Breaking News

‘গণমুক্তি সংকল্প দিবস’—শিবদাস ঘোষ

গত বিশ বছর ধরে আমরা পার্টির তরফ থেকে স্বাধীনতা দিবসকে ‘গণমুক্তি সংকল্প দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, স্বাধীনতা দিবসকে আমরা কেন ‘গণমুক্তি সংকল্প দিবস’ হিসাবে পালন করছি। স্বাধীনতা দেশে আসেনি—এ কথা আমরা বলতে চাইছি না, বা আমরা তা বিশ্বাসও করি না। আমরা মনে করি, দেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার ত্রুটিবিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা, দেশের শাসকগোষ্ঠীর সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির প্রতি আনুগত্য ও নমনীয় মনোভাব, তাদের সাম্রাজ্যবাদ-ঘেঁষা নীতি, সামন্ততন্ত্রের সাথে আপসমুখী মনোভাব ও সর্বোপরি দেশের শাসনব্যবস্থাকে পুঁজিপতিশ্রেণীর স্বার্থে পরিচালনা– এ সব সত্তে্বও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, দেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েছে।

তবে আমরা স্বাধীনতা দিবস একটা উৎসব হিসাবে উদযাপন না করে গণমুক্তি সংকল্প দিবস হিসাবে কেন উদযাপন করছি? তার কারণ, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা অন্যতম লক্ষ্য জনসাধারণের সামনে ছিল স্বাধীনতা লাভ ও সর্বপ্রকার শোষণ থেকে মুক্তি অর্জন। সেই উদ্দেশ্য, সেই লক্ষ্য বর্তমান স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের বুকের উপর চেপে বসেছে তার দ্বারা পরিপূরিত তো হয়ইনি, উপরন্তু জনসাধারণের সে আশা-আকাঙক্ষাকে রূপায়িত করার পথে তা আজ একটা প্রচণ্ড বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই বাধা হটাতে না পারলে শোষণ থেকে জনসাধারণের মুক্তি অসম্ভব।

আমরা যখন বলি, ভারতবর্ষের সমাজ শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, অনেকে মনে করতে পারেন যে, এটা মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীদের একটা বলবার ফ্যাশন বা নিজেদের একটা কথা। ভারতবর্ষের সমাজ যে একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় সমাজ নয় বা একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় জাতি নয়, এটা যে শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, তা মার্ক্সবাদীদের একটা বানানো কথা নয়। ভারতবর্ষের খেটে খাওয়া মানুষ, সাধারণ মানুষ যাঁরা একেবারে নিচু তলার লোক, যাঁরা কায়িক শ্রম করেন, তাঁদের থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী শিক্ষিত সম্প্রদায়— এঁরা সবাই একটা বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণি। তাঁরা দেশের সম্পদের মালিক নন, দেশের সম্পত্তি যা গড়ে উঠছে বা উৎপাদন যন্ত্র যার মধ্য দিয়ে দেশের সম্পদ গড়ে ওঠে, তার মালিকানা তাঁদের হাতে নেই। এঁরা শুধু নিজেদের পরিশ্রম বিক্রি করছেন, সেই পরিশ্রম কাজে লাগছে উৎপাদনের, তার দ্বারা দেশের উৎপাদন হচ্ছে, মালিকশ্রেণির হাতে মুনাফার পাহাড় জমা হচ্ছে, আর কোনও মতে এঁরা নিজেদের পেট পূরণ করছেন। আর এক দল হচ্ছে— যারা দেশের উৎপাদন যন্ত্রের মালিক, কলকারখানার মালিক, ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক এবং তাদের এই ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা চালাবার অধিকার, ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের ওপর ভিত্তি করে যে উৎপাদন ব্যবস্থা তার মালিকানা ও কর্তৃত্বের অধিকার বজায় রাখবার জন্যই এ দেশে পুঁজিপতিশ্রেণির স্বার্থের পরিপূরক ‘সোস্যাল সেন্স অব জাস্টিস’-এর (সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার) উপর ভিত্তি করেই ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ বা আইন-শৃঙ্খলার কাঠামোটি এ দেশে গড়ে উঠেছে।

এ দেশে এই যে বিভাজন— শহরে শ্রম বিক্রি করে যারা দিন চালান তারা আর মালিকশ্রেণি, গ্রামে চাষি আর জোতদার শ্রেণি বা ধনী চাষি– এই বিভক্তি কোনও মতেই অস্বীকার করার উপায় নেই। এ আমরা মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরা সৃষ্টি করিনি। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এর সৃষ্টি হয়েছে। আজকের প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়ারা ও তাদের দালাল চিন্তাবিদরা তাদের কোনও মনগড়া যুক্তির দ্বারা এ সত্যকে উড়িয়ে দিতে পারে না। কারণ ইতিহাসের ছাত্রমাত্রেরই জানা উচিত যে, শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের স্রষ্টা মার্ক্স নন, রেনেসাঁসের যুগে বুর্জোয়ারাই এই তত্ত্বের জন্মদাতা। মার্ক্স শুধু শ্রেণিসংগ্রামের ক্রমবিকাশের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও শ্রেণিসংগ্রামের ‘কালমিনেশন’ (অবশ্যম্ভাবী পরিণতি) হিসাবে ‘সর্বহারার একনায়কত্ব’ তত্ত্বের জন্মদাতা।

তাই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শোষক ও শোষিতের কাছে ‘স্বাধীনতা’ কথাটার মানেও আলাদা, ‘দেশের স্বার্থ’ কথাটার মানেও আলাদা। এ কথাকে যারা অস্বীকার করতে চায় এবং জনসাধারণের কাছে সত্য চেপে যারা ‘জাতীয় স্বার্থ’, ‘স্বাধীনতা’র নামে গোটা দেশের স্বার্থের একটা সাধারণ ব্যাখ্যা দেয়, তারা আমার ভাষায় হয় কিছু জানে না, না হয় জেনেশুনে জোচ্চুরি করছে। জেনেশুনে মানুষকে ঠকাচ্ছে। তাদের এ সোজা সত্য কথাটা জিজ্ঞেস করতে হবে, আমাদের দেশে আজ শ্রেণিবিভক্ত সমাজের একদিকে মালিকশ্রেণি, আর একদিকে শ্রমিক শ্রেণি-খেটেখাওয়া-বেকার জনসাধারণ—চাষি, মজুর, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবীরা। তোমরা দেশের স্বার্থ বলতে কাদের স্বার্থ বোঝাতে চাইছ?

আইন-শৃঙ্খলা দেশের স্বার্থের জন্য দরকার। যদি এই বিরাট জনতাকে বাদ দিয়ে দেশের স্বার্থ হয়, তা হলে তা গিয়ে দাঁড়ায়, হয় খানিকটা জলমাটি, না হয় এই মালিক শ্রেণির স্বার্থ। সে দেশের স্বার্থের সাথে জনসাধারণের সম্পর্ক কী? আর ‘দেশ’ বলতে যদি এই বিরাট জনসমুদ্রকে বোঝায়—তা হলে দেশের স্বার্থে ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে না, জনগণকে ঠকাতে পারে না, জনগণকে পেটাতে পারে না, জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে দমন করতে পারে না, মালিকের স্বার্থরক্ষাকে দেশের স্বার্থ বলতে পারে না, মালিকের আবদার রক্ষা করার নাম দেশের আইনকানুন রক্ষা করা বলতে পারে না। ‘দেশ’ মানে তো মালিক নয়! অথচ ‘আইন’ ‘আইন’ করে যারা চিৎকার করছেন তাঁদের বক্তব্যগুলো বিচার করলে শেষপর্যন্ত গিয়ে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে, দেশের নামে নির্লজ্জ ভাবে মালিক শ্রেণির স্বার্থের ওকালতি।

১৫ই আগস্টের স্বাধীনতা ও গণমুক্তির সমস্যা১৫ই আগস্ট ’৬৭ কলকাতার সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের সভায় প্রদত্ত ভাষণ