Breaking News

শিক্ষা আন্দোলনে নয়া ইতিহাস, জনগণের পার্লামেন্টে গৃহীত জনগণের শিক্ষানীতি

বাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত জনগণের পার্লামেন্টে উপস্থিত সদস্যদের একাংশ। ২৪ জানুয়ারি

২৪ জানুয়ারি, ২০২৬। দেশের অন্যতম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগীরা মিলিত হলেন বাঙ্গালোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে রামাইয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অ্যাপেক্স হলে। সারা দেশ থেকে এসেছিলেন অধ্যাপক, স্কুলশিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের নানা অংশের নানা পেশার সহস্রাধিক শিক্ষানুরাগী মানুষ। উদ্দেশ্য, জনগণের পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র বিকল্প দেশে একটি জনগণের শিক্ষানীতি গ্রহণ করা।

এই বিকল্প শিক্ষানীতি প্রণয়নের ভাবনা আচমকা আসেনি। কোভিড লকডাউনের সংকট সময়ে ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভার একতরফা সিদ্ধান্তে চালু হয়ে যায় নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি। অথচ যা নিয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবিদদের সঙ্গে তো বটেই, সংসদেও কোনও আলোচনা হয়নি। তার এক বছর আগে, জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর তার যে সর্বনাশা রূপ প্রকাশ পেয়েছিল, তা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বহু ব্যক্তি ও সংগঠন এই নীতির প্রতিবাদ করে সর্বনাশা দিকগুলি বাতিল করার দাবি জানিয়ে ই-মেল ও চিঠি পাঠান। কিন্তু চূড়ান্ত শিক্ষানীতি প্রকাশের পর দেখা যায়, কোনও একটি দাবি বা সুপরামর্শও জাতীয় শিক্ষানীতিতে স্থান পায়নি। বরং শিক্ষার বেসরকারিকরণ, ব্যবসায়ীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের পক্ষে আরও খোলাখুলি ওকালতি করা হয়েছে। সেই সময় কোভিড লকডাউনের মধ্যেও অল ইন্ডিয়া সেভ এডুকেশন কমিটি এই সর্বনাশা শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে নানা উপায়ে, প্রতিবাদের সব রকম মাধ্যম ব্যবহার করে, বিশেষ করে অনলাইনে ও ওয়েবিনারের মাধ্যমে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের মতামত সংগঠিত করে। লকডাউনের হাজার বিধিনিষেধের মধ্যেও সারা দেশে নানা ধরনের প্রতিবাদ সংগঠিত হতে থাকে। লকডাউন উঠে গেলে সেই আন্দোলন রাস্তায় নেমে আসে। এই সব আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাবিদদের সুচিন্তিত অভিমত একত্রিত করে দীর্ঘ দু’বছরের ধারাবাহিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে গত ২২ মে, এ দেশের নবজাগরণের মহান পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের জন্মদিনে দিল্লি, কলকাতা, বাঙ্গালোর সহ দেশের ১৮টি রাজ্যের ২১টি শহরে সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রকাশ করা হয় খসড়া জনগণের শিক্ষানীতি। জনগণের শিক্ষানীতি ২০২৫-এর খসড়া সব স্তরের মানুষের পড়ার সুবিধার জন্য দেশের ১২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। সেই দিন থেকেই এই খসড়া নীতি জনগণের মতামতের জন্য কয়েক হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেই সব মতামতকে গুরত্ব সহ বিচার করে খসড়া শিক্ষানীতি উত্থাপন করা হল ২৪ জানুয়ারি জনগণের পার্লামেন্টে। জনগণের শিক্ষানীতি জনগণের দ্বারা বিকশিত হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়ার কথা সূচনায় উল্লেখ করেন অল ইন্ডিয়া সেভ এডুকেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক, এ দেশের শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা অধ্যাপক তরুণকান্তি নস্কর।

জনগণের পার্লামেন্ট। উপস্থিত শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনেরা

কমিটির সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক প্রকাশ এন শাহ উদ্বোধনী ভাষণ দিতে আহ্বান জানান ইউজিসি-র পূর্বতন চেয়ারম্যান অধ্যাপক সুখদেও থোরাটকে। একে একে বক্তব্য রাখেন ভারত সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব জহর সরকার, মুম্বাই আইআইটি-র প্রাক্তন অধ্যাপক রাম পুনিয়ানি, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিত্য মুখার্জী, হাম্পি কন্নড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এ মুরিগেপ্পা, জেএনইউ-র প্রাক্তন অধ্যাপক অরুণ কুমার, অধ্যাপিকা আর মহালক্ষ্মী।

অধ্যাপক তরুণকান্তি নস্কর

তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেখান কী ভাবে ইতিমধ্যেই অবক্ষয়িত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও যতটুকু ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, বৈজ্ঞানিক ধারণার অবশেষ রয়েছে, তাকেও নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার উপড়ে ফেলতে চাইছে।

প্রত্যেক আলোচকই দেশের শিক্ষা সম্পর্কে, শিক্ষার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন। সকলেই জনগণের পার্লামেন্টে উপস্থিত সদস্যদের আগ্রহ ও একাগ্রতা দেখে আপ্লুত হয়েছেন।

অধ্যাপক সুখদেও থোরাট

উদ্বোধনী সমাবেশের শেষ পর্বে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য জনগণের পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত হন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক শচীদানন্দ সিনহা। জনগণের শিক্ষানীতির ১০টি মূল বিষয়ের জন্য ১০টি অধিবেশনের জন্য নির্বাচিত হন ২০ জন কো-চেয়ারপার্সন। এমন চেয়ারপার্সনদের মধ্যে ছিলেন প্রাক-প্রাথমিক ও স্কুলশিক্ষা বিষয়ক সেশনে প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী, উচ্চশিক্ষা-বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা ও গবেষণা বিষয়ে প্রাক্তন উপাচার্য এ এইচ রাজাসাব, শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ে প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক এল জওহর নেশান সহ শিক্ষা-বিষয় ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের সাহায্য করার জন্য নিয়োজিত হন ২০ জন সহযোগী। পাঁচটি হলে সকল সদস্যরা ভাগ হয়ে গিয়ে কো-চেয়ারম্যানদের পরিচালনায় খসড়া ও সংশোধনীগুলির উপর তাঁদের মতামত রাখেন। জনগণের পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এটাই স্মরণ করাল যে, ভারতের সরকারি পার্লামেন্টে জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি। লোকসভার ৫৪৩ জন এবং রাজ্যসভার ২৮৮ জন সদস্যকে জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে কোনও আলোচনার সুযোগ সরকার দেয়নি। সাংসদদের মতামত ছাড়াই জাতীয় শিক্ষানীতি দেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় ১ হাজার শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্টজনের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ আলোচনা ও সারা দেশ থেকে আগত শিক্ষাবিদ-শিক্ষক-শিক্ষানুরাগীদের থেকে নেওয়া মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত হল জনগণের শিক্ষানীতি-২০২৬।

অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জী

বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনের পর প্লেনারি সেশনে অংশ নেন জেএনইউ-র অধ্যাপিকা মৃদুলা মুখার্জী, আইজার কলকাতার প্রাক্তন ডিরেক্টর অধ্যাপক সৌমিত্র ব্যানার্জী, ইনসা বিজ্ঞানী অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জী, এআইফুকটো-র সাধারণ সম্পাদক অরুণ কুমার, নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এইচ শ্রীকান্ত ও অধ্যাপক বাতস্কেম মায়রোবহ।

সাংবাদিক প্রকাশ এন শা

এর পর স্পিকার শচীদানন্দ সিনহা জনগণের পার্লামেন্টের সদস্যদের আনা সংশোধনী, সংযোজনী ও বাতিল প্রস্তাব ভাষায় রূপ দিয়ে চূড়ান্ত নীতি আকারে প্রকাশ করার জন্য একটি স্ক্রুটনি কমিটি গঠন এবং জনগণের শিক্ষানীতির উপর ভোটাভুটি আহ্বান করেন। সর্বসম্মতিক্রমে প্রবল করতালির মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় জনগণের শিক্ষানীতি-২০২৬।

এই শিক্ষানীতিতে বলা হয় শিক্ষার আর্থিক দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে এবং কেন্দ্রীয় বাজেটের ১০ শতাংশ এবং রাজ্যগুলির বাজেটের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে হবে। ভাষার প্রশ্নে সারা দেশে দ্বি-ভাষা নীতি মাতৃভাষা ও ইংরেজি চালুর আহ্বান জানানো হয়। অবৈজ্ঞানিক বিষয় সিলেবাসে ঢোকানো, শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের স্থান জনগণের শিক্ষানীতিতে নেই। এই নীতিতে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে, সকলের শিক্ষার অধিকারের দাবি সহ সেই দাবিগুলি, যা আমাদের দেশের নবজাগরণের মনীষী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্বপ্ন পূরণ করার সাথে সাথে সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

জহর সরকার

 জনগণের শিক্ষানীতি গৃহীত হওয়ার পর জনগণের পার্লামেন্টের সদস্যদের অনুমোদনে উত্থাপিত হয় ‘বাঙ্গালোর ঘোষণাপত্র’। উত্থাপন করেন অল ইন্ডিয়া সেভ এডুকেশন কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য দেবাশীষ রায়। এই ঘোষণাপত্রে বাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত জনগণের পার্লামেন্টের দ্বারা গৃহীত ‘জনগণের শিক্ষানীতি ২০২৬’ সম্পর্কে দেশের মানুষকে পরিচিত করানোর দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলির কাছে সর্বনাশা জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিল করা ও জনগণের শিক্ষানীতি চালু করার জোরালো দাবি আহ্বান জানানো হয়।

ঘোষণা করা হয় জনগণের এই দাবিকেই জনগণের স্বাক্ষর সংগ্রহের মধ্য দিয়ে সংগঠিত করা হবে। এই দাবিকে আরও শক্তিশালী করতে দেশের সর্বত্র অসংখ্য সেভ এডুকেশন কমিটি গঠন, শিক্ষা দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান,

অধ্যাপক রাম পুনিয়ানি

কনভেনশন, ধরনা প্রভৃতি আন্দোলন এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যাতে জনমতের চাপে সরকার তার সর্বনাশা শিক্ষানীতি বাতিল করতে এবং জনমুখী শিক্ষানীতি চালু করতে বাধ্য হয়। বাঙ্গালোর ঘোষণাপত্র ভোটে গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের পার্লামেন্টের প্লেনারি অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সদস্যদের দৃপ্ত স্লোগানের মধ্য দিয়ে ধ্বনিত হয়ে ওঠে আগামী দিনের বৃহত্তর শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা।