
তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কলকাতা অফিস ও তার মালিকের বাড়িতে, কেন্দ্রীয় আর্থিক তদন্তকারী সংস্থা ইডির অভিযান এবং তাকে ঘিরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ একাধিক শীর্ষ স্থানীয় প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্তার অতি সক্রিয়তা নিয়ে কিছুদিন ধরে হইচই চলছে। দুই জায়গাতেই তল্লাশি চলাকালীন সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ঢুকে গিয়ে একাধিক ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসছেন, সে দৃশ্য এতদিনে কয়েক শত বার রাজ্যের মানুষ দেখে ফেলেছেন।
ইডির অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে বেআইনি কয়লা উত্তোলন ও তার বিক্রির মাধ্যমে যে ২০ হাজার ৭৪২ কোটি টাকার দুর্নীতি চলেছে তার ২০ কোটি টাকা হাওলার মাধ্যমে আইপ্যাকের সূত্রে লেনদেন হয়েছে। এই আইপ্যাক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে এখন তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা শুধু নয়, তাদের দলের সমস্ত স্তরের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে সরকার পরিচালনায় দলের নীতি, ভোট মেশিনারি ইত্যাদি সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রসঙ্গত, ২০১৪ পর্যন্ত এই সংস্থাই ছিল গুজরাটে বিজেপির মুখ্য পারামর্শদাতা। অবশ্য পোশাকি নামে পরামর্শদাতা বলে ডাকলেও আসলে এখন বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস থেকে শুরু করে নানা রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এই ধরনের সংস্থাগুলিই দলের হয়ে সমস্ত ধরনের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কাজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।
ফলে আইপ্যাক সংস্থার অফিস ও মালিকের বাড়িতে ইডি তল্লাশি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তাঁর দলের তথ্য হাতাতে এসেছিল কেন্দ্রীয় সংস্থা। দলীয় স্বার্থ রক্ষা দলের প্রধান হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর মাথাব্যথার কারণ হলেও মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ স্থানীয় আমলা ও পুলিশ কর্তাদের দায়ও কি সেটাই ছিল? তাঁরা দলীয় ফাইল রক্ষার কাজে গেলেন কেন? এটা কি তাঁদের সরকারি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? মুখ্যমন্ত্রীকেই বা এত তড়িঘড়ি ছুটতে হল কেন? চিটফান্ড, চাকরি দুর্নীতি, বেআইনি কয়লা, গরু পাচার, বালি পাচার ইত্যাদিকে জড়িয়ে যে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর দলের নেতাদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তার কোনওটাকেই তো মিথ্যা বলা যাচ্ছে না। দলীয় ফাইলের সাথে এমন কোনও কেলেঙ্কারির ফাইলও সরানো হল কি না সে প্রশ্ন অবান্তর বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষত এই তদন্তে যখন কয়লা কেলেঙ্কারির বিষয়টি সরাসরি জড়িয়ে আছে এবং সেই অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রীর অতি ঘনিষ্ঠ লোকজনের নাম রয়েছে– সে ক্ষেত্রে একজন প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে তাঁর এই ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকছে না।
একই সাথে প্রশ্ন থাকছে, ২০২০ থেকে কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত করছে সিবিআই। এতগুলো বছর পার করে তারা তদন্তের কতটুকু অগ্রগতি ঘটিয়েছে? এখন হঠাৎ মঞ্চে ইডির আগমন দেখা গেল! তারা এতদিন কী করছিল? বেআইনি লেনদেনের অভিযোগগুলি কি কেবলমাত্র ভোট এসে পড়লেই সিবিআই-ইডির মনে পড়ে? সেই কারণেই কি ২০২০ থেকে ক্স২১-এর বিধানসভার নির্বাচন পর্যন্ত তদন্ত নিয়ে খানিকটা লাফালাফি করার পর ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনের সামান্য আগে কিছুটা নড়ে বসেছিল সিবিআই? ২০২৬-এ বিধানসভা নির্বাচন আসছে বলেই কি এখন আবার ইডি নেমেছে আসরে?
ইডি সিবিআই উভয় সংস্থাকে নিয়েই সারা ভারতে মানুষের ধারণা হল– কেন্দ্রীয় সরকারি দলে থাকলে কোনও দুর্নীতিবাজকে তারা দেখতে পায় না। আর বিরোধী দলের কোনও দুর্নীতির গন্ধ পেলে তারা তার প্রকৃত তদন্ত করে সত্য উদঘাটনের বদলে বিষয়টাকে ঝুলিয়ে রাখে পরের পর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় শাসক দলের হাতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রচারের রসদ জোগানোর জন্য। দুর্নীতির জন্য দায়ী নেতা-মন্ত্রী-প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও শাস্তি, সাধারণ মানুষের টাকায় গড়া সরকারি তহবিল উদ্ধার, প্রতারিত মানুষের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা ইত্যাদি কোনও কিছুর দায় যেন ইডি সিবিআই কারও নেই! এ ছাড়া কোনও বিরোধী দলের নেতা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়েই বিজেপিতে নাম লেখালে সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর চোখে তিনি যেন অদৃশ্য হয়ে যান! পশ্চিমবঙ্গেও এমন উদাহরণ খুব কম নয়। কারা এর উদাহরণ তা রাজ্যের প্রায় প্রতিটি মানুষ জানেন। এখন সারা ভারত জুড়েই এই দুই এজেন্সির কাজ হয়েছে বিরোধী দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা জোগাড় করা ও তাদের মামলার চোখ রাঙানি দিয়ে বিজেপির আশ্রয়ে পোরা! সাম্প্রতিক আইপ্যাক তদন্তের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী অক্লেশে যে কারণে এই রাজ্যের বিরোধী দলনেতার সাথেও দুর্নীতির সংযোগের কথা বলতে পেরেছেন। অবশ্য দুর্নীতির প্রশ্ন উঠলেই এই দলগুলোর নেতারা অন্যে কত বড় দুর্নীতিগ্রস্ত তা বলতে থাকেন। যেন দুর্নীতির প্রতিযোগিতা চলছে দেশ জুড়ে!
পার্লামেন্টারি রাজনৈতিক দলগুলিও এখন বাস্তবে এক একটা কর্পোরেট সংস্থা হয়ে উঠেছে। তাদের মাথায় থাকেন পুঁজিপতিদের পছন্দের নামকরা নেতা-মন্ত্রীরা। আর মাঝখানের স্তর থেকে একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা হয়ে উঠেছেন মজুরি শ্রমিক। কোনও রাজনৈতিক নীতি, আদর্শের বালাই থাকছে না, কোন দল বেশি টাকা দেবে, সুবিধা দেবে, সরকারি নেকনজরে রাখতে পারবে, পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবে, ইত্যাদির ভিত্তিতেই ঠিক হয় কোন দলের দিকে ভিড় বেশি থাকবে।
এই কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক কর্মীদের বদলে আইপ্যাকের মতো সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে, কর্মপন্থা ঠিক করার ক্ষেত্রে। নেতা কী বলবেন, কেমন করে বক্তৃতা দেবেন, কখন হাসবেন কিংবা কাঁদবেন, নাকি রাগবেন সব পেশাদার পরামর্শদাতারা ঠিক করে দিচ্ছেন। এটা এখন কর্পোরেট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, সেই পেশাদাররা কখনও এই দল কখনও ওই দল– যার ঠিকা যখন নিচ্ছে তাদের ভোটে জেতানোর জন্য পরিকল্পনা করছে। তাই আইপ্যাক গুজরাটে, বিহারে বিজেপির পক্ষে কাজ করে পশ্চিমবঙ্গে তার বিরোধী তৃণমূলের ঠিকা নিয়েছে।
আর বিজেপি আরও বড় সংস্থাকে ধরেছে। কংগ্রেসও এমন কর্পোরেট সংস্থা ও পেশাদারদের নিয়োগ করে। রাজনীতির ময়দানে এই দলগুলো যে সব কথা বলে তার কোনওটি জনস্বার্থ থেকে, অন্তর থেকে বলা কথা নয়। কোন কথাটা বললে ভোটে সুবিধা হবে, পেশাদার পরামর্শদাতাদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুসারে জনসেবার ভেক ধরে তারা। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বুলি ও তার রাজনীতি আজ কতটা জনবিচ্ছিন্ন এ তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই কারণেই বুর্জোয়া দলগুলোর টাকার থলির আয়তন বাড়ানোর প্রয়োজন উত্তরোত্তর বেড়ে চলে। কালো টাকা, দুর্নীতির টাকা ছাড়া এত খরচ জোগানো মুশকিল। তাই বিজেপি যেমন দুর্নীতিগ্রস্তদের আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও দলের মুখ বাঁচাতে কোনও রীতি নীতির তোয়াক্কা না করে মুখ্যমন্ত্রীকেই ফাইল কাড়তে আসরে নামতে হয়েছে।