
প্রধানমন্ত্রী মোদিজি ঘোষণা করেছেন, কৃষকদের স্বার্থ বিপন্ন করে মার্কিন সরকারের সাথে তিনি চুক্তিতে সই করবেন না। করবেন না, কারণ, ট্রাম্প ও মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে ঢুকতে চাইছে। আর ঢুকতে পারলে ভারতের কৃষকদের সর্বনাশ হবে। এত বড় সর্বনাশ তিনি দেশের কৃষকদের হতে দিতে পারবেন না।
চারিদিকে ধন্য ধন্য রব। হিন্দুত্ববাদীরা উদ্বাহু নৃত্য জুড়ে দিয়েছেন। সগর্বে বলছেন, বুকের পাটা দেখেছ! ট্রাম্পের মুখের উপরে একেবারে না বলে দিল। এই তো দেশপ্রেম! আর এর জন্যই তো ডেয়ারি শিল্পের সাথে যুক্ত ৮ কোটি কৃষক বেঁচে গেল। সাব্বাস মোদিজি সাব্বাস!
গোদি মিডিয়ার প্রচারের এত সব ঢক্কানিনাদ সত্ত্বেও সব প্রশ্ন কিন্তু চাপা পড়ছে না। আর সেই সব প্রশ্নগুলি নিন্দুকের অপবাদ বলেও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সরিয়ে দেখলে বেশ কিছু প্রশ্ন চোখে পড়বে। প্রশ্ন উঠছে, যে মোদিজি ও তাঁর সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের পথ অনুসরণ করে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি পুঁজির অবাধ অনুপ্রবেশের রাস্তা খুলে দিয়েছে, যাঁরা সার-বীজ-তেল তুলে দিয়েছে মার্কিন বহুজাতিক পুঁজির হাতে, যাঁরা দেশের জল-জঙ্গল-জমি ও সমগ্র বিপণন ব্যবস্থা দেশি-বিদেশি পুঁজির হাতে তুলে দিচ্ছে, যাঁদের কালা কৃষিনীতি প্রতিরোধ করার জন্য ৭৩৬ জন কৃষককে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে, এই সেদিনও যাঁরা ব্রিটেনের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে ভারতকে ব্রিটিশ বহুজাতিক পুঁজির কৃষিপণ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে– তাঁরা হঠাৎ কৃষক দরদি হয়ে উঠলেন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় আদাজল খেয়ে নেমে পড়লেন– এ কথা কি বিশ্বাস করা যায়?
প্রশ্ন উঠছে, যদি মোদিজি ও তাঁর সরকার সত্যিই কৃষকদরদি হত, তা হলে তো তাঁরা ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য তথা এমএসপি চালু করতেন, কৃষকের সমস্ত কৃষিঋণ মকুব করে দিতেন, খেতমজুরের সারা বছর কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। কই এ সব করার কথা তো ওরা ভাবছে না। বরং ওদের রাজত্বে কৃষক সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যার বেদনাদায়ক পথ গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কৃষকের শুভ চিন্তায় মোদিজি ব্যাকুল, এমন প্রমাণ তাঁর এগারো বছরের রাজত্বে পাওয়া যায়নি। এই প্রশ্নে দেশের কৃষকদের অভিজ্ঞতা ভয়ঙ্কর তিক্ত, এতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে কৃষক দরদ একটা বাহানা। আসল কারণ ‘অন্য কোথা, অন্য কোনও খানে।’ কী সেই কারণ?
ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের বাজারে রাশিয়ার তেল বিক্রির পরিমাণ কমতে থাকে। ফলে রাশিয়া দেশে দেশে তেল বিক্রি করার জন্য নতুন খদ্দের খুঁজতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজার দরের তুলনায় ব্যারেল প্রতি দাম কমিয়ে দেয় ৫ থেকে ৩০ ডলার। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে চিন, ভারত ও তুরস্ক।
ভারত মানে শুধু ভারত সরকার নয়, ভারতের বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলিও– বিশেষ করে আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডিয়ার রিলায়েন্স মবিলিটি লিমিটেড কোম্পানি। এরা রাশিয়ার থেকে সস্তায় তেল আমদানি করে, এ দেশের শোধনাগারে সেই তেল শোধন করে ইউরোপ আমেরিকার বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে।
গত বছর ওরা গুজরাটের জামনগর রিফাইনারিতে রাশিয়া থেকে আমদানি করা তেল শোধন করে ইউরোপে বিক্রি করেছে। বিক্রি করেছে ২০০ কোটি ডলার মূল্যের তেল। আর এই প্রক্রিয়ায় গত বছর লাভ করেছে ৬৮৫০ কোটি টাকা। (হিন্দুঃ ১৮ মার্চ, ২০২৫) ফলে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ হলে ক্ষতি হবে কার? ক্ষতি হবে, যাদের সেবায় মোদিজিরা জীবন মন সমর্পণ করেছেন, সেই আম্বানিদের। মোদিজি কি তা সহ্য করতে পারেন?
প্রসঙ্গত আর একটা কথা বলা দরকার। সস্তায় রাশিয়া থেকে তেল আমদানি শুরু হয়েছে ২০২২ সাল থেকে। কিন্তু দেশে পেট্রল ডিজেলের দাম কী কমেছে? কমেনি। বরং বেড়েছে। তাই, এ কথা পরিষ্কার, সস্তায় রাশিয়া থেকে তেল আমদানির সাথে এ দেশের জনগণের স্বার্থের কোনও সম্পর্ক নেই। লাভের সব গুড় যাচ্ছে আম্বানির পেটে। তাই, রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ হলে ভারতের বহুজাতিক পুঁজির ক্ষতি। এই ক্ষতি কি মোদিজি হতে দিতে পারেন? তাই এত নর্তন-কুন্দন, এত ট্রাম্পবিরোধী জেহাদ। এটা আসলে দরকষাকষির অংশ। কৃষি এবং ডেয়ারির বাজার না খোলার হুমকি দিয়ে তেলের ক্ষেত্রে ছাড় আদায়ের চেষ্টা। যদিও ইতিমধ্যেই ভারতের কৃষি ও ডেয়ারি বাজারে ভারতীয় ও বিদেশি একচেটিয়া মালিকদের যথেষ্ট ছাড় দেওয়াই আছে। সাধারণ কৃষকদের জন্য কিন্তু সরকারের কোনও মাথাব্যথা নেই।
আসলে ট্রাম্প যেমন সংকটগ্রস্ত মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় দুনিয়ার বুকে যুদ্ধব্যবসা ফেরি করছেন, শুল্ক চাপাচ্ছেন। মোদিজিও তেমনি সংকটগ্রস্ত ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষায় নানা দরজায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। এ হল আন্তর্জাতিক লুটের বাজারে সাম্রাজ্যবাদী ভাগ বাটোয়ারার খেলা। ডাকাত দলের মধ্যে মারামারি। এর সাথে দেশের কৃষকের স্বার্থের সম্পর্ক নেই।