
কেন্দ্রীয় সরকার পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশনে ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিক্ষণ বিল ২০২৫’ পেশ করেছে। এই বিল আইনে পরিণত হলে একটি নতুন কমিশন তৈরি হবে যা ইউজিসি, এআইসিটিই ও এনসিটিই-র মতো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলিকে অবলুপ্ত করে উচ্চশিক্ষার বেশিরভাগ অংশকে একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন করবে। এত দিন ইউজিসি-র দায়িত্বে ছিল সাধারণ উচ্চশিক্ষা, এআইসিটিই-র হাতে ছিল কারিগরি ও ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা এবং এনসিটিই দেখভাল করত শিক্ষক শিক্ষণের মান বজায় রাখার কাজটি। এই সমস্তই এই কমিশনের তত্ত্বাবধানে চলে যাবে। অর্থাৎ পরিপূর্ণ কেন্দ্রীকরণ। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (এনইপি) যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উপর এমন নিয়ন্ত্রণই চেয়েছিল। এনইপি-তে এমন কমিশন গঠনের আগাম বার্তা শোনানো ছিল।
এই নিয়ে দ্বিতীয় বার বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে আইন করল। প্রথম এসেছিল ২০১৮ সালে ইউজিসি-কে অবলুপ্ত করার উদ্দেশ্যে হায়ার এডুকেশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া বা ‘হেকি’ বিল। দেশজুড়ে শিক্ষাবিদরা সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন–ওই বিল আইনে পরিণত হলে উচ্চশিক্ষায় স্বাধিকার থাকবে না, শিক্ষার চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ হবে। সরকার বাধ্য হয় বিল প্রত্যাহার করতে। ২০২৫-এ তড়িঘড়ি নতুন আঙ্গিকে, আরও দাঁত-নখ পরিয়ে এই আইন করা হয়েছে।
২০১৮-র বিলে ছিল ইউজিসি বিলোপের অভিসন্ধি, ২০২৫-এ মুছে দেওয়ার তালিকায় যোগ হল আরও দুটি সংস্থা–এআইসিটিই ও এনসিটিই। অর্থাৎ আরও কেন্দ্রীকরণ। অন্য দিকে ইউজিসি-র হাতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অর্থ যোগানের দায়িত্ব ছিল, ২০১৮-র বিল এমনকি এনইপি-তেও তার স্বীকৃতি ছিল। যদিও আইন থাকলেও আর্থিক অনুদান ইউজিসি বাস্তবে বন্ধ করেছিল সরকারি নীতির কারণে। বাস্তবে এক বছর আগে ইউজিসি-র বাজেট হ্রাস হয়েছিল ৬১ শতাংশ। যাই হোক, ২০২৫-এ সরকার নতুন কমিশনের হাতথেকে খাতায়-কলমে থাকা আর্থিক অনুদানের অধিকার ছিনিয়ে নিল। সব থেকে বিপজ্জনক যে ক্ষমতা এই কমিশনের হাতে দেওয়া হল তা হল– তাদের নিয়মের মাপকাঠির সঙ্গে যদি সঙ্গতিপূর্ণ না হয় তা হলে কমিশন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধ করে দেওয়ার ফরমান জারি করতে পারবে। অর্থাৎ নতুন কমিশন কেবল ছড়ি ঘোরাবে, অনুদান দেবে না।
ছড়ি ঘোরানোর ফল পাওয়া যাচ্ছে হাতেনাতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মতো বিধিবদ্ধ সংস্থা যার সদস্য শিক্ষকরাই। বিশেষজ্ঞদেরই কাজ এটা। অথচ সরকার সেই দায়িত্ব ইউজিসি-র হাতে তুলে দিয়েছে। সম্প্রতি ইউজিসি গণিত, রসায়ন, বাণিজ্য, অর্থনীতি, ভূগোল, নৃতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের খসড়া পাঠ্যসূচি এমন রচনা করে পাঠিয়েছে যে অধ্যাপকদের মাথায় হাত। গণিতের পাঠ্যক্রমে আছে, জীববিজ্ঞানের জন্য গণিত, ধ্যানের জন্য গণিত, তিথি, নক্ষত্র এবং শুভ ও অশুভ মুহূর্তের নির্ণয় পদ্ধতি ইত্যাদি। পাঠ্যক্রম প্রণেতাদের মধ্যে গণিতের মূল বিষয়গুলিকে পাশে ঠেলে দিয়ে ‘ভারতীয় জ্ঞানধারা’-র নামে কিছু বুজরুকি প্রচারের প্রবণতা স্পষ্ট। সর্বোপরি আছে বৈদিক গণিত–যা আধুনিক যুগে চলে না। আরএসএস নেতা মোহন ভাগবতের হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণে হয়তো এই পাঠ্যক্রম সহায়ক হবে, কিন্তু শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ভেবে শিক্ষকরা উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগ থেকে গণিতের ৯০০ জন অধ্যাপক ইউজিসি-কে প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়ে লিখেছেন, পাঠ্যক্রমের বেশির ভাগই আদ্যিকালের এবং অবৈজ্ঞানিক যা আমাদের সভ্যতাকে শত বছর পিছিয়েদেবে। পড়ুয়ারা আধুনিক অঙ্কশাস্ত্রে অজ্ঞ থেকে যাবেন। অন্য বিষয়গুলির পাঠ্যক্রমও তথৈ বচ। নতুন কমিশনকে দিয়ে সরকার যে এমন কাজই করাতে চাইবে তা বলাবাহুল্য।
এনইপি স্নাতক কোর্স তিন থেকে চার বছরে বৃদ্ধির পর বিপত্তি বেড়েছে শতগুণ। ‘দক্ষতা-বৃদ্ধি’, ‘মূল্য-সংযোজিত’ প্রভৃতি অমূল্য (!) কোর্সের বাহানায় কোর বা প্রধান বিষয়গুলি পাঠ্যসূচির বাইরে চলে গেছে। পড়তে হচ্ছে, ‘সুখী হওয়ার কৌশল’, ‘ফিট-ইন্ডিয়া’, ‘সচ-ভারত’, ‘ব্যক্তিত্ব-বিকাশ’, ‘গরু-কল্যাণ’, ‘ব্রাহ্মণ-কল্যাণ’ ইত্যাদি বিষয়গুলি। এমনিতেই এক বছর বৃদ্ধি, তার উপর এমন বিষয়বস্তু-এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপর পড়ছে। তাঁরা কোনও আকর্ষণ বোধ করছেন না। প্রচণ্ড হতাশায় হয় তাঁরা কলেজে ভর্তি হচ্ছেন না বা ভর্তি হয়ে কলেজ-ছুট হচ্ছেন অথবা কলেজের খাতায় নাম লিখিয়ে ক্লাস-মুখো হচ্ছেন না। এক সময়ের গমগম করা শ্রেণিকক্ষগুলিতে ৫-৭ জন পড়ুয়াকে নিয়ে অধ্যাপক পাঠদান করছেন– শিক্ষার এমন ছন্নছাড়া চিত্র দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুর সারা দেশেরই।
পড়ুয়া ভর্তির ছবিটাও দেশজুড়ে বেশ করুণ। এ বছর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি ধাপে ছাত্র ভর্তি করেছে–একটি ‘স্পট রাউন্ড’, দুটি ‘মপ-আপ রাউন্ড’ ও একটি ‘স্পট মপ-আপ রাউন্ড’। তাতেও ৬৯টি কলেজের ৭১ হাজার আসনের ৫ হাজার আসন খালি আছে। অথচ পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা মাপকাঠি ছিল দ্বাদশের বোর্ড পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের ৯৮-৯৯ শতাংশ। এ সত্ত্বেও কলেজগুলি চাহিদার চাপে নিয়মিত ভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ভর্তি নিত। অথচ এখন শূন্যপদ পূরণ করতে ‘স্পট মপ-আপ রাউন্ড’ চালাতে হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছাত্রী-ভর্তি সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়া–২০২১ সালে ৬১ শতাংশ থেকে বর্তমানে ৫৪ শতাংশ। আবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় সিইউইটি পরিচালিত কেন্দ্রীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে স্নাতক স্তরে ভর্তি করা হয়, যা কোচিং নির্ভর, অর্থাৎ ব্যয়সাপেক্ষ। ফলে বিত্তশালীরা ছাড়া অন্যদের সুযোগ পাওয়া কঠিন। অন্য দিকে সিইউইটি-র ফল প্রকাশ দেরিতে হওয়ায় বেসরকারি অশোকা, আজিম প্রেমজি ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আগে ভর্তি হচ্ছেন। অর্থাৎ সিইউইটি বেসরকারি ব্যবস্থার সহায়ক হচ্ছে।
এ রাজ্যের তৃণমূল সরকার এনইপি চালু না করার দাবি করেছে, কিন্তু চার বছরের স্নাতক কোর্স চালু হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিধিবদ্ধ সংস্থাতে নতুন স্নাতক কোর্সের গুণগত মান বিচার না করে সরকারি ফরমানে তা চালু হয়েছে। এ রাজ্যের পড়ুয়া ভর্তির পরিসংখ্যানও হতাশাজনক। সরকারি ও সরকার-সহায়তা প্রাপ্ত কলেজগুলোতে স্নাতকে ৯ লক্ষ ৩৬ হাজার ২১৫টি আসন আছে। ভর্তির কেন্দ্রীয় পোর্টালে নিবন্ধন করেছিলেন ৪ লক্ষ ১ হাজার ৩০১ জন। ভর্তি হয়েছেন মাত্র ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭৭৭ জন, যা মোট আসনের মাত্র ২৮.৮১ শতাংশ। গত শিক্ষাবর্ষে ৪.৪৪ লক্ষ আসন পূরণ হয়েছিল। অর্থাৎ ভর্তি হারের নিম্নগামিতা চোখে পড়ার মতো। এ বছর ওবিসি মামলার অজুহাতে কেন্দ্রীয় পোর্টাল দেরিতে খোলায় বেসরকারি কলেজেই বেশি ভর্তি হয়েছে। ফলে মালিকদের মুখের হাসি চওড়া হয়েছে। অর্থাৎ পড়ুয়াদের উচ্চমূল্যের বেসরকারি ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য করছে বিজেপি তৃণমূল উভয় সরকার। শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকিকরণের রাস্তা আরও প্রশস্ত হচ্ছে, শিক্ষা হচ্ছে মহার্ঘ। ফলে উচ্চশিক্ষার আঙিনায় প্রবেশের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, যা কোনও ভাবেই বাঞ্ছিত হতে পারে না।