
কবি-মাসে বাংলার আকাশ বাতাসে নতুন রঙ। এই রঙে কবির নাম উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু সেই উচ্চারণে কবির হৃদয়ের বেদনা উচ্চারিত হয়নি। কবির বিশ্বমায়ের আঁচলপাতা নেই সেই উচ্চারণে। তাই এমন উচ্চারণে বাংলার আকাশ-বাতাসে দুর্যোগ ঘনিয়ে এল কি না, তা সময় বলবে। তবে ঠিক এই মুহূর্তে কবিগুরুর জন্মমাসে কালবৈশাখী মেঘের নতুন রূপ দেখা দিচ্ছে। যদিও পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু আগে থেকে সতর্ক হয়নি কেউই। তাৎক্ষণিক চাকচিক্যের মোহে মানুষ আচ্ছন্ন হয়েছে। বাহ্যিক চাকচিক্য কখনওই মনন গড়ে উঠতে সাহায্য করে না। মনন গড়ে তোলার প্রয়াসে কেউই আগ্রহ দেখায়নি। সমাজ ও রাজনীতির আকাশের মেঘের রঙ তার পরিচয় দিচ্ছে। রঙের উন্মাদনায় আজ রঙের মাহাত্ম্য হারিয়ে গেছে। শান্তি, বিশ্বাস আর প্রজ্ঞার রঙ নীল, সাদা শান্তি ও পবিত্রতার রঙ। গত পনেরো বছর বাংলায় এই রঙের অর্থ অর্থহীন হয়েছে। অন্য দিকে ত্যাগ, সাহস ও জ্ঞানের রঙ গেরুয়া।
বাংলার বাতাস আজ এই রঙ মেখেছে। কিন্তু এই রঙের অর্থ প্রথম থেকেই যেন অর্থহীন পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ত্যাগের চিহ্ন অবশ্যই বহন করছে, তা শুধু ধৈর্য্য ও জ্ঞান ত্যাগের। এমন ত্যাগের উদাহরণ তৈরি করাই যেন সাহসের পরিচয়! এমন সাহস সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যের বিপদ। সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদের রঙ যে কী বিপদ নামায় তার ট্র্যাডিশনে যেন ছেদ নেই।
এই সময়ে কবিগুরুর কয়েকটি কথা স্মরণ করতে হয়। তিনি বলছেন, ধর্মকে পরিমাণের দ্বারা বিচার না করে তার উৎকর্ষের দ্বারা বিচার করাই শ্রেয়। কিন্তু এই বিচার করে দেখার দৃষ্টি হারিয়ে দিতে ব্যস্ত চারিধারে। সেই দীপশিখা কোথায়, যার আলোয় সেই দৃষ্টি আলোকিত হবে। কবির কথায়, ‘অন্যকে দৃষ্টিশক্তি দিব বলিয়া দীপশিখা ব্যস্ত হইয়া বেড়ায় না, নিজে সে যে পরিমাণে উজ্জ্বল হইয়া উঠে সেই পরিমাণে স্বভাবতই অন্যের দৃষ্টিকে সাহায্য করে।’ অন্যের দৃষ্টিকে সাহায্য করার জন্য এমন আলো আজ দেখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কবি যদিও ধর্মের মধ্যেই সেই আলো আছে বলে মনে করেছেন। সেই ধর্ম কখন মানুষের কল্যাণ দিতে পারে না তাও বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ধর্মের আক্রোশে যদি বা উপদ্রব নাও করি তবে ধর্মের মোহে মানুষকে নির্জীব করে রাখি, তার বুদ্ধিকে নিরর্থক জড় অভ্যাসের নাগপাশে অস্থিতে-মজ্জাতে নির্দিষ্ট করে ফেলি। দৈবের প্রতি দুর্বলভাবে আসক্ত করে তুলি। বুদ্ধি যেখানে শৃঙ্খলিত, পুরুষকার যেখানে গুরুভারগ্রস্ত, সেই হতভাগ্য দেশে সর্বপ্রকার দৈহিক মানসিক রাষ্ট্রিক অমঙ্গল অব্যাখ্যাতে অচল হয়ে ওঠে।’ আবার বললেন, ‘ধর্মকে কবরের মতো তৈরি করে তারই মধ্যে সমগ্র জাতিকে ভূতকালের মধ্যে নিহিত করে রাখলে উন্নতির পথে চলবার উপায় নেই, কারও সঙ্গে কারও মেলবার উপায় নেই। … শিক্ষার দ্বারা সাধনার দ্বারা সেই মূলের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। … তারপরে আমাদের কল্যাণ হতে পারবে।’ কিন্তু আমাদের এই কল্যাণে বাধা কোথায়? সেই বাধার কথা কবি বলেছেন, ‘যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোনও বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ।’ এই বিভেদ থেকে উদ্ধার কে করতে পারে, কী ভাবে করতে পারে, সে প্রশ্ন কবি রেখেছেন, ‘যে ধর্ম মানুষের সঙ্গে মানুষকে মেলায়, সেই ধর্মের দোহাই দিয়েই আমরা মানুষকে পৃথক করেছি। … বন্ধনকে ছেদন করাই যার কাজ, তাকে দিয়েই আমরা বন্ধনকে পাকা করে নিয়েছি– তা হলে আজ আমাদের উদ্ধার করবে কে।’
কবি একদিকে বলেছেন ধর্মের আলো দৃষ্টি খুলে দিতে পারে। আবার আর একদিকে বলেছেন ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। বিভেদসৃষ্টিকারী ধর্ম কবির কাছে একপ্রকার বিকার। এই বিকারেই আমাদের দুর্গতির কারণ। তিনি বলেছেন, ‘ধর্মের বিকারে গ্রিস মরিয়াছে, ধর্মের বিকারে রোম লুপ্ত হইয়াছে এবং আমাদের দুর্গতির কারণ ধর্মের মধ্যে ছাড়া আর কোথাও নাই।’ এই বিকারে কি আমরা বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছি?
কবির ‘গোরা’ উপন্যাসের গোরা সনাতন ধর্মের কট্টর উপাসক ও প্রচারক। তার সেই ধর্মে ভারতবর্ষের মুক্তি লুকিয়ে আছে বলে সে মনে করে বিশ্বাস করে এবং তা জাহির করে ও প্রতিষ্ঠিত করার যুক্তিজাল তার অত্যন্ত প্রখর। তার সেই বিশ্বাসকে এক লহমায় বর্জন করতে দ্বিধা করেনি, যখন তার বংশপরিচয় উদঘাটিত হল। দেশ ও মানুষের পরিচয় যে ধর্মে নয়, সে উপলব্ধি ঘটল। গোরার মুখের কথা দিয়ে কবি লিখলেন, আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান ব্রাহ্ম সকলেরই– যার মন্দিরের দ্বার কোনও জাতির কাছে, কোনও ব্যক্তির কাছে কোনও দিন অবরুদ্ধ হয় না– কেবল হিন্দুর দেবতা নয়, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা। ভারতবর্ষের্র এই দেবতা কী ভাবে হাজির হতে পারে সকল মানুষের জন্য। কবি সেই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ধর্মকে অন্তত বৎসরের মধ্যে একদিনও আমাদের স্বরচিত সমাজের বেষ্টন হইতে মুক্তি দিয়া সমস্ত মানুষের মধ্যে তাহার নিত্য প্রতিষ্ঠায় তাহার সত্য আশ্রয়ে প্রত্যক্ষ করিয়া দেখিতে হইবে। দেখিতে হইবে, সকল মানুষের মধ্যেই তাহার সামঞ্জস্য আছে কি না, কোথাও তাহার বাধা আছে কি না বুঝিতে হইবে। তাহা সেই পরিমাণেই সত্য যে পরিমাণে তাহা সকল মানুষেরই।’
সকল মানুষের জন্য ভারতবর্ষের সেই দেবতাকে সত্য করে তোলার জন্য রঙে রঙে এমন বাধা ক্রমে দানা বাঁধছে যা সকল মননকে ডুবিয়ে দিচ্ছে এক অন্ধকারে। এমন কবি-মাসের রঙ আকাশে দুর্যোগের কালো মেঘের বার্তা দিতে পারে কি না, তা সময় বলবে।
নরেন্দ্রনাথ কুলে, কলকাতা-৩৪