Breaking News

স্কুলে সামরিক শিক্ষা ও সাতটি শিশুর গল্প


১৯৬৫-র ‘সাউন্ড অব মিউজিক’ সিনেমাটি হিটলারের প্রশ্নহীন আনুগত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিল। অজানা নয় যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেচনা, মানবিক মূল্যবোধগুলোকে দাবিয়ে রেখে কেবল ভয়ের পরিবেশ, কেবল অন্ধ হুকুম তামিল করা–যে সংস্কৃতির নাম ফ্যাসিবাদ, সিনেমাটি ছিল এই সংস্কৃতির বিপরীতে মনের গতি, বিশেষত শিশু মন নিয়ে অনন্য একটি শিক্ষণীয় প্রচেষ্টা।

 সিনেমার গল্পটা হল, জার্মানির অধীনস্থ অস্ট্রিয়া। অস্ট্রিয়ার প্রাক্তন নৌবাহিনীর অফিসার ক্যাপ্টেন ভন। তাঁর সাতটি সন্তান। স্ত্রী বিয়োগের পর কঠোর সামরিক নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে তিনি তাঁদের মানুষ করার চেষ্টা করছেন। তিনি এটাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে এটাই প্রয়োজন। হুইসল বাজার সাথে সাথেই তারা যে যেখানে, যে অবস্থায় থাকুক না কেন, যেন অ্যাটেনশন পজিশন নিয়ে তৎক্ষণাৎ হাজির হয়। ড্রিল, মার্চ, এক-দো-তিন-একের ছন্দে তাদের দিন শুরু হয়। সময় মতো খাওয়া, সময় মতো বিছানায় যাওয়া, ঘুম থেকে ওঠা, মেপে কথা বলা, মেপে পা ফেলা, সবকিছুই রুটিন মাফিক। কিন্তু মুশকিল হল, এইসব করেও দুদিনের বেশি কোনও গভর্নেসই এদের দেখভালের জন্য এই বাড়িতে টেকে না। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মাঝে, কী করে অপরকে জব্দ, হয়রানি করে আনন্দ পেতে হয় তা তারা বিলকুল আয়ত্ত করে ফেলেছে। শিশুর স্বাভাবিক চাহিদা অবদমিত হলে, কী বিচিত্র পথে তার গমন হয়, তা বোধকরি কোনও সহজ সমীকরণে আজও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। কারণ সে মানব শিশু।

অন্যদিকে তরুণী সন্ন্যাসিনী মারিয়া। সন্ন্যাসিনীদের মাঝে রুটিন মাফিক প্রার্থনায় বসা, মাপ মতো পোশাকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা, সংযমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠা তার দ্বারা যেন অসম্ভব। প্রাণ চঞ্চল মারিয়া মাঠের জীবনেও ছিল টাটকা বাতাস। তাকেই পাঠানো হল ক্যাপ্টেন ভনের সাত শিশুর ভার নিতে।

কিছুটা সংশয়, কিছুটা দ্বিধা অতিক্রম করে মনে পূর্ণ ভরসা সঞ্চয়় করে মারিয়া ওই জেলখানার মতো লোহার তোরণ পেরিয়ে প্রাসাদোপম ক্যাপ্টেন ভনের় এক্তিয়ারে প্রবেশ করে। ক্যাপ্টেন ভনের ব্যক্তিত্বপূর্ণ চোখে সাহসী চোখ রেখে মারিয়া বিনয়ের সাথে জানায়, হুইসল দিয়ে শিশুদের ডাকতে নেই। তারা কুকুর, বেড়াল বা অন্য প্রাণীদের মতো নয়। তারা মানবশিশু। তাদের আত্মমর্যাদা আছে। এই তার ভয়কে জয় করা শুরু। যে শিশুরা মারিয়াকে প্রথমে হয়রানি করেছে, তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, মানবমনের মর্যাদার কাছে নত হয়ে নির্মল ভালবাসায় তাদের ধীরে ধীরে জয় করেছে মারিয়া। এই পথেই পাথর চাপা চোরা স্রোতের পরিবর্তে স্বাভাবিক জীবন পায় শিশুরা। তারা ড্রিল, পিটির পরিবর্তে মাঠে বল নিয়ে খেলা করে। উন্মুক্ত প্রান্তরে খেলতে খেলতে গানের সা রে গা মা পাঠ লাভ করে। সুরের জগতে প্রবেশ করতে হলে যে বিজ্ঞান লাগে, যে ব্যাকরণ লাগে তা তারা অনায়াসেই আনন্দের সাথে শিখে ফেলে। নৌকা বাইতে বাইতে টাল সামলাতে না পারলেও জলের তরঙ্গের দোলা তারা অনুভব করতে পারে। প্রতিকূল পরিবেশেও শিখে নেয় জীবনের বিজ্ঞানসম্মত কঠিন পাঠ। যৌবনের উচ্ছWল আবেগ দ্বারা জীবনকে অমূলক ছড়িয়ে না ফেলে, সঠিক খাতে বইয়ে দেওয়ার মতো শক্তি অর্জন করে। তারা হয়ে ওঠে স্বতঃপ্রণোদিত দায়িত্বশীল সম্ভাবনাময়, ভালোবাসা ও মানবিক গুণাবলিতে পূর্ণ এক একজন ব্যক্তিত্ব। ক্যাপ্টেন ভনের কথাও এখানে না বললে নয়। মারিয়ার এই উচ্ছWল প্রকৃতির কাছে ক্যাপ্টেন ভনের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার শৃঙ্খলগুলো নিজের অজান্তে কখন খসে খসে খুলে পড়ে। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে মমত্বময় ও সত্যিকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক পুরুষ, যে প্রেমে পড়ে মারিয়ার। হিটলারের কঠোর, কঠিন এই জীবনকে দুঃসাহসে অতিক্রম করার সাহস সঞ্চয়় করে। অবশেষে ক্যাপ্টেন ভনকে দেখা যায় বাড়ির মাথায় লাগানো জার্মানির পতাকাকে খুলে দলা পাকিয়ে অবজ্ঞায় ফেলে দিয়ে এক দুঃসাহসিক অভিযানে সামিল হতে। স্ত্রী, সন্তানের মুক্ত জীবনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে তারা। হোক কঠিন পথ, হোক চড়াই উতরাই আর জীবনের চরম অনিশ্চয়তা। তাদের জীবন পূর্ণ হয়ে আছে প্রেম, ভালবাসা আর জীবনকে জয় করবার প্রত্যয়ে। জীবন তাদের সঙ্গীতের সুরের মতো বয়ে চলে। সাউন্ড অব মিউজিক।

এতক্ষণ মারিয়া, ক্যাপ্টেন ভন আর সাতটি শিশুর যে গল্প বর্ণিত হল, খুঁজে দেখা যাক আজকের সময়েও তা কতটা প্রাসঙ্গিক। অতি সম্প্রতি মহারাষ্ট্র সরকার প্রাথমিক স্কুলে শিশুদের দেশপ্রেম জাগানোর দোহাই দিয়ে সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আড়াই লক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হবে শিশুদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। এদের মধ্যে থাকবেন প্রাক্তন সেনা কর্মীরা। শিশুদের শেখানো হবে কল্পিত শত্রুকে কী ভাবে ঘায়েল করতে হয়, কী ভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়। কড়া নিয়ম, অনুশাসনের ঘেরাটোপে শিশুমন শিখে নেবে শৃঙ্খলা, সর্বোপরি দেশপ্রেম। অজানা শত্রু যেমন অজানা ভয় তৈরি করে, জীবনের প্রতি অনাস্থা, অবিশ্বাস তৈরি করে, তেমনি এর বিপরীতে, শত্রুকে বিনাশ করছি এই মনোভাবের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় ছদ্ম বীরত্ববোধ। সে প্রকৃতিকে চিনল না, সমাজকে জানল না, সামাজিক পরিবেশের কোথায় তার অবস্থান জানল না, দেশ কী জানল না, দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলনে বীর বিপ্লবীদের গৌরবগাথা জানল না, সমাজ-সভ্যতা দেশের প্রত্যেকটি ইট গাঁথা হয়েছে যে শ্রম আর মূল্যের বিনিময়ে তার কিছুই জানল না, অথচ প্রতিদিন শেখানো হবে দেশ বিপন্ন, তাই যুদ্ধ, তাই প্রশিক্ষণ। অথচ তারা জানবে না দেশের মানুষের দুর্দশার প্রকৃত কারণ কী? কেন কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী স্কুল ছেড়ে কাজের বাজারে নাম লেখায় তাদের কৈশোরেই। তারা যাতে এর কারণ না খোঁজে সে জন্য মনটাকেই মেরে দিতে। বিজ্ঞানভিত্তিক সিলেবাসের পরিবর্তে পুরনো ধ্যানধারণা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, যা অন্ধ কুসংস্কারের জন্ম দেবে তা সুকৌশলে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতির নামে, শিক্ষাকে আরও বৃত্তিমুখী করার কথা বলতে বলতে মৌলিক বিষয়ের গভীরে পড়াশুনা করার সুযোগ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যার পরিণামে মেশিন চালানো, সুইচ টেপা প্রভৃতি যান্ত্রিক কাজের পেশাদার কিন্তু চিন্তা শক্তিহীন, যুক্তিহীন, মানবিক মূল্যবোধহীন একদল রোবটের মতো মানুষ তৈরি হবে।

আমেরিকার এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি দেখে বহু আগে আইনস্টাইন বলেছিলেন, এই পদ্ধতি আসলে পূর্ণ বিকশিত মানুষের পরিবর্তে ‘ট্রেন্ড ডগ’ অর্থাৎ ‘সুশিক্ষিত কুকুর’ তৈরি করছে। যারা কেবল হুকুম তামিল করবে। কোনও প্রশ্ন করবে না। ভালো-মন্দ বিচার করবে না। তাদের কাছে দেশপ্রেমের মানে দাঁড়াবে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যেমন করে হিটলার উগ্র অন্ধতায় ইহুদি নিধন শুরু করেছিল, এরা মেতে উঠবে মুসলিম নিধনে। অন্ধভাবে খেপে উঠবে ‘পাকিস্তান’ নামক দেশের বিরুদ্ধে। চাকরি নেই কেন? বিভাজনের রাজনীতি কারা করে, কী জন্য করে? যুদ্ধ কেন হয়, কারা যুদ্ধ বাধায়? এ সব প্রশ্ন মনের মাঝে উঁকি যাতে না দেয় তার শেষ বন্দোবস্ত বোধহয় শিক্ষায় সামরিক প্রশিক্ষণের এই নিদান। সামাজিক এই সমস্ত বাধা পেরিয়ে চুঁইয়ে পড়া শিক্ষার যতটুকু তলানি এসে ঠেকছিল প্রান্তিক শিশুদের কাছে, তার ভিত্তিতে যতটুকু বিকাশের সম্ভাবনা আজও টিকে ছিল, মাঠের সামরিক শৃঙ্খলা, কঠোর অনুশাসনে ঘেরা প্রশিক্ষণে তার সম্ভাবনা শুধু মুছে যাবে নয়, একদল ট্রেন্ড রোবট তৈরি হবে। দেশের শাসকেরা তাই চায়। ২০২১ সালে কেন্দে্রর বিজেপি সরকার তাই বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে একশোটি নতুন সৈনিক স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এই স্কুলগুলির পরিচালনার ভার পাবে বিজেপির নেতা বা সংঘ ঘনিষ্ঠরা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, শিক্ষার কফিনে শেষ পেরেক পুঁততে এই নয়া কৌশল। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রী বাই ফুলে, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সত্যেন বোস প্রমুখ মনীষীদের শিক্ষাচিন্তার বিপরীতে এই শিক্ষা নীতি, শিক্ষা কৌশল। জীবনের আনন্দ, জীবনের মূল সুরটি হারিয়ে শিশুরা, সর্বোপরি দেশ আজ প্রকৃতই বিপন্ন দেশ মানে তো কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, দেশ মানে এ দেশের ভূ-প্রকৃতি, জল-মাটি-বাতাস, পাহাড়-জঙ্গল-নদী। দেশের লুঠেরাদের হাত থেকে এ সবেরও রেহাই নেই। দেশ মানে দেশের আপামর মানুষ। সর্বোপর়ি মানুষের মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার।