
‘সীমান্ত’ কথাটা শুনলেই চোখের সামনে ভাসে কাঁটাতারের বেড়া, সেনাবাহিনীর কড়া নজরদারি, গুলি-গোলা-সংঘর্ষের ছবি। কোনও কারণে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে সংবাদমাধ্যমে, আলাপচারিতায় প্রতিনিয়ত উঠে আসে সীমান্ত, নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশের মতো শব্দগুলো। অথচ যে মানুষগুলোর নিত্যদিনের বাস, রুজি-রোজগার এই সীমান্তে, তাঁদের জীবনটা কেমন? সে জীবনের নিরাপত্তাই বা কতটুকু? পহেলগামের নারকীয় ঘটনার পরে যখন দেশের সর্বত্র রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ উন্মাদনার ঢেউ, তখন সমাজমাধ্যমে ঘুরে ফিরে আসছিল একটি পুরোনো অথচ প্রাসঙ্গিক আপ্তবাক্য– ‘যারা যুদ্ধ চায় তারা যুদ্ধে যায় না, যারা যুদ্ধে যায় তারা যুদ্ধ চায় না।’ পহেলগাম পরবর্তী চার দিনের ভারত-পাক সংঘর্ষে দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের যে সব মানুষের জীবন নতুন করে তছনছ হয়ে গেল, কিংবা ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইজরায়েলের লাগাতার হামলা সর্বস্বান্ত হলেন যাঁরা, তাঁরা কি এই যুদ্ধ চেয়েছিলেন?
উনিশ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে কাশ্মীরের সীমান্তে পাল্লানওয়ালা গ্রামে এসেছিলেন কমলকুমারী। বহু অলস দুপুর-বিকেলে একা বসে কমল ভাবতেন, ওই যে সীমান্তের ওপাশে অন্য দেশের মানুষগুলো, যাদের আজানের সুর, বিয়ে বা অন্য উৎসবের শব্দ এপারে শোনা যায় প্রায়শই, তাঁদের জীবনটাও কি এমন বিপদসঙ্কুল? ওদেরও যখন তখন লুকিয়ে পড়ার জন্য বাঙ্কার আছে? যুদ্ধ লাগলেই ওদেরও ঘর ছেড়ে পালাতে হয় প্রাণ হাতে নিয়ে? কার্গিল যুদ্ধের পর কমল কুমারীদের গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। এবারের যুদ্ধের সময় কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁরা রাতে ঘরে থাকার সাহস পাননি, দশ কিলোমিটার পথ উজিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাত কাটাচ্ছিলেন, সেই কারণেই অন্তত প্রাণটুকু রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু বোমার আঘাতে ঘরের ছাদ ভেঙে পড়েছে, যে ঘর ২০১৪ সালেই নতুন করে তৈরি করেছিলেন তারা। সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কমল বলেন, ‘যুদ্ধ যুদ্ধ করে যারা চিৎকার করছে, যুদ্ধ কী ভয়ানক জিনিস তারা জানে না। চোখের সামনে প্রিয়জনকে আহত হয়ে পড়ে যেতে দেখা, বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া– যুদ্ধের এই ভয়াবহতা তারা দেখেনি।’ কমলের পরিবার প্রাণে বাঁচলেও সেই সৌভাগ্য সবার হয়নি। রাজৌরিতে মারা গেছেন তিন জন, যার মধ্যে ছিলেন বিহারের এক বাসিন্দা এবং তার দু’ বছরের শিশুকন্যা। পুঞ্চ এলাকায় উনিশ বছরের কিশোরী আফরিনের চোখের সামনেই বোমার টুকরো ঢুকে গেছে তার বাবার বুকে। বাবা পড়ে যাওয়ার আগে মেয়েকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই আফরিনের প্রাণটা বেঁচেছে। কিন্তু হাতে, মাথায় বোমার অংশ ঢুকে মারাত্মক আহত হয়েছে সে। আফরিনের বাবা বছর চল্লিশের আক্রম ছিলেন শ্রমিক, পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল মানুষ। সুস্থ সবল মানুষটি সবার চোখের সামনে এক মুহূর্তে এভাবে নেই হয়ে গেলেন, এখনও ভাবতে পারছেন না আক্রমের স্ত্রী ফরিদা। আফরিন সহ ছয় সন্তানকে নিয়ে আগামী জীবনটা কেমনভাবে চলবে, সবটাই অন্ধকার তার কাছে। রোজকার মতোই মাদ্রাসায় যাবেন বলে ৭ মে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন পুঞ্চের আরেক বাসিন্দা মহম্মদ ইকবাল। ফিরেছে তাঁর প্রাণহীন দেহ। এই আকস্মিক আঘাতে বিপর্যস্ত তাঁর পরিবার যখন মানুষটির শেষকৃত্যে ব্যস্ত, তখনই তাঁরা খবর পেলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইকবালের ছবি দিয়ে তাঁকে সেনার হামলায় নিহত পাকিস্তানি জঙ্গি বলে দাবি করা হচ্ছে। পুঞ্চ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ইকবাল ছিলেন স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক, শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে এলাকার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। এমন একজনের নামে এত বড় মিথ্যে অপবাদ কী করে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করল, ভেবে পাচ্ছেন না ইকবালের ভাই, প্রিয়জনেরা। পরে পুঞ্চের পুলিশ বিবৃতি দিয়ে জানায় যে ইকবাল কোনও সন্ত্রাসবাদী ছিলেন না, একটি চ্যানেলও তাদের ভুল স্বীকার করে। কিন্তু ততক্ষণে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর ছবি দিয়ে সন্ত্রাসবাদী নিধনের ভুয়ো খবর। এই মিথ্যা প্রচারের ক্ষত ইকবালের মৃত্যুশোকের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তাঁর পরিবারের কাছে। ইকবালের ভাই বলেছেন, ‘সারা জীবন আমার দাদা ভারতে থাকলেন, মাদ্রাসায় পড়ালেন। আর মৃত্যুর পর দাড়ি আর টুপি দেখে ওরা তাঁকে সন্ত্রাসবাদী বানিয়ে দিল’! উরিতে মৃত্যু হয়েছে এক মহিলার, আহত হয়েছেন ১৫ জন, পঞ্চাশটিরও বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মা-বাবা সন্তানকে নিয়ে মাটির তলার বাঙ্কারে লুকিয়েছেন, কেউ প্রাণ হাতে করে ছুটেছেন, তাতেও নিজেদের দেহ আর জামাকাপড় ছাড়া কিছুই রক্ষা করতে পারেননি। কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখের সামনে গুঁড়িয়ে গিয়েছে বহু কষ্টে গড়ে তোলা বাড়ি, মাটির তলায় ধূলো হয়ে মিশে গেছে ঘর-গেরস্তালি-বিছানাপত্র সবকিছু। অসংখ্য শিশু-কিশোরের মনে এই যুদ্ধ যে ভয়াবহ আতঙ্ক, মানসিক বৈকল্য তৈরি করছে, কোনও যুযুধান দেশের সরকারি নেতামন্ত্রীরা কি তার দায় নেবেন?
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই হামলা এবং পাল্টা হামলায় সীমান্ত এলাকার দশ হাজারেরও বেশি বাড়ি গুঁড়িয়ে গিয়েছে। পুঞ্চ, রাজৌরি, বারামুলার মতো সীমান্তের গ্রামগুলো সবচেয়ে ভয়ানক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু পুঞ্চেই নব্বইটি পঞ্চায়েতের মধ্যে ষাটটি পঞ্চায়েতের হাজার হাজার বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, স্থানীয় সাংসদ ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন। কিন্তু এ দেশের সাধারণ মানুষ জানেন, ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের ধ্বংসে তাঁদের ক্ষতি যতখানি নিশ্চিত, সরকারি ক্ষতিপূরণ জিনিসটা ততটাই অনিশ্চিত এবং অপ্রতুল।
শুধু ভারত অধিকৃত কাশ্মীর নয়, ক্ষতি হয়েছে পাঞ্জাব সীমান্তেও। ৭ মে-র বোমাবর্ষণে পাঞ্জাবের ভাতিন্দায় মারা গেছেন হরিয়ানার এক শ্রমিক এবং আহত হয়েছেন আরও ন’জন। কাশ্মীরের কমলের সুরেই ফিরোজপুরের দোকানি নিশান্ত সিং বলেছেন, ‘যুদ্ধ কারও ভালো করে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথাই ভাবুন। এই যুদ্ধ যে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলবে, কেউ ভাবতে পেরেছিল? যুদ্ধ হোক, কখনোই চাইব না। একটা যুদ্ধ পাঁচ দিনে শেষ হবে, না পাঁচ বছর চলবে কেউ জানে না।’ এই অনুভব আসলে দুই দেশের অসংখ্য সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের উচ্চারণ, যুদ্ধের সাথে যাদের জীবনের কোনও সরাসরি সংযোগ নেই, অথচ রাষ্টে্রর ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই বারবার যাদের জীবন-জীবিকাকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
পহেলগামের জঙ্গি হামলায় যে ছাব্বিশটি প্রাণ ঝরে গিয়েছে, তাঁদের মতোই সীমান্তের এই মানুষগুলোও ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। অথচ এই বাইশজনের মৃত্যু, আরও অসংখ্য মানুষের আহত হওয়া, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি খুব কমই এসেছে খবরে। পহেলগামের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছিল, কাশ্মীরের মতো সেনাবাহিনী অধ্যুষিত জায়গায় এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল কী করে? দেশের গোয়েন্দাবিভাগ, প্রতিরক্ষা দপ্তর কিছুই টের পেল না, এও কি সম্ভব? একেবারে কিছুই না জেনে থাকলে প্রধানমন্ত্রীর ১৯ মে-র কাশ্মীর সফর হঠাৎ বাতিল হল কেন? যে দেশে বছর বছর প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানো হচ্ছে, সে দেশে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার এই হাল কেন? ভারত-পাক যুদ্ধ এর আগেও হয়েছে, অথচ তাতে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ কিছুই দমন করা যায়নি। এবারেও রাষ্ট্রনায়করা যতই অভিযান চালিয়ে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করেছেন বা একে অন্যকে জব্দ করেছেন বলে দাবি করুন, পহেলগামের একজন জঙ্গিও আজ পর্যন্ত ধরা পড়েনি। অথচ ওই জঘন্য অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে সাজা দেওয়াই ছিল দেশের মানুষের একমাত্র দাবি। পহেলগামে নিহত শৈলেশ কালাথিয়ার স্ত্রী শীতল বলেছিলেন, ‘সরকার আমাদের মাইনে থেকে ট্যাক্স কেটে নেয়, সব জায়গায় আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিই। অথচ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিরাপত্তা পান শুধু বড় ধনীরা। যখন আমার স্বামীর নিরাপত্তার দরকার ছিল, তখন কেউ এল না। আসলে এখানে নেতা-মন্ত্রীদের জীবনেরই দাম আছে, সাধারণ মানুষের জীবন মূল্যহীন।’
সীমান্তে এতগুলো মানুষের মৃত্যু এবং সাধারণ মানুষের জীবনের এই বিপুল ক্ষতিও আবার সেই প্রশ্নগুলোই তুলে দিল। এই দুর্ভোগ কি অনিবার্য ছিল? সরকার কি সীমান্তের সংঘর্ষপ্রবণ অঞ্চলের নাগরিকদের দায়িত্ব নিয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারত না? বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছিলেন, পাকিস্তানকে জানিয়েই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাঁর এই মন্তব্য নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। অথচ সীমান্ত এলাকায় এ দেশের যে মানুষগুলো বছরের পর বছর যুদ্ধের আতঙ্ক নিয়ে বাঁচেন, বারবার যাঁদের ঘর ভেঙে যায়, প্রিয়জনের মৃত্যু ঘটে, যুদ্ধ শুরুর আগে তাঁদের নিরাপত্তার কথা সরকার আদৌ ভাবল না। পাকিস্তানের মাটিতেও নিশ্চিত ভাবে এমন বহু নিরপরাধ মানুষ স্বজন হারিয়েছেন, হারিয়েছেন কষ্টার্জিত সম্পদ। দু’দেশের রাষ্ট্রনায়করাই পরস্পরকে সবক শেখানোর আনন্দে মেতে আছেন, কিন্তু দু’পারের এই সাধারণ মানুষগুলোর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির হিসেব কেউ নিল না।
এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ উপন্যাসে যুদ্ধের মাটিতে দাঁড়িয়ে এক তরুণ সৈনিক একটু একটু করে টের পেয়েছিল, শত্রুপক্ষের সৈনিকেরা বা অন্য দেশের সাধারণ মানুষ কেউ আসলে তার শত্রু নয়, তারা তারই মতো বিপন্ন, যুদ্ধবাজ শাসকের অসহায় শিকার। সময়, স্থান-কাল পাল্টে গেলেও পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ায় প্রাণঘাতী যুদ্ধের এই সার সত্য পাল্টায় না। এখানেই পহেলগামের বিধবা শীতল, পুঞ্চের পিতৃহারা আফরিন, পঞ্জাবের সুখবিন্দরের ছেলে যশবন্তের চোখের জল আর জীবনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা বারবার মিলে মিশে যায়। কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে, কখনও জঙ্গি হামলায়, কখনও যুদ্ধে, কখনও পাল্টা প্রত্যাঘাতে বারবার সব হারাতে হারাতে সাধারণ মানুষ টের পান, খিদে আর রুজিরুটির লড়াইয়ের আসলে কোনও সীমান্ত নেই।
(তথ্যসূত্রঃ দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দি হিন্দু- ১৭মে)
এই লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৪৭ সংখ্যা ৪ – ১০ জুলাই ২০২৫ এ প্রকাশিত