
সন্ত্রাসবাদীদের কোনও দেশ হয় না এবং তাদের কোনও ধর্ম নেই। অত্যন্ত সহজ এক সত্য কথা। চিন্তাশীল যে কোনও মানুষ বলবেন, এ আর নতুন কথা কী? নতুন না হলেও বিস্মিত হতে হয়, যদি তা বিজেপির কোনও শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখনিঃসৃত হয়।
গত ২৮ এপ্রিল কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক-এ সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ভুক্ত দেশগুলির প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে কথাগুলি বলেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং। অত্যন্ত সঠিক কথাই বলেছেন তিনি। কিন্তু এই সঠিক কথাগুলিই নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন বলতে পারেন না তিনি বা তাঁর দলের নেতারা? সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বলতে গেলেই কেন সন্ত্রাসবাদী হিসাবে কোনও বিশেষ দেশকে এবং কোনও বিশেষ ধর্মের মানুষকে দেগে দেন তাঁরা? কেন এই দ্বিচারিতা? তবে কি তাঁদের কাছে ঘরের রাজনীতি আর বাইরের রাজনীতি আলাদা?
কেন্দ্রে টানা তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতাসীন বিজেপি এই মুহূর্তে দেশের বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণির সবচেয়ে বিশ্বস্ত স্বার্থরক্ষাকারী দল। অপর বিশ্বস্ত দল কংগ্রেস স্বাধীনতার পর থেকে টানা প্রায় ৩০ বছর দেশ শাসন করেছে। কংগ্রেস শাসনে পুঁজিপতি শ্রেণির নির্বিচার শোষণ-লুণ্ঠনে মানুষ যখন দেশের সর্বত্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছে তখন পুঁজিপতি শ্রেণি দেদার অর্থ জুগিয়ে এবং প্রচার দিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই পুঁজিপতি শ্রেণিরই বিশ্বস্ত দল হিসাবে তাদের শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে বিজেপির বলার কিছু নেই। বরং পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণের চরিত্রকে আড়াল করা, তাদের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের ক্ষোভ যাতে বিক্ষোভের আকারে ফেটে পড়তে না পারে, তাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া, তার প্রধানতম দায়িত্ব। তাই জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য কোনও রকম চেষ্টা বিজেপির রাজনীতি নয়। বাকি থাকে একমাত্র মানুষকে প্রতারণা এবং বিভ্রান্ত করার রাজনীতি। ধর্মকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ এবং বিভাজনের রাজনীতি সে ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী উপায়। তাই বিদেশের মাটিতে যে সত্য উচ্চারণ করেছেন বিজেপি নেতা তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, দেশের মাটিতে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে সে সত্য উচ্চারণ তাঁর বা তাঁর দলের নেতাদের করা চলে না।
পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল যুগে সন্ত্রাসবাদ দেশে দেশে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণিরই মদতপুষ্ট। সন্ত্রাসবাদের শীর্ষ মদতদাতা হিসাবে রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। আল কায়দা, আইসিস সহ শক্তিশালী সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির পিছনে যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থ এবং পরিকল্পনাই কাজ করছে তা আজ প্রায় কারও অজানা নয়।
সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কোনও দেশ বা কোনও ধর্মকে যুক্ত করে প্রচার চালানোর পিছনে শাসক শ্রেণির বিশেষ উদ্দেশ্যই কাজ করে। সে উদ্দেশ্য হল, জনগণের সমস্ত দুদর্শার কারণ যে পুঁজিপতি শ্রেণি, একচেটিয়া ধনকুবের গোষ্ঠীর অবাধ লুণ্ঠন– এই সত্যটিকে আড়াল করে সন্ত্রাসবাদকে মূল শত্রু হিসাবে তুলে ধরা। অথচ কোনও একটি দেশের বা ধর্মের অতি নগণ্য সংখ্যক মানুষই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তার নিন্দা এবং বিরোধিতাই করে। এসসিও গোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের এ সত্য অজানা নয়। সেই জন্যই ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কিরঘিজস্তানের আন্তর্জাতিক মঞ্চে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে অন্য রকম কিছু বলতে পারেননি।
উল্লেখ্য, পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অপারেশন সিঁদুরের পক্ষে অনেক চেষ্টা করেও, দু-একটি দেশের নিছক সন্ত্রাসবাদের নিন্দা ছাড়া, বেশির ভাগ দেশের সমর্থন পাওয়া যায়নি। রাজনাথ জানতেন, বিজেপির ঘরোয়া সংকীর্ণ রাজনীতির কায়দায় কথা বললে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার সমর্থন তো পাওয়াই যাবে না, উপরন্তু নিন্দা জুটবে। সম্ভবত এই কাণ্ডজ্ঞানই রাজনাথকে মন্ত্রীগোষ্ঠীর বৈঠকে সত্য উচ্চারণে বাধ্য করেছে। উল্লেখ্য, এই বক্তৃতার পরে ভারতে পৌঁছেই রাজনাথ তাঁর সংকীর্ণ রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন।