ঘড়িতে তখন ঠিক দুপুর বারোটা বেজে বিয়াল্লিশ মিনিট। মঙ্গলবারের কর্মব্যস্ত কলেজ স্ট্রিটমোড় দেখল এক অপূর্ব দৃশ্য। হাওড়া, শিয়ালদা আর শ্যামবাজার থেকে এগিয়ে আসা মহিলা অঙ্গীকার যাত্রীদের তিনটি মিছিল এসে দাঁড়াল চার মাথার মোড়ের তিন প্রান্তে। নীল আকাশের গায়ে উড়ছে সারি সারি সাদা পতাকা, সে পতাকায় আছেন বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। আছেন প্রীতিলতা, রোকেয়া, সাবিত্রীবাঈ ফুলে। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে তাঁদের আহ্বান। রোকেয়া বলছেন, ‘বলো ভগিনী, আমরা আসবাব নই, বলো কন্যে, আমরা জড়োয়া অলংকার রূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই, সকলে সমস্বরে বলো, আমরা মানুষ।’ নারীশিক্ষার আর এক অগ্রদূত সাবিত্রীবাঈ ফুলে ডাক দিচ্ছেন, ‘শোষিত মানুষের দুঃখ দূর করো, আগল ভেঙে বেরিয়ে এসো।’
সোনালি রোদ ছুঁয়ে যাচ্ছে সেই উড্ডীন পতাকার সারি, ছুঁয়ে যাচ্ছে শত শত প্রতিবাদী মেয়ের প্রত্যয়ী মুখ, যারা অঙ্গীকারের পতাকা হাতে দু’দিন, চার দিন, সাত দিন ধরে পথচলা শুরু করেছেন রাজ্যের প্রান্ত-প্রত্যন্ত থেকে। সকাল দশটায় শ্যামবাজারে পৌঁছেছেন কোচবিহার থেকে আসা অঙ্গীকার যাত্রীরা। কলকাতার নানা এলাকা থেকে আরও বহু স্থানীয় মহিলা যোগ দিয়েছেন সেখানে। হাওড়া স্টেশন থেকে এসেছে ঝাড়গ্রাম-পুরুলিয়ার অঙ্গীকার যাত্রীদের মিছিল, শিয়ালদা থেকে এসেছেন মূলত দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার যাত্রীরা। কিন্তু সকলের বুকেই সমাজের হাজার অভয়া আর নির্ভয়ার যন্ত্রণা, তাঁরা বিগত দু-মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্রাম-শহর-মাঠ-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষকে বুঝিয়েছেন এই অঙ্গীকার যাত্রার প্রয়োজনীয়তা, বুঝিয়েছেন, নারীর ওপর অত্যাচার যত দিন না বন্ধ হবে, এই প্রতিবাদের আগুনকেও তত দিন নিভতে দেওয়া চলে না। তাই আজ যখন সেই দীর্ঘ পবিশ্রম, বহু অসুবিধা, রাত জাগার ক্লান্তি আর পথশ্রমের শেষে তিনটি মিছিল মিলল নদীর স্রোতের মতো। সকলেরই মুখে বিজয়ের হাসি, চোখে আনন্দের অশ্রু। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছেন তাঁরা। এক একটি করে দল চলে যাচ্ছে কলেজ স্কোয়ারের দিকে।
কলেজ স্কোয়ার, পশ্চিমবাংলার বহু গর্বের আন্দোলনের, জনজাগরণের পীঠস্থান। সেখানে সমাপনী সমাবেশের মঞ্চ সেজে উঠেছে কালো কাপড়ের ওপর আঁকা রঙিন ম্যুরালে। রাস্তার চারপাশে অসংখ্য পোস্টার। সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা, অভয়ার ন্যায়বিচার, ধর্ষক-নির্যাতকের শাস্তির দাবি, অন্যায়ের প্রতিবাদে মুখর হওয়ার আহ্বান। গোটা কলেজ স্ট্রিট তখন কার্যত অবরুদ্ধ, যত দূর চোখ যায় অগণিত মানুষের মাথা। মঞ্চের দু-পাশের রাস্তায় চেয়ারে বসেছেন বয়স্ক, অসুস্থ মানুষ আর সাদা টুপি সাদা জ্যাকেট পরা অঙ্গীকার যাত্রীরা। আরও হাজার হাজার মানুষ অনুষ্ঠান শুনছেন মাটিতে বসে, দাঁড়িয়ে। মানুষ যখন একান্ত পরিচিত বৃত্তের বাইরে গিয়ে অপরিচিত বিপন্ন মানুষের জন্য পথে নামে, নিজের অজান্তেই সে মানুষ হিসেবে অনেক বড়ো হয়ে যায়। সংসার-সন্তান-চার দেওয়ালের পিছুটানকে জয় করে প্রতিবাদের খোলা দিগন্তে এসে দাঁড়ানো এই মানুষগুলোও তেমনই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করে গেলেন নিজেদের অজান্তেই। অঙ্গীকার যাত্রীদের সাগ্রহে, সসম্ভ্রমে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন অন্যেরা, আবার নবীন অঙ্গীকার যাত্রীরা নিজেরা না বসে বয়স্ক মানুষকে বসতে দিচ্ছেন, একে অন্যকে জল, শুকনো খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন। ‘এত দূর থেকে বাড়ির লোকদের ছেড়ে এসেছেন, কষ্ট হয়নি’? উত্তরবঙ্গের ইন্দিরা বিশ্বাস, অপর্ণা বিশ্বাস বললেন, ‘ওটুকু আমাদের জয় করতেই হবে ন্যায়বিচার পেতে গেলে।’ হাতে হাতে অঙ্গীকার পত্র দিচ্ছিলেন মেদিনীপুরের মধুমিতা পাল। পাঁশকুড়া কলেজের ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী মধুমিতা মিছিলে যোগ দিয়েছেন ১২ তারিখ। বললেন, ‘ভেবেছিলাম দু-দিন থেকে ফিরে যাব, পারলাম না। অনেক মানুষের ভালবাসা পেলাম, অনেক নতুন বন্ধু পেলাম’। একই আবেগ নিয়ে কলকাতার বনশ্রী তরফদার বললেন, ‘যখন বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে হাঁটছি, অসংখ্য মানুষ যে ভাবে এসে হাত মেলাচ্ছেন, মনে হচ্ছিল আমাদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল।’ গোসাবার টুম্পা সর্দার আর মগরাহাটের রহিমা বিবি একই সুরে বললেন, ‘এমন প্রতিবাদে আবার আসব। আমাদের ঘরেও তো ছোট মেয়ে আছে। সব মায়েদের বুঝতে হবে, প্রতিবাদ করা দরকার।’
যে সামাজিক সংগঠনের ডাকে এই অঙ্গীকার যাত্রা, সেই ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’-র বিশিষ্ট আহ্বায়করা বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মালা দিয়ে শুরু করলেন সমাপনী সমাবেশ। আরজিকরের নির্যাতিতা অভয়ার মা-বাবা তাঁদের বক্তব্যে সমবেত জনতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেশের সকল নির্যাতিতা মেয়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান রাখলেন। পুরুলিয়ার একদল যাত্রী এই লড়াইয়ের যাত্রা পথেই অভয়াদের জন্য বেঁধেছেন টুসু গান, সেই গান শোনালেন। অঙ্গীকার যাত্রাকে সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদী গান-নাচ-নাটক মঞ্চস্থ করল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ প্রতিবাদী ডাঃ অনিকেত মাহাতো, ভয়েস অফ অভয়া ভয়েস অফ উইমেন-এর সম্পাদক ডাঃ বিপ্লব চন্দ্র অঙ্গীকার যাত্রাকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, যে দেশে নির্যাতিতাকে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে অপরাধীকে আড়াল করতে পুলিশ-প্রশাসন বেশি সচেষ্ট, সেখানে মন্ত্রী-আমলার অপেক্ষা না করে জনগণকেই ভলান্টিয়ার বাহিনী গঠন করে এ ধরনের যে কোনও অন্যায় সর্বশক্তি দিয়ে আটকাতে হবে।
একই আহ্বান উঠে এল বিশিষ্ট সমাজসেবী কল্পনা দত্ত, সিস্টার ভাস্বতী মুখার্জী, ডাঃ নূপুর ব্যানার্জীর বক্তব্যেও। অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আজ সমাপন নয়, নতুন অঙ্গীকারের উদ্বোধন।’ অঙ্গীকার যাত্রীদের প্রতি অভিবাদন পত্র পাঠ করেন চলচ্চিত্র পরিচালক শতরূপা স্যান্যাল। সভা পরিচালনা করেন অধ্যক্ষা মৈত্রেয়ী বর্ধন রায়। এ ছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষা সীমা চক্রবর্তী, অধ্যাপিকা শাহনাজ নবী, আইনজীবী দেবযানী সেনগুপ্ত, ক্রীড়াবিদ শান্তি মল্লিক, ডাঃ নাসরিন আলি, ভাস্কর অসিত সাঁই, অধ্যাপিকা সোমা রায় প্রমুখ। শীতের বিকেলে আলো কমে আসছে, ঠান্ডা বাড়ছে একটু একটু করে। কিন্তু কলেজ স্কোয়ার প্রাঙ্গন গোটা বাংলার বহ্নিশিখাদের লড়াইয়ের উত্তাপে, আলোয় উদ্ভাসিত। সমাজ দাগিয়ে দেয়– ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু।’ সমাজ আজও দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে ‘চুড়ি পরা হাত’ দিয়ে।
সেই সমাজের বুকে দাঁড়িয়েই দেশের হাজার হাজার মেয়ের চোখের জলের জবাব চেয়ে এই ঐতিহাসিক অঙ্গীকার যাত্রা বুঝিয়ে গেল, মনুষ্যত্বের, প্রতিবাদের শক্তি আজও অন্ধকারের চেয়ে বেশি। সভার শেষে সিস্টার ভাস্বতী মুখার্জীর সাথে গলা মিলিয়ে নারীর সমস্ত রকম অবমাননার বিরুদ্ধে আমরণ রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নিয়ে গেলেন সমবেত নারী-পুরুষ। বুকে নিয়ে গেলেন নতুন লড়াইয়ের প্রত্যয়। অঙ্গীকারের বজ্রমুঠিতে আকাশ ছোঁয়ার লক্ষ্যে বাংলা জুড়ে, দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়বেন আজকের বহ্নিশিখারা, তৈরি করবেন আন্দোলনের দাবানল।
