Breaking News

ইতিহাস লেখার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার এবং নমিত অরোরা তাঁদের সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ‘স্পিকিং অফ হিস্ট্রি, কনভারসেশন অ্যাবাউট ইন্ডিয়াজ পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’-এ ইতিহাস রচনার সাম্প্রতিক প্রবণতা এবং ইতিহাস বিকৃতির বিপদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। একজন অভিজ্ঞ ও প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসবিদ হিসেবে রোমিলা থাপার সব সময়ই ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য উপাদান ও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বর্তমানে ইতিহাস লিখন পদ্ধতি ও তার প্রবণতা সম্পর্কে তাঁর অভিমত, ‘সব সময়ই যে ইতিহাস অতীতকে আরও ভাল ভাবে অনুধাবনের জন্য লেখা তা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা বর্তমানকে বৈধতা দেওয়ার জন্যও নতুন করে উপস্থাপন করা হয়।’

তাই যুক্তি নির্ভর ইতিহাস রচনা এবং ইতিহাসের যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে যখন হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া মন্তব্য থেকে ইতিহাস জানার প্রবণতা তৈরি হয় তখন তা সমাজ এবং জাতির বৌদ্ধিক জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এই গ্রন্থে তিনি ইতিহাস চর্চার এই সাম্প্রতিক প্রবণতাকেই নমিত অরোরার সঙ্গে কথোপকথনের আকারে তুলে ধরেছেন। শুধু তাই নয়, এমন প্রবণতা তৈরির জন্য দায়ী কারণগুলিকেও তিনি চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর মতে, ‘আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেও সমাজবিজ্ঞানের যে কোনও শাখা সম্পর্কে মৌলিক ধারণার অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজজীবনে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে। এই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস গড়েই উঠেছে পৌরাণিক কাহিনি এবং ভারতীয় ইতিহাস রচনার ঔপনেবিশক দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে। এদের কাছে ইতিহাস হল, এক ধরনের ‘ফ্যান্টাসি’ (কল্পনা), আর যারাই এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে তাদের ‘মার্ক্সবাদীক্স হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া শুরু হয়।

ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি

একজন অলস এবং অমনোযোগী পাঠকের পক্ষেও এটা বোঝা কঠিন নয় যে, হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস রচনার দৃষ্টিভঙ্গি আসলে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিরই অনুকরণ। ঔপনিবেশিক যুগে এই প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা থেকে, যে– ভারতবাসীর ইতিহাস নেই, তাই ভারতবাসীকে সভ্য জাতি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ভারতের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব ব্রিটিশদেরই নিতে হবে। এই ধারণা থেকেই জেমস মিল ১৮১৭ সালে ‘হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইতে তিনি ভারতের ইতিহাসকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন –‘হিন্দু যুগ’, ‘মুসলিম যুগ’ ও ‘ব্রিটিশ যুগ’। এই ভাবে ধর্মের ভিত্তিতে ইতিহাসের যুগ বিভাজন যে কতটা অযৌক্তিক, বিশেষত ভারতের মতো একটি বহু জাতি-বহু ধর্ম অধ্যুষিত দেশের ক্ষেত্রে, তা বোঝা যায় যখন জৈন ধর্মাবলম্বী চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সম্রাট অশোকের রাজত্বকালকেও ‘হিন্দু যুগক্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের মতে, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে জাতি হিসেবে উপস্থাপিত করার ধারণা তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যেহেতু ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পূর্বে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ছিল মুসলমান শাসকেরা, তাই ভারতের ইতিহাসে মুসলমান শাসনের অধ্যায়কে কালিমালিপ্ত করার অপপ্রয়াস বা ‘অন্ধকারময় যুগ’ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা ব্রিটিশ আমল থেকেই শুরু হয়েছিল। তাই আজ হিন্দুত্ববাদীরা যতই ‘নতুন করে’ ইতিহাস রচনার দাবি তুলুন, তাঁদের ইতিহাস রচনার দৃষ্টিভঙ্গি আসলে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিরই অনুকরণ।

আর্য সমস্যা

ব্রিটিশ আমলে ধর্মের ভিত্তিতে যুগ বিভাজনকে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসির অংশ হিসেবে যে ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, আজও ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইতিহাস বিকৃতির এই হীন প্রচেষ্টা আরও ফলপ্রসূ হচ্ছে কারণ বর্তমানে যুব সমাজের মধ্যে পাঠ্যবই থেকে ইতিহাস জানার পরিবর্তে ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইতিহাসে’র গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই হোয়াটসঅ্যাপ ইতিহাসে ভারতের আদিম ও প্রকৃত অধিবাসী হিসেবে আর্যদের উপস্থাপিত করা হচ্ছে এবং সমস্ত মুসলমান শাসককে ‘বহিরাগত আক্রমণকারীক্স এবং ‘রক্তপিপাসু স্বেচ্ছাচারী’ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। যেখানে ইতিহাসের পাঠকমাত্রই জানেন যে, অনার্য হরপ্পীয় সংস্কৃতি থেকেই ভারতীয় সভ্যতার সূচনা এবং অধিকাংশ পণ্ডিতই এ বিষয়ে সহমত যে, ভারতীয় আর্য হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয় তাদের প্রকৃত উৎপত্তিস্থল ভারতবর্ষ নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানার বাইরে অবস্থিত মধ্য এশিয়া থেকে তাঁরা এ দেশে এসেছিলেন। যে কারণে ভারতীয় আর্য ও ইরানীয় আর্যদের মধ্যে বহু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতীয়-বৈদিক আর্যরা যেমন ‘সোমক্স রীতি পালন করত, তেমনই ইরানীয় আর্যরা পালন করত ‘হোমক্স রীতি। প্রসঙ্গত ইরানি ভাষায় ‘স’-এর উচ্চারণ না থাকায় তা বদলে গিয়ে ‘হ’-এ পরিণত হয়। একই ভাবে ভারতের সিন্ধু নদ ইরানি ভাষায় হয়ে যায় ‘হিন্দু’ এবং সিন্ধু নদের অপরপ্রান্তে সকল অধিবাসীই তাদের কাছে হিন্দু নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ হিন্দু কোনও ধর্মীয় সংজ্ঞা নয়, বরং এটি একটি ভৌগোলিক সংজ্ঞা। ভাষাগত এই সাদৃশ্য ঋকবেদে এবং জেন্দ-আবেস্তা-র মধ্যেও দেখা যায়।

পুরুষতান্ত্রিকতা

সিন্ধু হোক বা হিন্দু–ইন্দো-আর্য সংস্কৃতিতে পুরুষতান্ত্রিকতা ছিল প্রবল। রোমিলা থাপার দেখিয়েছেন যে ধর্মশাস্ত্র বা স্মৃতিশাস্ত্র নারীদের কোনও স্বাধীনতাই দিত না। জীবনের প্রতি পর্যায়েই তাদের পুরুষের অধীন করে রাখা হয়েছিল– বিবাহের পূর্বে পিতার অধীনে, বিবাহের পর স্বামীর অধীনে, বিধবা অবস্থায়় পুত্রের অধীনে। যদিও এর ব্যতিক্রম রয়েছে। সে যুগেও প্রভাবতী গুপ্তার মতো নারী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর পুত্র সাবালক না হওয়ায় রানি হিসেবেই রাজকার্য পরিচালনা করেছেন। দক্ষিণ ভারতের অন্দাল, কাশ্মীরের লাল দেদ এবং রাজস্থানের মীরাবাই-এর মতো সাধিকারা ভক্তিধর্ম প্রচার করেছেন। তবে তাঁরা ছিলেন ব্যতিক্রম মাত্র। বৃহত্তর নারী সমাজের উপর তাঁরা তেমন কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। পরবর্তী কালেও মুঘল এবং রাজপুতদের মধ্যে বৈবাহিক সন্ধিগুলোর ক্ষেত্রেও মেয়েদের সম্পত্তি হিসেবেই গণ্য করা হত।

পরিবর্তনশীলতা

ইতিহাস বিকৃতির এই অন্ধকারময় দিকগুলি তুলে ধরার পাশাপাশি রোমিলা থাপার এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমার দীর্ঘ জীবনে আমি যদি কিছু শিখে থাকি তা হল কোনও কিছুই চিরকাল স্থায়ী হতে পারে না। কোনও একটা সময়ে যা সঠিক বলে মনে হয় পরবর্তী কালে সময়ের প্রয়োজনে সেটিও পরিত্যক্ত হয়। এই পরিবর্তনশীলতাকে স্বীকার করতেই হবে।’