Breaking News

বিহারে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য নির্যাতিতাদের সুবিচারের আশাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলল

রাজ্যে প্রায় এক লক্ষ শিক্ষকের পদ ফাঁকা, অথচ সরকার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করছে না। চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন বিহারের পাটনায়। সেই ‘অপরাধে’ তাদের ওপর নির্বিচারে লাঠি চালাল বিজেপি সরকারের পুলিশ। মহিলাদের ওপরেও চলল বেপরোয়া লাঠিচার্জ। গুরুতর আহত হলেন বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী। সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করলেন– মেয়েদের ওপর এই ভাবে পুলিশি আক্রমণ হল কেন, বিহারের সদ্য শপথ নেওয়া শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তেওয়ারি প্রকাশ্যে বললেন, ‘মেয়েদের বিক্ষোভে আসার দরকার কী? তাদের এ ভাবে রাস্তায় নেমে আসার দরকারটা কী, যখন নারীশক্তির বন্দনার জন্য মোদিজি রয়েছেন’?

শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যে দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এ মন্তব্য এক দিকে যেমন কর্মহীন যুবসমাজের বেকারত্বের যন্ত্রণার প্রতি চূড়ান্ত অসংবেদনশীলতা, অন্য দিকে নারীপ্রগতিরও চূড়ান্ত বিরোধী। মেয়েদের রাস্তায় বেরনো এবং প্রতিবাদ করা অন্যায় হলে দেশের শিক্ষারত, কর্মরত এবং স্বনির্ভর হতে চাওয়া প্রতিটি নারীকেই অপরাধী বলতে হয়। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনে যে সব মেয়েরা পুরুষের পাশাপাশি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়লেন, প্রাণ দিলেন, অপরাধী তা হলে তাঁরাও। তবে বিহারের শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য ভয়ানক হলেও খুব অপ্রত্যাশিত বা চমকপ্রদ নয়, কারণ আরএসএস-বিজেপির ইতিহাসে নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিরোধী এমন মন্তব্য ও ভাবনার ছড়াছড়ি।

সংঘচালক স্বয়ং গোলওয়ালকর তাঁর বইতে সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং প্রতিপালনকেই হিন্দুরাষ্ট্রের নারীর মূল কর্তব্য হিসাবে দেখেছেন। এমনকি সুরক্ষিত রাখার জন্য নারীকে অন্তঃপুরে বন্দি রাখার নিদানও দিয়েছেন। ১৯৮৭ সালে রাজস্থানে রূপ কানোয়ারকে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে গোটা দেশ যখন উত্তাল, তখন সতী প্রথার সমর্থনে গলা ফাটিয়েছিলেন গোয়ালিয়রের বিজেপি নেত্রী বিজয়রাজে সিন্ধিয়া। বেশ কয়েক বছর এগিয়ে এসে ২০১৩ সালে সংঘগুরু মোহন ভাগবতের মন্তব্য মনে করলে দেখা যাবে, তিনি বিবাহকে বলেছেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা চুক্তি, যেখানে স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীকে নিরাপদে রাখা এবং স্ত্রীর দায়িত্ব ঘর সামলানো। ২০১৯-এ একটি রিপোর্ট পেশ করতে গিয়েও নারীদের ঘরে রাখার সপক্ষে অনুরূপ মন্তব্য করতে শোনা যায় তাঁকে। ফলে আজ বিহারের শিক্ষামন্ত্রী তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে যে বার্তা দিলেন, তাকে একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত খেয়াল বা মর্জি মনে করার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। সমাজ-সংসারে মহিলাদের ভূমিকা এবং অবস্থান সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির মনুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কথায়।

বিহারের শিক্ষামন্ত্রী উপদেশ দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর নারীশক্তির বন্দনার ভার অর্পণ করে দেশের মেয়েরা যেন নিশ্চিন্তে থাকে। কিন্তু দেশের মেয়েরা শুধু সংবাদমাধ্যমে আর নির্বাচনী সভায় বিজ্ঞাপনী বন্দনা চান না, চান সম্মান, সুরক্ষা ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার। বাস্তবে মোদিজির নারী-বন্দনার আসল চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায় দেশ জুড়ে ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যগুলোতে নারীসুরক্ষার হাল দেখে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যে রাজ্যগুলোতে– সেই রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, গোয়া, মধ্যপ্রদেশ সর্বত্রই বিজেপির শাসন। গুজরাটে বিলকিস বানোর ধর্ষকদের ফুল-মিষ্টি দিয়ে অভ্যর্থনা, কাঠুয়াতে ধর্ষকদের সমর্থনে বিজেপি কর্মীদের মিছিল, উন্নাওতে বিজেপি বিধায়ক ধর্ষক-খুনি কুলদীপ সেঙ্গারের অপকীর্তি– এমন অজস্র উদাহরণ মোদিশাসিত ভারতে নারীর অগ্রগতি ও নিরাপত্তার ছবিকে ‘বেটি বঁচাও বেটি পড়াও’-এর বিজ্ঞাপনী জৌলুসের বাইরে বেশিদূর এগোতে দেয়নি।

পশ্চিমবঙ্গেও এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার। বিগত তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল জনরোষের একটি অন্যতম কারণ ছিল আর জি করে অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা এবং তার ধারাবাহিকতায় সন্দীপ ঘোষ থেকে শুরু করে তৃণমূল-আশ্রিত ছোট-বড় নেতাদের দম্ভোক্তি, পার্কস্ট্রিট-কামদুনি থেকে কসবা ল কলেজ পর্যন্ত নানা ঘটনায় নির্যাতিতাকে দোষী প্রমাণের জঘন্য মানসিকতা।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজ্যের একটা বিরাট অংশের মানুষ সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি চান, বিজেপি সরকারের কাছে নির্যাতিতা নারীর জন্য সুবিচারের আশা রাখেন। বিহারের বিজেপি শিক্ষামন্ত্রীর এই সাম্প্রতিক মন্তব্য আবারও সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

তীব্র নিন্দা এ আই এম এস এস-এর

আমাদের দেশে মহিলাদের শিক্ষালাভের প্রয়োজন সম্পর্কে বিহারের শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন, এআইএমএসএস-এর সভানেত্রী কেয়া দে ও সাধারণ সম্পাদিকা ছবি মহান্তি ১৫ মে এক বিবৃতিতে তার তীব্র নিন্দা করেছেন।

সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিতে দেরি হওয়ার প্রতিবাদে পাটনায় কর্মহীন তরুণ-তরুণীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশ নির্মম ভাবে লাঠি চালালে মহিলারাও রেহাই পাননি। প্রতিবাদী মহিলাদের উপরে লাঠি চালানো হল কেন– সংবাদমাধ্যম এ প্রশ্ন তুললে বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মন্তব্য করেন– ‘‘মহিলারা ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন কেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই যখন নারী ক্ষমতায়নের পদক্ষেপ নিয়েছেন, তখন মহিলাদের পড়াশোনা করারই বা দরকার কী?’’

এআইএমএসএস মহিলাদের উপর পুলিশের বর্বর লাঠিচার্জ এবং ওই মন্ত্রীর চরম পুরুষতান্ত্রিক আচরণের তীব্র নিন্দা করেছে। এআইএমএসএস মনে করে, শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য গোটা দেশের মহিলাদের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙক্ষার প্রতি চরম অপমান।

সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অবিলম্বে বিহারের শিক্ষামন্ত্রীকে প্রকাশ্যে দেশের নারীসমাজের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মহিলাদের শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে এবং সামাজিক সমতা নিশ্চিত করতে বিহার রাজ্য সরকারকে দ্রুত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।