
নাগরিক হেনস্থার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে অভূতপূর্ব জনবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দল, নানা নাগরিক সংগঠন এই পাহাড় প্রমাণ দুর্ভোগের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। ব্লকে ব্লকে এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনে বিক্ষোভ দেখিয়েছে এসইউসিআই(সি)। সুপ্রিম কোর্টে নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে মামলাও হয়েছে। প্রবল ক্ষোভের ঢেউ লক্ষ করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাও নাগরিক হেনস্থার বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারেননি। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের চাপে কমিশন তার মৌনতা ভেঙে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছে।
কী বলেছে নির্বাচন কমিশন? নির্বাচন কমিশন বলেছে, ‘শুধুমাত্র ভোটার তালিকার জন্যই তারা নাগরিকত্ব যাচাই করছে এবং যাচাইয়ের পদ্ধতি উদার ও সহানুভূতিসম্পন্ন।’ নির্বাচন কমিশনের এই দাবি কি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আদৌ মেলে? ইতিমধ্যে নানা উদ্বেগ এবং দুর্ভোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএলও এবং সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অল্প সময়ের মধ্যে অত্যধিক কাজের চাপ, বারবার পদ্ধতি পরিবর্তন এবং নানা আশঙ্কার কারণে বিএলও-রা আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন। এই কি নির্বাচন কমিশনের উদারতা ও সহানুভূতির নমুনা? হাজারো দুর্ভোগের যে পাহাড় প্রমাণ খবর ইতিমধ্যেই নানা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সে সব পরপর সাজালে তার দৈর্ঘ্য কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাবে।
নির্বাচন কমিশন এই কাজটি করার জন্য ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে। কেন ২০০২ সালের তালিকাকে ভিত্তি করা হল? তার পরে যে ২৩ বার তালিকা তৈরি হয়েছে সেগুলিকে কেন মান্যতা দেওয়া হবে না? ভারতের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকায় নাম থাকে শুধু নাগরিকদেরই। তা হলে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রত্যেক বছর সংশোধন-পরিমার্জন করা তালিকাগুলি কি অনাগরিকদের? তা হলে তার ভিত্তিতে নির্বাচিত সরকার, তা কেন্দ্রই হোক বা রাজ্য, বৈধ হয় কী করে? এবং সেই সরকারের দ্বারা মনোনীত নির্বাচন কমিশন বৈধ হয় কী করে? এ সব প্রশ্নের উত্তর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নেই, নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। তাদের এক কথা, ২০০২ সালে ভোটার তালিকাকেই ভিত্তি করতে হবে।
নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, কাউকে দেশ থেকে বিতাড়ন করতে এসআইআর করা হচ্ছে না। কেন তাকে সুপ্রিম কোর্টে এ কথা বলতে হল? কারণ প্রেক্ষাপট খুব গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন এই কথাটি এমন একটা সময়ে বলেছে, যার কিছু কাল আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় অন্যান্য মন্ত্রী এবং রাজ্য বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ক্রমাগত বলে চলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিটেক্ট’ অর্থাৎ চিহ্নিত করতে হবে, ভোটার লিস্ট থেকে তাদের ‘ডিলিট’ করতে হবে অর্থাৎ বাদ দিতে হবে এবং তারপর ‘ডিপোর্ট’ করতে হবে অর্থাৎ দেশ থেকে বের করে দিতে হবে। সুসংহত ভাবে এই তিনটি ‘ডি’ সম্পন্ন করে ভোটার তালিকা থেকে ২ কোটির মতো ভোটার যা তাদের ভাষ্যে বিদেশি অনুপ্রবেশকারী বাতিল করতে পারলে, এ রাজ্যে বিজেপির জয় অনিবার্য– এই যে স্বপ্ন এবং আশা বিজেপি ব্যক্ত করেছে, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম পরিচালনা এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য তার সাথে মিলে যায়।
নির্বাচন কমিশন এ বার স্পষ্টতই স্বীকার করে নিল, নাগরিকত্ব যাচাই সে করছে। এটা কি তার কাজের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে? নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকায় উঠল কি না সেটা দেখাই নির্বাচন কমিশনের একমাত্র কাজ। এ বার নির্বাচন কমিশন কি তা করছে? নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত আমলাদের কার্যত বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা যেন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যখন বিজেপির সব স্তরের নেতারাই দু’কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলছে, তখন তো এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে বিনা কারণে নয়। ইতিমধ্যেই যতটুকু জটিলতা তৈরি হয়েছে তাতে মতুয়া সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষ সহ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সব অংশের মানুষ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রবল আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ১৩টি নথির কথা বলেছে। কমিশনের বক্তব্য এই ১৩টির মধ্যে কোনও একটিও কারও কাছে থাকবে না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশনের প্রধান কর্তা যিনি, দেশের আশি ভাগ মানুষ সম্পর্কে যদি তাঁর ধ্যানধারণা থাকত, তা হলে তিনি এ কথা বলতেন না। এ দেশে সরকারি নানা প্রকল্পের জন্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষ নানা সময়ে উচ্ছেদ হয়েছে, বস্তি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, অপারেশন সাইনাইনে হাজার হাজার হকার উচ্ছেদ হয়েছে, প্রতি বছর বন্যায় ভেসে গেছে হাজার হাজার মানুষের বাড়িঘর, ভূমিকম্পে ধসে গেছে বহু এলাকা, আগুনে পুড়ে অজস্র মানুষের নথি শেষ হয়ে গেছে, কজন এঁদের খোঁজ রাখে? যাদের দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করতেই ব্যস্ত থাকতে হয়, যাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট করার মতো টাকাই থাকে না, প্যান কার্ড করার প্রয়োজন হয় না, যারা কোনও দিন ভাবতেই পারেনি নিজ দেশে, নিজের জন্মভূমিতে থাকার জন্য নথি করতে হবে, আজ তাদেরই উপর তাদেরই দ্বারা নির্বাচিত সরকার এ ভাবে নাগরিক হেনস্থা নামিয়ে এনেছে এসআইআর-এর নামে। মানুষ এই অন্যায় মানবে কী করে?
অনেক বিলম্বে, সুপ্রিম কোর্টের চাপে অবশেষে নির্বাচন কমিশন বলল, মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেটের সাথে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড জন্মের প্রমাণ হিসাবে দেওয়া যাবে। কিন্তু যারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে পাস করেনি তাদের কী হবে? অ্যাডমিট কার্ডের ভিত্তিতেই তো মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। তা হলে একক ভাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড কেন গ্রহণযোগ্য হবে না? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কয়েক দিনের মধ্যেই আবার কমিশন বলল, অ্যাডমিট কার্ড গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশনের কেন এত খামখেয়ালিপনা! বেশির ভাগ মানুষের কাছে থাকা যে নথিগুলি বহু বছর ধরে সরকারি নানা কাজে পরিচিতির প্রামাণ্য দলিল হিসাবে গৃহীত হয়েছে সেই ভোটার কার্ড, জব কার্ড, ফ্যামিলি রেজিস্টার ইত্যাদি কোনও কিছু নির্বাচন কমিশনের তালিকায় নেই। যেগুলি আছে তা সমাজের উচ্চস্তরের কাছে যতটা সহজলভ্য, দরিদ্র সাধারণ মানুষের কাছে ততটাই কঠিন।
লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা যুক্তিসঙ্গত অসঙ্গতি অনেক বেড়ে গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে। ভোটারের নামের বানানে ভুল, বাবার নামের বানানে ভুল, মহিলাদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন, মুসলিমদের ক্ষেত্রে একই পরিবারে বিভিন্ন জনের ভিন্ন ভিন্ন পদবী ব্যবহার ইত্যাদি সংশোধন করার জন্য দরকার ছিল এই বাংলার মাটি সম্পর্কে যাঁরা জানেন, বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে যাঁরা জানেন, তেমন যোগ্য লোকেদের দিয়ে নির্বাচন কমিশনের অ্যাপে তোলা তালিকাকে মেলানোর কাজটি করানো। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি এ কাজটা করার জন্য এআই ব্যবহার করার ফলে সমস্যার মাত্রা বহু গুণ বেড়ে গেছে। এর দায় কি নির্বাচন কমিশন অস্বীকার করতে পারে?
উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে দিয়েছে প্রতিটি জেলায় একটি করে ডিটেনশন ক্যাম্প বা বন্দিশিবির করতে হবে। উদ্দেশ্য ডিপোর্ট বা অন্য দেশে পুশ-ব্যাক করা। সরকার যখন এই উদ্দেশ্য নিয়েছে, তখন নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে, যথেষ্ট সময় নিয়ে যত্ন সহকারে করা উচিত, যাতে কারও কোনও সামান্যতম ভুলের জন্য এই দেশের একজন নাগরিকও বিদেশি হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে না যায়। মৃত ভোটারের নাম দেওয়া, স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, যাদের নাম একাধিকবার আছে তাদের এক বার রাখা এবং এ জন্য সংশোধন মাঝে মাঝেই হয়, দরকারও আছে, কেউ তার বিরোধিতা করে না। কিন্তু এ বার নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে বিজেপি যা করছে, তা অতীতের সমস্ত নজির ছাপিয়ে গেছে।
এসইউসিআই(কমিউনিস্ট ) শুরু থেকেই এসআইআর-এর এই সব অসঙ্গতির বিরোধিতা করেছে। নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে বিক্ষোভ দেখিয়েছে, জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে বিক্ষোভ চলছে। একটাই দাবি, প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না। যদি কোথাও কোনও অনুপ্রবেশকারী ধরা পডে, তাকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রীকে করতে হবে। এ জন্য দেশের অভ্যন্তরে প্রতিদিনের রাজনৈতিক প্রচারে কাঁদুনি গাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই যে, অনুপ্রবেশে দেশ ভরে গেল, তারা জনবিন্যাস পাল্টে দিল। এ সব সস্তা রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, বিহারে এসআইআর করার সময় এই রকম ধুয়োই তারা তুলেছিল। কিন্তু কতজন অনুপ্রবেশকারীকে তারা ধরেছে, তা জানা যায়নি। তা ছাড়া অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করানোর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। অনুপ্রবেশকারী আটকানোর দায় কেন্দ্রীয় সরকারের সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর। তারা সেটা আরও দক্ষতার সাথে করুক। সেখানে ঢিলেঢালা কিছু থাকলে প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
স্বশাসিত সংস্থা নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর নামে যে ভাবে কেন্দ্রীয় শাসক বিজেপির দলদাসের ভূমিকা পালন করে চলেছে তা বোধহয় নির্লজ্জতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে। ভোটার তালিকা থেকে সরকারের বিরোধী বৈধ নাগরিকদের নাম যথাসম্ভব বাদ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে বিজেপি। ৭ নং ফর্ম পূরণ করে একই ব্যক্তি বহুজনের নাম বাদ দেওয়ার জন্য জমা দিচ্ছে। অন্যদিকে অন্য রাজ্যের নিজেদের সমর্থকদের নাম যুক্ত করার জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নেওয়াটাকে ভোটে জেতার মূল রাস্তা হিসাবে বেছে নিয়েছে বিজেপি। এবং তা করতে গিয়ে আজ সংসদীয় ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ ভোটব্যবস্থার উপর থেকে গণতন্ত্রের সমস্ত আবরণ টেনে ছিঁড়ে দিয়েছে তারা।