Breaking News

দিল্লির ছাত্র-যুব আন্দোলন যে শিক্ষা রেখে গেল

ক’দিন আগেও একের পর এক রাজ্যে ক্ষমতার দখল নিয়ে শাসক বিজেপি নিজেকে অমিত শক্তিধর প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে। প্রশাসনিক-আর্থিক ক্ষমতার জোরে, ইডি, এনআইএ, সিবিআইকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলগুলির সাংসদ এবং বিধায়কদের ভাঙিয়ে এনে নিজের দল ক্রমাগত ভারী করে তুলেছে। সংখ্যার এই বদলকেই তারা জনগণের সমর্থন-বদল হিসাবে, অর্থাৎ বিরোধী দলগুলির থেকে শাসক বিজেপির দিকে জনগণের আস্থার বদল হিসাবে তুলে ধরেছে। অন্য দিকে, যে ভাবে তারা জনস্বার্থকে দু’পায়ে মাড়িয়ে চলেছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরিবর্তে বিরোধী দলগুলি সংসদীয় তরজার মধ্যেই নিজেদের আটকে রেখেছে। অথচ আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, ভয়াবহ বেকারত্ব, শিক্ষা-চিকিৎসার লাগামছাড়া বেসরকারিকরণ সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। শোষণ-জর্জরিত মানুষ প্রতিকারের আশায় অসহায়ের মতো দিন গুনছে। ঠিক এমন সময়ে দিল্লির যন্তর-মন্তরের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলন প্রমাণ করে দিল বিরোধিতার শক্তি শুধু বিধায়ক-সাংসদের সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। এবং তা শুধু আইনসভার চার দেওয়ালের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের সীমাহীন দুর্দশা দেখেও যখন ‘নির্বাচিত’ বিধায়ক-সাংসদরা চুপ করে থাকেন, শাসক শ্রেণির সাথে বোঝাপড়ার বন্দোবস্ত করতে ব্যস্ত থাকেন, তখন সরকারি শোষণ-বঞ্চনার নির্মম শিকার ছাত্র-যুব সহ দেশের সাধারণ মানুষের ধূমায়িত বিক্ষোভ তার জ্বলে ওঠার উপায় ঠিক বের করে নেয়। যন্তর-মন্তরের বিরাট ছাত্র-যুব আন্দোলন তারই স্পষ্ট প্রমাণ রেখে গেল।

বিরোধী দলগুলি আসল বিরোধী নয়

নিট পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের গা-ছাড়া মনোভাব শুধু ভুক্তভোগী ছাত্রদেরই নয়, গোটা ছাত্র-যুব সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সেই ক্ষোভ ফেটে পড়ে যখন সিজেপি নামের একটি অনলাইন পার্টি তার বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর-মন্তরে আন্দোলনের ডাক দেয়। তদন্তে দোষীদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি রোধ নিশ্চিত করার মতো সম্পূর্ণ ন্যায্য এবং গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হলেও ক্রমে অন্যতম দাবি হয়ে ওঠে ঘটনায় মূল দায়ী শিক্ষামন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের লাগাতার অনশন আন্দোলনকে মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। আন্দোলনকে দুর্বল করার লক্ষ্যে সরকার ওয়াংচুককে পুলিশ দিয়ে জোর করে যন্তর-মন্তর থেকে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার পরিবর্তে এই ঘটনা তাতে ঘি ঢালে। হাজারে হাজারে ছাত্র-যুব শুধু দিল্লি নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকে এসে আন্দোলনে যোগ দেয়। বিজেপি সরকার আন্দোলনকে ভেঙে দিতে নির্মম দমন-পীড়ন চালিয়ে ছাত্র-যুবদের ক্ষত-বিক্ষত করে। নির্বিচারে লাঠি-টিয়ার গ্যাস-জল কামান, এমনকি ছররা গুলি পর্যন্ত চালায়। পুলিশি বর্বরতা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করে দেয়। ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যে রাজ্যে। মানুষের এই স্বতঃর্স্ফূতবিক্ষোভ কাঁপন ধরায় ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ বিজেপি সরকারের নেতা-মন্ত্রীদের বুকে। যে সরকার বেপরোয়া ভাবে ঘোষণা করেছিল– কোনও মতেই শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করবেন না, গোটা বিজেপি সরকার শিক্ষামন্ত্রীর পিছনে রয়েছে। এমনকি এক সপ্তাহ আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সার্টিফিকেট দেন যে, জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়ণে ধর্মেন্দ্র প্রধান অসাধারণ কাজ করেছেন। সেই সরকারই ছাত্র-যুবদের সাথে বার বার আলোচনায় বসতে বাধ্য হল শুধু নয়, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেও বাধ্য হল। এই আন্দোলন আবার প্রমাণ করল, যত বড় উদ্ধত সরকারই হোক, ন্যায়সঙ্গত শক্তিশালী গণআন্দোলনের কাছে তা মাথা নিচু করতে বাধ্য। গণআন্দোলনের সামনে এই সরকারকে দেশের মানুষ মাথা নত করতে দেখেছিল ২০২০-২১ এ দিল্লির ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনে। এস ইউ সি আই (সি) পশ্চিমবঙ্গে ১৯ বছর আন্দোলন চালিয়ে ১৯৯৯-এ তৎকালীন সরকারকে বাধ্য করেছিল প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি ফেরাতে। ২০০৭-০৮-এ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের সামনে পিছু হঠতে হয়েছিল সরকারকে। ১৯২৪-এ অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ পথে নেমে প্রমাণ করেছিল তারা প্রতিবাদ করতে জানে। সব মিলিয়ে প্রতিবাদের প্রকৃত শক্তি হিসাবে জনশক্তির ভূমিকা আজ কোনও শাসকের পক্ষে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।

জনগণের দাবি উপেক্ষা করা শাসকের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে

যন্তর-মন্তরের এই বিরাট জয় শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কিংবা কিছু প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে নতুন আইন তৈরিই নয়, আরও অনেক বড় তাৎপর্য নিয়ে দেশের মানুষের সামনে উপস্থিত হয়েছে। এই বিরাট আন্দোলন একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শৃঙ্খলার এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকারি কর্তা এবং শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা আন্দোলনে বিশৃঙ্খলার যত অপপ্রচারই করুন, বাস্তবে যন্তর-মন্তরের আন্দোলন ছিল পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ। আন্দোলন স্থলে মহিলা-পুরুষ মিলে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটালেও সেখানে অশালীন কিছু ঘটেনি। আন্দোলন প্রমাণ করেছে, ব্যাপক গণআন্দোলন ছাড়া আজ শাসকরা এমনকি অত্যন্ত ন্যায্য একটি দাবিও মানতে রাজি নয়। আন্দোলন প্রমাণ করেছে, বিধানসভা কিংবা সংসদ, বিধায়ক কিংবা সাংসদরা আজ আর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন না, জনস্বার্থের পতাকা বহন করেন না। তাই শাসক বিজেপি তো বটেই তথাকথিত বিরোধী দলগুলিকে, তাদের নেতাদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেল না। বরং কংগ্রেসের মতো অন্য সব ভোটসর্বস্ব দলগুলিও কী ভাবে এই আন্দোলনের সুফল আত্মসাৎ করা যায়, তারই নানা ফন্দি ভেঁজে চলেছে। ছাত্র-যুবদের রাস্তার বীরত্বপূর্ণ লড়াইকে, সরকারি দমন-পীড়নের সাহসী মোকাবিলাকে ভোটের বাক্সে কী ভাবে ঢোকানো যায় তারই নানা উপায় খুঁজে চলেছে। অন্য দিকে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এই আন্দোলনকে অভিনন্দন জানিয়ে সরকারকে ছাত্র-যুবদের দাবিগুলি মেনে নিতে বলেছে। দলের সাধারণ সম্পাদক প্রভাস ঘোষ বলেছেন, এই আন্দোলন দেশের নিপীড়িত জনগণকে বর্তমান শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং তার সেবায় নিয়োজিত শাসকদের বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম সংগঠিত করতে অনুপ্রাণিত করবে। আন্দোলনের শুরু থেকেই এআইডিএসও, এআইডিওয়াইও যেমন যন্তর-মন্তরে সক্রিয় অংশ নিয়েছে তেমনই রাজ্যে রাজ্যে আন্দোলনের সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অধিকাংশ মিডিয়া শাসক বন্দনায় ব্যস্ত

বিজেপি সরকার তার পেটোয়া সংবাদমাধ্যমকে দিয়ে, যেগুলি গোদি মিডিয়া নামে কুখ্যাতি লাভ করেছে, লাগাতার প্রচার করেছে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের অভাব-অভিযোগের ফয়সালা করার জন্য রয়েছেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। পরিবর্তে কোনও দাবিকে সামনে রেখে এ ভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষকে জড়ো করা আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করা। শাসক দলের নেতারা এমনও অভিযোগ করেছিলেন যে, এই আন্দোলনের পিছনে বিদেশি শক্তি এবং তাদের টাকা কাজ করছে। যদিও তাদেরই সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আন্দোলনের জন্য বিদেশ থেকে টাকা আসার কোনও প্রমাণ সরকারের কাছে নেই। বাস্তবে আন্দোলনের তীব্রতার সামনে সরকার এতখানি কোণঠাসা হয়েছিল যে, আন্দোলনকে অবৈধ, অন্যায়, বেআইনি প্রভৃতি প্রমাণ করতে নানা কাল্পনিক অভিযোগ করেছে এবং পেটোয়া মিডিয়া সেগুলিকেই ছড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজি যত একচেটিয়া আকার নিয়েছে, যত বেশি বেশি করে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তত তা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে, তত তা গণতন্ত্রের মুখোশটিকে খুলে ফেলে তার স্বৈরতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট মুখটিকে সামনে এনেছে। ততই বিরোধী সংসদীয় রাজনীতিও বেশি বেশি করে শাসক শ্রেণির স্বার্থেই পরিচালিত হয়ে চলেছে। তাই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে একটি দলের সরকারকে বদলে অন্য একটি দলের সরকারকে বসালেও শেষপর্যন্ত তা জনগণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে শাসক শ্রেণির স্বার্থকেই রক্ষা করে। তাই গণতন্তে্রর নামে আজকের ভারতে একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থেরই রমরমা। জনগণের কোনও প্রকারে বেঁচে থাকার মতো দাবিগুলিও নেতা-মন্ত্রীরা অনায়াসে দুপায়ে মাড়িয়ে যায়। জনগণের মতামত বা প্রতিক্রিয়া আজ শাসকদের শুধুই পরিহাসের বিষয়। বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠ আজ কঠোর আইনের ফাঁসে রুদ্ধ। নির্বাচন ব্যবস্থায় আজ আর জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন হয় না। একের পর এক নতুন আইন যেমন একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে তৈরি হয়ে চলেছে তেমনই সেই আইনগুলি জনগণের, শোষিত মানুষের সমস্ত প্রতিবাদকে, প্রতিরোধকে দমন করতেই কাজে লাগছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অপরিহার্য গণআন্দোলনের পরিসর

এই অবস্থায় যখন সংসদীয় প্রতিষ্ঠানগুলি এবং তার প্রতিনিধিরা তাঁদের ঘোষিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অক্ষম এবং অকার্যকর হয়ে উঠেছে, মূল ধারার গণমাধ্যমগুলি কার্যত দখল হয়ে গিয়ে জনস্বার্থের পক্ষে ন্যূনতম খবর প্রচারেও অনিচ্ছুক হয়ে উঠেছে, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলির দখল নিয়ে সেগুলির মাথায় বসানো হয়েছে শাসক শ্রেণির পেটোয়া ব্যক্তিদের, যখন ভিন্ন মতকে কঠোর আইন দিয়ে প্রশাসনিক নির্মমতায় রুদ্ধ করা হচ্ছে, নির্বাচন যখন আর জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না, বিচার বিভাগ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়ে উঠেছে তখন রাস্তার আন্দোলন তথা গণআন্দোলনই জনগণের ইচ্ছা-আশা-আকাঙ্খার প্রকাশ এবং পূরণের একমাত্র মাধ্যম। এই আন্দোলন যতই শাসক শ্রেণি, তাদের স্বার্থরক্ষাকারী সরকার এবং শাসক দলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠুক, বর্তমান ব্যবস্থায় তা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক এবং বৈধ।

মনে রাখতে হবে, দিল্লির এই ছাত্র-যুব আন্দোলন কোনও সংগঠিত আন্দোলন ছিল না। সিজেপি কোনও সংগঠিত রাজনৈতিক দলও নয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-যুবরা তাঁদের নিজস্ব ক্ষোভকে কেন্দ্র করে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে গিয়েছেন। সাহস, দৃঢ়তা, স্থির লক্ষ্য তাঁদের জয় এনে দিয়েছে। এই আন্দোলন শিক্ষা দেয়, আন্দোলন যদি সংগঠিত হয়, যদি আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে জনগণের নিজস্ব সংগঠনগুলির জন্ম দেওয়া যায়, যেগুলির পরিচালনা, পরিকল্পনা, নেতৃত্ব জনগণই দিতে পারেন, তবে সেই সংগঠিত আন্দোলনের দ্বারা জনগণের ন্যায্য দাবিগুলি আদায় করা সম্ভব। এস ইউ সি আই (সি) এই পথেই গণআন্দোলগুলিকে সংগঠিত করার মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।