
এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর পলিটবুরো সদস্য, ঝাড়খণ্ড রাজ্য সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক রবীন সমাজপতি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে গত ২৬ জুন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় ৩ জুলাই, হাওড়ার শরৎ সদনে। সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড স্বপন চ্যাটার্জী। প্রধান বক্তা ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ। তাঁর সেই বক্তব্য আমরা এখানে প্রকাশ করলাম।
কমরেড সভাপতি, কমরেডস
কমরেড রবীন সমাজপতির প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, তাঁর স্মরণসভায় কিছু বলা, আমার কাছে খুবই কষ্টদায়ক, খুবই বেদনাদায়ক। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনার প্রথম দিন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত, আমার সাথে তাঁর সম্পর্কের একটা গভীরতা, খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবুও আমাকেই তো বলতে হবে, যতই কষ্টকর হোক।

যে সময় কমরেড রবীন সমাজপতি দলের সাথে যুক্ত হন, একই সময়ে এবং একই সাথে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড চিররঞ্জন চক্রবর্তীও যুক্ত হন। এঁরা দুজনেই কলেজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, পরে দলের কমরেড হন। তাঁদের যুক্ত হওয়ার সময়কালীন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তখনও প্রতিষ্ঠিত আছে, চীনে তখনও মহান মাও সে তুং সমাজতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন, ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রাম সাফল্যের পথে, সেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পিছু হঠছে। ভারতবর্ষে কেন্দ্রে এবং বহু রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতায়। জনসংঘ, যা এখন বিজেপি বলে পরিচিত, তার শক্তি তখন খুবই কম ছিল। ভারতবর্ষে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে, কমিউনিজমের প্রতি আবেগ, মার্ক্সবাদের প্রতি আবেগ কাজ করত। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনের জোয়ার ছিল। এই সময়েই কমরেড চিররঞ্জন চক্রবর্তী, কমরেড রবীন সমাজপতি আলোচনা করেন একটা কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হওয়ার আকাঙক্ষা নিয়ে। আমাদের পার্টি তখন আজকের মতো এতটা পরিচিত ছিল না। আমাদের ছাত্র সংগঠন ডিএসও প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। এই সময়ে ঐক্যবদ্ধ সিপিআই-এর এআইএসএফ, কিছুদিন পর সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই খুবই শক্তিশালী ছিল সারা রাজ্য জুড়ে। এই অবস্থাতেই ১৯৫৬ সালে আমরা আশুতোষ কলেজে ইউনিয়নে জয় লাভ করি, ১৯৫৮ সালে যোগমায়া দেবী কলেজ ইউনিয়ন দখল করি। এইভাবে দক্ষিণ কলকাতার অনেক কলেজের ছাত্রসংসদে আমাদের ছাত্র সংগঠন জয়ী হয়। এই সময় যারা ডিএসও-র সাথে যুক্ত হচ্ছেন, তাঁরা কেউই পার্টি পরিবার থেকে আসেননি, আসার প্রশ্নও তখন ছিল না। চারুচন্দ্র কলেজে আমাদের ইউনিয়ন তখন প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। সেই সময় ওখানে সংগঠন করছিলেন কমরেড মুকুন্দ ঘোষ, তিনি ১৯৬৯ সালে কমরেড রবীন সমাজপতি এবং কমরেড চিররঞ্জন চক্রবর্তীকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। আমি তাঁদের সাথে কিছু আলোচনা করি, এই ভাবে তাঁরা ধীরে ধীরে ডিএসওতে যুক্ত হন। কিছু দিন পর কমরেড রবীন সমাজপতিকে আমি পার্টি অফিসে নিয়ে আসি। তখন আমাদের মহান শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষ জীবিত। প্রতিদিন বিকেলবেলা তিনি পার্টি অফিসে আসতেন। অফিসের বড় ঘরে দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে বহু মূল্যবান আলোচনা করতেন। কমরেড রবীনকে প্রথম দিন যখন অফিসে নিয়ে আসি, এই আলোচনায় তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। তারপর কমরেড রবীন এই আলোচনার আকর্ষণে প্রায়ই অফিসে আসতেন, বিভিন্ন বিষয় জানবার আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করতেন এবং কমরেড শিবদাস ঘোষের আলোচনা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন। এই সময় থেকেই তাঁর চরিত্রে একটা রূপান্তর ঘটতে থাকে। আমি তখনও ছাত্রফ্রন্টের দায়িত্বে আছি। কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা অনুযায়ী ছাত্র কর্মীদের শুধু কাজকর্ম দেখাশোনাই নয়, ব্যক্তিগত নানা সমস্যা নিয়েও আলোচনা করি, তাদের গড়ে উঠতে সাহায্য করি। কমরেড রবীনের সাথে দিনের পর দিন তত্ত্বগত প্রশ্নে, সাংগঠনিক সমস্যা প্রসঙ্গে কত আলোচনা হয়েছে। তাঁর জানার, বোঝার, শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। সিনিয়র-জুনিয়র সকলের সমালোচনা সহজ ভাবে গ্রহণ করতে পারতেন। কেউ ভুল সমালোচনা করলেও পাল্টা প্রতিক্রিয়া বা ক্ষোভ ব্যক্ত করতেন না। ‘সবসময় অপরের গুণ দেখবে, নিজের ত্রুটি দেখবে’—কমরেড শিবদাস ঘোষের এই মূল্যবান শিক্ষা তাঁর় জীবনে প্রতিফলিত হত। সিনিয়ররা কেউ অন্যায় ভাবে সমালোচনা করেছেন, দুর্ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এই নিয়ে কোনও দিন অভিযোগ জানাননি। খবর পেয়ে হয়তো জিজ্ঞাসা করেছি, উত্তরে বলেছেন, ‘ছেড়ে দিন, ওটা এমন কিছু নয়’। এই ভাবে নিতে পারা সহজ কথা নয়। একবার তাঁর একজন সিনিয়র নেতার স্ত্রীর প্রতি দুর্বলতাজনিত আচরণ নিয়ে কমরেড রবীন ও কমরেড চিররঞ্জন আমাদের সাথে বৈঠক করেন। কমরেড রবীন ওই নেতার আচরণ এমন ভাবে উপস্থিত করেন যেন এটা তাঁরই ত্রুটি। এটা বিস্মিত করে আমাদের।
আপনারা শুনেছেন, তিনি দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছিলেন। পরিবারের একমাত্র ভরসাস্থল ছিলেন কমরেড রবীন। পরিবারের সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাঁর পিতা অসুস্থ, ঘরে ছোট ভাইবোন। তাঁর কাকা এসেছিলেন চাকরির প্রস্তাব নিয়ে। কমরেড রবীন নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তিনি চাকরি করবেন না। কমরেড চিররঞ্জনকে বলেছেন, ‘আমার বাবা মারা যাবে দেখতে হবে, ভাই বোনদের অভুক্ত দেখতে হবে। তা সত্ত্বেও আমি চাকরি করব না। আমি বিপ্লবী রাজনীতির পথটাকেই গ্রহণ করলাম।’ এটা কিন্তু আমাদের কারও সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়নি। এই সিদ্ধান্ত একান্তই তাঁর নিজের। এই কথাগুলো আমি বলছি কারণ, এই হাউসে পশ্চিমবঙ্গের কর্মীরা যেহেতু আছেন, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের কিছু কমরেডও এসেছেন। এ রকম সময় বহু কমরেডের জীবনে আসে, কী করবে ঠিক করতে হয়। কিন্তু এটা ঠিক করতে কমরেড রবীনের এক মুহূর্ত লাগেনি, কোনও নেতার সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজনও হয়নি, নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটা অত্যন্ত দরিদ্র, উপায়হীন পরিবারকে পেছনে রেখে এসে বিপ্লবী আন্দোলনকে গ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের কমরেডদের মধ্যে যারা ৯৪-৯৫ সালের পরে পার্টিতে এসেছেন, তাঁদের কমরেড রবীন সমাজপতিকে চেনা ও বোঝার সুযোগ হয়নি। তিনি তখন রাজ্যের বাইরে। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর ভূমিকা মূলত ছাত্র আন্দোলনেই। তাঁর সাথে যাঁরা সেই সময় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছিলেন, তার মধ্যে দলের বর্তমান রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড স্বপন চ্যাটার্জী এখানে উপস্থিত। এঁরা তাঁর ইমিডিয়েট জুনিয়র। এঁদের মধ্যেও কমরেড রবীন গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি যখন কলকাতা জেলা ডিএসও-র সভাপতি ছিলেন, তখন সম্পাদক যিনি ছিলেন, তিনি এখন দলের বিরোধী। তাঁর আচার-আচরণ ছিল ব্যুরোক্রেটিক, জুনিয়রদের ধমকাধমকি করতেন। তিনি কমরেড রবীন সমাজপতিরও সিনিয়র ছিলেন। তাঁর আচরণে আহত জুনিয়র কমরেডরা কমরেড রবীন সমাজপতির আলাপ আলোচনায়, ব্যবহারে একটা স্বস্তি পেত, ভরসা পেত। তারা বলেছে যে, আমরা মন খুলে কথা বলতে পারতাম। এ কথাও তারা তখন উপলব্ধি করেছে যে, জুনিয়ররা যাতে ক্রমাগত এগিয়ে যায়, তার জন্য কমরেড রবীন সমাজপতি পিছন থেকে সবসময়ই সাহায্য করতেন। এটা বিহার, ঝাড়খণ্ডের কমরেডরাও প্রত্যক্ষ করেছেন যে, শুধু মিটিংয়ে বক্তৃতা নয়, আচার-ব্যবহারের মধ্যেও তাঁর প্রচেষ্টা ছিল যে, জুনিয়ররা বড় হোক, আমি পিছনে থাকি, তাদের সাহায্য করি। কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেছেন যে, তাঁর চেহারা-ছবি, পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে আলাদা করে কোনও আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু যখনই কোনও বিষয়ে আলোচনা করতেন, একটা গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে পারতাম। পশ্চিমবঙ্গে যাঁরাই তখন তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, এ কথা তাঁরা অনেকেই ব্যক্ত করেছেন। আলোচনা অনেকেই করে, বক্তৃতা অনেকেই দেয়, বক্তৃতার মধ্যে অনেকেরই যুক্তি থাকে। কিন্তু কমরেড রবীন কোনও ব্যক্তির সাথে কথা বলছেন বা মিটিংয়ে বক্তব্য রাখছেন বা গ্রুপে কথা বলছেন, তার মধ্যে প্রাণ থাকত, সেই আলোচনা প্রাণবন্ত হত। শ্রোতার প্রাণকে তাঁর বক্তৃতা স্পর্শ করত, তাদের বিবেক জাগাত। এই বিরল ক্ষমতা তাঁর ছিল। যেহেতু কথাগুলো তাঁর অন্তরের থেকে আসত, ফলে তার প্রভাব পড়ত।
১৯৭৬ সালে পার্টি সিদ্ধান্ত নেয় মহান কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন হবে। তখন জরুরি অবস্থা চলছে, সমস্ত রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ। মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে শরৎচন্দ্রের মূল্যায়ন করে ছয়টি মূল্যবান আলোচনা করেন। এর আগে বাংলাদেশে, ভারতবর্ষে মানুষের মধ্যে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ ছিল, কিন্তু শরৎচন্দ্র যে একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক, বস্তুবাদী দার্শনিক, নিরীশ্বরবাদী এবং তিনি যে বিশ্বসাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, এই ধারণা কারও ছিল না। বরং তাঁর সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা সিপিআই, সিপিএম প্রচার করত। কমরেড শিবদাস ঘোষই প্রথম শরৎচন্দ্র সম্পর্কে ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করেছিলেন এবং ১৯৭৬ সালে তার ভিত্তিতে শরৎচন্দে্রর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন হয়। এই উদযাপন কমিটির সভাপতি ছিলেন সাহিত্যিক বনফুল, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কমরেড মানিক মুখার্জী। কমরেড মানিক মুখার্জীকে সাহায্য করার জন্য একটি কমিটি হয়, এই কমিটিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন কমরেড রবীন সমাজপতি, গোটা পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জেলায় উদযাপনে এবং কলকাতায় কেন্দ্রীয় উদযাপনেও। এই সময় কমরেড রবীন সমাজপতি শরৎচন্দ্র সম্পর্কে কমরেড শিবদাস ঘোষের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন বহন করে নিয়ে যান পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় নানা সভায়, আলোচনায়। তা খুবই প্রভাব বিস্তার করে।
কমরেড রবীন সমাজপতির আর একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ’৭৭ সালে সিপিএম ক্ষমতায় আসার পরে ’৭৯ সালে আমরা পশ্চিমবাংলায় প্রথম সিপিএম সরকারের জনবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করি। ওই বছরের ১৫ জুন সরকার আমাদের দলের বিক্ষোভ মিছিলে লাঠিচার্জ করে, বহু কমরেড আহত হন, রাজ্য জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপর ’৮০ সালে সিপিএম সরকারের প্রাথমিকে ইংরেজি এবং পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন শুরু করি। এই আন্দোলনে ডক্টর সুকুমার সেন, প্রমথনাথ বিশী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সন্তোষ ঘোষ সহ বহু বরেণ্য সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী যুক্ত হন। কমরেড মানিক মুখার্জী এঁদের সংগঠিত করেন। আমার কাজ ছিল বিভিন্ন জেলার পার্টি কর্মীদের এই আন্দোলনে সামিল করানো, সাধারণ মানুষকেও নামানো। দিনের পর দিন আমরা আন্দোলন করেছি, বহু মিছিল, অবস্থান করেছি। আর কমরেড রবীন সমাজপতি সহ কয়েকজনের ভূমিকা ছিল বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করা, এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা। এ রাজ্যে থাকাকালীন এই দুটি ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল।
কমরেড রবীন সমাজপতি ডিএসও-র কাজকর্ম করতেন, বহু ডিএসও কর্মীকে তিনি আকৃষ্ট করেছেন। পুরুলিয়ায়, দক্ষিণ ২৪ পরগণার নামখানায়, জয়নগরে নির্বাচনের কাজকর্ম করেছেন। যখন পুরুলিয়ায় বা নামখানায় কাজ করেছেন, তখন সেখানে থাকা খাওয়ার জায়গাও বিশেষ ছিল না। কিন্তু সেখানেও তিনি প্রবল উৎসাহ ও আবেগের সাথে কাজ করেছেন এবং সেখানকার ছাত্র-যুবকদের, সাধারণ মানুষদের দলের প্রতি আকৃষ্ট করেছেন, বেশ কিছু নতুন কর্মী দলে যুক্ত করেছেন। সম্প্রতি প্রয়াত দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার দলের মহিলা নেত্রী কমরেড প্রতিভা মিশ্রকে তিনিই নামখানায় নির্বাচনী কাজ করতে গিয়ে দলে যুক্ত করেন। ছাত্র-যুবকদের কী ভাবে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা যায়, এই প্রচেষ্টা তাঁর সবসময় ছিল।
আপনারা শুনেছেন, ১৯৮৬ সালে ডিএসও-র সর্বভারতীয় সম্মেলনে কমরেড রবীন সমাজপতি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই সময় আমাকে বলেছিলেন, আমি পারব কি? আমি বলেছিলাম, তুমি পারবে বলেই তো দল তোমাকে ঠিক করেছে। আর দ্বিতীয় বাক্য উচ্চারণ করেননি। তিনি যে পারেন, সেই সময় তাঁর ভূমিকাই সেই স্বাক্ষর বহন করেছে। পশ্চিমবাংলায় তখন বহু গণআন্দোলন চলছিল, এই আন্দোলনগুলিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, ’৯০ সালে সিপিএম সরকারের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বাসভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ইংরেজি ও পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের দলের উদ্যোগে আন্দোলন চলছিল। ধারাবাহিক ভাবে আন্দোলন করতে করতে ১৯৯০ সালের ৩১ আগস্ট রানি রাসমণি রোডে আমরা আইন অমান্য করি। সেই আইন অমান্যে বিভিন্ন সারিতে ভলান্টিয়ার বাহিনী ছিল, একেবারে সামনের সারির ভলান্টিয়ার বাহিনীর ইনচার্জ ছিলেন কমরেড রবীন সমাজপতি। সেই মিছিলে ব্যাপক লাঠিচার্জ হয়, গুলিবর্ষণ হয়। কমরেড মাধাই হালদার শহিদ হন। আরও ৩২ জন কমরেড গুলিবিদ্ধ হন। সে দিন কমরেড রবীন সমাজপতি সহ আরও বেশ কিছু সংগঠক পরে এই আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সবই করেছেন। এই নৃশংস পুলিশি আক্রমণের প্রতিবাদে ৩ সেপ্টেম্বর আমরা প্রথম বাংলা বনধ করি। অল্প সময়ের মধ্যে কমরেডরা বনধের প্রচারে নামে, সেখানেও কমরেড রবীন সমাজপতির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক সফল ধর্মঘট। এরপরেও পশ্চিমবঙ্গে নানা দাবিতে আমাদের দল ১০ বার সফল বাংলা বনধ করে। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এই রাজ্যের নানা কাজকর্মে, আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এরপর পাটনায় অল ইন্ডিয়া ডিএসও-র কনফারেন্সের প্রস্তুতির জন্য ১৯৯৪ সালে তিনি বিহারে যান। এর আগেও ডিএসও-র সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তিনি বিহারে গেছেন। সেই সময় পাটনায় তিনি বেশ কিছু দিন থাকেন এবং ওখানকার সংগঠনের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। ডিএসও-র সম্মেলনের এই প্রস্তুতি যখন চলছে, তখন শংকর সিং, যিনি দীর্ঘদিন অবিভক্ত বিহারে পার্টির সম্পাদক ছিলেন, তাঁর অধঃপতন ঘটতে থাকে এবং তিনি নানা দলবিরোধী কার্যকলাপ শুরু করেন। কমরেড অমৃতেশ্বর চক্রবর্তী তখন রাজ্য সম্পাদক, শিবশংকর সিং, হেম চক্রবর্তী এইসব নেতারা, যাঁদের নাম কমরেড স্বপন চ্যাটার্জী উল্লেখ করেছেন, এঁরা সকলেই তখন বৃদ্ধ, অসুস্থ। এই সময় শংকর সিংয়ের অপপ্রচারের মোকাবিলা করার জন্য বিহার পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সাহায্য চায়। কে পারবে? এখানকার কিছু সিনিয়রের নাম আসে, রবীন সমাজপতির নামও প্রস্তাব করা হয়। কারও কারও মধ্যে তখন এ নিয়ে দ্বিধা ছিল— ও কি পারবে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমরেড নীহার মুখার্জী তাঁকেই দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। সেই সময়ের ঘটনা ব্যক্ত করতে গিয়ে বিহারের এখনকার সম্পাদক কমরেড অরুণ সিং অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে আমাকে বলেছেন, ‘রবীনদা না থাকলে আমরা হয়তো এই আক্রমণ ঠেকাতে পারতাম না। আমাদের তখন তেমন অফিস ছিল না। মিন্টুদা, রবীনদা চাটাইতে থাকতেন। আমরা কখনও কখনও চিঁড়ে-গুড় বা চিঁড়ে-নুন সংগ্রহ করে আনতাম, হাসিমুখে তাই খেয়েই দিন কাটাতেন। রবীনদা সেই সময় বিহারের জেলায় জেলায় ঘুরেছেন। সেখানে তখন কর্মীদের মধ্যে নানা সমস্যা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল। কেউ রাগারাগি করছে, কথা শুনতে চাইছে না, কেউ কটু মন্তব্য করছে। রবীনদা শান্তভাবে শুনে ধীরস্থির ভাবে তাদের বোঝাতেন। কেউ হয়তো মিটিংয়ে আসেনি, তার বাড়ি চলে যেতেন বোঝাবার জন্য।’ এই ভাবে বিহারে পার্টির অবস্থান শক্ত হয়। শংকর সিংয়ের আশা ছিল, গোটা বিহার পার্টি তার পক্ষে চলে যাবে। শেষ পর্যন্ত দু-তিনজন ছাড়া কাউকে পাননি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত রাজ্যে গিয়ে শংকর সিংয়ের মতো এতদিনকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এইভাবে লড়াই করা, সংগঠনকে রক্ষা করা এই সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন ছিল। যদিও অন্য কমরেডরাও তাঁকে সাহায্য করেছেন। কমরেডস অমৃতেশ্বর চক্রবর্তী, শিবশঙ্কর সিং, হেমচন্দ্র চক্রবর্তী—এঁরা সবাই কমরেড রবীন সমাজপতিকে উপদেশ, উৎসাহ দিতেন, তাঁকে খুব স্নেহের চোখে দেখতেন। বিহারের বর্তমান রাজ্য সম্পাদক অরুণ সিংও তাঁর পাশে ছিলেন। এইভাবে ধীরে ধীরে তিনি বিহার পার্টি সংগঠনকে একটা দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে খুবই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
আরও দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কমরেড অরুণ সিং বলেছেন। শংকর সিংয়ের পরিচালনায় দলে শৃঙ্খলা বলে কিছু ছিল না। কমিটি ফাংশনিং, বডি ফাংশনিং ছিল না। বিপ্লবী রাজনীতির চর্চা, বিপ্লবী আচরণবিধির চর্চা হত না। সবই ছিল এলোমেলো, অগোছালো। কমরেড রবীন গিয়ে পশ্চিমবাংলায় পার্টির কাজকর্ম পরিচালনা যে ভাবে দেখেছেন, নিজে করেছেন, বুঝেছেন, বিহারে গিয়ে সেই ভাবে শুরু করেছেন। অবিভক্ত বিহারে, বিশেষ করে বিহারের ওই অংশে এগুলো তিনি শুরু করেছিলেন। আর একটা বিষয়ও অরুণ সিং বলেছেন—‘যত্ন করে দলের কর্মী তৈরি করা, ক্যাডার তৈরি করা— এই জিনিস বিহারে ছিল না। রবীনদা গিয়ে এটা শুরু করেন।’ এবং তার থেকে কিছু কিছু কমরেডকে বাছাই করে কলকাতায় আমার কাছে পাঠাতেন— এটাও অরুণ সিংয়ের বক্তব্য।
বিহারে তাঁর এই ভূমিকা সম্পর্কে আমি কমরেডদের, বিশেষ করে যুবকদের বলব, অনেক সময় বিশেষ করে যুবকরা তাদের চেনা এলাকা ছাড়তে চায় না। কিছু কমরেড রেসপন্স করে, কিন্তু বেশিরভাগই জেলার বাইরে, রাজ্যের বাইরে অপরিচিত জায়গায় যেতে চায় না। অথচ বাইরে কাজ করতে গিয়ে কমরেডদের চরিত্রের বিকাশ ঘটে। পার্টি গঠনের প্রথম যুগে প্রয়াত শ্রদ্ধেয় নেতা কমরেড প্রীতীশ চন্দ, কমরেড হীরেন সরকার, কমরেড তাপস দত্ত, কমরেড অমৃতেশ্বর চক্রবর্তী এই ভাবেই বাইরে গিয়ে সংগঠন গড়ে তোলেন, নিজেরাও নেতৃত্বের স্তরে উন্নীত হন। একই ভাবে পরবর্তীকালে বাংলাদেশে কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় নতুন দল বাসদ (মার্ক্সবাদী) প্রতিষ্ঠা করেছেন, আসামে কমরেড অসিত ভট্টাচার্য একই ভাবে দল গড়ে তোলেন। উভয়েই উন্নত স্তরে উন্নীত হন। একই ঘটনা কমরেড রবীন সমাজপতির ক্ষেত্রেও ঘটেছে। বিহারে পার্টির সংকটের মুহূর্তে কাজ করতে গিয়ে তিনি পার্টিকে যেমন রক্ষা করেছেন, আবার পশ্চিমবঙ্গে তাঁর যে ভূমিকা ছিল, যে স্ট্যান্ডার্ড ছিল, বিহারে কাজ করতে গিয়ে তা অনেক উন্নত হয়েছে। নতুন জায়গায় বাধা-বিপত্তির মধ্যে দিয়ে কাজ করতে গিয়ে, সংগ্রাম করতে গিয়ে তো চরিত্রের বিকাশ ঘটে। আমি জুনিয়র কমরেডদের ক্ষেত্রে এটাকে একটা শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করতে বলব।
২০০০ সালে বিহার বিভক্ত হয়ে ঝাড়খণ্ড গঠিত হয়। সেই সময় ঝাড়খণ্ডের কমরেডরা চাইছেন কমরেড রবীন সমাজপতি তাঁদের ওখানে আসুন। আবার বিহারের কমরেডরা চাইছেন কমরেড রবীন সমাজপতি সেখানেই থাকুন। আমি সেই মিটিংয়ে ছিলাম। বিহারের কমরেডদের মধ্যে কমরেড রবীন সমাজপতিকে নিয়ে যে আবেগ, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি, তাদের চোখের জল দেখেছি। তারা তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না। রবীন সমাজপতিরও নিশ্চয়ই এই সম্পর্কের প্রতি গভীর আবেগ এবং আকর্ষণ ছিল। কিন্তু পার্টি যখন সিদ্ধান্ত নিল তাঁকে ঝাড়খণ্ডে আসতে হবে, তিনি ঝাড়খণ্ডে চলে এলেন। ঝাড়খণ্ডের সম্পাদক ছিলেন কমরেড হেমচন্দ্র চক্রবর্তী। দলের মধ্যে শ্রদ্ধাভাজন, কিন্তু বৃদ্ধ, অশক্ত। তিনি দীর্ঘদিন ধানবাদে থাকতেন। তাঁর স্বাস্থ্যের জন্য তাঁর পরিবার তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না। তিনি বেরোতে চাইছেন, পরিবার আটকাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই লড়াই চলছিল। ফলে সংগঠনকে সেই ভাবে দেখার কেউ ছিল না। কমরেড সুমিত রায় আমাকে বলেছেন, ঝাড়খণ্ডের সাংগঠনিক রাজ্য সম্পাদক কমরেড হেমচন্দ্র চক্রবর্তী আসতে পারছিলেন না। কমরেড রবীন সমাজপতি কমরেড হেমচন্দ্র চক্রবর্তীকে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত রেখে দলের সকল কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। এমন ভাবে করতেন যেন তিনি নন, রাজ্য সম্পাদকই সব কিছু করাচ্ছেন। এই ভূমিকা খুবই বিরল, দৃষ্টান্তমূলক ও শিক্ষণীয়।
আগে এক সময়ে রাঁচিতে সংগঠনের কিছু কাজ ছিল। যে কমরেড এখানে দায়িত্বে ছিলেন, মোটর দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। এরপর রাঁচিতে সংগঠন প্রায় ছিল না বললেই চলে। এখানে এসে কমরেড রবীন সমাজপতির সংগ্রাম আবার নতুন করে শুরু হয়। এই সময় যখন তিনি কলকাতায় আসতেন, আমি জিজ্ঞেস করতাম, কাজ হচ্ছে? বলতেন– এটা হচ্ছে, ওটা হচ্ছে। কিন্তু যে কথা আজকের শ্রদ্ধার্ঘ্যেও বলা আছে—আমি এটা করেছি, আমি ওটা করেছি— এই জিনিস আমি তাঁর মধ্যে কোনও দিন পাইনি। পশ্চিমবঙ্গেও যখন কাজ করেছেন তখনও পাইনি, ওখানে যখন কাজ করেছেন, তখনও পাইনি। অথচ এই কাজগুলি তিনিই করেছেন। আমি যা জেনেছি তার ভিত্তিতেই বলছি।
ঝাড়খণ্ডে তখন পার্টি অফিস ও থাকার জন্য কোনও সেন্টার কিছুই ছিল না। কোনও সমর্থকের বাড়িতে থাকতেন। ঘুরে ঘুরে আবার নতুন করে যোগাযোগ বের করা শুরু করেছেন। এখানে সালটা আমার জানা নেই, কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও আন্দোলন সংগঠিত করার কাজ তিনি একের পর এক করে গেছেন। একটা হচ্ছে, রাঁচিকে কেন্দ্র করে কাজ করা। পরে একটা ছোট অফিস করেছিলেন, কিছুদিন পরে সেটা হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে তাঁর ভাবনা ছিল, পার্টির নিজস্ব অফিস করতে হবে। কিন্তু জায়গা নেই, অর্থ নেই। অন্যেরা বলেছে, আমরা দেনায় ডুবে যাব। কমরেড রবীন বলেছেন, আমাদের অফিস করতেই হবে, আমরা লড়াই করে করব। তারপর ধার করেছেন, চাঁদা তুলেছেন। একটু একটু করে টাকা জোগাড় করে একটু জমি কিনে অফিস করেছেন। পাশে আরএসএসের দপ্তর ছিল। এই জমিতে তারা মন্দির করতে চেয়েছিল। এই নিয়ে তাদের সাথে বিরোধ হয়, কিন্তু স্থানীয় মানুষের সমর্থন নিয়ে দলের অফিস রক্ষা করেন। আজও সেই অফিস আছে।
এরপরে রাঁচিতে আদিবাসী এবং আদিবাসী নয়, এই দুই অংশের মানুষের মধ্যে চাকরির সংরক্ষণ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। দাঙ্গা, লুঠতরাজ, ঘরবাড়ি পোড়ানো এইসব হয়। পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়। ওখানকার অন্যান্য দল এমনকি বামপন্থী দলগুলোও আদিবাসী এবং অ-আদিবাসী, এই ভাবে বিভক্ত হয়ে ছিল। এই সময় কমরেড রবীন সমাজপতির উদ্যোগে পার্টির একটা বক্তব্য পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা হয়। স্থানীয় জনগণের উপর এই বক্তব্যের খুবই প্রভাব পড়ে। ফলে সেই পুস্তিকা কয়েক বার ছাপাতে হয়। সেই সময় এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর এই বক্তব্য জনগণকে সমস্যা সমাধানে সঠিক পথ দেখায়।
আগে বিহারে এবং ঝাড়খণ্ডে ২৪ এপ্রিল জেলায় জেলায় বিচ্ছিন্ন ভাবে পালন করা হত। কমরেড রবীন সমাজপতিই প্রথম কেন্দ্রীয় ভাবে সমাবেশ করার উদ্যোগ নেন। অনেকেই ভরসা পাচ্ছিল না। উনি তখন বলেন যে, আমরা এই সমাবেশ সফল করব। তার পরে জেলায় জেলায় ঘোরেন, কমরেডদের সাথে, সমর্থকদের সাথে কথা বলেন, তাদের আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কমরেডরাও উৎসাহিত হয়। এ ছাড়াও রাঁচিতে মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ও জনজীবনের অন্যান্য সমস্যার সমাধানের দাবিতে তাঁর প্রচেষ্টায় ও অন্যান্য কমরেডদের সহযোগিতায় আমাদের দলের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়, সেখানে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, বেশ কিছু কমরেড আহত হন। এই ধরনের আন্দোলন বিহারে বা ঝাড়খণ্ডে এর আগে হয়নি। এতে কর্মীদের মধ্যে মিলিট্যান্ট আন্দোলনের মানসিকতা তৈরি হয়, তারা শক্তি পায়।
পরবর্তীকালে ঝাড়খণ্ডে বিভিন্ন বস্তি উচ্ছেদ হচ্ছিল। বস্তিবাসীরা অন্যান্য দলের কাছে যায়, কেউ সাড়া দেয়নি। আমাদের দল সাড়া দেয়। কমরেড রবীন সমাজপতির গাইডেন্সে বস্তি বাঁচাও আন্দোলন শুরু হয়। বস্তি বাঁচাও কমিটি গঠিত হয়। দিনের পর দিন এই আন্দোলন চলে। বুলডোজার সহ পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী, ব়্যাফ নামানো হয়। মহিলারা রাস্তায় শুয়ে পড়ে প্রতিরোধ করেন। বারবার উচ্ছেদের আক্রমণ আসে, বারবার বস্তিবাসীরা প্রতিরোধ করে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিবাদ চলতে চলতে বস্তিবাসীদের মধ্যেও পার্টির খুবই প্রভাব তৈরি হয়।
কমরেড রবীন সমাজপতি আর একটা কাজ বিহারে থাকাকালীন শুরু করেছিলেন সেটা হচ্ছে, শরৎচন্দ্র, প্রেমচন্দের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান। কমরেড রবীন সমাজপতিই বিহারে এটা প্রথম শুরু করেন। পরে ঝাড়খণ্ডেও এটা শুরু হয়, এখনও হচ্ছে। বিভিন্ন মনীষী, আদিবাসীদের বীর যোদ্ধা সহ বিভিন্ন বিপ্লবীদের স্মরণ করে তাঁদের জন্মজয়ন্তী, স্মরণ দিবস পালনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছাত্র-যুবক, সাধারণ মানুষদের শামিল করে ওখানে চলছে।
কমরেড রবীন সমাজপতির সমস্ত কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে দলের কর্মী-সংগঠকরা তাঁকে যেভাবে দেখেছেন—তাতে সবাই বলেছেন, তিনি এমন একজন সংগঠক ছিলেন যিনি কখনও এতটুকু আত্মপ্রচার চাননি, যাঁর মধ্যে কোনও ইগো, কোনও অহংকার, বা আমি এই করেছি, আমি ওই করতে পারি এসব জিনিস ছিল না। বলতে গেলে অনেকখানি ইমপার্সোনাল ক্যারেক্টার, সংবেদনশীল, দরদি মনের ও নম্র আচরণের অধিকারী ছিলেন তিনি। ছোট-বড় নির্বিশেষে যারাই তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, তাদের ওপরে তিনি একটা গভীর ছাপ ফেলেছেন, তারা কমরেড রবীন সমাজপতিকে ভুলতে পারবে না।
এই যে ভূমিকা, এই যে চরিত্র, এর উৎস কোথায়? এর উৎস মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা। এই শিক্ষাকে কমরেড রবীন সমাজপতি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং এই শিক্ষাকে নিয়েই তিনি আজীবন সাধনা করে গেছেন। আজ কমরেডরা তাঁর জন্য যে চোখের জল ফেলছে, আবেগরুদ্ধ কণ্ঠস্বরে তাঁর সম্পর্কে বলছে, এটা তাঁর প্রাপ্য, তার চরিত্রের জন্যই এটা তাঁর প্রাপ্য। তাঁর জীবনের সাথে আমি প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত ছিলাম। ফলে এই কথাগুলো আজ যে আমাকে এখানে বলতে হচ্ছে এটা যখন ভাবি, খুবই কষ্ট দেয়, বেদনা দেয়। আমি অনেক সময় তাঁর সমালোচনা করেছি। আমাদের দলে আত্মসমালোচনা, সমালোচনা চলে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে ভিত্তি করেই। কমরেড শিবদাস ঘোষ অন্য নেতাদের সমালোচনা করেছেন, আমারও করেছেন, আবার আমিও এখন নেতাদের সমালোচনা করি। এটা ভালবাসা থেকেই করা হয়।
এই বছর মে মাসে যখন কমরেড রবীন সমাজপতি চিকিৎসার জন্য কলকাতা এসেছিলেন, ঝাড়খণ্ডের সংগঠন নিয়ে আলোচনা করতে করতে আমি তাঁকে কিছু সমালোচনা করি। উত্তরে তিনিও আমার সমালোচনা করে বলেন, প্রভাসদা, বড় দেরি করে ফেললেন। আমি তো আর বেশি দিন কিছু করতে পারব না। আমি বলি, কেন? তিনি বলেন, আমার যা স্বাস্থ্য আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। আমি বললাম সে কী? তুমি তো আমার থেকে অনেক ছোট। তিনি বলেন, আপনাকে আরও অনেক দিন বাঁচতে হবে, কিন্তু আমার সেই স্বাস্থ্য আর নেই। এই কথাগুলো যে এত অল্প দিনের মধ্যে এত নিষ্ঠুর বাস্তব হয়ে দেখা দেবে, তা আমি সে দিন ভাবতে পারিনি।
কমরেড, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় পরিস্থিতি আজ খুবই ভয়ঙ্কর। প্যালেস্টাইনে, গাজায় হাজার হাজার মানুষকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাহায্য নিয়ে ইজরায়েল খুন করছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইরান আক্রমণ করেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে মিথ্যা অভিযোগে মাঝরাতে বন্দি করে তুলে নিয়ে গেছে। বিশ্বজুড়েই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই আক্রমণ চলছে। আজ সমাজতান্ত্রিক শিবির নেই, কমিউনিস্ট আন্দোলনের জোয়ার নেই। দেশে দেশে বিক্ষোভ-আন্দোলন হচ্ছে এ কথা ঠিক। কিছু বছর আগে আমেরিকায় কয়েক মাস ধরে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন চলল। সম্প্রতি প্যালেস্টাইনের পক্ষ নিয়ে আমেরিকায় ‘নো কিংস’ স্লোগান দিয়ে আন্দোলনের ঢেউ উঠছে। ইউরোপ সহ দেশে দেশে বিক্ষোভের ঢেউ আসছে, আবার স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনও কমিউনিস্ট পার্টি নেই। আমরা জানি, কমরেড শিবদাস ঘোষ লেনিন-পরবর্তীকালে মার্ক্সবাদকে যে ভাবে উন্নত করেছেন, বিকশিত করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন, আজকের দিনে একটা কমিউনিস্ট পার্টি কী ভাবে গড়ে তুলতে হবে সেই শিক্ষা রেখে গেছেন, একে বাদ দিয়ে আজ বিশ্বের কোনও দেশে যথার্থ কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই কথাগুলো কে পৌঁছে দেবে? এখানেই আমাদের দলের উপর ঐতিহাসিক দায়িত্ব এসে পড়েছে। যদি আমরা দ্রুত শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারি, তা হলে আমরা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন দলগুলির কাছে কমরেড শিবদাস ঘোষের এই অমূল্য শিক্ষাগুলি পৌছে দিতে পারি।
আমাদের দেশের পরিস্থিতিও ভয়ঙ্কর। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক, নৈতিক জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই সর্বগ্রাসী সংকট। কেন্দ্রে এবং বহু রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতাসীন। কংগ্রেস পুঁজিবাদের স্বার্থে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, বিজেপি তাকে আরও মজবুত করছে, শক্তিশালী করছে। একচেটিয়া পুঁজি, মাল্টিন্যাশনালরা দেশের সমস্ত সম্পদ গ্রাস করছে। জনসংখ্যার ৫ শতাংশ দেশের সমস্ত সম্পদের ৬৫ শতাংশের মালিক। বাকি ৯৫ শতাংশ হচ্ছে শোষিত এবং তার মধ্যেও ৯০ শতাংশ হচ্ছে সর্বহারা, আধা সর্বহারা, ভিখারি। মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত হচ্ছে, নিম্নমধ্যবিত্ত সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে। রাজনীতি নীতিহীন। চূড়ান্ত দুর্নীতি, মিথ্যাচার, কপটতা, প্রতারণা—এই হচ্ছে রাজনীতির চেহারা। নীতি-নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব আজ ধ্বংসপ্রায়। কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদ এলে মানুষ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকেই ধ্বংস করে দেয়, দেশে মানুষ বলে আর কিছু থাকে না। সেই অবস্থাই আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি। নীতি-নৈতিকতা, মনুষ্যত্বের সংকট প্রবল, যুবসমাজ পথভ্রষ্ট। যুবসমাজের মধ্যে ড্রাগ অ্যাডিকশন, মোবাইল অ্যাডিকশন, সেক্স অ্যাডিকশন, আরও নানা ধরনের অ্যাডিকশন দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এই মুহূর্তে, এখনই দেশজুড়ে কত কৃষক-শ্রমিক খিদের জ্বালায়, ঋণের জ্বালায় আত্মহত্যা করছে। এই মুহূর্তে কত নারী আক্রান্ত হয়ে আর্তনাদ করছে। এই হচ্ছে দেশের পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে কে? কোন সেই শক্তি? একমাত্র শক্তি কমরেড শিবদাস ঘোষ প্রতিষ্ঠিত দল এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)। একমাত্র আমরাই পারি। তার জন্য আমাদের দলের বিস্তার দরকার, সংগঠনের বিস্তার দরকার। আমাদের কর্মীদের রাজনৈতিক চেতনার মান, চরিত্রের মান আরও উন্নত হওয়া দরকার। যে ভাবে, যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই সময় কমরেড রবীন সমাজপতি গড়ে উঠেছিলেন, সেই সংগ্রাম চাই। যে ভাবে তিনি নিজেকে সর্বাত্মক সংগ্রামের দ্বারা গড়ে তুলেছিলেন, আজকের দিনে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে গিয়ে কমরেডদের সেটাই স্মরণ করতে হবে। আজ তাঁর সিনিয়র যাঁরা আছেন, মঞ্চে যাঁরা আছেন আমি তাঁদের জানি, তাঁদেরও কমরেড রবীন সমাজপতির থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। জুনিয়রদেরও শেখার আছে, সকলেরই শেখার আছে। সেই ভাবে যদি আপনারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যার যেখানে ত্রুটি-বিচ্যুতি-সীমাবদ্ধতা আছে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এগিয়ে যান, কমরেড শিবদাস ঘোষের উপযুক্ত ছাত্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-কমরেড শিবদাস ঘোষের ঝান্ডা বহন করার জন্য, তবেই এই স্মরণসভার সার্থকতা। না হলে, আমরা যতই আবেগ প্রকাশ করি, চোখের জল ফেলি, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কোনও সার্থকতা নেই। ফলে এই ভাবেই আপনারা ভাববেন, বিচার করবেন, এই আবেদন রেখেই আমি আমার বক্তব্য এখানে শেষ করছি।
কমরেড রবীন সমাজপতি লাল সেলাম
কমরেড শিবদাস ঘোষ লাল সেলাম
এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) জিন্দাবাদ