
ডিসেম্বরের ৯ থেকে ১৬। ক্যালেন্ডারের হিসেবে আটটি মাত্র দিন, কিন্তু এই আট দিনেই বহু বছর ধরে তিলে তিলে জমে ওঠা এক যন্ত্রণাকে মোকাবিলার শপথে মিলে গেলেন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব পেশার, সমাজের সব স্তরের, সব জেলার হাজার হাজার মানুষ। রাজ্যের চারটি কোণ থেকে কলকাতা অভিমুখে এগিয়ে চলা অঙ্গীকার যাত্রা শুধু বিপন্ন নারীর যন্ত্রণাকে ছুঁয়ে গেল না, তাকে রোখার শপথের এক সামাজিক আন্দোলনের জোয়ারকে পৌঁছে দিয়ে গেল অসংখ্য মনের গভীরে।
সে যন্ত্রণার ইতিহাস বহু দিনের। ৯ ডিসেম্বর ছিল সে যন্ত্রণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক অগ্নিশিখা সম চরিত্র রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ও মৃত্যু দিন। সময় বদলেছে। কিন্তু বিশ্বময় তথাকথিত অগ্রগতি, উন্নয়ন, প্রগতির ঢাক আর তীব্র আলোক ছটার নীচে আজও বিপন্ন নারীর কান্না চাপা পড়ে আছে। দিল্লির নির্ভয়া, উত্তরপ্রদেশের উন্নাও, হাথরসের ধর্ষিতা-নিহত তরুণী, এ রাজ্যের বানতলা, ধানতলা, কামদুনি, হাঁসখালির নির্যাতিতারা, আর জি কর-এর তরুণী চিকিৎসক, কসবা ল কলেজের ছাত্রী, রামপুরহাট, মহিষমারির নির্যাতিতা তরুণী-কিশোরী-শিশুকন্যাদের রক্ত, তাদের আর্তনাদ মানুষের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করছে– এমনটাই কি চলতে দেবে তোমরা? কত নাম মনে পড়ে যায়–আসিফা, মনীষা বাল্মিকী, তাপসী মালিক, নির্ভয়া, তিলোত্তমা! পরিবারের নিকটজন, এমনকি পিতার লালসারও শিকার হয়েছে কত কন্যা! চাপা কান্নায় প্রতিকারের পথ খুঁজে ছটফট করে মানুষ। অসহায় আর্তিতে কাঁদে বিপন্ন নারী। যন্ত্রণা চেপে একা একা চোখের জল ফেলেন কত জন। কিন্তু চোখের জলেই কি সব শেষ হবে? নাকি তিল তিল যন্ত্রণার অবসান চেয়ে উঠে দাঁড়াব আমরা! এই অনুভূতিরই স্বতোৎসারিত প্রকাশ ঘটল অনন্যসাধারণ এক সামাজিক উদ্যোগ– অঙ্গীকার যাত্রায়। দিল্লির নির্ভয়া ঘটনার পর এক জনজাগরণ দেখেছিল সারা দেশ। আর জি কর-এর ঘটনায় অভয়ার বিচার চেয়ে আর এক অভূতপূর্ব আন্দোলন দেখেছে সারা ভারত। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত মঞ্চ– ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’। মঞ্চের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পেশার ১২ জন বিশিষ্ট মহিলা আহ্বায়ক ডাক দিয়েছিলেন, আসুন আমরা নারীর তথা মনুষ্যত্বের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনকে ব্যাপক এক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করি। যে সামাজিক আন্দোলনের উদ্যোগ একদিন নিয়েছিলেন মহান মনীষী রামমোহন, বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজি নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নারীর মনুষ্যত্বের অধিকারের দাবিতে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিন ৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে নির্ভয়া দিবস ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের চারটি প্রান্ত থেকে মহিলাদের অঙ্গীকার যাত্রার ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা।
এ অঙ্গীকার আমাদের সকলের
সমাজের মধ্যে নারীর অবমাননার বিরুদ্ধে ধিকি ধিকি জ্বলা প্রতিবাদের আগুন থেকেই উঠে এসেছে অঙ্গীকার যাত্রার দাবি। নারীর মর্যাদা রক্ষা, ধর্ষক-খুনি-নারী নির্যাতনকারীদের শাস্তির দাবি যেমন শাসকের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন, তেমনই যে সমাজটা এই ধর্ষক-নির্যাতনকারী নরপশুদের জন্ম দেয় তাকে বদলানোর মন তৈরি করার কাজটাও আজ অতি জরুরি। তাই নিছক দাবি নয়, নারীর মর্যাদা রক্ষায় সমাজ মননকে পরিবর্তনের আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার প্রয়োজন আজ মানুষ হিসাবে সকলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রয়োজন বোধ থেকে– লড়াইয়ে আমিও আছি, থাকব সর্বদাই, এই অঙ্গীকার নিতে এগিয়ে এসেছেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের অঙ্গীকারের পতাকাবাহী অঙ্গীকার যাত্রীরা পথশ্রমের ক্লান্তি, শরীরের অসুবিধা সব দূরে ঠেলে দিয়ে কোচবিহার, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, কাকদ্বীপ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এসে পৌঁছলেন কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে মহান বিদ্যাসাগরের মূর্তির সামনে।
কে ছিলেন না অঙ্গীকার যাত্রীদের মধ্যে! ছাত্রী, কর্মরতা তরুণী, সাংবাদিক, নার্স থেকে শুরু করে চা-বাগানের আদিবাসী নারী-শ্রমিক, পুরুলিয়ার অধিবাসী মহিলা– সকলেই এক হয়ে পথ চললেন। এমনকি বহু বর্ষীয়ান মহিলাও দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন।
রাজ্যের সর্বত্র অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছেন মানুষ। মহিলারা দলে দলে অঙ্গীকার যাত্রী হতে চেয়ে নাম লিখিয়েছেন, পুরুষরা দায়িত্ব নিতে চেয়েছেন সহযোগী স্বেচ্ছাসেবকের। আলাদা চারটি পথে মহানগরী কলকাতায় আসার পথে অঙ্গীকার যাত্রীরা ছুঁয়ে এসেছেন রাজ্যের প্রায় সমস্ত জেলাকে। অধিকাংশ টিভি, সংবাদপত্র এই উদ্যোগের প্রচার দেয়নি। তা সত্তে্বও হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবকের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগের আবেদন পৌঁছে গেছে পশ্চিমবঙ্গের কোনায় কোনায়। অঙ্গীকার যাত্রার আবেদন অপরিচয়ের সমস্ত দূরত্বকে সরিয়ে দিয়ে অভূতপূর্ব সাড়ায় মানুষের সমর্থন অর্জন করেছে। প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমেও অঙ্গীকার যাত্রার আহ্বান নিয়ে পৌঁছে গেছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। থাকার জায়গা নেই। সব শুনে পেশায় আইনজীবী জনৈক ব্যক্তি তাঁর বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছেন। বলেছেন, এই মহতী উদ্যোগের জন্য অফিস প্রয়োজন? তাঁর বাড়িকেই অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হোক।
এই সর্বব্যাপক সমর্থন আকস্মিক নয়। নারীর প্রতি ধারাবাহিক অবমাননার বিরুদ্ধে এই সমাজেই জমে থাকা কান্না প্রতিবাদ হয়ে ফেটে পড়েছিল এক বছর আগে আর জি কর আন্দোলনে। ২০২৪-এর ১৪ আগস্টের রাত দখল আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মাইল ফলক হয়ে আছে। ‘বিচার চাই’ ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ আজ সারা দেশের সব আন্দোলনের স্লোগানে পরিণত। এমনকি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে তা পৌঁছেছে বিশ্বের প্রতিবাদী মানুষের কাছে। সেই ন্যায়বিচারের দাবির প্রতিবাদী ঢেউকে সর্ব্যাপক জোয়ারে পরিণত করে মানুষের অন্তরের গভীরে পৌঁছে দিয়ে গেল এই অঙ্গীকার যাত্রা।
বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুনের আঁচ আরও জোরদার হয়েছে
অভূতপূর্ব সেই জনজাগরণ এবং জুনিয়র ডাক্তার সহ সাধারণ মানুষের ধারাবাহিক আন্দোলনে কিছু দাবি অর্জিত হলেও অভয়া ন্যায়বিচার পায়নি। একের পর এক ঘটনায় বারবার বিপন্ন হয়েছে নারী। শাসকরা একদিকে দমন নীতি চালিয়েছে, অন্য দিকে হতাশায় ডুবিয়ে দিতে চেয়েছে মানুষকে। কিন্তু সরকার প্রশাসন অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ালেও সমাজ অভ্যন্তরে ন্যায়ের পক্ষে যে বোধ প্রবাহিত হচ্ছে সেই বোধেই মানুষ ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিয়েছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। এই প্রয়োজনবোধ থেকে জন্ম নিয়েছে একটি উদ্যোগ। এগিয়ে এসেছেন সমাজের সচেতন মহিলারা। তাঁরা কেউ চিকিৎসক, কেউ অধ্যাপক, শিক্ষক, কেউ চলচ্চিত্র নির্মাতা, কেউ বা খেলোয়াড়। কিন্তু তাঁদের আরও বড় পরিচয়– তাঁরা বিপন্ন নারীর চোখের জল মোছাতে, সমস্ত মানুষের মনুষ্যত্বের দরজায় আহ্বান পৌঁছে দিয়ে তৈরি করেছেন ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ প্ল্যাটফর্ম। পুরুষরাও পাশে দাঁড়িয়েছেন।
জেলায় জেলায় জনস্রোত
অঙ্গীকার যাত্রা রাজ্যের চারটি জায়গা থেকে শুরু হয়ে কলকাতায় আসার পথে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলাকে ছুঁয়ে শহর, গ্রাম, গঞ্জে নিয়ে গেছে অঙ্গীকারের বার্তা। সর্বত্র মানুষ প্রবল উচ্ছ্বাসে পাশে থেকেছেন অঙ্গীকার যাত্রীদের। আট দিন ধরে হাজার হাজার অঙ্গীকার যাত্রীর থাকা খাওয়া, যাত্রাপথের প্রধান শহরগুলিতে সমাবেশ ও অনুষ্ঠান, এ সবের সংস্থান করেছেন সাধারণ মানুষ। কেউ অর্থ দিয়েছেন, কেউ অন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংস্থান করেছেন। কলকাতায় জনৈক ব্যক্তি অঙ্গীকার যাত্রার সমাবেশে অংশ নিতে চেয়ে ছুটির আবেদন করেছিলেন তাঁর কর্পোরেট অফিসে। ছুটি মেলেনি। তিনি চাকরি ছেড়েছেন। এক সাংবাদিক মহিলা চাকরির তোয়াক্কা না করে শিলিগুড়ি থেকে একটানা অংশ নিয়েছেন অঙ্গীকার যাত্রায়। কলকাতায় বেহালার এক ছাত্রী পরীক্ষা না দিয়েই অঙ্গীকার যাত্রায় শামিল হয়েছেন। চলমান অঙ্গীকার যাত্রীদের পথচলতি মানুষ এসে শুভেচ্ছা ও সম্বর্ধনা জানিয়েছেন। কৃষ্ণনগরে অঙ্গীকার যাত্রীদের দেখে এক ভিখারিনি বৃদ্ধা এগিয়ে এসে তাঁর সেই মুহূর্তের সম্বল পাঁচ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন। পুষ্পস্তবক দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছে বহু সংগঠন। এই চিত্র বহু জায়গায়। শ্রীরামপুরে জনৈক ব্যক্তি চলমান অঙ্গীকার যাত্রীদের হাতে চকলেট তুলে দিয়ে বলেছেন, সন্তানের জন্মদিন পালনের এটাই সবচেয়ে ভাল রাস্তা বলে মনে করছি। এই রকমই আরও বহু ঘটনা। অঙ্গীকার যাত্রার সমর্থনে ছোট বড় নানা শহরে সংঘটিত হয়েছে অজস্র সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। পথ নাটকের বহু দল নিজেদের দলীয় উদ্যোগের বাইরে গিয়ে অঙ্গীকার যাত্রাকে সমর্থন জানিয়ে নাটক পরিবেশন করেছে। জেলায় জেলায় দশ হাজারের বেশি অভ্যর্থনা কমিটি গঠিত হয়েছে, যার সাথে যুক্ত হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। কয়েক হাজার সহযোগী সংগঠন, ক্লাব, সমিতি এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে এগিয়ে এসেছে। স্বেচ্ছাসেবক হয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ। এইগুলি নিছক একটি সংখ্যা নয়, সামাজিক চেতনা। যা প্রমাণ করে এই উদ্যোগ এক ব্যাপক সামাজিক চরিত্র অর্জনে সফল হয়েছে। সফল হয়েছে মানুষ প্রস্তুত ছিল বলে– সে গ্রামীণ ক্ষেত্র হোক বা শহর। সারা দেশে নারীর অবমাননার বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে চায়।
চলমান সংগ্রামের অঙ্গীকার
আট দিনের এই বিরল উদ্যোগে রাজ্য জুড়ে কয়েক হাজার মহিলা পথ হেঁটেছেন। হিসাবিরা বলতে পারেন, এতেই কি থেমে যাবে বিপন্ন নারীর কান্না? যে নরপশুরা বিকৃত লালসায় জান্তব উল্লাসে মত্ত, তাদের পশুত্ব কি এই প্রক্রিয়ায় মানবতায় উন্নীত হবে? এ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গীকার যাত্রীরা বলেছে, মানুষ হয়ে ওঠার যে অঙ্গীকার এই হাজার হাজার নারী রেখে গেলেন সমাজের বুকে, এই পথ হাঁটা, পথশ্রমে ক্লান্ত পা কিন্তু মনুষ্যত্বের উজ্জ্বলতায় ভাস্বর মুখগুলো, তাঁদের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশে-বাতাসে যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধ্বনি ছড়িয়ে দিয়ে গেল তা ব্যর্থ হতে পারে না। বলে গেল তাঁরা থামবেন না।
একটা যাত্রা শেষ হল রাস্তায়, এ বার এই অঙ্গীকার অনুরণিত হবে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মনের গভীরে, অনুরণন তুলবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিসে-কারখানায়-জমিতে সর্বত্র। সমাজে যে আলোড়ন তৈরি হল, তার রেশ থাকবেই। থাকবে এই অত্যাচারের বিপরীতে সামাজিক প্রতিরোধ হিসেবে। যে অঙ্গীকার সকলে নিলেন, তা রক্ষা করে তার মর্যাদা রক্ষার দায় এখন আমাদের সকলের।