Breaking News

ভোট দেওয়ার আগে বিচার করে দেখুন

গ্যাস সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সোচ্চার মহিলারা। কলকাতা, ১৬ মার্চ

ভারতের নির্বাচন কমিশন ৬০ লক্ষ ‘বিচারাধীন’ ভোটারের ভোটাধিকারের বিষয়টি অনিশ্চিত রেখেই বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে। এটাই নাকি দেশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা! প্রায় চার মাস ধরে নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি কাণ্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষকে চূড়ান্ত হয়রানিতে পড়তে হয়েছে। তার জন্য সুপ্রিম কোর্টও তাদের তিরস্কার করেছে। সব মিলে রাজ্যের মানুষের কাছে এটা পরিষ্কার যে, ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে কেন্দে্রর বিজেপি সরকারের কোনও গোপন অ্যাজেন্ডা এর পিছনে কাজ করেছে।

এই নির্বাচনে আপনি যখন ভোট দিতে লাইনে দাঁড়াবেন, কোন মাপকাঠিতে সঠিক দল এবং প্রার্থী বিচার করবেন? কোন দল সবচেয়ে লম্বা চওড়া প্রতিশ্রুতি দিল তা দেখবেন? কোন দলের জাঁকজমক বেশি, নামী দামি নেতা বেশি, টাকার জোর বেশি, মস্তান-পুলিশ মাফিয়াদের হাতে রাখার শক্তি বেশি, তা দেখবেন? কে কটা মন্দির মসজিদ তৈরি করল, কিংবা ভাঙল, কে বেশি করে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক কথার ফুলঝুরি ছোটাতে পারল, কে অন্য দলের নেতা-নেত্রীকে কত খারাপ গালাগালি দিতে পারল, কে ভাতা-খয়রাতির বাজারে বেশি টাকা হাঁকল– এই সব দেখবেন?

নাকি দেখবেন, আপনার জীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোর কথা কোন দলের প্রার্থী সবচেয়ে ভালভাবে তুলে ধরছেন, কারা সেগুলি সমাধানের জন্য লড়াইয়ে সারা বছর সচেষ্ট থাকে, কোন দলের রাজনীতি খেটে খাওয়া মানুষের ইজ্জত কেনার চেষ্টার বদলে তাদের রক্ত ঘামের যথার্থ মর্যাদা দিতে পারে? ভেবে দেখবেন কোন সে দল– যারা খেটে খাওয়া মানুষের লড়াইতে যেমন সর্বদাই পাশে থাকে, নেতৃত্ব দেয় তেমন দলকে বাছবেন? গণআন্দোলনের শক্তি হিসাবে একমাত্র সেই দলই তো বিধানসভার ভিতরে এই লড়াইয়ের কণ্ঠ হয়ে উঠে মানুষের কথাকে বলিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরতে পারবে। ভোটে আপনার সমর্থন কোন দিকে থাকবে, তার বিচারটা এর ভিত্তিতেই হওয়া দরকার নয় কি?

ভোটে দল বিচারের মাপকাঠি ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ কেন?

দল বিচারের মাপকাঠি ঠিক করার প্রশ্নটা প্রথমেই আসছে কেন? আসছে, কারণ টিভি চ্যানেলের সান্ধ্য বিতর্কে, খবরের কাগজের পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে আপনি যে সমস্ত দলের নেতাদের মুখ প্রতিনিয়ত দেখেন তাঁরা কেউ কি ভুয়ো প্রতিশ্রুতি, খয়রাতি, সাম্প্রদায়িক উস্কানি, টাকা-মদ ছড়িয়ে ভোট কেনার প্রতিযোগিতায় একে অপরের থেকে কিছু কম যান! ঝান্ডার রং আর দলের সাইনবোর্ডের পার্থক্য ছাড়া অন্য কোনও মাপকাঠিতে তাদের যে আলাদা করা যায় না, তা তো আপনি অভিজ্ঞতা দিয়েই উপলব্ধি করেন। এই সব দলের অতি বড় সমর্থকও মুখে যাই বলুন না কেন, অস্বীকার করতে পারবেন না যে, তাদের নেতারা নিজেদের আখের গোছানো ছাড়া জনস্বার্থে কোনও বিষয় নিয়ে সত্যিই ভাবেন না! ভাবলে এই দলগুলির কার্যক্রমে এবং নেতাদের ভাষণে জীবনযন্ত্রণায় জ্বলেপুড়ে জেরবার হওয়া মানুষের সমস্যা সমাধানের প্রকৃত রাস্তা খোঁজার একটা চেষ্টা অন্তত দেখা যেত। কিন্তু তাঁরা বলেন– আমাকে ভোট দিয়ে গদিতে বসাও, তোমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে! ভোটের সময় জনসেবকের ভেকধারী নেতা ১৯৫২ সাল থেকে হরেক নির্বাচনে মানুষ কম দেখেনি, এই ধরনের প্রতিশ্রুতিও কম শোনেনি। এ বারেও দেখা গেলপ্রধানমন্ত্রী বঙ্গবাসীকে খোলা চিঠি দিয়ে বলেছেন ‘একটিবার সেবার সুযোগ দিন’! তৃণমূল কংগ্রেসও এখন আপনার ‘সেবক’, কংগ্রেস সহ অন্য দলের নেতারাও এই রকম সেবকের বেশে হাজির। ভেবে দেখুন, আপনি এদের যতবার বিশ্বাস করেছেন ততবারই কিন্তু ঠকেছেন।

ভোটে জিতে নেতা-মন্ত্রী, সাংসদ-বিধায়করা বিধানসভা, লোকসভা, রাজ্যসভায় জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত কোনও আলোচনা কি করেন? বরং লোকসভা কিংবা বিধানসভা সব ক্ষেত্রেই তো চেনা দৃশ্য হল হই-হট্টগোল, সাম্প্রদায়িক স্লোগান, বিনা আলোচনায় বিল পাশ, বিরোধীদের পাইকারি হারে সাসপেন্ড করে বিল পাশ করিয়ে নেওয়া। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতে শাসক তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপি দুই দলের নেতারাই বিধানসভার শেষ অধিবেশনে অর্ন্তর্বতী বাজেটের খুঁটিনাটির বদলে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ এবং সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বতেই মেতে থেকেছেন। এমনকি বিরোধী দলনেতার মুখে শোনা গেছে, জিতলে তাঁরা সমস্ত মুসলিম বিধায়ককে চ্যাংদোলা করে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন।

মনে পড়ে যায়, মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর প্রতিষ্ঠাতা কমরেড শিবদাস ঘোষের কথা, তিনি বলেছিলেন– ‘ইলেকশন হচ্ছে একটা বুর্জোয়া পলিটিক্স। জনগণের রাজনৈতিক চেতনা না থাকলে, শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম এবং শ্রেণিসংগঠন না থাকলে, গণআন্দোলন না থাকলে, জনগণের সচেতন সংঘশক্তি না থাকলে শিল্পপতিরা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিরা বিপুল টাকা ঢেলে এবং সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে যে হাওয়া তোলে, যে আবহাওয়া তৈরি করে, জনগণ উলুখাগড়ার মতো সেই দিকে ভেসে যায়’ (১৯৭৪-এ শিক্ষাশিবিরে ভাষণ)।

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোটবাজ দলগুলির নেতাদের প্রচার দেখলে বোঝা যায়, এই কথাটা কত বড় সত্যকে তুলে ধরেছে। এখন একদিকে তৃণমূল সরকারের তরফে দান-খয়রাতি ঘোষণার জোয়ার চলছে, অন্যদিকে বিজেপি কিংবা কংগ্রেস তো বটেই, এমনকি সিপিএমও ব্যস্ত ক্ষমতায় এলে তারা কত খয়রাতি বাড়াবে তা নিয়ে পাল্টা নিলাম হাঁকার মতো প্রতিযোগিতায়।

বিজেপি ব্যস্ত কখনও লক্ষ লক্ষ, কখনও কোটি কোটি, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘রোহিঙ্গা’ ধরার প্রচারে। অথচ বিজেপির নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন অপদার্থতায় এত অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়তে পারল, সে কথায় তারা নীরব। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তাদের ভোট যাত্রার নাম দিয়েছে ‘পরিবর্তন যাত্রা’। কিন্তু এগারো বছরের বেশি কেন্দ্রীয় সরকার চালিয়ে সারা ভারতে তারা কংগ্রেসী ধারাতেই মানুষের আরও যন্ত্রণা বৃদ্ধি করা ছাড়া কী পরিবর্তন এনেছে? এর উত্তর তো বিজেপি নেতাদেরই দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে ঢাল করে এসআইআর-এর নামে একদিকে বিজেপি মুসলিম বিরোধী জিগির তুলে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বৈধ ভোটারদেরও বাদ দিয়ে নির্বাচনে জিততে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ভোটারদের আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে যাতে মানুষ তাদের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকে। এই টানা-পোড়েনে সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব চলে যাওয়ার আতঙ্কে দিশাহারা। জীবনের জ্বালা যন্ত্রণা সমাধানের দাবি থেকে মানুষের চোখকে এইভাবে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ভোট এলেই আর একটা প্রশ্নকে অবধারিত ভাবে মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ানো হতে থাকে– কাকে হারাতে হলে কাকে ভোট দিতে হবে! দুটো পক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে এমনভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা হয়, যেন এরাই একে অপরের বিকল্প। এদের মধ্যেই কাউকে বেছে নিতে হবে। এক দলের বিরুদ্ধে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠলে দেশের আসল মালিক পুুঁজিপতি শ্রেণি তাদেরই সেবাদাস আর একটি দলকে সামনে নিয়ে এসে মানুষকে বোঝায়– এরাই পারবে ওই দলকে হারাতে। এই রকম দলগুলোকে দরাজ হাতে টাকা জোগায়, প্রচার দেয় পুঁজিপতি শ্রেণি। সাধারণ মানুষ এই সব খতিয়ে না দেখে ভাবে, অন্য যে আসে আসুক, এরা তো যাক! পশ্চিমবঙ্গের এ বারের বিধানসভা নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়।

 তৃণমূল কংগ্রেসের অপশাসনে অতিষ্ঠ মানুষ

তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনে বীতশ্রদ্ধ মানুষ। জিনিসপত্রের দাম নাগালের বাইরে। সার কীটনাশক সহ চাষবাসের উপকরণের দাম বেড়েই চলেছে। পুলিশ-প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে সারের কালোবাজারি। চাষের খরচ উত্তরোত্তর বাড়ছে। ফসলের উপযুক্ত দাম না পেয়ে চাষির আত্মহত্যা প্রায় রোজকার ঘটনা। কর্মসংস্থান তলানিতে। বেকারের সংখ্যা এই রাজ্যে বেড়েই চলেছে। নতুন কলকারখানা তৈরি দূরে থাক বরং বহু চালু কারখানা বন্ধ হয়ে কর্মরত শ্রমিকরাই ছাঁটাই হয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে যুবশ্রী, কন্যাশ্রী, যুবসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রভৃতি হরেক রকম অনুদানের ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী মানুষকে তার অধিকার ভুলিয়ে দিয়ে দয়া নির্ভর করে তুলেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের় নেতা-কর্মীদের চুরি-দুর্নীতি ক্রমবর্ধমান। পুলিশের প্রশাসন দলদাসত্ব, তোলাবাজি, সিন্ডিকেটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ। হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে মেয়েদের কোথাও কোনও নিরাপত্তা নেই। আরজি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত মহিলা ডাক্তারের খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় রাজ্যের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের ভয়াবহ দুন¹তি সামনে এসেছে। এই ঘটনা কর্তৃপক্ষ চাপা দিয়ে দিতে পারত যদি না ওই হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তার, নার্স ও এসইউসিআই(সি)-র মেডিকেল ইউনিটের কর্মীরা তৎপরতার সাথে এগিয়ে আসতেন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজ্য জুড়ে উত্তাল আন্দোলন গড়ে উঠলেও রাজ্য সরকার প্রকৃত দোষীদের আড়াল করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের চাকরি বেচে টাকা কামানোর ধাক্কায় রাজ্যের প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্কুল স্তরের শিক্ষায় তৈরি হয়েছে গুরুতর সংকট। শুধু স্বাস্থ্য বা শিক্ষা দপ্তর নয় আজ এই রাজ্যের সরকারি ব্যবস্থাটাই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আর এই সব দুর্নীতির সাথে যুক্ত সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরা। কয়লা পাচার, বালি পাচার, গরু পাচারের মতো দুর্নীতিতে শাসক দল অভিযুক্ত।

একদিকে স্থায়ী সরকারি চাকরি কার্যত অবলুপ্ত, অন্যদিকে স্কুল থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত চরম অব্যবস্থা। স্কুলগুলোতে উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই, হাজার হাজার শিক্ষক পদ শূন্য। পড়াশুনার পরিবেশটাই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকরা বাধ্য হচ্ছেন সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করতে। অথচ, ছাত্র নেই এই অজুহাতে ৮২০৭টি সরকারি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষাও হয়ে পড়েছে ব্যয়বহুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচন শেষবার কবে হয়েছে তা শাসক দলের নেতারাও মনে করতে পারবেন না। রাজ্যের আশাকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড-ডে মিল কর্মীদের ওপর একদিকে সরকারি বঞ্চনা, অন্যদিকে তাঁদের আন্দোলনের ওপর পুলিশ-প্রশাসন-শাসক দলের নেতাদের জুলুম, অত্যাচার চলছে।

একের পর এক চা বাগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চালু বাগানের শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ২৫০ টাকা হলেও বেশিরভাগ শ্রমিক তা পায় না। দৈনিক ৬০০ টাকা বা মাসে ১৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি অতীতে সিপিএম সরকারের মতো তৃণমূল সরকারও মানছে না। মালিকরা চা বাগান চালানোর বদলে ফড়েদের মাধ্যমে অল্প দামে চাষিদের কাছ থেকে পাতা কিনে তা ফ্যাক্টরিতে প্রসেসিংয়ের দিকেই ঝুঁকেছে। যদিও চাষি পাতা তোলার খরচটাও পায় না।

এর সাথে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু করেছে ‘নরম হিন্দুত্বে’র রাজনীতি। তারা একদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে জগন্নাথ মন্দির, দুর্গা ও মহাকাল মন্দির নির্মাণ করছে, জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় করে দুর্গা পূজার সময় ক্লাবগুলোকে অনুদান দিচ্ছে। অন্য দিকে মুসলিম ভোটারদের কাছে ত্রাতা সাজতে চাইছে। এর মাধ্যমে বিজেপি আজ সারা দেশে যে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি করেছে, তৃণমূল তাকে আরও বাড়াতেই সাহায্য করছে।

বিজেপি কি তৃণমূলের বিকল্প?

বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের মানুষের মধ্যে এখন তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রবল। অনেকেই ভাবছেন তৃণমূলকে হারিয়ে অন্য কাউকে ক্ষমতায় বসালেই বুঝি তাদের জীবনের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এর সুযোগ নিয়ে প্রচার করছে– একবার বিজেপিকে সেবার সুযোগ দিয়েই দেখুন না!

বিজেপি কি নতুন কোনও দল? লোকসভার তিন-তিনটে দফায় কেন্দ্রের সরকারি গদিতে অসীন বিজেপিকে দেখেছে মানুষ। জনগণের প্রাপ্তি কী? কোথায় গেল প্রধানমন্ত্রীর বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি? কোথায় গেল প্রত্যেক ভারতবাসীর ব্যাঙ্কঅ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্ন? এটা যে একটা প্রতারণা ছিল, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জুমলা’ মন্তব্যেই স্পষ্ট। সারা দেশে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় মানুষ নাজেহাল। অথচ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নাকি দাম বাড়ার খবরই পাননি!

কেন্দ্রীয় সরকার চারটি শ্রমকোড চালু করে শ্রমিকদের বহু আন্দোলন ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সারা দেশে ৪ লক্ষের বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। র়েল, ব্যাঙ্কের মতো বৃহৎ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোতে নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ। যতটুকু নিয়োগ হচ্ছে, তার বেশিরভাগই অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক। সেনা বাহিনীতেও অস্থায়ী অগ্নিবীর দিয়ে কাজ চলছে। আট ঘণ্টার কর্মদিবস অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দেশে বেকারত্বের হার নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বেকার যুবকরা কাজের সন্ধানে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, এমনকি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে, এমনকি প্রাণে মেরে ফেলা হয়েছে। লকডাউনের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার পথে মর্মান্তিক মৃত্যুর স্মৃতি এখনও ফিকে হয়ে যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রায় প্রতিটি বক্তৃতায় নিজেকে কৃষক-বন্ধু বলে পরিচয় দেন। অথচ চাষের খরচ বেড়েই চলেছে। কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার কোনও ব্যবস্থা মোদি সরকার করেনি। সারা দেশে প্রতি বছর শত শত কৃষক ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। মোদি সরকার চাইছে কৃষিক্ষেত্রকে কর্পোরেট পুঁজির শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত করতে। এ জন্য তারা তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন করেছিল। প্রায় সাত শতাধিক শহিদের জীবনের বিনিময়ে কৃষকরা লাগাতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা রদ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের স্বার্থেই কেন্দে্রর বিজেপি সরকার কৃষক, মৎস্যজীবী, পশুপালক সহ সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে আমেরিকার সাথে ‘ট্রেড ডিলে’ চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এর ফলে খাদ্যশস্য, দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় দ্রব্যের বাজার দখল করে নেবে মার্কিন বহুজাতিক পুঁজি। এ দেশের কৃষকরা সীমাহীন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। শুধু তাই নয়, আমেরিকার নির্দেশে রাশিয়ার কাছ থেকে আমদানি বন্ধ করে বাড়তি দামে তেল কিনতে সম্মত হয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। আমেরিকার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার অস্ত্র কিনতে ইতিমধ্যেই তারা চুক্তি করেছে। এ দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দীর্ঘ ঐতিহ্যকে পদদলিত করে তারা আমেরিকা ও ইজরায়েলের ইরান আক্রমণের ঘটনায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে কার্যত যুদ্ধবাজ ও নরহত্যাকারী এই দুই দেশকে সমর্থন করেছে।

বিজেপির শাসনে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিণতি শোচনীয়। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে স্কুল ‘ক্লোজার অ্যান্ড মার্জার’ হচ্ছে ২৭ হাজার, রাজস্থানে ১৯ হাজার ৫০০, মহারাষ্টে্র ১৫ হাজার, গুজরাটে ৭ হাজার। এই ভারতে গত পাঁচ বছরে ৬৫ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি শিশু স্কুলছুট হয়েছে প্রাথমিক স্তরেই। অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ করার জন্য দেশের মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০। মাধ্যমিক পরীক্ষা ঐচ্ছিক করে দিয়ে বিরাট সংখ্যক ছাত্রের শিক্ষায় ইতি টানার ব্যবস্থা হচ্ছে।

বিজেপি নেতারা এখন বাংলার মানুষের কাছে ডবল ইঞ্জিন তত্ত্বফেরি করে বেড়াচ্ছেন। যেন কেন্দে্র রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকলে রাজ্যের মানুষের দুর্দিন চলে যাবে। গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ সহ ১৫টি রাজ্যে তো এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার। ওই নেতাদের প্রশ্ন করুন, এই রাজ্যগুলোতে সাধারণ মানুষের এত দুঃখ-দুর্দশা কেন? কেন সেখানে নারী নির্যাতন বাড়ছে? উন্নাও, কাঠুয়া, হাথরস, বিলকিস বানো, সাক্ষী মালিকদের ঘটনা তো বিজেপি শাসিত রাজ্যেই ঘটেছে! তাদের প্রশ্ন করুন, জিনিসপত্রের দাম কেন আকাশচুম্বী। বেকার যুবকরা কেন মাঝে মাঝেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে? কৃষকরা কেন আত্মহত্যা করছে? শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকার কেন? এই সব রাজ্যে শাসক দলের মদতে তোলাবাজি পশ্চিমবাংলাকে লজ্জা দেবে। বিজেপি সরকারই তো সারা দেশে খনিজ, বনজ ও জল সম্পদের মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে ধনকুবের গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছে। এতে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশপাশি কোটি কোটি জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের জীবন জীবিকা থেকে উৎখাত হয়ে যাচ্ছে।

আর দুর্নীতি? বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে ব্যপম দুর্নীতির সমকক্ষ আর কেউ আছে নাকি? বিজেপির উচ্চ স্তরের নেতাদের দুর্নীতি চাপা দিতে ৪৮ জন মানুষকে প্রাণ দিতে হলেও দুর্নীতির সাথে যুক্ত রাঘব বোয়ালদের একজনেরও শাস্তি হয়নি। সমস্ত বিজেপি শাসিত রাজ্যেই দুর্নীতি আজ জলভাত হয়ে গেছে। কিন্তু কোনও বিজেপি নেতাকে দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হয়নি। কারণ তাদের মাথার উপর নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের হাত আছে। সিবিআই, ইডির মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো কার্যত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজেপি যাদের বিরুদ্ধে এক সময় দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিল, এই রকম ২৫ জন এখন বিজেপির ‘রত্ন’। তাদের মধ্যে বিজেপির বিচারে এক সময় চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসাবে ধিক্কৃত হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত পিএম কেয়ার ফান্ডের কোনও হিসেব দেওয়া হবে না। এটা এক বিরাট দুর্নীতি। আর একটা বড় দুর্নীতির ক্ষেত্র হল ইলেক্টোরাল বন্ড। নরেন্দ্র মোদি সরকার আইন করে সমস্ত কিছু গোপন রাখার ব্যবস্থা করেছিল, তার জন্য সুপ্রিম কোর্টেও তারা তিরস্কৃত হয়েছে। ভেবে দেখুন, এই বিজেপি কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে?

সর্বনাশা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি

সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টি করে এক সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আর এক সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণার মনোভাব তৈরি করার ক্ষেত্রে বিজেপি অন্য সকলকে ছাপিয়ে গেছে। বিভিন্ন ধর্মের ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলে মিশে বাস করা এ দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বিজেপি তা ধ্বংস করছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এক সম্প্রদায়ের মানুষের মনে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পর্কে ঘৃণা ও অসহিষ্ণুর মানসিকতা তৈরি করেছে। প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ কি এ জিনিস অনুমোদন করে?

আর এই কর্মযজ্ঞের প্রধান কান্ডারী হলেন বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী। সাধু-সন্ন্যাসীরা নয়, বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরাই এখন ধর্ম প্রচারক। এর পিছনে রয়েছে তাঁদের একটাই উদ্দেশ্য– ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি। এই জন্যই একের পর এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান, নানা ধর্মীয় মেলা। কুম্ভমেলায় কত মানুষ মারা গেল তার হিসাব নেই। মৃতদের পোস্টমর্টেমও হয়নি। এই মেলাটাও ছিল ভোট বৈতরণী পার হওয়ার একটা কৌশল। সৎ, ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কি এদের এই সব কাজকর্মকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারেন?

প্রতিটি নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতারা দলে দলে এই রাজ্যে আসেন। নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী ধারার ঐতিহ্য সম্পন্ন এই বাংলায় তাঁরা ঘৃণাভাষণ দেন। মানুষের মধ্যে থাকা ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরির চেষ্টা করেন। ইতিমধ্যেই বিজেপি নেতারা শোরগোল তুলেছেন যে, অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গায় নাকি এই রাজ্য ভরে গিয়েছে। অথচ ভোটার তালিকা সংশোধনের পরে কতজন অনুপ্রবেশকারী ও কতজন রোহিঙ্গা বাস্তবে পাওয়া গেল, সেই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর তারা দিচ্ছেন না। শুধু হুঙ্কার ছাড়ছেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে সংখ্যালঘুদের সকলকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেবেন। তাতেই নাকি এই রাজ্যের বেকার সমস্যা থেকে শুরু করে সব সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। তাই যদি সত্যি হত, তাহলে তাদের দলের শাসনে থাকা রাজ্যগুলোতে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত! কিন্তু হল না কেন?

এদের অতীত ইতিহাস বলছে, এরা ভারতের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধী। স্বাধীনতা আন্দোলনে যখন এ দেশের যুবকরা প্রাণ দিচ্ছেন, তখন এদের নেতা গোলওয়ালকর বই লিখে প্রচার করেছিলেন যে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন প্রকৃত স্বাধীনতা আন্দোলন নয়। শুধু তাই নয়, ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তাঁরা ব্রিটিশদের সহযোগিতা করেছিলেন, বিপ্লবীদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এদের নেতা সাভারকরই ১৯২৩ সালে তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ বইতে প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের দাবি তুলেছিলেন। নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী এই বাংলার মাটিতে এই বিজেপিকে জায়গা দেওয়া চলে না।

কংগ্রেসের রাজনীতি

সর্বভারতীয় স্তরে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসও নিজেদের তৃণমূল ও বিজেপির বিকল্প বলে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তারাই তো দীর্ঘদিন দেশ চালিয়েছে। মানুষের কোনও সমস্যার সমাধান হয়েছে কি? কংগ্রেস আমলে মূল্যবৃদ্ধি হয়নি? কালোবাজারি হয়নি? বেকার সমস্যা ক্রমাগত বাড়েনি? কংগ্রেস সরকারই তো শিক্ষা সংকোচন শুরু করেছিল। তাদের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীই তো জাতীয় শিক্ষানীতি ১৯৮৬ চালু করে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। বিশ্বায়ন ও অর্থনীতির উদারীকরণের নীতি নিয়ে সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি সংস্থার হাতে সমর্পণের নীতি নরসীমা রাও-এর নেতৃত্বে কংগ্রেস আমলেই শুরু হয়েছিল। বিজেপি আজ কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় বসে যে সব নীতি-নিচ্ছে, তার প্রায় সবই তো কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া কংগ্রেসও বহু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য দায়ী। কংগ্রেস শাসনে বহু অগণতান্ত্রিক কালা কানুন পাশ করা হয়েছিল। তাদের আমলেই জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। এই কংগ্রেস কখনও জনগণের স্বার্থ দেখতে পারে না।

সিপিএম-এর অবাম রাজনীতি

তৃণমূল সরকার গত ১৫ বছর ধরে যত দুষ্কর্ম করছে, ভেবে দেখুন তো, এর কোনওটিই কি সিপিএম আমলের থেকে নতুন কিছু? সিপিএম ফ্রন্টের দেখানো পথেই তো তৃণমূল চলেছে। ২০১১ সালে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল কেন? কারণ সিপিএম জমানায় সরকারের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ হলেই তারা তাকে পুলিশ ও ক্যাডার বাহিনী দিয়ে দমন করতে চেয়েছে। নদিয়াতে আন্দোলনকারী কৃষকদের হত্যা করেছে, চটকল শ্রমিকদের হত্যা করেছে, কলকাতা বন্দরের শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে। এস ইউ সি আই (সি)-র ১৫৯ জন নেতা-কর্মীকে খুন করেছে। বাসভাড়া ও মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলনে গুলি চালিয়ে এস ইউ সি আই (সি) কর্মী মাধাই হালদার, শোভারাম মোদক, হাবুল রজককে হত্যা করেছে। বহু মানুষকে পঙ্গু করে দিয়েছে। সিঙ্গুরে একচেটে পুঁজির স্বার্থে চাষিকে পিটিয়েছে। রাজকুমার ভুল, তাপসী মালিককে হত্যা করেছে। নন্দীগ্রামে গুলি চালিয়ে, গুন্ডা দিয়ে নারী ধর্ষণ করে মানুষের উপর নারকীয় অত্যাচার করেছে। মরিচঝাঁপিতে উদ্বাস্তু মানুষকে উচ্ছেদ করতে লাঠি-গুলি চালিয়েছে, বাড়িঘর জ্বালিয়েছে। শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দলবাজি, স্বজনপোষণ চূড়ান্তভাবে করেছে সিপিএম। পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি কথাটা সিপিএম আমলকে দেখেই এসেছে। আর দুর্নীতি? সিপিএম আমলে দুর্নীতি হয়েছে ব্যাপক। একটাই পার্থক্য, সিপিএম সাংগঠনিক বাঁধুনির জন্য আজকের মতো সবকিছু প্রকাশ্যে আসেনি। এই সিপিএম কখনওই তৃণমূলের অপশাসন দূর করার কাজটি করতে পারে না।

সিপিএম নিজেদের বামপন্থী, মার্ক্সবাদী বলেই পরিচয় দেয়। বহু মানুষ বামপন্থার প্রতি আবেগ থেকে এই দলে যুক্ত হয়ে আছেন। কিন্তু বাস্তবে তারা কি বামপন্থার আদর্শ নিয়ে চলছে? এস ইউ সি আই (সি)-র পক্ষ থেকে সিপিএম নেতাদের কাছে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে আপনারা জনগণের স্বার্থে প্রকৃত গণআন্দোলনে আসুন। মহান মার্ক্সবাদী নেতা লেনিনের শিক্ষা অনুযায়ী আপনারা জনগণের কাছে ভুল স্বীকার করুন। জনগণ আপনাদের আবার মাথায় তুলেনেবে। কিন্তু তাতে তাঁরা সাড়াদেননি। বরং যে কংগ্রেস এ দেশে সবচেয়ে বেশিদিন রাজত্ব করে জনসাধারণের উপর শোষণ নির্যাতন চালিয়েছে, আন্দোলনে লাঠি-গুলি চালিয়েছে, যারা বহু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হোতা, তার সঙ্গে সারা দেশে এবং এই রাজ্যে সিপিএম জোট করেছে। এবার কংগ্রেস চায়নি বলে এ রাজ্যে তাদের সাথে সিপিএম-এর জোট হয়নি।

আইএসএফ-এর সাথে গত বছরের মতো এ বছরও জোট করেছে সিপিএম। আইএসএফ কি সেকুলার? এমনকি মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ তৈরির হোতা হুমায়ুন কবীরের সাথে সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক গোপন বৈঠক করেছেন। আন্দোলনের পথ ছেড়ে দিয়ে তাঁরা এখন হিসাব কষতে ব্যস্ত যে, কার সাথে জোট করলে কিছু সিট পাওয়া যায়, তাতে নীতি-আদর্শ থাকল কি গেল, তাতে কিছু যায় আসে না। ২০১৬-র নির্বাচনের সময় থেকেই তাঁরা কর্মীদের ‘আগে রাম, পরে বাম’ মন্ত্র জপতে শিখিয়ে বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দলকে এই রাজ্যে জায়গা করে নিতে সাহায্য করেছিলেন। দলের নেতৃত্ব তাঁদেরকোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা সৎ, বামপন্থায় বিশ্বাসী, আদর্শবাদী সিপিএম কর্মী সমর্থকদের ভেবে দেখতে বলব।

কেন এই দলগুলি প্রত্যেকটিই জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে

এই প্রশ্নটি গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। সমাজটা শ্রেণি বিভক্ত। এর একদিকে আছে কোটি কোটি শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ। আর একদিকে আছে মুষ্টিমেয় কর্পোরেট সংস্থা বা একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠী। এই দুই শ্রেণির স্বার্থ এক নয়– সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজনৈতিক দল সংখ্যায় যতই হোক না কেন, আসলে তারা দুটি পক্ষে বিভক্ত। হয় তারা পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী, নয় তো খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী। বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল– সকলেই পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। সরকারে বসে তাদের স্বার্থেই নীতি নির্ধারণ করে। বিনিময়ে পুঁজিপতিরা এই দলগুলোকে টাকা দেয়। ইলেকশন বন্ডের বিষয়টা প্রকাশ্যে আসার পরে সাধারণ মানুষের কাছে ঘটনাটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। মানুষ সামনে দেখে সরকারকে আর সরকারি দলের নেতা মন্ত্রীদের। ভাবে এদের পাল্টালেই বুঝি তাদের জীবনের দুর্দশা দুর হবে। কিন্তু এই দলগুলোর মধ্যে যারাই সরকারি ক্ষমতায় আসুক বাস্তবে অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয় না। তাই মহান লেনিন বলেছিলেন, ‘‘কয়েক বছর অন্তর শোষক শ্রেণির হয়ে কারা সরকারে বসবে এবং জনগণকে শোষণ অত্যাচার করবে নির্বাচনের দ্বারা এটাই নির্ধারিত হয়।’’ (দি স্টেট অ্যান্ড রেভলিউশন)

 সাধারণ মানুষের প্রকৃত বিকল্প কী

গত ‘৫২ সাল থেকে এ দেশের মানুষ ভোট দিয়ে এই দলগুলোর কাউকে না কাউকে জিতিয়ে আসছে। কিন্তু অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। ভোট দিয়ে সরকার পাল্টানো যায়, শোষণমূলক ব্যবস্থাকে পাল্টানো যায় না। এই ব্যবস্থাকে পাল্টাতে হলে লড়াই চাই, আন্দোলন চাই। এটা তত্ত্বকথা বলে এড়িয়ে গেলে জনসাধারণেরই ক্ষতি। ইতিহাসে আমরা দেখি মানুষ যতটুকু অধিকার অর্জন করেছে, তার জন্য তাকে লড়তে হয়েছে। লড়াই ছাড়া, আন্দোলন ছাড়া শাসকরা কোনও অধিকার দিয়ে দেয় না। যারা বর্তমান ব্যবস্থার সুফল ভোগ করছে তারা কখনোই বিনা লড়াইয়ে এক কপর্দকও আপনাকে দেবে না। তাই লড়াই আন্দোলনই একমাত্র বিকল্প। যারা লড়াই আন্দোলন গড়ে তুলছে, আপনার অধিকার আদায় করার জন্য জীবনপাত করছে, বুঝবেন তারাই আপনার প্রকৃত বন্ধু। যে দল লড়াই আন্দোলনে আপনার সাথী, সেই দলই তো আপনার ভোট পাওয়ার প্রকৃত দাবিদার। তাদের শক্তিবৃদ্ধি মানে জনগণের সংগ্রামের শক্তিবৃদ্ধি। তাদের প্রতিনিধিকে বিধানসভায় পাঠাতে পারলেই একমাত্র আপনার কণ্ঠস্বর বিধানসভার ভিতরে পৌঁছাবে। তাই কোন দলের গ্ল্যামার বেশি, কার টাকা বেশি, লোকবল বেশি, প্রচারবেশি– এ সব বিচার অর্থহীন। কোন দলকে দিয়ে কোন দলকে হারাবো– এই চিন্তা নয়, আজ সাধারণ মানুষের প্রয়োজন কী করলে সত্যিই নিজেরা জিতবেন, তা দেখা। মানুষের জয় আনতে পারে সংগ্রামী বামপন্থা। এই জন্যই নির্বাচনে সংগ্রামী বামপন্থী রাজনীতিকে চিনে নিতে হবে। এটাই হল দল বিচারের প্রকৃত মাপকাঠি।

 এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) আপনার লড়াইয়ের সাথী

 ভোটসর্বস্ব দলগুলোর একেবারে বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে সংগ্রামী বামপন্থার শক্তি এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)। এই দল নির্বাচনে লড়ছে জনস্বার্থে গণআন্দোলন গড়ে তোলার শক্তিকে জেতানোর আহ্বান নিয়ে। কেন মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ- শিবদাসঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই দল নির্বাচনী লড়াইকে গণআন্দোলনের পরিপূরক লড়াইয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার কথা এত জোর দিয়ে বলে? মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা দেখায়, ভোটে জেতে দল, মানুষ জেতে একটার পর একটা গণআন্দোলনের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘ভোটের মারফত হাজারবার সরকার পাল্টে বা আক্ষরিক অর্থে আইন কানুন সংশোধন করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থা থেকে জনসাধারণের মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। এই মুক্তি অর্জনের একমাত্র পথ হচ্ছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সঠিক বিপ্লবী কায়দায় পরিচালনার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে জনসাধারণের অমোঘ সংঘশক্তি গড়ে তোলা এবং বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণির দলের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা।’’

এই শিক্ষার ভিত্তিতেই এস ইউ সি আই (সি) জন্মলগ্ন থেকেই সাধারণ মানুষের লড়াই আন্দোলনের পাশে থেকেছে। মানুষকে সংগঠিত করে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম পরিচালনা করেছে। তৃণমূল সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমাদের অসংখ্য কর্মী আহত হয়েছেন। দু’জন যুবকর্মীর চোখ চলে গিয়েছে। এই লড়াইয়ের জন্যই দক্ষিণ ২৪ পরগণার নেতা কমরেড সুধাংশু জানাকে হত্যা করেছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতকারীরা। আর জি কর মেডিকেল কলেজে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসকের হত্যা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজ্যব্যাপী লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে। কখনও দলীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে, আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গণকমিটি গড়ে তুলে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এছাড়াও ব্লকে ব্লকে চাষিদের নিয়ে সারের কালোবাজারির বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে বিদ্যুতের স্মার্ট মিটার চালুর বিরুদ্ধে এবং বিদ্যুতের মাশুল কমানোর দাবিতে আন্দোলন, আশাকর্মী সহ স্কিম ওয়ার্কারদের আন্দোলন, জুট শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিক, বাইক ট্যাক্সিচালক, চা শ্রমিকদের সংগঠিত করে দলের শ্রেণি ও গণসংগঠনগুলি আন্দোলন গড়ে তুলছে। একই সাথে বিজেপি সরকারের সর্বনাশা জাতীয় শিক্ষানীতি, তৃণমূল সরকারের রাজ্য শিক্ষানীতি, পরীক্ষার সেমেস্টার পদ্ধতি ও ৪ বছরের ডিগ্রি কোর্সের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। রাজ্য জুড়ে ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন রুখতে পদক্ষেপের দাবিতে, মদ সহ মাদকের প্রসার বন্ধের দাবিতেও এই দল লড়ছে। প্রাথমিকে ইংরেজি ও পাশফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন সহ বহু গৌরবময় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এস ইউ সি আই (সি) আজ গণআন্দোলনের একমাত্র শক্তি হিসেবে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। এই দলের কিশোর কর্মী শহিদ মাধাই হালদারের রক্তধারা, পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের বাস ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলনের শহিদ আবুল রজক ও শোভারাম মোদকের রক্তধারার সাথে জড়িয়ে আছে সংগ্রামের ইতিহাস। সুন্দরবন এলাকার তেভাগা আন্দোলন ও পরবর্তীকালে গরিব মানুষের আন্দোলনের নেতা আমির আলী হালদার, মোকাররম খাঁ, সুষেণ মাইতি, অশোক হালদার সহ শতাধিক শহিদ এই দলের সংগ্রামী লাল পতাকা বুকে জড়িয়ে রক্ত ঢেলে গেছেন কৃষকের অধিকার, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে।

গণআন্দোলনের শক্তিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এস ইউ সি আই (সি) ২৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। গণআন্দোলনের পরীক্ষিত সৈনিকরাই আমাদের দলের প্রার্থী হিসাবে মনোনীত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের লড়াইকে শক্তিশালী করতে সমস্ত দিক থেকে সাহায্য করুন এবং সর্বত্র এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) প্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়ী করুন।