
এই রাষ্ট্রযন্ত্র বলতে আমরা কী বুঝি? মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্র আর সরকার এক নয়। একটা গোলমাল এখানে সব সময় সৃষ্টি করে রাখা হয়। বোঝানো হয়, যেন সরকারই সব। যেন সরকারটা দখল করতে পারলেই রাষ্ট্রটাকে যেমন খুশি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। বলা হয়, যত নষ্টের মূলে রয়েছে সরকারে থাকা ওই সব বদ লোকগুলো। ওদের হটিয়ে দিয়ে যদি আমাদের মতো ভাল লোকেরা সরকারে যেতে পারি তবেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিপ্লব-টিপ্লবের হাঙ্গামার আর দরকার নেই। এ ধারণার মধ্যে না আছে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ, না আছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে সঠিক ধারণা। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা, অথবা ইচ্ছাকৃত ভাবে রাষ্ট্রের প্রশ্নকে, তাকে উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিকে লঘু করে দেখা এবং মানুষকে ভোটের রাজনীতিতে আটকে রাখা। আপনাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের প্রশ্নকে বাদ দিয়ে কোনও বিপ্লবী আন্দোলন ভাবাই যায় না। এই যে শোষণমূলক ব্যবস্থা আমাদের দেশে টিকে রয়েছে, একে টিকিয়ে রেখেছে একটা রাষ্ট্রযন্ত্র। রাষ্ট্রের তিনটি শাখা, অর্থাৎ তিনটি স্তম্ভ– মিলিটারি, পুলিশ সহ আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা, আর বিচারবিভাগ। এই তিনটিই রাষ্ট্রের স্থায়ী সংস্থা। ইলেকশনের দ্বারা সরকার পাল্টালেই এগুলো পাল্টায় না। সমঝোতা করে সরকার পাল্টালেও এগুলো যায় না। ক্যু করে সরকার পাল্টালেও যায় না। এর একটা কি দুটো ব্যক্তি এ-দিক ও-দিক হতে পারে মাত্র। রাষ্ট্র হচ্ছে অনেকটা যন্তে্রর মতো। আর সরকার হচ্ছে সেই যন্তে্রর পরিচালক, ইঞ্জিনিয়ার, অপারেটার বা মিস্ত্রি। এক একটা বিশেষ রাষ্ট্রযন্ত্রের ধরনধারণ, কায়দাকানুন, মানসিক ধাঁচা, নিয়মকানুন, চলবার রীতিনীতি– তার তিনটি স্থায়ী সংস্থা নিয়ে এক ধাঁচে বাঁধা। যেমন করে একটা মেশিন, তার বিভিন্ন পার্টস একটা নিয়মে জোড়া দেওয়া হয় এবং একই নিয়মে কাজ করে। অপারেটারকে সেই নিয়ম মেনে কাজ করতে হয়। সেই মেশিন দিয়ে সে অন্য কাজ করতে পারে না। যেমন একটা কাপড়ের কল, সে শুধু কাপড়ই বুনবে। অপারেটার ভাল হলে, বা তাঁতি ভাল হলে, ভাল কাপড় বুনবে অল্প সময়ে। তাঁতি খারাপ হলে, অজ্ঞ হলে কম কাপড় বুনবে, সময় নেবে অনেক। এইটুকু মাত্র পার্থক্য।
ঠিক সেই রকম পুঁজিবাদী রাষ্ট্র়যন্ত্র দিয়ে পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থায় শোষণ করাই সম্ভব। শোষণটা মিষ্টি করে করবে, সহ্য করিয়ে করিয়ে নিয়ে করবে, এবং শোষণটা করবার সময় তারই সঙ্গে মলম মাখাতে থাকবে কি না, সেটা আলাদা কথা। একদল শোষণ করে চাবুক ঘুরিয়ে, আর একদল শোষণ করে, আবার তারই সঙ্গে যাদের শোষণ করে তাদের একটু ডাব খাওয়ায়, কমলালেবুর রস খাওয়ায়, মাখন খাওয়ায়। কিন্তু শোষণটা ঠিকই করে যায়। আর শোষণ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলে, এই যে এত ডাব খাওয়াচ্ছি, এত ফলের রস খাওয়াচ্ছি, বুঝতে পারছেন না, কত ভালবাসি আপনাদের। আমি তো চেষ্টা করছি। কী করব, পারছি না। একটু সময় লাগবে। আর একটু সময় দিন।
এই করে করে দুশো বছর ব্রিটিশের অধীন ভারতবর্ষের জঞ্জাল হটাতে কংগ্রেস সাতাশ বছর পার করে দিল। আবার কংগ্রেসকে হটিয়ে যাঁরা আসবেন, তাঁরা আরও পনেরো-কুড়ি বছর নেবেন, আর আপনাদের ক্রমাগত জানিয়ে যাবেন– কী করব বলুন, কংগ্রেস তো সব শেষ করে দিয়ে গেছে, আমাদের সামলে উঠতে একটু সময় দিন। এর পর অন্য কেউ এলে একই ভাবে বলবে।
এই ভাবে সময় চলেই যাচ্ছে। জনসাধারণের অবস্থার কোনও বদল ঘটছে না। শোষণের জগদ্দল পাথরটা আরও শক্ত হয়ে চেপে বসছে। ফলে পুঁজিবাদী উ×ৎপাদন-সম্পর্ক ও পুঁজিবাদী উৎপাদনের উদ্দেশ্য থেকে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যদি মুক্ত করতে হয়, তা হলে বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে বিপ্লবের আঘাতে উচ্ছেদ করাই হচ্ছে তার একমাত্র পথ।
(নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতি নয় বিপ্লবী আন্দোলনই মুক্তির পথ)