
কৃষ্ণনগরঃ শত বছরের শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরনো খুব কঠিন। অত্যাচারীদের তৈরি সব সমাজের নিয়ম এই বেড়ি ভাঙতে দেয় না। কিন্তু এই জমে থাকা ক্ষোভ যখন ঠিকরে বেরোয় তা হয় ‘বহ্নিশিখা’। বিদ্রোহী কবি নজরুল বলে গেছেন– ‘মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও শিকল“যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ “ দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ’। কবি নজরুল বেঁচে থাকলে এই নারীজাগরণ দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। পাহাড় থেকে সমতল চলেছে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার ‘অঙ্গীকার যাত্রা’। দেশে প্রতি ১৬ মিনিটে ১০০ জন মেয়ে ধর্ষিতা হয়। মনুষ্যদেহধারী একদল পশু ছিন্নভিন্ন করে কত নারীর দেহ। তাদের কান্না বাতাসে ভাসে। তাদের রক্তে ভেজা রাজপথের ওপর দিয়ে দৃপ্ত কন্ঠে হেঁটে যাচ্ছে এই সমাজের মায়েরা-বোনেরা, স্তম্ভেরা! এই যাত্রার একভাগ এখন দাঁড়িয়ে আছে কৃষiরনগরে, এক ঐতিহ্যমণ্ডিত শহরে। শহরের রাজপথ কম্পিত হচ্ছে স্লোগানে–প্রীতিলতার বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই, রাস্তা-বাড়ি-জনপদ/নারী হোক নিরাপদ, অভয়ার রক্তচোখ/অঙ্গীকারের মশাল হোক, ডাক দিয়েছে মা বোন/লড়াই হবে মরণপণ। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছেন অগণিত মানুষ, আছেন শ্রমজীবী মা-বোনেরা, বঞ্চিত নিপীড়িত তাঁরা, যাঁরা না থাকলে হয়তো এ সভ্যতা তৈরি হত না।
চোখে জল, মেয়ে কোলে মা দেখাচ্ছে– ‘মা, বড় হয়ে এদের মতো হোস’। কলেজফেরতা ছাত্রীরা দাঁড়িয়ে পড়ছে, দৃপ্ততার সাথে গলা মেলাচ্ছে– ‘ধর্ষকদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’! কত যন্ত্রণা জমা হলে গোটা রাজ্যের মেয়েরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জলে তাকিয়ে থাকে একটা মিছিলের দিকে। কৃষ্ণনগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে একজন অঙ্গীকার যাত্রীর সাথে আলাপ হল, উত্তরবঙ্গের এক গ্রাম থেকে এসেছে। জিজ্ঞেস করলাম– ‘আচ্ছা, মা ছাড়ল এত দিনের জন্য, এত দূরে’? চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিল, জমি যা ছিল, বাবা মদ খাওয়ার জন্য বিক্রি করে দিয়ে ওদের পথে বসিয়েছে। মায়ের উপর অকথ্য অত্যাচার ‘কেন মেয়ে হয়েছে’। ‘বোন আর আমাকে নিয়ে মা ঘর ছেড়েছে। কনস্ট্রাকশন সাইটে জোগাড়ের কাজ করে দিন চলে। মা বলেছে, যা অঙ্গীকার যাত্রায়, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবি না– এ হয় না। তুই যা’।
জীবনের কী গভীর উপলব্ধি! আজকের অঙ্গীকার এই সমাজকে নবাগত শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার। কৃষ্ণনগরের অঙ্গীকার মঞ্চ থেকে ভেসে এল– ‘আমি চাই এই সমাজে পুরুষেরা হোক সূর্যমুখী, মেয়েরা হবে ঝুমকো জবার ফুল। আর শিশুরা … শিশুরা হবে কমলা বোঁটায় ফুটে থাকা শিউলি’! আমরা চাই সবাই মুক্ত হোক, সমস্ত শৃঙ্খল ছিন্ন করে এক নতুন সূর্যের ভোর আনুক এ মিছিল। আমরা সবাই সেই আলোর পথযাত্রী।