Breaking News

সাম্যবাদের মূল নীতি—ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

১৮৪৭ সালে কমিউনিস্ট লিগের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে একটি কর্মসূচি তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। রচনার দায়িত্ব নেন লিগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। প্রথম খসড়াটির নাম রাখা হয়েছিল, ‘কনফেশন অফ ফেথ’। এই খসড়াটির কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রশ্নোত্তরে লেখা বর্তমান রচনাটি দ্বিতীয় খসড়া রূপে এঙ্গেলস তৈরি করেন। কমিউনিজমের আদর্শকে সহজ ভাষায় বোঝাবার জন্য প্রশ্নোত্তর রূপে লিখলেও, এঙ্গেলস এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। ১৮৪৭-এর ২৩ নভেম্বর মার্ক্সকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন– প্রশ্নোত্তরে লেখাটার উপর একটু ভাবনা-চিন্তা কোরো। আমার মনে হয়, এ ভাবে চলবে না। ইতিহাসের ঘটনাবলি কিছু যুক্ত করেই এটা দাঁড় করাতে হবে এবং নামও হওয়া উচিত ‘কমিউনিস্ট ইস্তাহার’। ১৮৪৮ সালেই প্রকাশিত হয় মার্ক্স-এঙ্গেলস রচিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো বা ইস্তাহার। সুতরাং বর্তমান প্রশ্নোত্তরের লেখাটিকে কমিউনিস্ট ইস্তাহারের খসড়া হিসাবেই দেখতে হবে। ৫ আগস্ট এঙ্গেলসের ১৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা লেখাটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছি।

প্রথম কিস্তি (৭৯ বর্ষ ২ সংখ্যা ৭ আগস্ট ২০২৬)

প্রশ্নঃ কমিউনিজম কী?

উত্তরঃ কমিউনিজম হল সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির জন্য আবশ্যক শর্তাবলি সংক্রান্ত মতবাদ।

প্রশ্নঃ সর্বহারা শ্রেণি কী?

উত্তরঃ সর্বহারা শ্রেণি হল সমাজের সেই শ্রেণি যারা জীবনধারণের রসদ জোগাড় করে সম্পূর্ণ ভাবে ও কেবলমাত্র শ্রম বিক্রি করে, কোনও রকম পুঁজি থেকে পাওয়া লাভ দিয়ে নয়। যাদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য, জীবন-মরণ, সমগ্র অস্তিত্ব নির্ভর করে শ্রমের চাহিদার উপর, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভাল আর মন্দ পালা-বদলের উপর, লাগামছাড়া প্রতিযোগিতার ওঠা-পড়ার উপর। এক কথায় প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেণি হল উনিশ শতকের শ্রমিক শ্রেণি।

প্রশ্নঃ তা হলে কি সর্বহারা শ্রেণি সব যুগে ছিল না?

উত্তরঃ না। গরিব মানুষ আর মেহনতি শ্রেণি সব সময়েই থেকেছে। মেহনতি শ্রেণিগুলির বেশির ভাগই ছিল গরিব। কিন্তু আজকের দিনে যে পরিস্থিতিতে গরিব মেহনতি মানুষের বাস, তা আগে ছিল না। অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণি সব যুগে ছিল না। ঠিক যেমন এই ধরনের বল্গাহীন অবাধ প্রতিযোগিতার যুগও চিরকাল ছিল না।

প্রশ্নঃ সর্বহারা শ্রেণির উদ্ভব হল কী ভাবে?

উত্তরঃ শিল্প বিপ্লবের ফল হিসাবেই সর্বহারা শ্রেণির জন্ম হয়েছিল, যে বিপ্লব গত শতাব্দীর (অষ্টাদশ) দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডে সংঘটিত হয়েছিল এবং সেখান থেকে দুনিয়ার সমস্ত সভ্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

স্টিম ইঞ্জিন, সুতো কাটার নানাবিধ যন্ত্র, যন্ত্র চালিত তাঁত এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির বিপুল সম্ভার আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে শিল্পবিপ্লব দ্রুতগতিতে বাস্তব রূপ নিতে থাকল। এই সমস্ত যন্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুলহওয়ায় একমাত্র বৃহৎ পুঁজিপতিদের পক্ষেই তা কেনা সম্ভব ছিল। এই নতুন যন্ত্র এবং প্রযুক্তি উৎপাদনের পুরো পদ্ধতিটাকেই পাল্টে দিল। সাথে সাথে আগেকার কারিগর এবং হস্তশিল্পীদেরও উচ্ছেদ করে দিল। কারণ, হস্তশিল্পীরা তাদের পুরনো চরকা ও হস্তচালিত তাঁতের সাহায্যে যা উৎপাদন করত তার তুলনায় মেশিন এখন অনেক সস্তায় অনেক উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হল। এই সব যন্ত্রপাতিই শিল্পোদ্যোগকে পুরোপুরি তুলে দিল বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে এবং হস্তশিল্পীদের হাতে থাকা অকিঞ্চিতকর সম্পত্তিকে (যেমন– ছোটখাটো যন্ত্রাদি, তাঁত ইত্যাদি) নেহাত অকেজো জিনিসে পর্যবসিত করল। এই ভাবে অচিরেই পুঁজিপতিরা হয়ে গেল সব কিছুর মালিক। শ্রমিকদের হাতে আর রইল না কিছুই। এই ভাবেই বস্ত্রশিল্পে কারখানাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা সূচিত হল।

যন্ত্রপাতি ও কারখানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হওয়ার সাথে সাথেই শিল্পোৎপাদনের সমস্ত শাখায়, বিশেষ করে পোশাক, মুদ্রণ শিল্প, মৃৎশিল্প ও ধাতুশিল্পে এই ব্যবস্থা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।

কাজ ক্রমে ব্যক্তি শ্রমিকদের মধ্যে বিভক্ত হতে থাকল। ফলে আগে যে কারিগর একাই কোনও একটি কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করত, এখন সে করে কাজের কেবল অংশবিশেষ মাত্র। এই শ্রমবিভাজন আরও সস্তায় ও দ্রুতহারে উৎপাদন সামগ্রী প্রস্তুত সম্ভব করে তুলল। এই শ্রমবিভাগ ব্যক্তি শ্রমিকের কাজকে পরিণত করল সরল ও অনবরত পুনরাবৃত্ত যান্ত্রিক ক্রিয়ায়। এই উৎপাদন কেবলমাত্র মেশিনের দ্বারা সম্ভব হল তাই নয়, তা আরও ভাল ভাবে সম্পন্ন হল। সুতাকাটা ও বয়নশিল্পে যা ঘটেছিল, সে ভাবেই একে একে শিল্পের সমস্ত শাখা বাষ্পশক্তি, যন্ত্রশক্তি ও কারখানা ব্যবস্থার আওতায় চলে এল।

এরই সাথে সমস্ত শিল্প বৃহৎ পুঁজিপতিদের কুক্ষিগত হল এবং শ্রমিকরা আগে যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করত তার থেকে বঞ্চিত হল। বৃহৎ পুঁজিপতিরা বিশাল বিশাল ওয়ার্কশপ খুলে যত বেশি বেশি করে দক্ষ ক্ষুদ্র হস্তশিল্পীদের উৎপাটিত করতে শুরু করল, ততই প্রকৃত উৎপাদন শিল্প শুধু নয়, এমনকি হস্তশিল্পজাত উৎপাদনও কারখানাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার আওতায় চলে এল। এর ফলে পুঁজিপতিদের খরচ যেমন অনেক বাঁচল, তেমনই শ্রমবিভাজনকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ মিলল।

এই রাস্তাতেই বর্তমান যুগের সভ্য দেশগুলিতে কারখানাভিত্তিক উৎপাদন পূর্বপ্রচলিত প্রায় সকল প্রকার শ্রম, হস্তশিল্প এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়েছে, সমস্ত প্রকার শ্রমই ব্যয়িত হচ্ছে কারখানায়। এই ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান হারে আগেকার মধ্যশ্রেণিগুলি, বিশেষত অপেক্ষাকৃত খুদে হস্তশিল্পীদের উত্তরোত্তর ধ্বংস করে দিয়েছে, সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে শ্রমিকদের আগেকার অবস্থান। দেখা দিয়েছে দু’টি নতুন শ্রেণি, যারা অন্যান্য সমস্ত শ্রেণিকে ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, এই শ্রেণি দু’টি হলঃ

(১) বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণি, এরা সমস্ত সভ্য দেশে ইতিমধ্যে প্রায় সামগ্রিক ভাবেই জীবনধারণের সমস্ত সামগ্রীর এবং সেগুলি উৎপাদনের জন্য আবশ্যক কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি আর কল-কারখানা ইত্যাদির উপর একছত্র দখল কায়েম করে ফেলেছে। এরাই হল বুর্জোয়া শ্রেণি বা পুঁজিপতি।

(২) সম্পূর্ণ সম্পত্তিহীন শ্রেণি, যারা তাদের বেঁচে থাকার উপায় ও উপকরণ সংগ্রহের জন্য বুর্জোয়াদের কাছে তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এদেরই বলা হয় সর্বহারাশ্রেণি বা সর্বহারা।

প্রশ্নঃ বুর্জোয়াদের কাছে সর্বহারাদের এই শ্রম বেচা চলে কোন শর্তে?

উত্তরঃঅন্য যে কোনও পণ্যের মতো শ্রমও একটা পণ্য এবং সে সব পণ্যের মতোই একই নিয়মে তার দাম স্থির হয়। আমরা দেখব– বৃহৎ শিল্প কিংবা অবাধ প্রতিযোগিতার রাজত্ব– উভয় ক্ষেত্রেই একই রকম ভাবে– পণ্যমূল্য সব সময়ই মোটের উপর পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের সমান। সুতরাং, শ্রমের মূল্যও শ্রমের উৎপাদন ব্যয়ের সমান।

কিন্তু শ্রম উৎপাদনের ব্যয় বলতে বোঝায়, সেই পরিমাণ জীবন ধারণের উপকরণের দাম, যতটুকু না হলে মজুর আগামী দিনে কাজ চালিয়ে যাবার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না এবং যা শ্রমিকশ্রেণিকে মরে শেষ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যতটুকু দরকার, শ্রমের দাম হিসেবে তার থেকে একটুও বেশি মজুর পাবে না। অন্য কথায়, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের সবচেয়ে কম পরিমাণই হবে শ্রমের দাম বা মজুরি। যেহেতু ব্যবসা কখনও ভাল চলে, কখনও মন্দ, তার ওপর নির্ভর করে মজুর তার শ্রমের মূল্যও কখনও বেশি, কখনও কম পায়। কিন্তু আবার ঠিক ভাবে ধরতে গেলে, একজন শিল্পপতির সময় ভাল চলুক বা মন্দ, গড়পড়তা পণ্য উৎপাদনের ব্যয়ের তুলনায় সে পণ্যের দাম কখনওই বেশি বা কম পায় না। অনুরূপে মজুরও গড়পড়তা ন্যূনতম মজুরির থেকে কম বা বেশি পায় না। বৃহদায়তন শিল্প উৎপাদনের সমস্ত শাখার উপর যত বেশি পরিমাণে দখলদারি কায়েম করছে, তত কঠোর ভাবে প্রযুক্ত হচ্ছে মজুরির এই নিয়ম।

প্রশ্নঃ শিল্প-বিপ্লবের আগে কোন কোন মেহনতি শ্রেণি ছিল?

উত্তরঃসমাজের বিকাশের বিভিন্ন পর্বে মেহনতি শ্রেণিগুলির জীবনযাত্রার পরিবেশ ছিল বিভিন্ন রকম। মনিব এবং শাসক শ্রেণিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ছিল বিভিন্ন। প্রাচীনকালে মেহনতি জনগণ ছিল তাদের মালিকদের দাস, ঠিক যেমন এখনও তারা রয়েছে অনেক অনগ্রসর দেশে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাংশেও।

মধ্যযুগে তারা ছিল ভূস্বামী অভিজাতকূলের অধীনস্থ ভূমিদাস, যেমনটা এখনও রয়েছে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড এবং রাশিয়ায়। এর সাথে মধ্যযুগে এমনকি শিল্প-বিপ্লব পর্যন্ত ছিল পেটি-বুর্জোয়া মনিবদের কাজে নিযুক্ত শহরাঞ্চলের হস্তশিল্পীরা। ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প প্রসারের সাথে ক্রমে ম্যানুফ্যাক্টরি (ছোট কারখানা) শ্রমিকদের উদ্ভব ঘটেছিল। ধীরে ধীরে এখন তারাই বড় বড় পুঁজিপতিদের অধীনে কর্মরত।

প্রশ্নঃ দাসদের সাথে সর্বহারার পার্থক্য কোথায়?

উত্তরঃ একবারেই পুরোপুরি ভাবে বিক্রি হয় দাস। সর্বহারা নিজেকে বিকোতে বাধ্য হয় প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায়। একজন বিশেষ দাস, একজন বিশেষ মালিকের সম্পত্তি– আর কিছু না হলেও অন্তত মালিকের স্বার্থের খাতিরে এই দাসের জীবনধারণের উপায় নিশ্চিত থাকে, সেটা যত অকিঞ্চিৎকরই হোক। একজন ব্যক্তি সর্বহারা মানুষ কার্যত গোটা বুর্জোয়া শ্রেণির সম্পত্তি, কারও প্রয়োজন হলেই কেবলমাত্র তার শ্রম কেনা হয়। ফলে তার বেঁচেবর্তে থাকার কোনও গ্যারান্টি নেই। শুধুমাত্র সামগ্রিক শ্রেণিগত ভাবেই সর্বহারার অস্তিত্বের নিশ্চয়তা আছে।

দাস থাকে প্রতিযোগিতার বাইরে, প্রলেতারিয়েতের অবস্থান সেটার মধ্যে। তাই এর যাবতীয় অনিশ্চিত ওঠা-পড়ার ফল তাকে ভুগতে হয়়। দাস গণ্য হয় সামগ্রী হিসাবে,সমাজের একজন হিসাবে নয়। এর ফলে সর্বহারাদের তুলনায় তাদের টিকে থাকা হয়ত সহজ ছিল। যদিও সর্বহারা সংযুক্ত সমাজ বিকাশের একটা উচ্চতর স্তরের সঙ্গে। তার সামাজিক অবস্থানও দাসের চেয়ে উপরের স্তরে। সকল প্রকার ব্যক্তি মালিকানা সংক্রান্ত সম্পর্কের মধ্যে কেবল দাসত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করেই একজন ব্যক্তি-দাস মুক্তি পেয়ে সর্বহারায় পরিণত হতে পারে। অন্য দিকে সর্বহারা মুক্তি লাভ করতে পারে শুধু সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা লোপ করার দ্বারাই।

প্রশ্নঃ ভূমিদাসদের সাথে সর্বহারার পার্থক্য কোথায়?

উত্তরঃ উৎপাদনের একটা হাতিয়ার অর্থাৎ একটুকরো জমি থাকে ভূমিদাসের দখলে, যা সে ব্যবহারের অধিকারী। যার বিনিময়ে তাকে উৎপাদিত দ্রব্যের কিংবা পরিষেবা হিসাবে শ্রমের একাংশ দিতে হয়। সর্বহারা উৎপাদনের যে যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করে সেটা অপরের, সে কাজ করে সেই অপরের সুবিধার জন্য, তার জন্য সে পায় উৎপাদনের একাংশ। ভূমিদাস দেয়, সর্বহারাকে দেওয়া হয়। ভূমিদাসের জীবনধারণের উপায়ের নিশ্চয়তা থাকে, সর্বহারার থাকে না। ভূমিদাস থাকে প্রতিযোগিতার বাইরে, সর্বহারার অবস্থান সেটার মাঝে। ভূমিদাস মুক্ত হতে পারে তিনটি উপায়ে– সে শহরে পালিয়ে গিয়ে সেখানে হস্তশিল্পী হয়ে উঠতে পারে, অথবা সামন্তপ্রভুকে শ্রম আর উৎপাদিত দ্রব্যের বদলে টাকা দিয়ে স্বাধীন প্রজায় পরিণত হতে পারে। না হলে সামন্ত প্রভুকে উৎখাত করে সে নিজেই হয়ে উঠতে পারে সম্পত্তির মালিক। এক কথায়, কোনও না কোনও উপায়ে সে এসে যায় মালিক শ্রেণি আর প্রতিযোগিতার মধ্যে। অপর দিকে, প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং সমস্ত শ্রেণিগত পার্থক্য লোপ করে মুক্ত হয় সর্বহারা।

দ্বিতীয় কিস্তি (৭৯ বর্ষ ৩ সংখ্যা ১৪ আগস্ট ২০২৬)

প্রশ্নঃ কারিগরদের সাথে সর্বহারার পার্থক্য কোথায়?

উত্তরঃ সর্বহারার বিপরীতে তথাকথিত যে কারিগর (হস্তশিল্পী) সম্প্রদায়কে গত শতাব্দীতে (অষ্টাদশ) প্রায় সর্বত্র দেখা যেত এবং এখনও স্থানে স্থানে তাদের পাওয়া যায়, তারা বড়জোর সাময়িক ভাবে সর্বহারা। তাদের লক্ষ্য থাকে নিজস্ব পুঁজি সঞ্চয় করার, যার মাধ্যমে অন্য মজুরদের শোষণ করা যায়। এই লক্ষ্য পূরণ তাদের পক্ষে সম্ভব– যেখানে এখনও কারিগরদের গিল্ডের অস্তিত্ব আছে অথবা যেখানে গিল্ডের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পেশায় থাকা কারিগরদের উৎপাদন এখনও কারখানা ভিত্তিতে সংগঠিত হয়নি এবং সে কারণে এখনও হিংস্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু যে মুহূর্তে কারুশিল্প কারখানা-উৎপাদন ব্যবস্থার অন্তর্গত হল এবং প্রতিযোগিতা পুরোপুরি মাথা তুলল, আগের পরিস্থিতি ক্রমাগত লুপ্ত হয়ে কারিগররা বেশি বেশি করে সর্বহারায় রূপান্তরিত হতে লাগল। এই ভাবে কারিগররা হয় নিজেরাই বুর্জোয়ায় পরিণত হয়ে, অথবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তে পরিণত হয়ে নিজেদের মুক্ত করল। আর না হলে প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে তারা পরিণত হল সর্বহারায় (আজকের দিনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা ঘটছে)। এই অবস্থায় তারা সর্বহারা আন্দোলনে যোগ দিয়ে যথার্থ মুক্তি অর্জন করতে পারে– যা বলতে গেলে বাস্তবে কমিউনিস্ট আন্দোলন।

(এই প্রশ্নটির উত্তরের জায়গাটি এঙ্গেলস খসড়ায় ফাঁকা রেখেছিলেন। কিন্তু এই রচনার ঠিক আগে লেখা ড্রাফট অফ এ কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ’-এ ১২ নম্বর প্রশ্ন এবং উত্তরটি ছিল হুবহু এক। সেটিই এখানে দেওয়া হল। সূত্রঃ কার্ল মার্ক্স-ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কালেক্টেড ওয়ার্কস, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স নিউইয়র্ক, ১৯৭৬)

প্রশ্নঃ প্রাক-শিল্পবিপ্লব ক্ষুদ্র উৎপাদন শ্রমিকদের (ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিক) সঙ্গে সর্বহারাদের তফাৎ কোথায়?

উত্তরঃ সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকের ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিকদের হাতে কিছু উৎপাদনের হাতিয়ার যেমন, নিজস্ব তাঁত, পারিবারিক সুতা কাটার যন্ত্র, অবসর সময়ে চাষবাস করা চলে এমন ছোট একখণ্ড জমি– এ সব ছিল এবং এখনও কোথাও কোথাও তা আছে। সর্বহারার এ সব কিছুই নেই।

ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিকেরা মূলত গ্রামাঞ্চলে বাস করত এবং জমিদার বা নিয়োগকারীদের সঙ্গে খানিকটা পিতৃতান্ত্রিক সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল।

সর্বহারা মূলত শহরবাসী এবং নিয়োগকারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিখাদ আর্থিক। বৃহৎ শিল্প ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিককে তারএই পিতৃতান্ত্রিক সম্পর্ক থেকে ছিন্ন করল শুধু নয়, তার সামান্য যা নিজস্ব সম্পত্তি ছিল, এর ফলে তাও সে হারাল এবং এ ভাবেই পরিণত হল সর্বহারায়।

প্রশ্নঃ শিল্প-বিপ্লব এবং বুর্জোয়া আর সর্বহারার মধ্যে সমাজ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তরঃ প্রথমত, যন্ত্রের সাহায্যে উৎপাদনের ফলে শিল্পজাত দ্রব্য সমানে সস্তা হয়ে যেতে থাকল। ফলে, কায়িক শ্রমের ভিত্তিতে চলা ক্ষুদ্র উৎপাদন শিল্পের (ম্যানুফ্যাক্টরি) পুরনো প্রণালীটা পৃথিবীর সমস্ত দেশে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল। যে সব অর্ধসভ্য (সেমি বারবারিয়ান) দেশ তখনও পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক অগ্রগতির ধারা থেকে কিছুটা হলেও বিচ্ছিন্নছিল এবং তাদের উৎপাদন পদ্ধতি তখনও পুরনো উৎপাদন প্রণালীতে চলত, তাদের বিচ্ছিন্নতার গণ্ডি থেকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করা হল। ব্রিটিশের অপেক্ষাকৃত সস্তা পণ্যদ্রব্য কেনার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষুদ্র উৎপাদন-শ্রমিকদের ধ্বংস হয়ে যেতে দিতে হল তাদের। হাজার হাজার বছরেও যে সব দেশে প্রগতির চিহ্ন দেখা যায়নি– যেমন, ভারতবর্ষ– সেখানেও আগাগোড়া বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেল, এমনকি, চীনও বিপ্লবের পথে হাঁটা শুরু করল।

আজ এমন এক পরিস্থিতি এসেছে যে, ইংল্যান্ডে উদ্ভাবিত একটা যন্ত্র বছরখানেকের মধ্যে চীনের লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে কর্মহীন করে দেয়।

বৃহদায়তন শিল্প এই ভাবে পৃথিবীর সমস্ত জাতিকে একটা সম্পর্কের মধ্যে টেনে এনেছে। ছোট ছোট সমস্ত স্থানীয় বাজারকে জুড়ে দিয়েছে বিশ্ব-বাজারে, সভ্যতা আর প্রগতির পথ সুগম করেছে সর্বত্র। উন্নত দেশগুলির ঘটনা প্রবাহের দ্বারা যাতে দুনিয়ারসমস্ত দেশ প্রভাবিত হয় সেই ব্যবস্থা করেছে।

তাই আজ ইংল্যান্ড কিংবা ফ্রান্সের শ্রমিকরা মুক্তি অর্জন করলে তা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বের সমস্ত দেশের শ্রমিককে বিপ্লবের রাস্তা দেখাবে। আজ হোক আর কাল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এই সমস্ত দেশের শ্রমিক মুক্তি অর্জনে সফল হবেই।

দ্বিতীয়ত, যেখানেই ক্ষুদ্র শিল্পকে হটিয়ে তার জায়গায় বৃহদায়তন শিল্প এসেছে, সেখানেই শিল্প বিপ্লব বুর্জোয়াদের উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে। তাদের সম্পদ ও ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে গেছে, তাদের প্রধান শ্রেণি হিসাবে গড়ে তুলেছে। তার ফল হয়েছে, যেখানেই এই ঘটনা ঘটেছে সেখানে বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং উচ্ছেদ করেছে পূর্বতন সমস্ত শাসক শ্রেণি– অভিজাতকূলকে, গিল্ডের মনিবদের এবং এই দু’য়ের প্রতিভূ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রকে। 

তৃতীয় কিস্তি (৭৯ বর্ষ ৪ সংখ্যা ২১ আগস্ট ২০২৬)

 

প্রশ্নঃ শিল্প-বিপ্লব এবং বুর্জোয়া আর সর্বহারার মধ্যে সমাজ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তরঃ প্রথমত, যন্ত্রের সাহায্যে উৎপাদনের ফলে শিল্পজাত দ্রব্য সমানে সস্তা হয়ে যেতে থাকল। ফলে, কায়িক শ্রমের ভিত্তিতে চলা ক্ষুদ্র উৎপাদন শিল্পের (ম্যানুফ্যাক্টরি) পুরনো প্রণালীটা পৃথিবীর সমস্ত দেশে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল। যে সব অর্ধসভ্য (সেমি বারবারিয়ান) দেশ তখনও পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক অগ্রগতির ধারা থেকে কিছুটা হলেও বিচ্ছিন্নছিল এবং তাদের উৎপাদন পদ্ধতি তখনও পুরনো উৎপাদন প্রণালীতে চলত, তাদের বিচ্ছিন্নতার গণ্ডি থেকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করা হল। ব্রিটিশের অপেক্ষাকৃত সস্তা পণ্যদ্রব্য কেনার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষুদ্র উৎপাদন-শ্রমিকদের ধ্বংস হয়ে যেতে দিতে হল তাদের। হাজার হাজার বছরেও যে সব দেশে প্রগতির চিহ্ন দেখা যায়নি– যেমন, ভারতবর্ষ– সেখানেও আগাগোড়া বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেল, এমনকি, চীনও বিপ্লবের পথে হাঁটা শুরু করল।

আজ এমন এক পরিস্থিতি এসেছে যে, ইংল্যান্ডে উদ্ভাবিত একটা যন্ত্র বছরখানেকের মধ্যে চীনের লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে কর্মহীন করে দেয়।

বৃহদায়তন শিল্প এই ভাবে পৃথিবীর সমস্ত জাতিকে একটা সম্পর্কের মধ্যে টেনে এনেছে। ছোট ছোট সমস্ত স্থানীয় বাজারকে জুড়ে দিয়েছে বিশ্ব-বাজারে, সভ্যতা আর প্রগতির পথ সুগম করেছে সর্বত্র। উন্নত দেশগুলির ঘটনা প্রবাহের দ্বারা যাতে দুনিয়ারসমস্ত দেশ প্রভাবিত হয় সেই ব্যবস্থা করেছে।

তাই আজ ইংল্যান্ড কিংবা ফ্রান্সের শ্রমিকরা মুক্তি অর্জন করলে তা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বের সমস্ত দেশের শ্রমিককে বিপ্লবের রাস্তা দেখাবে। আজ হোক আর কাল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এই সমস্ত দেশের শ্রমিক মুক্তি অর্জনে সফল হবেই।

দ্বিতীয়ত, যেখানেই ক্ষুদ্র শিল্পকে হটিয়ে তার জায়গায় বৃহদায়তন শিল্প এসেছে, সেখানেই শিল্প বিপ্লব বুর্জোয়াদের উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে। তাদের সম্পদ ও ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে গেছে, তাদের প্রধান শ্রেণি হিসাবে গড়ে তুলেছে। তার ফল হয়েছে, যেখানেই এই ঘটনা ঘটেছে সেখানে বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং উচ্ছেদ করেছে পূর্বতন সমস্ত শাসক শ্রেণি– অভিজাতকূলকে, গিল্ডের মনিবদের এবং এই দু’য়ের প্রতিভূ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রকে।

সম্পত্তির উত্তরাধিকারকে বংশানুক্রমেকুক্ষিগত করে রাখার অধিকারকে বাতিল করে এবং ভূমি-সম্পত্তিকে ক্রয়-বিক্রয়ের যোগ্য করে দিয়ে, উচ্চবর্গীয়দের় সমস্ত বিশেষ অধিকার লোপ করে বুর্জোয়ারা অভিজাত এবং উচ্চবর্গীয়দের ক্ষমতা চূর্ণ করেছিল। গিল্ডগুলিকে এবং হস্তশিল্পীদের বিশেষ অধিকারকে লোপ করে বুর্জোয়ারা গিল্ড মালিকদের ক্ষমতা চূর্ণ করেছিল। তাদের জায়গায় তারা এনেছিল অবাধ প্রতিযোগিতা, অর্থাৎ এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে যে কোনও ব্যক্তির অধিকার রয়েছে তার পছন্দমতো শিল্পের যে কোনও শাখায় প্রবেশ করার। এ কাজে আবশ্যক পুঁজির অভাব ছাড়া অন্য কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

অবাধ প্রতিযোগিতার প্রবর্তন সর্বসমক্ষে ঘোষণা করে দিল– এখন থেকে সমাজের সভ্যদের মধ্যে একটিমাত্র বৈষম্যই বিরাজ করবে, তা হল, তাদের হাতে সঞ্চিত পুঁজির পরিমাণের বৈষম্য। পুঁজিই হয়ে উঠল ক্ষমতার নির্ণায়ক শক্তি, তাই পুঁজির মালিকবুর্জোয়া শ্রেণিই হয়ে উঠল সমাজের সর্বপ্রধান শ্রেণি। বৃহৎ শিল্পের সূচনার সময়ে অবাধ প্রতিযোগিতা ছিল প্রয়োজনীয় শর্ত, কারণ একমাত্র এই সামাজিক অবস্থার মধ্যেই বৃহদায়তন শিল্প বিস্তার লাভ করতে পারে।

অভিজাতবর্গ আর গিল্ড মালিকদের সামাজিক ক্ষমতা চূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়ারা চূর্ণ করল তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও। সমাজে সর্বপ্রধান শ্রেণি হয়ে ওঠার সাথে সাথে বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সর্বপ্রধান শ্রেণি হিসাবে নিজেদের ঘোষণা করল। তারা এ কাজ করল প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই শাসনব্যবস্থার মূল অবলম্বন হল– বুর্জোয়া সাম্যের ধারণার ভিত্তিতে আইন ও অবাধ প্রতিযোগিতার আইনি স্বীকৃতি। ইউরোপের দেশগুলিতে এই শাসনব্যবস্থা নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্তে্রর রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সব নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্তে্রর দেশে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পুঁজির মালিকেরাই, অর্থাৎ কেবলমাত্র বুর্জোয়ারাই ভোটদানের অধিকারী। এই বুর্জোয়া ভোটাররাই ডেপুটিদের নির্বাচন করে, এবং এই বুর্জোয়া ডেপুটিরা কর দিতে অস্বীকার করার অধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচন করে একটি বুর্জোয়া সরকার।

তৃতীয়ত, শিল্প বিপ্লব যেমন বুর্জোয়াদের সৃষ্টি করেছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে সর্বহারাদের। যে-মাত্রায় বুর্জোয়াদের সম্পদবৃদ্ধি ঘটেছে, সেই মাত্রায় সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে সর্বহারাদের। যেহেতু একমাত্র পুঁজিই সর্বহারাকে কাজে নিয়োগ করতে পারে, আবার পুঁজি কেবল তখনই বাড়তে পারে যখন সে নিযুক্ত করে শ্রম, তাই সর্বহারার বৃদ্ধি ঘটে ঠিক পুঁজির বৃদ্ধির সঙ্গে সমান তালে। একই সঙ্গে শিল্প-বিপ্লব বুর্জোয়া এবং সর্বহারা উভয়কেই জড়ো করে বড় বড় শহরে, যেখানে শিল্প চালানো সবচেয়ে লাভজনক। একই জায়গায় এই বিপুল জনসমষ্টির একত্রিত হওয়ার ঘটনা সর্বহারাদের তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এই ব্যবস্থা যত অগ্রসর হয়, তত বেশি করে উদ্ভব হয় শ্রম-সাশ্রয়কারী যন্ত্রের, যা ক্রমাগত উচ্ছেদ করে কায়িক শ্রমকে, ততই তা মজুরিকে নামিয়ে নিয়ে যায় একেবারে ন্যূনতম জায়গায়, যা সর্বহারাদের জীবনকে ক্রমাগত অসহনীয় করে তোলে। একদিকে সর্বহারাদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং অন্যদিকে তাদের উত্তরোত্তর শক্তিবৃদ্ধি সর্বহারা সমাজ-বিপ্লবের পথ প্রস্তুত করে তোলে।

প্রশ্নঃ শিল্প-বিপ্লবের অন্যান্য ফলাফল কী?

উত্তরঃ স্টিম ইঞ্জিন এবং অন্যান্য যন্তে্রর সাহায্যে বৃহদায়তন শিল্পঅতিদ্রুত এবং স্বল্প খরচে উৎপাদনকে সীমাহীন ভাবে বাড়িয়ে চলার উপায় আয়ত্ত করল। উৎপাদনের স্বচ্ছন্দতার কল্যাণে অবাধ প্রতিযোগিতা, যা বৃহদায়তন শিল্পের অবশ্যম্ভাবী ফল, তা অচিরেই চরম মাত্রায় তীব্র হয়ে উঠল। বহুসংখ্যক পুঁজিপতি লেগে গেল শিল্পে, অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন হতে থাকল প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। উৎপাদিত পণ্যের বিক্রির উপায় থাকল না। ফলে দেখা দিল তথাকথিত এক বাণিজ্যিক সংকট। কল-কারখানা বন্ধ করে দিতে হল। সেগুলির মালিকেরা হল দেউলিয়া, শ্রমিকদের অন্ন ঘুচল। সর্বত্র ঘনিয়ে এল শোচনীয় দুর্দশা। কিছুকাল পরে উদ্বৃত্ত উৎপাদন বিক্রি হল। কল কারখানাগুলি আবার চলতে শুরু করল, মজুরি বাড়ল, আগের চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে এল তেজিভাব। কিন্তু বেশি দিন গেল না। আবার পণ্য উৎপন্ন হতে থাকল বড় বেশি, আরও একটা নতুন সংকট ছড়িয়ে পড়ল এবং আগেরটার পথেই তা এগোতে থাকল। এই ভাবে, এই শতাব্দীর (ঊনবিংশ) শুরু থেকে শিল্প পর্যায়ক্রমে কখনও বাড়বাড়ন্ত কখনও সংকটের আবর্তের মধ্যে ওঠা-পড়া করেছে অবিরাম। প্রায় প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর অন্তর নতুন সংকটের প্রাদুর্ভাব ঘটে, যা সব সময় বয়ে নিয়ে এসেছে শ্রমিকদের আরও অবর্ণনীয় দুর্গতি এবং একই সাথে নিয়ে এসেছে সর্বব্যাপক বৈপ্লবিক আলোড়ন, আর প্রচলিত পুরো ব্যবস্থার জন্য চূড়ান্ত বিপদ।

প্রশ্নঃ পর্যায়ক্রমে ফিরে আসা এইসব বাণিজ্যিক সংকটের পরিণতি কী?

উত্তরঃ প্রথমত, বৃহদায়তন শিল্প তার বিকাশের প্রারম্ভিক পর্বে নিজেই অবাধ প্রতিযোগিতার জন্ম দিলেও এই শিল্পের বৃদ্ধি এখন অবাধ প্রতিযোগিতার পরিধি ছাপিয়ে গেছে। একদিকে প্রতিযোগিতা অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানায় শিল্পোৎপাদন বৃহদায়তন শিল্পের পায়ে বেড়ির মতো জড়িয়ে গেছে। এই শৃঙ্খলকে শিল্পের অবশ্যই ভাঙা চাই এবং তা সে ভাঙবেই। যত দিন বৃহদায়তন শিল্প বর্তমান ভিত্তিতে চলবে, তা চলতে পারে শুধু সাত বছর অন্তর-অন্তর পুনরাবৃত্ত সর্বব্যাপক বিশৃঙ্খল অবস্থার ভিতর দিয়ে। এই অবস্থা শুধু সর্বহারাদের চরম দুর্দশার আবর্তে ঠেলে দেয় না, একই সাথে তা ধ্বংস করে বিরাট সংখ্যক বুর্জোয়াকে এবং এর মধ্য দিয়ে তা বারে বারে বিপন্ন করে সমগ্র সভ্যতাকে।

ফলে সমাজকে হয় বৃহদায়তন শিল্প ত্যাগ করতে হবে, যা একেবারেই অসম্ভব, নইলে সমাজকে অনিবার্যভাবে সংগঠিত করতে হবে সম্পূর্ণ নতুন রূপে– যেখানে শিল্পোৎপাদন পরিচালিত হয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি-মালিকদের দ্বারা নয়, সমাজের প্রত্যেকের কথা বিবেচনা করে সেই অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে সমাজের দ্বারা।

দ্বিতীয়ত, বৃহদায়তন শিল্প এবং তার উৎপাদনবৃদ্ধির অসীম ক্ষমতা এমন এক সমাজব্যবস্থার উদ্ভব ঘটাতে পারে যেখানে জীবনধারণের উপকরণগুলির উৎপাদনের প্রাচুর্য সমাজের প্রত্যেকটি সদস্যকে পূর্ণতম মাত্রায় তার শক্তি ও সামর্থ্যকে বিকশিত করতে এবং যথার্থ স্বাধীন ভাবে তা প্রয়োগ করার সুযোগ দেয়। সঠিক ভাবে বলতে গেলে, বৃহদায়তন শিল্পের যে বৈশিষ্ট্য আজকের সমাজে যাবতীয় দুর্দশা আর বাণিজ্যিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে, ভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে এর সেই বৈশিষ্ট্যই এইসব দুর্দশা এবং বিপর্যয়কর ওঠা-পড়ার অবসান ঘটাবে।

এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছেঃ

১। এখন থেকে সমস্ত সামাজিক অকল্যাণের জন্য সেই বিশেষ সমাজব্যবস্থাই দায়ী বলে বুঝতে হবে, যে ব্যবস্থা সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

২। একটা নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই সমস্ত অকল্যাণ নিঃশেষে দূর করা সম্ভব।

চতুর্থ কিস্তি (৭৯ বর্ষ ৫ সংখ্যা ২৮ আগস্ট ২০২৬)

প্রশ্নঃ এই নতুন সমাজব্যবস্থাকে কেমন হতে হবে?

উত্তরঃ এই নতুন সমাজ সর্বপ্রথমে, পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের হাত থেকে শিল্প এবং উৎপাদনের সমস্ত শাখার পরিচালনার ভার কেড়ে নেবে। এর বিপরীতে নতুন সমাজব্যবস্থা উৎপাদনের সমস্ত শাখাকে সামগ্রিকভাবে পরিচালনা করবে সামাজিক কর্তৃত্বে। অর্থাৎ সমাজের সকল সদস্যের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সামাজিক কল্যাণের জন্য সামগ্রিক পরিকল্পনা অনুসারে তা পরিচালিত হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে আসবে সম্মিলিত প্রয়াস। ব্যক্তির দ্বারা শিল্প পরিচালনার অবশ্যম্ভাবী ফল ব্যক্তি মালিকানা। যেহেতু ব্যক্তি মালিকদের শিল্প চালাবার ধরনই হল পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা, তাই শিল্পের ব্যক্তিগত পরিচালনা এবং প্রতিযোগিতা থেকে ব্যক্তিগত মালিকানাকে আলাদা করা যায় না। কাজেই ব্যক্তিগত মালিকানারও অবসান ঘটাতে হবে। তার জায়গা নেবে সর্বসাধারণের দ্বারা উৎপাদনের সমস্ত হাতিয়ারের ব্যবহার এবং সর্বসাধারণের সম্মতির ভিত্তিতে সমস্ত উৎপাদনের বণ্টন। যাকে বলা হয় দ্রব্যসামগ্রীর যৌথ মলিকানা। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, ব্যক্তি মালিকানার বিলুপ্তিই হল গোটা সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর যা বৃহদায়তন শিল্পের বিকাশের ফলে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনার সংক্ষিপ্ততম এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ। কমিউনিস্টরা সঠিক ভাবেই ব্যক্তি সম্পত্তি বিলুপ্তির দাবিকে তাদের প্রধান দাবি হিসাবে তুলে ধরেছে।

প্রশ্নঃ ব্যক্তিগত সম্পত্তি লোপ কি এর আগে সম্ভব ছিল না?

উত্তরঃ না। সমাজব্যবস্থার প্রত্যেকটা পরিবর্তন, মালিকানা সম্পর্কের প্রত্যেকটা বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন হল নতুন নতুন উৎপাদিকা-শক্তি সৃষ্টি হওয়ার অপরিহার্য ফল। এই নতুন উৎপাদিকা-শক্তি পুরনো মালিকানা সম্পর্কের সঙ্গে আর মানানসই থাকে না। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবও এই পথেই হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি চিরকাল ছিল না। কিন্তু মধ্যযুগের শেষের দিকে চালু হয়েছিল এক নতুন উৎপাদনব্যবস্থা, সেটা হল ম্যানুফ্যাকচার (ছোট কারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থা)। তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক আর গিল্ডের সম্পত্তির সঙ্গে এই উৎপাদন সম্পর্ক খাপ খাচ্ছিল না। এই উৎপাদন পদ্ধতি পুরনো মালিকানা সম্পর্কের পরিধিকে ছাপিয়ে গিয়ে জন্ম দিল নতুন ধরনের মালিকানা– ব্যক্তিগত মালিকানা। ম্যানুফ্যাকচার এবং বৃহদায়তন শিল্প গড়ে ওঠার প্রথম পর্যায়ের কালে ব্যক্তিগত মালিকানা ছাড়া কোনও ধরনের মালিকানা সম্ভব ছিল না। এই ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নতুন সমাজব্যবস্থা ছাড়া অন্য সমাজব্যবস্থাও সেদিন সম্ভব ছিল না।

যত দিন পর্যন্ত সকলের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ উৎপাদনকে ছাপিয়ে গিয়ে সামাজিক পুঁজির বৃদ্ধি এবং উৎপাদিকা শক্তির আরও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্বৃত্ত উৎপাদন সম্ভব না হয়, ততদিন পর্যন্ত সমাজে একটা প্রভুত্বকারী শ্রেণি সর্বদাই থাকে। যে শ্রেণি সমাজের উৎপাদিকা-শক্তিসমূহের পরিচালক, আর থাকে একটি দরিদ্র উৎপীড়িত শ্রেণি। উৎপাদনব্যবস্থার বিকাশের স্তরের উপর নির্ভর করে শ্রেণি-দুটির গঠন। মধ্যযুগ ছিল কৃষির উপর নির্ভরশীল, তখন ছিল ভূস্বামী আর ভূমিদাস। মধ্যযুগের শেষ ভাগের শহরগুলিতে আমরা দেখতে পাই দক্ষ কারিগর (গিল্ডসম্যান) ও তার অধীনে নানা শিক্ষানবিশ আর দিন মজুরদের। সপ্তদশ শতকে– ম্যানুফ্যাকচারার এবং ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিক। উনিশ শতকে– বড় কারখানার মালিক আর সর্বহারা।

এটা নিতান্ত স্পষ্ট যে, এর আগে পর্যন্ত সকলের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদন করার মতো বিকাশ উৎপাদিকা শক্তির ঘটেনি, যাতে ব্যক্তিগত মালিকানা উৎপাদিকা শক্তিকে শৃঙ্খলিত করে তাকে বাধা দেয়। কিন্তু বৃহদায়তন শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে এখন, প্রথমত, পুঁজি আর উৎপাদিকা শক্তি এমন পরিসরে সৃষ্টি হয়েছে যা এ যাবৎ শোনা যায়নি। অল্পকালের মধ্যেই উৎপাদিকা শক্তির অসীম বৃদ্ধির উপায়-উপকরণ আজ মজুত। দ্বিতীয়ত, এইসব উৎপাদিকা শক্তি কেন্দ্রীভূত হয়েছে মুষ্টিমেয় বুর্জোয়াদের হাতে, পক্ষান্তরে বিপুল জনরাশি ক্রমাগত বেশি বেশি পরিমাণে পরিণত হচ্ছে সর্বহারায়। যে পরিমাণে বুর্জোয়াদের ধনদৌলত বাড়ছে ঠিক সেই পরিমাণেই বিপুল জনরাশির দুর্দশা এবং দুর্বিষহ অবস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তৃতীয়ত, এই মহাশক্তিশালী উৎপাদিকা শক্তিকে সহজেই বিপুল পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব। এর বৃদ্ধি ব্যক্তিগত মালিকানা এবং বুর্জোয়া ব্যবস্থার পরিধিকে এতখানি ছাড়িয়ে গেছে এর ধাক্কায় বারে বারে তীব্র আলোড়নে সমাজব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই এখনই ব্যক্তিগত সম্পত্তি লোপ করার সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে উঠেছে শুধু তাই নয়, তা হয়ে উঠেছে একেবারেই অপরিহার্য। 

পঞ্চম কিস্তি (৭৯ বর্ষ ৬ সংখ্যা ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)

প্রশ্নঃ শান্তিপূর্ণ উপায়ে কি ব্যক্তিগত মালিকানার বিলোপ সম্ভব?

উত্তরঃ এমনটা হলে ভালই হত, কমিউনিস্টরা তাতে বাধাও দিত না। কমিউনিস্টরা খুব ভাল করেই জানে, যে কোনও ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ যে শুধু অকার্যকরী তাই নয়, ক্ষতিকারকও বটে। তারা খুব ভাল ভাবেই জানে, চাইলেই কারও মর্জিমাফিক বিপ্লব ঘটানো যায় না। সবক্ষেত্রে এবং সব সময়ই বিপ্লব হল পরিস্থিতির অনিবার্য পরিণতি, যা বিশেষ কয়েকটি পার্টি বা শ্রেণির নেতৃত্ব বা ইচ্ছার উপর একেবারেই নির্ভরশীল নয়।

কিন্তু কমিউনিস্টরা এটাও লক্ষ করছে যে, প্রায় সব উন্নত দেশেই সর্বহারাদের বিকাশ গায়ের জোরে দমন করা হচ্ছে এবং তার মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট বিরোধীরা সর্বশক্তি দিয়ে বিপ্লবের পক্ষেই কাজ করে যাচ্ছে। নিপীড়িত সর্বহারা শ্রেণিকে শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের দিকে ঠেলে দেওয়া হলে, আমরা কমিউনিস্টরা সক্রিয় ভূমিকায় নেমে সর্বহারার স্বার্থ রক্ষা করব, যে কাজটা এখন আমরা করছি তাদের দাবি ও বক্তব্যকে ভাষা দিয়ে।

প্রশ্নঃ ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান কি এক-ধাক্কায় ঘটানো সম্ভব?

উত্তরঃ না, সম্পদের উপর যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ যতটা প্রয়োজন, বর্তমান উৎপাদিকা শক্তিগুলিকে এক ধাক্কায় সেই মাত্রায় বৃদ্ধি করা যেমন অসম্ভব, এটাও তেমনই অসম্ভব। সে কারণে সর্বহারা বিপ্লব, সমস্ত সম্ভাবনাই বলছে যা অবশ্যম্ভাবী, তা পুরনো সমাজকে পাল্টাবে ক্রমে ক্রমে এবং একমাত্র তখনই ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান ঘটানো সম্ভব হবে যখন তা প্রয়োজনীয় পরিমাণে উৎপাদনের উপকরণ সৃষ্টি করতে পারবে।

প্রশ্নঃ এই বিপ্লবের গতিপথ কী হবে?

উত্তরঃ প্রথমেই এই বিপ্লব সূচনা করবে একটা গণতান্ত্রিক সংবিধানের এবং তার মাধ্যমে চালু হবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সর্বহারা শ্রেণির রাজনৈতিক শাসন। ইংল্যান্ডের মতো দেশে, যেখানে ইতিমধ্যে জনগণের অধিকাংশই সর্বহারা, সেখানে এই শাসন হবে প্রত্যক্ষ। ফ্রান্স আর জার্মানির মতো দেশে তা হবে পরোক্ষ শাসন। এই দুই দেশে জনগণের বেশিরভাগ অংশে সর্বহারার সাথে মিশে আছে ক্ষুদ্র কৃষক আর শহুরে পেটি বুর্জোয়ারা। এরা ক্রমাগত সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে, এবং রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে ক্রমাগত প্রলেতারিয়েতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সেইজন্য সর্বহারার দাবিগুলি তাদেরও দাবি হয়ে উঠবে। এর জন্য হয়ত প্রয়োজন হবে দ্বিতীয় একটা লড়াই, কিন্তু সে-লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটবে শুধু সর্বহারার বিজয়ে।

সর্বহারার কাছে গণতন্ত্র একেবারেই মূল্যহীন, যদি না তা সাথে সাথে ব্যক্তিগত মালিকানার উপর নতুন করে সরাসরি আক্রমণের কাজে লাগে এবং সর্বহারার জীবনধারণের উপায় সুনিশ্চিত করার প্রয়োজনে কাজ দেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে প্রধান পদক্ষেপগুলি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছেঃ

১) ব্যক্তিগত মালিকানার পরিধি কমাতে তার উপর বর্ধিত হারেকর, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির উপর চড়া হারে কর, জ্ঞাতিসূত্রে (ভাই, ভাইপো ইত্যাদি) সম্পত্তি-প্রাপ্তির অবসান, ধনীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ঋণ (কর) আদায় ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ।

২) ভূস্বামী, শিল্পপতি, রেলওয়ে এবং জাহাজ ব্যবসার রাঘববোয়ালদের হাত থেকে ধাপে ধাপে মালিকানা কেড়ে নিতে অংশত সাহায্য নিতে হবে রাষ্ট্রীয় শিল্পের সাথে তাদের প্রতিযোগিতার, আর অংশত করতে হবে সরাসরি বন্ডের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিয়ে।

৩) সমস্ত দেশত্যাগী ব্যক্তি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।

৪) শ্রমিকেরশ্রমকে সংগঠিত ভাবে রাষ্ট্রীয় কৃষিক্ষেত্র, রাষ্ট্রীয় শিল্প আর কর্মশালায় নিয়োগ করা। তার মাধ্যমে শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার অবসান ঘটানো। যত দিন কারখানায় ব্যক্তিমালিকানা টিকে থাকবে তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের মতো বর্ধিত হারে মজুরি দিতে বাধ্য করা।

৫) ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পূর্ণ লুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সমাজের সমস্ত সদস্যের কাজ করার সমান বাধ্যতা। শিল্প শ্রমিক বাহিনী গঠন, বিশেষ ভাবে কৃষির জন্য।

৬) রাষ্ট্রীয় পুঁজির মাধ্যমে গঠিত জাতীয় ব্যাঙ্কের সাহায্যে আর্থিক লেনদেন আর ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা রাষ্টে্রর হাতে কেন্দ্রীভূত করা এবং সমস্ত বেসরকারি ব্যাঙ্ক আর ব্যাঙ্কারদের দমন করা।

৭) রাষ্ট্রের আয়ত্তাধীন পুঁজি এবং শ্রমিক যে হারে বাড়ে সেই হারে কল-কারখানা, কর্মশালা, রেলওয়ে এবং নৌপরিবহণ শিল্পের বৃদ্ধি, সমস্ত অনাবাদী জমিতে আবাদ এবং ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত কৃষিজমির উন্নতি ঘটানো।

৮) মায়ের কোল ছাড়ার মতো বয়সে এলেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে, রাষ্ট্রীয় খরচে সমস্ত শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করা। শিক্ষাকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা।

৯) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমিতে বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণ, যেগুলি হবে শিল্পে এবং কৃষিকাজে নিযুক্ত নাগরিকদের যৌথ বসবাসের স্থান। সেগুলিতে শহর ও গ্রামীণ উভয় জীবনের সুযোগ-সুবিধাগুলোকে যুক্ত করতে হবে, যাতে কোনওটার একপেশে প্রভাব কিংবা অসুবিধা নাগরিকদের ভোগ করতে না হয়।

১০) শহর গ্রামের সমস্ত অস্বাস্থ্যকর এবং বাসের অযোগ্য বাড়ি ও বসতি ভেঙে ফেলা।

১১) বিবাহিত বা অবিবাহিত পিতা-মাতার সন্তান নির্বিশেষে সমস্ত শিশুর উত্তরাধিকারের সমান সুযোগ।

১২) পরিবহণের সমস্ত উপায়-উপকরণ রাষ্টে্রর হাতে কেন্দ্রীকরণ।

এ কথা ঠিক, এই সমস্ত পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়া যায় না। কিন্তু একটি শুরু করলেই পরপর অন্যগুলি নেওয়া সহজ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিমূলে প্রথম বৈপ্লবিক আঘাতটি হানলেই সামগ্রিকভাবে পুঁজি, কৃষিউৎপাদন, শিল্প, পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কেন্দ্রীভূতকরার কাজে সর্বহারা শ্রেণি নিজেই আরও এগিয়ে চলার আবশ্যকতা বুঝতে পারবে। উপরোক্ত পদক্ষেপগুলি যত বাস্তবায়িত হতে থাকে সামাজিক কেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়াও তত বাড়ে। সর্বহারা শ্রেণি তার শ্রমের দ্বারা দেশের উৎপাদিকা শক্তিকে যে হারে বাড়িয়ে চলে, সে হারেই বাড়ে এই কেন্দ্রীকরণের গতি। শেষ পর্যন্ত যখন পুঁজি, উৎপাদন, আর বণ্টন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে জাতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে, ব্যক্তিগত মালিকানা আপনা থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে, টাকা হয়ে পড়বে অকার্যকরী। উৎপাদন এতটাই বাড়বে এবং মানুষ এমন ভাবে বদলে যাবে, যাতে পুরনো সামাজিক সম্পর্কের শেষ চিহ্নটুকুও ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যাবে।

 

প্রশ্নঃ শুধুমাত্র একটি দেশে এই বিপ্লব হতে পারে কি?

উত্তরঃ না। বৃহদায়তন শিল্প বিশ্ব-বাজার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সমস্তজাতি, বিশেষত সভ্য জাতিগুলিকেএমনভাবে সংযুক্ত করেছে যাতে একটি জাতির জীবনে যা ঘটছে তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে অন্যান্য জাতি। তা ছাড়া, বৃহদায়তন শিল্প সকল সভ্য দেশের সামাজিক বিকাশের ধারাকে একসাথে এমন এক স্তরে নিয়ে গেছে, যাতে এই দেশগুলির প্রত্যেকটিতে বুর্জোয়া আর সর্বহারা শ্রেণি হয়ে উঠেছে সমাজের দুই নির্ণায়ক শ্রেণি। আর তাদের মধ্যে সংগ্রামটা হয়ে উঠেছে এখনকার দিনের মুখ্য সংগ্রাম। কাজেই, কমিউনিস্ট বিপ্লবটা এখন শুধু একটা জাতীয় বিপ্লবের আকারে হবে না, এই বিপ্লব একই সাথে ঘটবে সমস্ত সভ্য দেশে, অন্তত ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স আর জার্মানিতে হবে একই সাথে। কোন দেশে শিল্পের বিকাশ, সম্পদ এবং উৎপাদিকা-শক্তির পরিমাণ কী ভাবে বেড়েছে, তার উপর নির্ভর করবে সে দেশে এই বিপ্লবের বিকাশ হবে দ্রুত হারে, নাকি এর গতি হবে ধীর। জার্মানিতে এই বিপ্লবের গতিবেগ হবে সবচেয়ে কম এবং সাফল্য অর্জন করাও হবে সবচেয়ে কঠিন। ইংল্যান্ডে হবে সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে সহজ। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সকল দেশের উপর এর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে, তাদের বিকাশের বর্তমান ধারাকে এই বিপ্লব পুরোপুরি বদলে দিয়ে তাকে ত্বরাণ্বিত করবে দ্রুত হারে। এই বিপ্লব বিশ্বব্যাপী, তাই তার সম্ভাবনাও বিশ্বব্যাপী।

ষষ্ঠ কিস্তি (৭৯ বর্ষ ৭ সংখ্যা ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)

প্রশ্নঃ ব্যক্তিগত মালিকানার চূড়ান্ত অবলুপ্তির ফল কী হতে পারে?

উত্তরঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ব্যক্তি মালিকের হাত থেকে সমস্ত উৎপাদিকা শক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বণ্টন ব্যবস্থা ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নেওয়া। উৎপাদনের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার ও সামগ্রী যতটা পাওয়া যাচ্ছে সেই অনুযায়ী সমাজের সকলের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদিকা শক্তিকে কাজে লাগানো। এর মধ্য দিয়েই বৃহদায়তন শিল্পের বর্তমান কুপ্রভাবগুলি সমাজ থেকে মুছে যাবে। সে দিন সংকটের অবসান ঘটবে। উৎপাদন আরও বাড়বে, যদিও আজকের সমাজব্যবস্থায় বর্ধিত উৎপাদন মানেই অতিউৎপাদন, যা জনগণের চরম দুর্দশার কারণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সমাজে দেখা যাবে এই বর্ধিত উৎপাদনও যথেষ্ট নয়, বরং আরও ক্রমাগত বেশি বেশি করে উৎপাদন বাড়িয়ে চলতে হচ্ছে। বর্ধিতউৎপাদন সেদিন আর দুর্দশার জন্ম দেবে না। সমাজের আশু প্রয়োজন মেটানোর কাজকে ছাপিয়ে অতিউৎপাদন সকলের সব প্রয়োজন মেটানোর দিকে নজর দেবে। এই অগ্রগতি অর্জন করতে গিয়ে জন্ম হবে নতুন নতুন চাহিদা আর তা মেটানোর শক্তির। নতুন অগ্রগতির আবশ্যক শর্ত এবং কারণ হয়ে উঠবে এই ক্রমবর্ধমান উৎপাদন। তার জন্য, এত দিন যা ঘটে এসেছে তার মতো, সমাজকে বিশৃঙ্খলার পথে ঠেলে দেওয়ার দরকার হবে না। ব্যক্তিমালিকানার জোয়াল থেকে মুক্তি পেলেই বৃহদায়তন শিল্প যে মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে তার পাশে আজকের বৃহদায়তন শিল্পের আকার নিতান্ত তুচ্ছ হয়ে পড়বে। যেমন পুরনো ক্ষুদ্র শিল্পকে (ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প) আজকের বৃহদায়তন শিল্পের পাশে একেবারেই অকিঞ্চিৎকর দেখায়, বিষয়টা তেমনই ঘটবে। শিল্পের এই অগ্রগতি সমাজের হাতে তুলে দেবে প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট দ্রব্যসামগ্রী।

একই ভাবে কৃষিক্ষেত্রেও এখনই যে উন্নত ব্যবস্থাগুলি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে প্রয়োগ করা যেত, ব্যক্তি মালিকানা এবং ছোট ছোট জোতে জমির বিভাজনের চাপে তা আটকে গেছে। এ ক্ষেত্রেও সামাজিক মালিকানা নিয়ে আসবে নতুন উদ্দীপনা, সমাজের হাতে তুলে দেবে বিপুল পরিমাণ উৎপাদন। এ ভাবেই সমাজের সকল সদস্যের সমস্ত প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট উৎপাদন এবং তার বণ্টন সম্ভব হবে। পরস্পর বিরোধী শ্রেণিতে সমাজের বিভাজন এর মধ্য দিয়ে অকার্যকরী হয়ে পড়বে। শ্রেণি বিভাজন শুধু অকার্যকরী হবে তাই নয়, নতুন সমাজ ব্যবস্থার সাথে তা কোনও ভাবেই খাপ খাবে না। শ্রম বিভাজনের ফলস্বরূপ জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি, সেই শ্রমবিভাগ এতদিন যে আকারে রয়েছে, তা একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবে।

শিল্প এবং কৃষির যে স্তরে উন্নতির কথা বলা হচ্ছে, তার জন্য শুধু যান্ত্রিক বা রাসায়নিক কুশলতাই যথেষ্ট নয়। যে মানুষ এই কুশলতাকে কার্যকর করবে তাদের যোগ্যতাকেও প্রয়োজনীয় উচ্চতায় বিকশিত করা দরকার। ঠিক যেমন বিগত শতাব্দীতে কৃষক এবং পুরনো ক্ষুদ্র শিল্পের (ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিক) শ্রমিকদের বৃহদায়তন শিল্পে টেনে আনার পর তারা নিজেদের জীবনযাত্রার আমূল বদল ঘটিয়ে পুরোপুরি নতুন মানুষে পরিণত হয়েছিল। একই ভাবে সমগ্র সমাজের যৌথ পরিচালনায় উৎপাদনের নতুন ধরনের অগ্রগতির জন্য সমাজ তার প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মানুষের সৃষ্টি করবে। যৌথ পরিচালনায় উৎপাদন আজকের সমাজের এই মানুষ দিয়ে চলবে না। তারা আজ উৎপাদনের একটি মাত্র শাখাতেই নিযুক্ত হয়ে তাতেই বাঁধা পড়ে গেছে, তার দ্বারা শোষিত হচ্ছে, তারা নিজেদের সকল যোগ্যতার মূল্যে কেবলমাত্র একটি ক্ষমতার পরিচর্যাতেই ব্যস্ত, তারা গোটা উৎপাদনের কেবল একটি মাত্র শাখা বা কোনও শাখার উপশাখাকেই শুধু জানে, এমন সব মানুষ দিয়ে উৎপাদনের যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এমনকি আজকের দিনের শিল্পেও এমন মানুষের প্রয়োজন ক্রমাগত কমছে।

সমাজের সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে যৌথ মালিকানায় চলা শিল্পের আবশ্যিক শর্ত হল সর্বাঙ্গীণভাবে বিকশিত মানুষ, যারা উৎপাদনের পুরো ব্যবস্থাটাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে সক্ষম। শ্রম বিভাজনের যে ধাঁচা একজনকে কৃষক, আর একজনকে চর্মকার, তৃতীয়জনকে কারখানা শ্রমিক, চতুর্থজনকে শেয়ার বাজারের দালাল বানায়, যন্ত্রের ধাক্কায় ইতিমধ্যেই ক্ষয়প্রাপ্ত সে ধাঁচা পুরোপুরি অবলুপ্ত হয়ে যাবে। শিক্ষা যুবসমাজকে সামগ্রিক ভাবে উৎপাদন ব্যবস্থাকে বুঝে নেওয়ার শক্তি দেবে, যাতে তারা সামাজিক প্রয়োজনে বা নিজের আগ্রহের টানে উৎপাদনের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় দ্রুত বিচরণ করতে পারে। বর্তমান শ্রম বিভাজন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর যে একপেশে ভূমিকার তকমা লাগিয়ে দেয় তা থেকে তারা এ পথেই মুক্ত হবে। এই ভাবে সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা তার সকল সদস্যকে দেয় তাদের কর্মদক্ষতার সামগ্রিক বিকাশ ও তার পরিপূর্ণ প্রয়োগের সুযোগ। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকার শ্রেণির অবলুপ্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে। নিশ্চিত ভাবে সাম্যবাদী সমাজের গঠনের সাথে শ্রেণির অস্তিত্বই খাপ খায় না, অন্য দিকে এই সমাজের প্রতিষ্ঠাই শ্রেণিগত বিভেদকে পুরোপুরি মুছে ফেলার পথ করে দেয়।

এর থেকে বোঝা যায়, একই ভাবে শহর-গ্রামের বৈপরীত্যও লোপ পাবে। একেবারে পুরোপুরি বস্তুগত কারণেই সাম্যবাদী সমাজ সংগঠনের আবশ্যক শর্ত হল, দুটি পৃথক শ্রেণির বদলে একই ধরনের জনগণের দ্বারা কৃষি ও শিল্পের পরিচালনা। গ্রামাঞ্চল জুড়ে কৃষিজীবী জনগণের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পাশাপাশি শিল্পে নিযুক্ত জনগণের বড় শহরে ভিড় জমানোর মধ্যে কৃষি ও শিল্পের অনুন্নত দশাই ফুটে ওঠে। এই দশা যে সমাজের আরও অগ্রগতির পথে বাধা ইতিমধ্যেই তা বোঝা যাচ্ছে।

ব্যক্তি সম্পত্তি অবলুপ্ত হওয়ার প্রধান ফলগুলি হল– সমাজের সকল সদস্যের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তির পরিকল্পিত এবং যৌথ ব্যবহার। সকলের প্রয়োজন মেটানো যাবে এমন মাত্রায় উৎপাদনের বিকাশ। যে ব্যবস্থার কারণে সমাজের এক অংশকে বঞ্চিত করার মূল্যে কিছু লোকের সন্তুষ্টি বিধান হয়, তার অবসান। শ্রেণি এবং তার বিরোধাত্মক দ্বন্দ্বের পূর্ণ অবলুপ্তি। এত দিন প্রচলিত শ্রম বিভাজনকে অবলুপ্ত করার মাধ্যমে সমাজের সকল সদস্যের ক্ষমতার সর্বাঙ্গীণ বিকাশ। এর জন্য কারিগরি শিক্ষা, কাজের ক্ষেত্র পরিবর্তনের সুযোগ, সকলের প্রচেষ্টায় সকলের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যর আয়োজন, শহর ও গ্রামের সংযুক্তি ঘটানোর ব্যবস্থা।

প্রশ্নঃ পরিবার প্রথার উপরে সাম্যবাদী সমাজের কী প্রভাব পড়বে?

উত্তরঃ সাম্যবাদী সমাজ নারী-পুরুষের সম্পর্ককে করে দেবে একান্ত নিজস্ব বিষয়, কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপার, তাতে সমাজের কোনও হস্তক্ষেপের আবশ্যকতা থাকবে না। কমিউনিস্ট সমাজ এ কাজ করতে পারে, তার কারণ এই সমাজ ব্যক্তিগত মালিকানা লোপ করে, শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা হয় সামাজিক তত্ত্বাবধানে। এই ভাবে নির্মূল হবে ব্যক্তিসম্পত্তির উপর গড়ে ওঠা এ যাবৎ বজায় থাকা বিবাহ প্রথার দুই মূল স্তম্ভ– স্বামীর উপর স্ত্রীর এবং বাপ-মায়ের উপর সন্তানদের নির্ভরশীলতা। কমিউনিজমে নারীদের ‘যৌথ সম্পত্তি’ করে তোলার কথা বলে নীতিবাগীশ কূপমণ্ডুকেরা যে শোরগোল করে, এটা হল তার একটা জবাব। নারীকে ‘যৌথ সম্পত্তি’তে পরিণত করার বিষয়টি পুরোপুরি বুর্জোয়া সমাজেরই অঙ্গ, এখন সেটা নিখুঁত রূপ পেয়েছে পতিতাবৃত্তিতে। যেহেতু পতিতাবৃত্তির মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানা, এই মালিকানা লোপ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পতিতাবৃত্তিও লোপ পাবে। তাই, সাম্যবাদী সমাজ নারীকে যৌথ সম্পত্তিতে পরিণত তো করবেই না, বরং তার অবসান ঘটাবে।

প্রশ্নঃ বিদ্যমান জাতিসত্তাগুলির প্রতি সাম্যবাদী সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

উত্তরঃ সম্প্রদায়গত মিলের ভিত্তিতে উদ্ভূত জাতিসত্তাগুলির জনগণ এই সমাজব্যবস্থায় আবশ্যিকভাবেই পরস্পর মিশে যাবে। ভূসম্পত্তি কেন্দ্রিক নানা বিরোধ এবং শ্রেণিগত পার্থক্য তারা দূর করবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপের মধ্য দিয়ে। (মূল খসড়াতে এই জায়গায় লেখা আছে শুধু ‘রিমেইন্স’ অর্থাৎ ‘রয়েছে’। এর উত্তরটি আছে ‘ড্রাফট অফ এ কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ’-এর ২১ নম্বর প্রশ্নে। সেটিই এখানে দেওয়া হল। সূত্রঃ কার্ল মার্ক্স-ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কালেক্টেড ওয়ার্কস, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স নিউইয়র্ক, ১৯৭৬)

প্রশ্নঃ ধর্মের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

উত্তরঃ এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত সমস্ত ধর্মই কোনও বিশেষ জাতি অথবা জাতিগোষ্ঠীর অগ্রগতির বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্তরের মূর্ত রূপ। কিন্তু সাম্যবাদ হল ঐতিহাসিক অগ্রগতির সেই স্তর, যেখানে প্রচলিত সমস্ত ধর্ম তার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং তাদের বিলুপ্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে।(মূল খসড়াতে এই জায়গাতেও লেখা আছে শুধু ‘রিমেইন্স’ অর্থাৎ ‘রয়েছে’। উত্তরটি আছে ‘ড্রাফট অফ এ কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ’-এর ২২ নম্বর প্রশ্নে। সেটিই এখানে দেওয়া হল। সূত্রঃ ওই) 

সপ্তম কিস্তি (৭৯ বর্ষ ৮ সংখ্যা ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)

প্রশ্নঃ কমিউনিস্টদের সঙ্গে সোসালিস্টদের পার্থক্য কী?

উত্তরঃ তথাকথিত সোসালিস্টদের তিনটি গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়।

প্রথম গোষ্ঠীটি হল সামন্ততান্ত্রিক এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অনুগামীদের নিয়ে– যে দু’টি সমাজকে প্রতিদিন ভাঙছে তাদেরই সৃষ্ট বুর্জোয়া সমাজ এবং তার বৃহদায়তন শিল্প ও বিশ্ব বাণিজ্য। সমকালীন সমাজের অনাচার দেখে এই গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত করে, সামন্ততান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যেহেতু এই ধরনের অনাচার ছিল না, তাই সামন্ততন্তে্রর পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই সমস্ত অনাচার দূর হতে পারে। তাদের সমস্ত প্রস্তাবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই সুরে বাঁধা। সর্বহারা শ্রেণির দুঃখ-দুর্দশায় তাদের সহানুভুতি এবং সমবেদনা প্রকাশ পেলেও, এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্রীদের বিরোধিতা করতে হবে কমিউনিস্টদের। কারণ,

১) তারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে চাইছে।

২) তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে অভিজাতগোষ্ঠী, গিল্ড-মাস্টার ও কারখানা মালিক, স্বৈরাচারী সামন্তপ্রভু ও তাদের অনুচরবৃন্দ–রাজকর্মচারী, সেনানায়ক আর যাজকদের কর্তৃত্ব। তাদের বর্ণিত পুরনো সমাজে একালের অনাচার ছিল না এটা সত্য, কিন্তু সেই সমাজেও তার নিজস্ব ধরনের অনাচার কিছু কম ছিল না। আর কিছু না হোক, সেগুলি তারা আমদানি করবে। কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলার পথে উৎপীড়িত শ্রমিকদের মুক্তির সম্ভাবনাটিও হারিয়ে যাবে।

৩) সর্বহারা শ্রেণি প্রকৃত বিপ্লবী বা কমিউনিস্ট চরিত্র অর্জন করেছে দেখলেই, এই সমাজতন্ত্রীদের আসল মনোভাব প্রকট হয়ে পড়ে। তখনই তারা সর্বহারা শ্রেণির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির সঙ্গে জোট বাঁধে।

সমাজতন্ত্রীদের দ্বিতীয় গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার সমর্থকদের নিয়ে। তাদের দুশ্চিন্তা হল, বর্তমান সমাজব্যবস্থা থেকে সৃষ্ট অনাচারই পাছে এই সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। তাই তাদের লক্ষ্য হল বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে অটুট রেখে এর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা অনাচারগুলি দূর করার চেষ্টা করা। এই লক্ষ্য নিয়েই তাদের কেউ কেউ চায় কিছু কল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু হোক, আবার কেউ কেউ ব্যাপক ভাবে সমাজ সংস্কারের কথা বলে। সমাজকে পুনর্গঠন করার নামে, এই ব্যক্তিরা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক কাঠমোটাকে বজায় রাখতে চায়, যার উদ্দেশ্য হল আসলে এই চলতি সমাজটাকেই অটুট রাখা। কমিউনিস্টদের অবিচল ভাবে এই সব বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রীদের বিরোধিতা করতে হবে। কারণ এরা সাম্যবাদের শত্রুদের সঙ্গে কাজ করছে এবং কমিউনিস্টরা যে সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়, তাকেই রক্ষা করতে চাইছে।

সর্বশেষ বা তৃতীয় গোষ্ঠী গঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের নিয়ে। ইতিপূর্বে আলোচিত ‘এই বিপ্লবের গতিপথ কী হবে’ (এঙ্গেলস এখানে একটু শূন্যস্থান রেখেছিলেন, খসড়ার ১৮ নং প্রশ্ন দ্রষ্টব্য হিসাবে, সূত্রঃ ওই) প্রশ্নের জবাবে কমিউনিস্টরা যে সমস্ত কর্মসূচির কথা বলেছে, তারা এর অনেকগুলিই মানে। কিন্তু এগুলি তাদের কাছে সমাজের সাম্যবাদে উত্তরণের হাতিয়ার নয়। তারা মনে করে এই সব কর্মসূচি যদি বর্তমান সমাজের অনাচার ও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে পারে সেটাই যথেষ্ট। এই সমস্ত গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা হয় নিজেরাই সর্বহারা শ্রেণির মানুষ যারা নিজেদের মুক্তির শর্তগুলি সম্পর্কে এখনও যথেষ্ট সচেতন নয়, কিংবা তারা পেটিবুর্জোয়া শ্রেণির অন্তর্গত। পেটি বুর্জোয়ারা হল সেই শ্রেণি, গণতন্ত্রের বিজয় অর্জন এবং তার উপর দাঁড়িয়ে সমাজতান্ত্রিকপদক্ষেপ গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত যাদের স্বার্থ অনেকাংশেই সর্বহারা শ্রেণির সাথে মিলে যায়। তাই সংগ্রামের সময় কমিউনিস্টদের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে যত দূর সম্ভব বোঝাপড়া করে চলতে হবে এবং সাধারণ ভাবে অন্তত কিছুকাল তাদের সাথে মিলিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। যত দিননা এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির সেবায় নিযুক্ত হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করছে, তত দিন একাজ চলবে। এ কথা অবশ্যই স্পষ্ট যে, মিলিত কর্মসূচিগুলি আদর্শগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনাকে বাদ দিয়ে চলতে পারে না।

প্রশ্নঃ এ কালের অন্যান্য রাজনৈতিক দল সম্পর্কে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

উত্তরঃ এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতিতে পার্থক্য আছে। গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে, বুর্জোয়া শ্রেণি যেখানে শাসন ক্ষমতায়, সেখানে সাময়িক ভাবে কমিউনিস্টদের স্বার্থের সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের স্বার্থ মিলে যায়। আজ প্রায় সর্বত্র গণতন্ত্রীরা সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করছেন, তারা যত বেশি একাজ করে তত তাদের সঙ্গে কমিউনিস্টদের লক্ষ্য মিলে যায়। তারা যত বেশি করে সর্বহারার স্বার্থকে তুলে ধরবে ততই তারা সর্বহারা শ্রেণির উপর নির্ভরশীল হবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ইংল্যান্ডের চার্টিস্টদের কথা। চার্টিস্টরা প্রায় সকলেই শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। তাই তারা গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়া বা তথাকথিত র্যাডিক্যালদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে কমিউনিস্টদের কাছাকাছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে একটা গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রবর্তিত হয়েছে, সেখানে যে দলগুলি এই সংবিধানকে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরোধিতায় ও সর্বহারার স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে, কমিউনিস্টরা তাদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে। এর অর্থ হল কমিউনিস্টরা সে দেশের জাতীয় কৃষি সংস্কারকদের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করবে। সুইজারল্যান্ডে ব়্যাডিক্যালদের মধ্যে নানা স্বার্থের মিশ্রণ থাকলেও, একমাত্র তাদের সঙ্গেই কমিউনিস্টরা একত্রে কাজ করতে পারে। এদের মধ্যে আবার ভাউড ও জেনেভার র্যাডিক্যালরাই বেশি অগ্রণী।

সব শেষে, জার্মানিতে বুর্জোয়া শ্রেণি ও চরম স্বৈরাচারী রাজতন্তে্রর মধ্যে চূড়ান্ত সংগ্রাম এখনও শুরু হয়নি। যেহেতু বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতায় আসীন না হওয়া পর্যন্ত কমিউনিস্টরা তাদের চূড়ান্ত মোকাবিলা করতে পারে না। তাই নিজেদের স্বার্থেই কমিউনিস্টদের় উচিত বুর্জোয়া শ্রেণিকে যথাসম্ভব দ্রুত ক্ষমতায় আসীন হতে সাহায্য করা, যাতে অতি দ্রুতই তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। সে জন্য রাজতন্তে্রর বিরুদ্ধে সংগ্রামে উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের কমিউনিস্টদের সাহায্য করতে হবে। কিন্তু তাদের সচেতন থাকতে হবে যাতে তারা বুর্জোয়া শ্রেণির আত্মপ্রবঞ্চনামূলক প্রচারের শরিক না হয়ে পড়ে। বুর্জোয়াদের জয় সর্বহারার কী উপকারে লাগবে সে বিষয়ে মিথ্যা আশ্বাবাণীতে ভুললে চলবে না।

বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা দখল থেকে কমিউনিস্টদের কেবল যেটুকু সুবিধা হতে পারে তা হলঃ ১, কিছু সুবিধা আদায়, যাতে কমিউনিস্টদের নিজেদের আদর্শের সপক্ষে প্রচার চালানো, আলোচনা করা ও নানা আক্রমণের হাত থেকে আদর্শকে রক্ষা করা সহজ হয়। তার মধ্য দিয়ে সর্বহারা শ্রেণিকে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ জঙ্গি এবং সুসংগঠিত শ্রেণিতে পরিণত করা যায়। ২, এটা নিশ্চিত যে, যেদিন স্বৈরাচারী রাজতন্তে্রর উচ্ছেদ হবে সেদিন থেকেই শুরু হবে বুর্জোয়া এবং সর্বহারার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ। সেই দিন থেকে থেকে জার্মান কমিউনিস্টদের নীতি ও কৌশল হবে যেখানে ইতিমধ্যেই বুর্জোয়ারা শাসকের ভূমিকায় বসেছে, সেই সব দেশের কমিউনিস্টদের অনুসৃত নীতি ও কৌশলের অনুরূপ।   (সমাপ্ত)