
বারুইপুরের সূর্যপুরে ১১ বছরের নাবালিকাকে নৃশংস অত্যাচার করে খুনের ঘটনায় ধৃত অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে পুলিশ এনকাউন্টারে হত্যা করার পর বিজেপির নেতা-কর্মীরা ব্যাপারটাকে দেখাতে চাইছেন যেন সরকার ন্যায় বিচার দিয়ে দিল! তাদের এক নেতার কথায় ‘দৈব শাস্তি’। মুখ্যমন্ত্রী ‘সকালে জমা, বিকালে খরচ’-এর কথা রেখেছেন বলে তাঁরা খুব উল্লাস করছেন। যদিও বাস্তবে জমা এবং খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ফাঁক অনেক।
যে স্থানীয় বিজেপি নেতা অভিযুক্তদের ফাঁড়ি এবং থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, এফআইআর-এ তাঁর নাম থাকলেও তাঁকে ‘জমা’ করার ব্যপারে পুলিশ কী করছে, তা জানা যায়নি আজও। মেয়েটি নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ অনেক আগে পেলেও স্থানীয় মানুষ তার দেহ উদ্ধার করে বিক্ষোভে ফেটে পড়ার আগে পর্যন্ত পুলিশ গা-ছাড়া ভাব দেখাল কেন সেই হিসাবও মিলছে না। যেমন মিলছে না, ওই এলাকায় গত এক বছরের মধ্যে ১৫০ জন মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জানা সত্ত্বেও পুলিশ কেন এতদিন নড়ে বসতে পারেনি, তার হিসাবও। প্রশ্ন উঠছে, হাতকড়া বাঁধা একজন ধৃতের পক্ষে একদল পুলিশের মধ্য থেকে এক অফিসারের সার্ভিস রিভলবার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা আদৌ সম্ভব কি না? পুলিশ গভীর রাতে জলকাদার জায়গায় কেন ঘটনা পুনর্নির্মাণে যাবে, কেন আশেপাশের কেউ তিন তিনটে গুলি চলার কোনও শব্দ শুনতে পেল না? পুলিস কি ঘটনা পুনর্নির্মাণের আবশ্যিক ভিডিওগ্রাফির ব্যবস্থা করেছিল? কেন ফরেন্সিক পরীক্ষার আগেই এনকাউন্টারে মৃতের দেহ পুড়িয়ে ফেলা হল? এনকাউন্টার নিয়ে পুলিশের এফআইআর এবং মৃতের পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও উঠেছে নানা প্রশ্ন। কোথায় এ সবের জবাব! প্রশ্ন আরও আছে— এই রকম নৃশংস ঘটনায় যখন শাসক দলের এক নেতার বিশেষ হস্তক্ষেপের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে, তখন গ্রেপ্তারের দু-দিনের মধ্যে অন্যতম প্রধান অভিযুক্তের এনকাউন্টার-হত্যা কি স্বাভাবিক? এই হত্যা যে বহু সত্যকে চাপা দিয়ে দিল, সে কথা কি পুলিশ এবং সরকারি কর্তারা অস্বীকার করতে পারবেন? প্রত্যক্ষদশ¹রা জানিয়েছেন, পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত ব্যক্তি আগে বলেছিলেন, তিনি মেয়েটিকে একজনের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কার কাছে, কোন উদ্দেশ্যে মেয়েটিকে তিনি নিয়ে যাচ্ছিলেন, সে কোন চক্রের লোক? কয়েকজন পুলিশের উপস্থিতিতে তাঁকে জেরা করার একটা ভিডিও সমাজমাধ্যমে এসেছে। তাতে তিনি যার নাম করছিলেন সেই লোকটি আসলে কে? এগুলি স্পষ্ট হওয়ার আর কোনও উপায় রইল না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ওই এলাকায় বিগত সরকারের আমল থেকেই চলা মেয়ে পাচার চক্র, মাদক চক্র ইত্যাদির মাথাদের ধরা ও তা নির্মূল করবার ইচ্ছা পুলিশের আদৌ কি আছে? মুখ্যমন্ত্রী দুই সপ্তাহের মধ্যে সব মদ-গাঁজার ঠেক ভেঙে দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিলেও। কিন্তু যে প্রতিবাদী জনগণ ওই দিন এই চক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল তাদের দেশ বিরোধী বলছেন! এই আচরণ তো দেশবিরোধী।
এখন এনকাউন্টারকেই বিচার বলে দেখানোর চেষ্টা বিজেপি শাসনের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। বিষয়টা যথেষ্ট উদ্বেগের। এই রকম নৃশংস হত্যা ও এক নিষ্পাপ বালিকার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের ঘটনায় জনমানসে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ জমা থাকে। সেই পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে একজন দুজন অভিযুক্তকে বেশ বীরোচিত কায়দায় গুলি করে দিয়ে সরকার হাততালি কুড়োতে পারে। কিন্তু এই রকম অপরাধীদের গোটা চক্রকে ধরতে ও নির্মূল করতে চাইলে দরকার গভীরে তদন্ত করা। কিন্তু আজকের ভারতে বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে পুলিশের এখন আর আইন মানা, তদন্তের কষ্ট করবার দরকার পড়ছে না। আদালত নয়, পুলিশই এখন বিচারক! এতে একদিকে সরকারের সস্তায় হাততালি জোটানোর সুযোগ হয়। অন্য দিকে জনমানসে গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতি আস্থার বদলে পুলিশের প্রতি আতঙ্ক ও সরকারের ক্ষমতার সামনে মাথা নিচু করে থাকার পরিবেশ তৈরি করা যায়। বিচারব্যবস্থাকে পঙ্গু করে ফেলে প্রশাসনের হাতেই সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুবিধা হয়। যা মানুষকে দাবিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কাজ দেয়। যত দিন যাচ্ছে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকারগুলো ন্যায় বিচারের ধারণাকে কার্যত নস্যাৎ করে দিচ্ছে। উঠে এসেছে এক মারাত্মক তথ্য, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এনকাউন্টারে হত্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই হত্যার পর পুলিশ যে ডায়রিগুলি করেছে সেগুলি প্রায় প্রতিটিই অন্যটির একেবারে কপি পেস্ট (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ জুলাই, ২০২৬)। এখন সারা দেশে সর্বত্রই নাকি আসামি পুলিশকে আক্রমণ করে পালিয়ে যেতে চায় এবং পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি চালায়!
আরও উদ্বেগের বিষয় হল মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুরো প্রশাসন এবং সরকারি দলের মূল নিশানা এখন সূর্যপুরের ধর্ষক-খুনিরা নয়। তাঁদের বেশি মাথাব্যথা অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাস্তায় নামা প্রতিবাদী জনতাকে শায়েস্তা করার দিকে। অথচ, ঘটনার দিন পুলিশের চরম গাফিলতির বিরুদ্ধে জনরোষ ফেটে না পড়লে পুলিশ যে কিছুই করত না, তা সে দিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। গণপিটুনিতে হত্যা অবশ্যই নিন্দনীয়। এই কাজে যারা জড়িত তাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করাটাও জরুরি। কিন্তু ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার পর জনরোষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল? ওই মৃত যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষিতা বালিকার পরিবার সহ এলাকার মানুষ সে দিন অভিযোগ তুলেছিল। পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে কার্যত আগ্রহই দেখায়নি বলে অভিযোগ। সে দিনই জানা গিয়েছিল ফাঁড়ি থেকে অভিযুক্তদের টোটোয় চাপিয়ে নিয়ে গেছে এক বিজেপি নেতা। কোথায় ছিল পুলিশ? পরে বাধ্য হয়ে পুলিশ ধরপাকড়ে নেমেছে।
মুখ্যমন্ত্রী এখন প্রতিবাদী মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চাইছেন— কখনও তাদের ‘অতৃপ্ত আত্মা’ বলছেন, কখনও তাদের দেশবিরোধী বলছেন। বলছেন, নাম, পদবি দেখে নাকি ওই যুবককে পেটানো হয়েছে! অথচ মুখ্যমন্ত্রী বলছেন না, প্রতিবাদীদের ধরতে তাঁর পুলিশ যত তৎপর, তার কিছু শতাংশও ঘটনার দিন দেখা গেলে মেয়েটিকে জীবন্ত ফিরে পাওয়া যেত, গণপিটুনিতে কারও মৃত্যুও হতে পারত না। যে পুলিশি অপদার্থতা ঢাকতে পুলিশকে দিয়ে এনকাউন্টারের নাটক সাজিয়ে সরকারের মুখ রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন বিজেপি কর্তারা, ঠিক এই পুলিশি অপদার্থতাই ওই দিন সাধারণ মানুষের ন্যায্য বিক্ষোভকে নিরুপায় ক্ষোভে রূপান্তরিত করেছিল। তাঁরা রাস্তা ও রেল অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন দাবি আদায়ে। তাঁরা সোচ্চার না হলে মেয়েটির দেহটাও উদ্ধার হত কিনা সন্দেহ আছে। উল্লেখ্য, এত উত্তেজনার মধ্যেও কিন্তু সাধারণ মানুষ ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে ঐক্য বজায় রেখেছেন। গণপিটুনিতে যারা জড়িত আইন মেনে তাদের খুঁজে বার করে শাস্তি দেওয়ার জন্য পুলিশের যেটুকু দক্ষতা প্রয়োজন সেটুকু থাকার আশা নেই বলেই কি মুখ্যমন্ত্রীকে একদিকে গণহারে প্রতিবাদী সাধারণ মানুষকে দোষী বলতে হচ্ছে এবং বিচারের আগেই নিহত যুবককে নির্দোষ বলে দিতে হচ্ছে! যদিও সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, মেয়েটির বাবার এফআইআর-এও গণপিটুনিতে মৃত যুবকের নাম আছে। তা হলে, ধর্ষণ-খুনের থেকে মানুষের মূল দৃষ্টিটা অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য!
সূর্যপুর থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী ও বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থীদের ওপর ডিম ছুঁড়তে বলেছেন। তিনি অবশ্য সাধারণত বিতর্কিত মন্তব্য করে সংবাদমাধ্যমে ভেসে থাকতে সর্বদা সচেষ্ট। তাঁর বামপন্থীদের ওপর রাগ হয়েছে কারণ, তারা সাধারণ মানুষের বিক্ষোভে সরকারের দমন নীতি ও ও এনকাউন্টারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। তাঁর এই প্রকাশ্য হুমকি দলদাস পুলিশ নিশ্চিতভাবেই শুনতে পাবে না। এটা বাস্তব যে, বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রকৃত বামপন্থী আদর্শ এবং বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা দেশে বাড়লে বিজেপির অন্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে সমূহ সর্বনাশ। সে কারণে বিজেপির নেতা হিসাবে তাঁর বামপন্থী ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকারীদের ওপর রাগ থাকতেই পারে। আবার ভোটের সামান্য কিছুদিন আগে তৃণমূল ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ওঠায় এখন হয়ত তাঁর বড় দায় দিল্লির কর্তাদের চোখে বড় বিজেপি হয়ে ওঠার। কিন্তু, একজন মন্ত্রী হিসাবে যখন তিনি এই রকম একটা হুমকি দেন এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে ধর্ষকদের বদলে প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে সরকারের মারাত্মক রোষ দেখা যায়, বোঝা যায় বিজেপি সরকারের ভয়ের কারণ আসলে মানুষের প্রতিবাদী ভূমিকা।
মানুষ দেখছে, ভোটের আগে বিজেপি আর জি কর-এর বিচারের ফাইল খুলবে বললেও তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন সিবিআই কার্যত কিছুই করছে না। যে কথা কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত বলেছে। তৃণমূলের দুন¹তির বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া বিজেপি নেতারা এখন ‘ভাল তৃণমূল’ বাছতে ব্যস্ত। এখনই নানা জায়গায় গুন্ডামি, দুর্নীতির অভিযোগে বিজেপি সাধারণ মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে শুরু করেছে। মহিলাদের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ঢালাও প্রতিশ্রুতি বিজেপির পক্ষে ব্যুমেরাং হয়ে তাদের দলের মধ্যেই বিক্ষোভ বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে মাত্র দুটো মাস সরকারের গদিতে থেকেই বিজেপি নেতারা টের পাচ্ছেন তাঁদের সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের আঁচ বাড়ছে। এতে বিজেপি শুধু নয়, আশঙ্কার মেঘ দেখতে শুরু করেছে দেশের একচেটিয়া পুঁজির মালিককুল। বিজেপির পিছনে শত শত কোটি টাকা তারা ঢেলেছে যাতে গদিতে বসে সমস্ত প্রতিবাদ-আন্দোলনকে বিজেপি নিঃশেষ করে দিতে পারে সেই আশায়। আবার দেখছে, ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার লোভে বিজেপিকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা বামপন্থী নামধারীরাই বাংলার মাটিতে সব নয়। এই মাটিতে গভীর শিকড় গেড়ে আছে স্বাধীনতা আন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের সংগ্রামী ঐতিহ্যবাহী ধারা। যে সংগ্রামী বামপন্থার শক্তি এই রাজ্যে আর জি কর আন্দোলনে অভূতপূর্ব জনজাগরণে সাহায্য করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকারের কর্পোরেটমুখী নীতিকে বহু ক্ষেত্রে প্রতিহত করতে পেরেছে। বিজেপি নেতারা বারুইপুরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের মধ্যে রাজ্য জুড়ে সংগঠিত আন্দোলনের সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বলেই কি এত হুমকি, এত কড়া কড়া বিবৃতি দিচ্ছেন! কিন্তু বারুইপুরের ১১ বছরের মেয়ে যদি প্রকৃত বিচার না পায় জনগণ কিন্তু আন্দোলন করেই তা আদায় করার পথে এগিয়ে যাবে।
আর জি কর নিয়েও শুধু মুখ রক্ষার বিবৃতিতেই বিজেপি সরকার ছাড় পাবে না, বিচার তাদের দিতেই হবে। এটা বিজেপি সরকারের কর্তারা জেনে রাখলে ভাল করবেন।