Breaking News

তৃণমূল সরকারের নেতা-মন্ত্রীদের চরম ঔদাসীন্যই আর জি করে অপমৃত্যুর জন্য দায়ী

মেডিকেল সার্ভিস সেন্টার, সার্ভিস ডক্টরস’ ফোরাম এবং নার্সেস ইউনিটির পক্ষ থেকে আরজিকর মেডিকেল কলেজের মেডিকেল সুপারেনটেনডেন্ট কাম ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে ডেপুটেশন কর্মসূচি, ২৪ মার্চ, ‘২৬

সংবাদপত্রের ওপরের পাতা জুড়ে ‘বাংলার জন্য দিদির দশ প্রতিজ্ঞা’। ভোটে জিতলে বাংলার উন্নয়নের যে বিপুল প্রতিশ্রুতি রাজ্য সরকার কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাপিয়েছে, তার একেবারে শুরুর দিকেই জ্বলজ্বল করছে সবার জন্য সুস্বাস্থ্যের অধিকার, দুয়ারে চিকিৎসা ইত্যাদি। আর পাতাটি ওল্টালেই শহর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল আর জি করে বছর চল্লিশের এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় শিশুপুত্রের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ঢুকেছিলেন ওই যুবক অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বেরিয়েছেন কাটাছেঁড়া মৃতদেহ হয়ে। হাতভাঙা শিশুসন্তানকে নিয়ে অরূপের স্ত্রী এবং অরূপ– এই তিনজন মানুষ এই বিকল লিফটে আটকে ছিলেন দশ মিনিট, পনেরো মিনিট, আধঘণ্টা নয়, দু-ঘণ্টারও বেশি। এই পুরো সময় জুড়ে তাঁরা প্রাণভয়ে চিৎকার করেছেন, বাইরে তাঁদের আত্মীয়রা বারবার নিরাপত্তারক্ষীদের বলেছেন যে ভাবে হোক দরজা খোলার ব্যবস্থা করতে। কেউ কিছু করেননি। এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিল।

হাসপাতাল মানে শুধু রোগী আর ডাক্তার নন। অসুস্থ পরিজনকে নিয়ে সুস্থ করার আশায় বুক ভরা আশা-আশঙ্কার দোলাচল নিয়ে যে মানুষগুলি হাসপাতালে আসেন, তাদের আশঙ্কার মেঘ কাটিয়ে আশা-ভরসার হাত বাড়ানোই একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কাজ। সে কাজ চিকিৎসক-হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ-সরকার-প্রশাসন এবং সমস্ত ধরনের পরিষেবা ও পরিকাঠামোর সাথে যুক্ত প্রতিটি মানুষের। অথচ সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা সরকারি হাসপাতালে সেই নূ্যনতম দায়িত্ববোধের জায়গাটুকু কোথায় নেমেছে, এই ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আর জি করের সুপারের প্রতিক্রিয়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে বেশি চোখে পড়ল দায় এড়ানোর মনোভাব, শাসকদলের স্থানীয় নেতা মামুলি দুঃখপ্রকাশ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর দায় চাপালেন, রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা প্রশাসনিক প্রধান ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া বা দুঃখপ্রকাশের সৌজন্যও দেখালেন না। সংবাদপত্র থেকে জানা যাচ্ছে তিনজন মানুষ ওইভাবে মরণফাঁদে আটকে রয়েছেন জেনেও নিরাপত্তারক্ষীরা ছুটে যাননি, চাবি পূর্ত দপ্তরের কাছে তাই কিছু করার নেই বলে দায় সেরেছেন। সমস্ত স্তরে এই যে প্রবল গা-ছাড়া মনোভাব, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত অবহেলা এবং ঔদাসীন্য, এর দায় কি সরকারের নেতা-মন্ত্রী-পুলিশ-প্রশাসনের নয়?

২০২৪-এ অভয়া আন্দোলনের সময় আন্দোলনের অন্যতম মুখ ডাক্তার অনিকেত মাহাতো এবং তাঁর সহযোদ্ধারা যে প্রশ্নগুলি তুলেছিলেন, তা শুধুই একটি ঘটনা নিয়ে ছিল না। তাঁরা বারবার বলেছিলেন এবং বলে আসছেন– স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্তরে ঘুণ ধরেছে, সরকারি হাসপাতালগুলি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। আজ এই ঘটনা আবারও অনিকেতদের সেই দাবিগুলির সত্যতা সামনে এনে দিল। মানুষের প্রবল ক্ষোভের সামনে পড়ে বাধ্য হয়ে সে দিনের ভারপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। করাই উচিত। এই ঘটনার জন্য দোষীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার দাবি সকলেই জানাচ্ছেন। কিন্তু দোষী কি শুধু তাঁরাই? ঘটনাস্থলে রোগীর আত্মীয়দের কাতর অনুরোধের সামনে যে পুলিশকর্মী কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছিলেন, দিনের পর দিন হাসপাতালের চিকিৎসা-নিরাপত্তা-পরিকাঠামোর এই বেহাল দশা যারা চলতে দিচ্ছেন এবং যাদের অন্যায় প্রশ্রয়ে এক দল কম¹ বুঝে নিয়েছেন দায়িত্ব পালন না করে কর্তাদের খুশি রাখাই যথেষ্ট, তাঁরা কি এই খুনের দায় এড়াতে পারেন?

যখন তদন্ত শুরু হওয়ার পর জানা যাচ্ছে, বহু দিন ধরেই ওই লিফট বিকল অথচ কোনও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, হাসপাতালের ৩২টি লিফটের অনেকগুলিতেই কোনও লিফটম্যান নেই, লিফটে যান্ত্রিক গোলযোগ হলে যাত্রীদের সাহায্য করার কেউ নেই, সে দিনও ডিউটির সময় কোনও লিফটম্যান ছিলেন না– তখন শিউরে উঠে বুঝে নিতে হয়, এই ‘নেই রাজ্যের নৈরাজ্যে’ আসলে যা নেই, তা হল সাধারণ মানুষের জীবনের দাম।

এই ঘটনার পরপরই উপযুক্ত তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করে আরজি করের আবাসিক ডাক্তারদের সংগঠন আরডিএ এবং আরজি কর মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্টস বডির পক্ষ থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।

কিন্তু সাধারণ মানুষকেও বুঝতে হবে, মার খাওয়া এবং বেঘোরে মরার একটিমাত্র বিকল্প আজ তাঁদের সামনে খোলা। তা হল যথার্থ গণআন্দোলনের শক্তিগুলির পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে এই পচন ধরা ব্যবস্থাকে একদিন সমূলে উপড়ে ফেলা যায়।

লিফট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রতিবাদ

যথাযথ তদন্তের দাবিতে ২০ মার্চ টালা থানায় এসইউসিআই(সি)-র ডেপুটেশন

ঘটনার প্রতিবাদে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর পক্ষ থেকে ২০ মার্চ টালা থানায় স্মারকলিপি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনার সাথে যুক্ত সমস্ত দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, আর জি কর হাসপাতালের প্রাক্তনী তথা দলের কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভার প্রার্থী ডাঃ নীলরতন নাইয়া।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে এবং আর জি কর সহ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে, বিশেষ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিতে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহের যে অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছে সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম। ভয়ংকর দুর্ঘটনার ফলে কার্ডিওলজি, শিশু সহ অন্যান্য বহু বিভাগের যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে চিকিৎসা বিভ্রাট ঘটছে।

মানুষের জীবন-মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত নিকৃষ্টতম এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ২১ মার্চ স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান সচিবের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও লিফট দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সার্ভিস ডক্টর্স ফোরাম।