Breaking News

আকাশছোঁয়া দামে আলু-পেঁয়াজ কিনছে জনগণ, কান্নায় দিন কাটছে চাষির

ফি বছর নিয়ম করে বিভিন্ন ফসল ওঠার মরসুমে দেশের চাষিদের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যায়। মাসের পর মাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, জল-কাদা গায়ে মেখে চাষিরা তাঁদের ফসল ঘরে তোলে। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় দেখা যায়, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। ফসলের দাম না পাওয়ায় চাষিদের যখন চোখের জল ফেলতে হয় তখন তাদেরই উৎপাদিত ফসল খুচরো বাজারে এমন চড়া দামে বিক্রি হয় যে ক্রেতাদের নাভিশ্বাস ওঠে। এ যেন এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!

ভারতের মোট আলু উৎপাদনের ২৩ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদিত হয়। অতিফলনের কারণে আলু চাষিরা এ বার দাম না পেয়ে হাহাকার করছে। হুগলি, বর্ধমান, হাওড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, নদিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আলু চাষিরা উৎপাদন মূল্যের থেকে অনেক কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে অনেকেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে পারেন। চাষিরা বর্তমানে জ্যোতি আলু বিক্রি করছে কেজি প্রতি ৩.৫০ টাকায় আর চন্দ্রমুখী কেজি প্রতি ৪.৫০ টাকা থেকে ৫ টাকায়। কিছুদিন আগে এর থেকেও সস্তায় আলু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন চাষিরা। অথচ মানিকতলা থেকে গড়িয়াহাট, কলকাতার প্রায় সব খুচরো বাজারে জ্যোতি আলুর দাম কেজি প্রতি ১৫ টাকা, চন্দ্রমুখী কেজি প্রতি ২০ টাকা। শহরতলির খুচরো বাজারের অবস্থাটাও প্রায় একই রকম। জোগান অফুরন্ত থাকা সত্ত্বেও আলুর দাম শহরের মানুষকে তেমন একটা স্বস্তি দিতে পারল না কেন? মাঝের বিপুল অংশ কারা আত্মসাৎ করে চলেছে? এর উত্তরটা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে চাষিরাও জানেন। কিন্তু সরকার ভাব দেখায় যেন কিছু জানে না!

পেঁয়াজের দামেও একই অবস্থা। দাম না পাওয়ায় পেঁয়াজ চাষিদের মাথায় হাত, এর পরও খুচরো বাজারে পেঁয়াজের দামের ঝাঁঝ কিছুতেই কমছে না। ভারত সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ২০২৩-২৪ সালে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের ৩৫.৪৫ শতাংশ উৎপাদন হয় মহারাষ্ট্রে, ১৭.১৭ শতাংশ মধ্যপ্রদেশে। পশ্চিমবঙ্গের পেঁয়াজ চাহিদার সিংহভাগই জোগান দেয় মহারাষ্ট্র, প্রায় ৭০ শতাংশ। পেঁয়াজের উৎপাদন এ বার বেশি হওয়ায় এবং যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন এবং সৌদি আরবে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ থাকায় দেশের বাজারে পেঁয়াজের যোগান অফুরন্ত। এই অবস্থায় মহারাষ্ট্রের সোলাপুর, নাসিকে চাষিরা কেজি প্রতি ৫০ পয়সা দামে পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি করতে এক রকম বাধ্য হচ্ছে। তারপরও কলকাতার খুচরো বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকার হাটে বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা। পশ্চিমবঙ্গেও যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, একটা সময় এই উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় অংশ রপ্তানি হত বাংলাদেশে। বর্তমানে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ। ফলে এ রাজ্যে পেঁয়াজের জোগানে কোনও রকম ঘাটতি নেই, তারপরও কেন পেঁয়াজের দাম ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে পারছে না? তার কারণ অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার, ফড়েরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। পিছনে থাকেন শাসক দলের নেতারা। চাষিরা ফসলের দাম না পেলেও, তাঁদের ‘অভাবি বিক্রি’র সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদাররা সস্তায় ফসল কিনে ব্যাপক ভাবে গুদামজাত করে।

চাষির হাত থেকে ফসল চলে যাওয়ার পরই এই অসাধু চক্র বাজারে কৃত্রিম অভাব তৈরি করে দাম বাড়ায়। সরকার যদি এ বিষয়ে তৎপরতা না বাড়ায়, নিয়মিত ভাবে পাইকারি ও খুচরো বজারে পরিদর্শন না করে এবং সর্বোপরি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫ (Essential Commodities Act., 1955) অনুযায়ী আলু ও পেঁয়াজ যথেচ্ছভাবে মজুত করার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাহলে এই অবস্থার পরিবর্তন কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। এর আগে কোনও সরকারই এ কাজ করেনি। খুচরো বাজারে আলু পেঁয়াজ সহ অন্যান্য কাঁচা আনাজের দাম স্থিতিশীল রাখতে পূর্বতন সরকারের আমলে ২০১২ সালের জুন মাস নাগাদ কৃষি বিপণন দফতরের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ঠিক হয় বাজার পর্যবেক্ষণকারী টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা নিয়মিত ভাবে কলকাতা-সহ জেলার বিভিন্ন বাজারে নজরদারি চালাবে এবং এই কাজে পুলিশের আইন প্রয়োগকারী শাখা তাদের সহযোগিতা করবে। তবে সাধারণ মানুষের বড় অংশের অভিজ্ঞতা, খাতায় কলমে টাস্ক ফোর্স গঠন হলেও দাম নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। এস ইউ সি আই (সি)-র বারবার দাবি তুলেছে সরকার চাষির থেকে ন্যায্য দামে কিনুক এবং তার এজেন্সি মারফত ন্যায্য দামে বিক্রির ব্যবস্থা করুক। পূর্বতন কোনও সরকারই এই দাবি কার্যকর করেনি। বিজেপি সরকারেরও কোনও উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার, ফড়ে চক্র নিয়ন্ত্রণ করার। পরিস্থিতি যে তিমিরে সেই তিমিরেই।