
প্রজাতন্ত্র দিবসের রাতটা কালো হয়ে গেল এ দেশের নাগরিক তথা শ্রমিকের দেহ পোড়া ধোঁয়ায়। আনন্দপুরের নাজিরাবাদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত বহুজাতিক সংস্থা ওয়াও মোমো ও পুষ্পাঞ্জলি ডেকরেটরের গুদাম। দেহ নয়, দেহাংশে পরিণত মানুষগুলির সঠিক সংখ্যা কত কে বলবে! পুলিশের খাতায় মৃত আর নিখোঁজ মিলিয়ে সংখ্যা একটা লেখা আছে বটে। তবে সেটা যে সঠিক নয়, বলবে যে কেউ।
নিখোঁজের তালিকা যদি আরও দীর্ঘ হয় কিংবা তারা যদি আর কখনও ফিরে না আসেন তা হলে কেউই যে বিস্মিত হবেন না তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
এই অগ্নিকাণ্ডে যাঁরা প্রাণ হারালেন তাঁরা সকলেই শ্রমিক, আমাদের সহনাগরিক। যে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে, আগুনের লেলিহান অগ্নিশিখায় একটু একটু করে পুড়তে, পুড়তে তাঁরা নির্মম মৃত্যুকে বরণ করতে বাধ্য হলেন এমন মৃত্যু কি তাঁদের পাওনা ছিল? চোখের সামনে নিশ্চিত মৃত্যু জেনে যারা সাহায্যের কাতর আবেদন করলেন অথচ কোনও সাহায্যই পেলেন না, তার দায় কি বেসরকারি খাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থার কেতাদুরস্ত আধিকারিকরা, মালিকরা এড়িয়ে যেতে পারেন? একটা ছোট বিবৃতি, সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ, প্রতিশ্রুতি আর এর ওর ঘাড়ে দোষ চাপালেই কি দায় ঝেড়ে ফেলা যায়? অগ্নিনির্বাপণের উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা তো দূরের কথা, নিয়ম মেনে যা যা করার কথা, তার কোনও ব্যবস্থাই তারা করেননি। এখানেই শেষ না। অভিযোগ উঠেছে রাতে চুরি ঠেকানোর অজুহাতে গুদামের ভেতরে শ্রমিকদের ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ রাখা হত। কোনও সভ্য দেশে শ্রমিকদের সাথে এমন বর্বর আচরণ করা যায়?
এই ভয়াবহ ঘটনায় দেশের শ্রমিকদের উপর শোষণের নির্মম ছবিটাই কি ফুটে ওঠে না? সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের নেশায় মত্ত মালিক গোষ্ঠী শ্রমিক সুরক্ষাকে কার্যত জলাঞ্জলি দিয়ে এতগুলো মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন এ সত্যকে অস্বীকার করার কোনও উপায় কি আছে? দেশের সরকার, রাজ্যের সরকার, স্থানীয় পৌরসভা, দমকল দফতর কেউ কি এই ঘটনার দায় এড়াতে পারে?
দেশে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈর়ি করার দোহাই দিয়ে যে ভাবে নতুন পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য আইনে পরিদর্শক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়েছে, স্ব-প্রত্যয়ন ও ব্যক্তিগত অডিটের কথা বলে যে ভাবে আইন লঙ্ঘনকারী মালিক পক্ষকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে তাতে শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা থেকে গেছে খাতায়-কলমে। যার প্রতিফলনে কলকারখানা,খনি, নির্মাণ শিল্প সহ একাধিক শিল্পক্ষেত্রে একের পর এক দুর্ঘটনা ও মৃত্যু মিছিল ঘটে চলেছে। সরকারি তথ্য বলছে প্রাথমিক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে ভারতে শিল্পক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে তিন জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাষ্ট্র কি তার নৈতিক দায় কোনও ভাবে এড়িয়ে যেতে পারে?
কলকাতা পুলিশের এলাকা থেকে কার্যত ঢিল ছোড়া দূরত্বে জলাজমি ভরাট করে যে ভাবে গুদামঘর তৈরি করা হয়েছে, রাজ্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে শাসক দলের সাথে বিশেষ লেনদেনের ব্যবস্থা না থাকলে এ কাজ করা যে কোনও ভাবেই সম্ভব না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে দুটি গুদামেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। ছিল না জরুরি নির্গমন পথ। কারখানায় রাত্রিবাসের জন্য যে সুরক্ষা ও আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলা দরকার তাও মানা হয়নি। এই সব তথ্য থেকে পরিষ্কার যে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গাফিলতি ছিল কিংবা সব জেনেও তারা না জানার ভান করে থেকেছেন। তাই শুধুমাত্র লোক দেখানো গ্রেফতারি আর ক্ষতিপূরণ দিয়েই রাজ্য সরকার তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।
আর কত দিন আমরা আমাদের সহ নাগরিকদের এমন নির্মম পরিণতি দেখেও উদাসীন থাকব, নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলব? শুধুমাত্র গল্পে, আড্ডায় এই নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেই কি আমরা দায় মুক্ত হতে পারি? আমরা কি তত দিন পর্যন্ত নীরব থাকব যত দিন না আমাদের পরিচিত মানুষ জন এমন ঘটনার মধ্যে পড়ছেন? আমাদের উদাসীনতা, আমাদের নীরবতাই কি পরোক্ষে মালিক শ্রেণির, শাসক পক্ষের দায়মুক্তির পথ প্রশস্ত করছে না? আর কত নির্মম মৃত্যুর সাক্ষী হলে তবে আমরা গর্জে উঠব, শাসকের চোখে চোখ রেখে চিৎকার করে বলতে পারব– এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না!
জিশু সামন্ত, খানাকুল, হুগলি