট ইজ আওয়ার্স, শিলিগুড়ি’, বালাসন উন্নয়ন নাগরিক কমিটি, বাতাসি মহিলা ক্লাব, আরবান আশাকর্মী, পোড়াঝাড় বিপর্যয় মোকাবিলা কমিটি, ফুল ব্যবসায়ী ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এই নারী জাগরণকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। বাঘাযতীন পার্কে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ডাঃ সুশ্রী সঙ্গীতা জেনা।
বক্তব্য রাখেন অভয়ার মা ও বাবা, ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’-র আহ্বায়ক অধ্যাপক ডাঃ নূপুর ব্যানার্জী, বিশিষ্ট নেপালি কবি ও সাংবাদিক মনোজ বাগোটী, নারী আন্দোলনের কর্মী ননিতা গৌতম, বিশিষ্ট নাট্যকার পার্থ চৌধুরী প্রমুখ। চোখের জল মুছতে মুছতে বেদনার্ত কণ্ঠে অভয়ার মা বলেন, ‘মেয়ে আমাকে যেন বলে যায়, মা, বিচার না পাওয়া পর্যন্ত থেমো না’। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বাতাসি মহিলা ক্লাবের সম্পাদক নিরূপমা সিনহা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতেই আজ ৬ মাসের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত যৌন লালসার শিকার। ভ্রূণহত্যা হচ্ছে। ‘এ সবের আমরা যথাযথ বিচার চাই’।
‘উই ডিমান্ড জাস্টিস’ স্লোগান শুনে মিছিলে পা মেলান বহু সাধারণ মানুষ। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে মিছিলে শামিল হয়ে শিলিগুড়ি কলেজের এক ছাত্রী বলেন, ‘প্রায়শই ধর্ষণের খবর শোনা যায়। এখনও যদি আমরা চুপ করে থাকি তা হলে ধর্ষকদের মনে ভয় হবে না’।