Breaking News

কমরেড মৃণাল দত্তের জীবনাবসান

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর রাজ্য কমিটির সদস্য এবং নদিয়া জেলার পূর্বতন সম্পাদক কমরেড মৃণাল দত্ত দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৩ মার্চ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

মৃত্যুসংবাদ পেয়ে দলের নদিয়া জেলার সর্বস্তরের অসংখ্য কর্মী-সমর্থক তাঁকে শেষ বারের মতো দেখতে আসেন। মরদেহ দুপুরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিহীন ও মূক-বধিরদের স্কুল ‘হেলেন কেলার স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে’। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মী সহ স্কুল পরিচালন কমিটির সদস্য ও বহু সাধারণ মানুষ সেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। বেলা ৩টায় তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় পল্লীশ্রীতে দলের অফিসে। সেখানে দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষের পক্ষে কমরেড মৃণাল দত্তের মরদেহে মাল্যদান করেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড নভেন্দু পাল। মাল্যদান করেন পলিটবুরো সদস্য কমরেড সৌমেন বসু, পলিটবুরো সদস্য ও রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী সদস্য কমরেড সান্টু গুপ্ত, নদিয়া উত্তর সাংগঠনিক জেলা কমিটির ইনচার্জ হররোজ আলি শেখ, নদিয়া দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলা কমিটির সম্পাদক অঞ্জন মুখার্জী সহ দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও অসংখ্য কর্মী-সমর্থক। দলীয় অফিস থেকে শহরের পোস্টঅফিস মোড় পর্যন্ত শেষযাত্রায় তাঁরা অংশগ্রহণ করেন। নবদ্বীপ শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

শৈশবে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর ১০ বছর বয়সে কমরেড মৃণাল দত্ত নরেন্দ্রপুর ব্লাইন্ড বয়েজ অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি দৃষ্টিহীনদের সংগঠন ‘ব্লাইন্ড পার্সনস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি তাঁর শিক্ষক শিবব্রত সেনগুপ্তর মাধ্যমে সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তার সংস্পর্শে আসেন এবং ছাত্র সংগঠন এআইডিএসও-র সাথে যুক্ত হন। তিনি তখন এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) দলের প্রতিও আকৃষ্ট হন। নরেন্দ্রপুরে পড়ার সময় সেখানকার নানা প্রাতিষ্ঠানিক বাধানিষেধ অতিক্রম করে তিনি দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান ছাত্রদের কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তার সংস্পর্শে নিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। স্বচ্ছন্দে কথা বলার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকায় তিনি তাঁর সমস্তরের এবং জুনিয়রদের সাহায্য নিয়েও নতুন যোগাযোগদের কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা করতেন।

১৯৭২ সালে তিনি কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র কংগ্রেস এবং কলেজে কলেজে ছাত্র পরিষদের ভয়াবহ সন্ত্রাসের পরিবেশ। কমরেড মৃণাল দত্ত সেই ভীতি ও সন্ত্রাসকে উপেক্ষা করে কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজে ছাত্র সংগঠন এআইডিএসও গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে বহরমপুরে অনুষ্ঠিত এআইডিএসও-র রাজ্য সম্মেলনে এবং ১৯৭৪ সালে সংগঠনের সর্বভারতীয় সম্মেলনে তিনি কৃষ্ণনগর থেকে বেশ কিছু ছাত্রকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। ১৯৭৫ সালে বীরভূমের সিউড়িতে ঐতিহাসিক যুব সম্মেলনে তিনি বহু ছাত্র যুবককে নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ছাত্র সংগঠনে কাজ করার সাথে সাথে কৃষ্ণনগরে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর সংগঠন গড়ে তোলার কাজেও তিনি মনোনিবেশ করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কৃষ্ণনগর শহরে স্থানীয় ছাত্র ও যুবকদের নিয়ে দলের ইউনিট গড়ে তুলতে সফল হন।

নদিয়া জেলায় সেই সময়ে নানা স্থানে গড়ে ওঠা দলের সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে জেলাভিত্তিক কাজ শুরু হয়। দলের সংগঠন গড়ে তোলার সেই কাজে যেমন অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন, তেমনি প্রতিবন্ধীদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর সংগ্রামও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দৃষ্টিহীনদের শিক্ষার জন্য তিনি কৃষ্ণনগরে হেলেন কেলার স্মৃতি বিদ্যামন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন। মূক ও বধিরদের জন্য সেই বিদ্যালয়ের শাখা গড়ে তোলার কাজটিও তিনি করেছেন।

১৯৭২-৭৩ সালে তিনি কৃষ্ণনগরে অগ্নিবীণা সাংস্কৃতিক সংস্থা গঠন করেন। বহু ছাত্র-যুবক এই সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে মহান সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের জন্ম শতবার্ষিকীতে নদিয়া জেলায় ‘শরৎ শতবার্ষিকী কমিটি’ গঠনে, বিশেষত কৃষ্ণনগর শহরের শিক্ষাবিদ বুদ্ধিজীবীদের এই কমিটিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে কমরেড মৃণাল দত্তের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরই ধারাবাহিকতায় অগ্নিবীণা সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক ব্যাপ্তিও বৃদ্ধি পায় এবং অগ্নিবীণা নাট্যগোষ্ঠী গঠন, ‘অগ্নিবীণা’ সাংস্কৃতিক পত্রিকা প্রকাশ সম্ভব হয়। ১৯৮৯ সালে শহিদ ক্ষুদিরাম জন্মশতবার্ষিকী কমিটির নদিয়া জেলা সম্পাদক হিসাবে বর্ষব্যাপী নানা কর্মসূচি রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর গানের গলা ছিল খুবই ভাল। নিজে বেশ কিছু গান রচনা করে সুর দিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিদ্যুৎসংকট, প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি ও পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়া, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বাসভাড়া বৃদ্ধি প্রভৃতির বিরুদ্ধে এসইউসিআই(সি)-এর নেতৃত্বে ধারাবাহিক ভাবে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার সবগুলিতেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। তিনি দলের কৃষ্ণনগর লোকাল কমিটির সম্পাদক থাকাকালেই জেলার চাকদহ রানাঘাট সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে দলের কাজকর্ম দেখতেন। দলের আর্থিক সংকট মেটাতে নিয়মিত জেলার বিভিন্ন স্থানে সারাদিন ধরে বা টানা দু-তিন দিন যে অর্থ সংগ্রহ হত, তাতে কমরেড মৃণাল দত্ত নিজে উপস্থিত থাকতেন। কোনও কর্মসূচি নিয়ে দেয়াল-লিখন হলে কমরেড মৃণাল দত্ত শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে কর্মীদের সঙ্গে নিজেও উপস্থিত থাকতেন। দলের প্রতিটি কাজকর্মে তিনি যেমন জড়িত থাকতেন, তেমনি তত্ত্বগত বিষয়ে ও জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা শাখা নিয়ে চর্চায় তিনি গভীর মনোযোগী ছিলেন। আদর্শগত চর্চার সাথে প্রতিটি সাংগঠনিক কাজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতেন বলেই দলের কর্মীদের সাংগঠনিক কাজে কী কী ভুল ত্রুটি হতে পারে, কী ভাবে সাফল্য আসতে পারে তা তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন। এই প্রক্রিয়াতেই তিনি একজন দক্ষ সংগঠকে পরিণত হয়েছিলেন।

দলের প্রথম নদিয়া জেলা সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সময় থেকেই তিনি জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি দলের নদিয়া জেলার সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে কমরেড মৃণাল দত্ত দলের রাজ্য কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন।

গত দেড় দশক ধরে তাঁর শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অসুস্থতার কারণে শেষ দিকে কয়েক বছর তিনি বাইরে কোথাও যেতে না পারলেও কমরেডদের খোঁজ রাখা, পরামর্শ দেওয়া, তত্ত্বগত চর্চা ও সাংগঠনিক কাজে উৎসাহিত করার দায়িত্ব বিশেষ ভাবে পালন করতেন।

দলের সর্বস্তরের কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা তাঁকে সকলের আপনজন করে তুলেছিল। দলের শিক্ষা অনুযায়ী নেতা-কর্মীদের নিয়ে যৌথজীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেন্টার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে নিজে সেই রকম একটি সেন্টার গড়ে তোলা, সেখানে থাকা এবং যৌথজীবন পরিচালনার সংগ্রাম করেছেন। সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা অনুযায়ী অত্যন্ত উন্নত রুচি-সংস্কৃতির আধারে দলের ন্যস্ত দায়িত্ব পালনে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অবিচল ছিলেন। কমরেড মৃণাল দত্তের মৃত্যুতে দল ও শ্রমজীবী মানুষ হারিয়েছেন একজন একনিষ্ঠ সংগ্রামী নেতাকে এবং বিশেষভাবে সক্ষম মানুষ হারিয়েছেন তাঁদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অন্যতম সাথীকে।

দলের রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে ২৪ মার্চ কমরেড মৃণাল দত্ত স্মরণে সভা আয়োজিত হয় কৃষ্ণনগর শহরের পল্লীশ্রী বিবেকানন্দ সংঘের মাঠে। সভাপতিত্ব করেন রাজ্য কমিটির প্রবীণ সদস্য কমরেড সেখ খোদাবক্স। প্রধান বক্তা ছিলেন দলের পলিটব্যুরো সদস্য ও রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য। রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড মৃদুল দাসও স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন। আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে স্মরণসভা সমাপ্ত হয়।

কমরেড মৃণাল দত্ত লাল সেলাম