Breaking News

কেন্দ্র ও রাজ্য কোনও সরকারেরই হেলদোল নেই, লোকসান থেকে আলু চাষিদের বাঁচতে চাই সংগঠিত আন্দোলন

ঘোষিত দামে সরকারকে এখনই চাষিদের থেকে আলু কেনার দাবিতে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাশাসক দফতরে কৃষক বিক্ষোভ। ১৮ মার্চ

সাম্প্রতিক অকাল বর্ষর্ণে জেলায় জেলায় আলু চাষের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আলু খেত জলে ভাসছে। পচে যাচ্ছে কৃষকের ঘাম রক্ত দিয়ে চাষ করা আলু। কোচবিহারের কৃষক অশ্বিনী বর্মন জানালেন, আলুচাষির বুকের ভেতর এখন শুধু কান্না আর হাহাকার।

মেদিনীপুরের কৃষক নেতা প্রভঞ্জন জানা ক্ষোভের সাথে বলেন, চন্দ্রকোণার রাঙামাটি গ্রামের আলু চাষি রাখাল আড়ি স্ত্রীর গয়না বন্ধক দিয়ে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। ফল ভাল হয়েছিল। কিন্তু বাজারে আলুর দাম তলানিতে। তীব্র মানসিক চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন এই ভাগচাষি। পূর্ব বর্ধমানের গলসির রামনগর গ্রামের বুলবুল মণ্ডলও ঋণের দায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। বাজারে এখন চাষি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে আড়াই-তিন টাকা কেজি দরে আলু। চূড়ান্ত ক্ষতির সম্মুখীন তারা। আরও কত কৃষক আত্মহত্যা করবে কে জানে। অথচ ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড বুরোয় রাজ্যের তৃণমূল সরকারের পাঠানো তথ্য বলছে, এ রাজ্যে কৃষক আত্মহত্যা শূন্য। এই ভণ্ডামির জবাব কি মানুষ দেবে না?

ঝাড়গ্রামে কৃষক বিক্ষোভ

আলু চাষে এখন বিঘা প্রতি খরচ মোটামুটি কত? হুগলির হরিপালের কৃষক বিশ্বনাথ ঘোষ জানালেন, এক বিঘা জমিতে সার, বীজ, সেচ, চাষ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি সহ আনুষঙ্গিক নানা খরচ মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। আলু উৎপাদন হয় ৮০ থেকে ১০০ বস্তার মতো। স্থান ভেদে পরিবেশগত কারণে উৎপাদনে পার্থক্য হয়। চাষি যে দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তাতে বিঘা প্রতি কমবেশি ১৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় আলু চাষে ক্ষতি প্রায় ২৫ হাজার টাকার মতো। আলু চাষিরা বাঁচবে কী করে? ভোটের জাঁকজমকে কি হারিয়ে যাবে চাষির জীবনযন্ত্রণার এমন আর্তনাদ!

তৃণমূল সরকারের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রভঞ্জন বাবু বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৯.৫০ টাকা কেজি দরে ১২ লক্ষ টন আলু কেনার কথা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ঘোষণাটুকুই সার। বাস্তবে আলু কেনার জন্য তারা নামেইনি, টাকা বরাদ্দ করেনি, কোনও পরিকাঠামো দাঁড় করায়নি। আলু ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত কম দামে আলু বিক্রি করতে চাষিদের বাধ্য করছে। চাষির হাত থেকে আলু চলে গেলেই ব্যবসায়ী এবং হিমঘর মালিকরা সস্তায় কেনা আলু বেনামে জমা করে সরকারি দাম হাতিয়ে নেবে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে নানা রকম কালোবাজারি। কিছুদিন আগেও আলুর এক একটা বস্তার দাম ছিল ১০ টাকা। সম্প্রতি সেটা এক লাফে বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা হয়ে গেল। বস্তা নিয়ে এই যে কালোবাজারি চলছে, সরকারের তা নিয়ে কোনও নজরদারি নেই। হিমঘরে প্যাকেট পিছু ভাড়া ছিল ৭০ টাকা। সেটা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮০ টাকা। সারে কালোবাজারি তো সারা বছর ধরেই চলে। শাসক দলের ছত্রছায়ায় সার ব্যবসায়ীরা সারের দাম ইচ্ছামতো বাড়ায়। কালোবাজারি চলে বীজ নিয়েও। সব মিলিয়ে আলু চাষ হয়ে পড়েছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই অবস্থায় সরকার যদি খানিকটা লাভজনক দাম দেওয়ার ব্যবস্থা না করে চাষি বাঁচবে কী করে?

কৃষকদের স্বার্থে কেন্দ্রের মোদি সরকারের ভূমিকাও চূড়ান্ত কৃষকবিরোধী। মোদি সরকার দেশি-বিদেশি পুঁজি মালিকদেরকে কৃষকের জমি তুলে দিতে যে কালা কৃষি আইন এনেছিল, তার বিরুদ্ধে প্রবল কৃষক বিক্ষোভ হয়েছিল প্রায় এক বছর ধরে দিল্লিতে। সেই আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আলু ধান পাট সহ ২৩টি কৃষিপণ্যের এমএসপি চালু করা হবে। আজ পশ্চিমবঙ্গের কুড়ি লক্ষ আলু চাষি বিপন্ন। এমএসপি চালু করলে চাষিদের এই ভাবে আত্মহত্যা করতে হত না। কেন্দ্র এবং রাজ্য কৃষকদের ছেড়ে দিয়েছে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের শোষণের সামনে। কোনও সুরক্ষা বলয় নেই। কৃষক সংগঠন এআইকেকেএমএস কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পরিসংখ্যান দিয়ে জানিয়েছিল মাত্র ২ লক্ষ কোটি টাকা এমএসপি বাবদ বরাদ্দ করলেই দেশের সকল কৃষক মোটামুটি লাভজনক দাম পেতে পারে। কিন্তু মোদি সরকার সে দাবি শোনেনি। আদানি আম্বানির মতো কর্পোরেটদের স্বার্থে মোদি সরকার ১৫ লক্ষ কোটি টাকা কর এবং ব্যাঙ্ক ঋণ ছাড় দিয়েছে। অথচ কৃষকের জন্য ২ লক্ষ কোটি টাকা দিতে তাদের আপত্তি। কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের কৃষক বিরোধী নীতির জন্যই দেশে প্রতি ১২ মিনিটে একজন করে কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে।

তুফানঞ্জে আলু চাষিদের জাতীয় সড়ক আবরোধ।

কৃষক সংগঠন এ আই কে কে এম এস-এর দাবি, আলু চাষিদের বাঁচানোর জন্য রাজ্য সরকারের যে ব্যবস্থাগুলো নেওয়া দরকার তা হল– রাজ্য সরকারকে নূ্যনতম ২৯ লক্ষ টন আলু কিনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা, বাংলাদেশ ও অন্যান্য রাজ্যে আলু রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, আলু রপ্তানির জন্য রোড ট্যাক্স তুলে দেওয়া, স্তরে স্তরে টোল ট্যাক্স মকুব করা, পুলিশের জুলুম বন্ধ করা, হিমঘরে বর্তমানে গাড়ি পিছু ২০ হাজার টাকা ভাড়া কমিয়ে ১০ হাজার টাকা করা, সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত সংখ্যক কোল্ডস্টোরেজ বা হিমঘর তৈরি করা, সেচের বিদ্যুৎ বিল মকুব করা, সস্তায় চাষিদের বীজ সরবরাহ করা,প্রান্তিক আলু চাষিদের জমিতে বীজ বপন ও আলু তোলার সময় ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের মাধ্যমে মজুর সরবরাহ করা। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, এই দাবিগুলো নিয়ে এ আই কে কে এম এস, কৃষক ও কৃষি বাঁচাও কমিটি, সারা বাংলা আলু চাষি সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে রাজ্য জুড়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি ২৫ মার্চ কলকাতায় কৃষি বিপণন মন্ত্রীর দপ্তরে বিক্ষোভ ডেপুটেশনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি মানুষ আলু চাষের উপর নির্ভরশীল। এদের বাঁচানোর জন্য কেন্দ্র এবং রাজ্য দুই সরকারকেই উপযুক্ত ভূমিকা নিতে হবে। তা না হলে প্রবল কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠবে।