
আপনাদের তিনটি জিনিস একসঙ্গে চর্চা করতে হবে। প্রথমত, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ আপনাদের গভীর ভাবে অধ্যয়ন করতে হবে এবং সেটা সাধারণ ভাবে নয়। আপনাদের মনে রাখতে হবে, শুধু মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিনের কতকগুলো ‘ইউনির্ভাসাল’ (সাধারণ সর্বজনীন) ভাষ্য আয়ত্ত করার নাম মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ আয়ত্ত করা নয়। ভারতবর্ষের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের বিশেষীকৃত প্রয়োগ পদ্ধতি কী হবে এবং তাকে বিশেষ ভাবে কোথায় কতটুকু ‘এনরিচ’ (উন্নত করা), ‘ইলাবরেট’ (সম্প্রসারিত করা) বা ‘কংক্রিটাইজ’ (বিশেষীকৃত) করার দরকার আছে, তা আপনাদের বুঝতে হবে। আর ‘সিউডো মার্ক্সইজম’ (মেকি মার্ক্সবাদ), ‘স্যাম মার্ক্সইজম’ (ভুয়া মার্ক্সবাদ) বা সংশোধনবাদ থেকে যথার্থ মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের পার্থক্য কী ও কোথায় এবং এক একটা বিশেষ আন্দোলনের মধ্যে, সংযুক্ত আন্দোলনের মধ্যে আন্দোলনের স্লোগান বা কর্মসূচি আপাতদৃষ্টিতে এক হলেও সত্যিকারের বিপ্লবীদের সঙ্গে মেকি মার্ক্সবাদীদের আন্দোলন সংক্রান্ত ‘অ্যাঙ্গুলারিটি’ (দৃষ্টিভঙ্গি), ‘অ্যাপ্রোচ’ (কায়দাকানুন) ও কলাকৌশলগত পার্থক্য কী– তা আপনাদের আলাদা করে বুঝতে হবে, শিখতে হবে। এই হচ্ছে প্রথম জিনিস যেটা আপনাদের করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আন্দোলনের আদর্শ এবং মূল বিপ্লবী রাজনৈতিক লাইন ঠিক রাখার বিষয়টিও এই একই ‘ক্যাটিগরি’র মধ্যে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আপনাদের সাহসী হতে হবে, ‘ডিটারমাইন্ড’ (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) হতে হবে এবং চরম আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তৃতীয়ত, আপনাদের রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে এবং সকলের আগে নিতে হবে ও নিজেদের এই উদ্যোগকে সবসময় জীবন্ত রাখতে হবে। এর মানে হচ্ছে, আপনারা উদ্যোগ নিতে কোনও সময়ই পিছিয়ে পড়েননি। যেমন ধরুন, আন্দোলনের একটা ‘ইস্যু’ এসেছে, অথবা দেখা যাচ্ছে, একটা ইস্যু তুললে জনসাধারণ সেটা নেবে– এ রকম অবস্থায় অন্য কেউ সেই ইস্যুটা তোলবার আগেই যাতে আপনারা জনসাধারণের মধ্যে ইস্যুটা তুলে জনসাধারণকে সংগঠিত করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন– আপনাদের উদ্যোগ সে রকম হওয়া চাই। কেউ ডাকার অপেক্ষায়, জিজ্ঞাসা করার অপেক্ষায় বা আপনাদের পাঠাবার অপেক্ষায়, ‘কনট্যাক্ট’ (যোগাযোগ) দেওয়ার অপেক্ষায় জবুথবু হয়ে আপনাদের বসে থাকতে হয় না। তা ছাড়া আপনাদের যোগাযোগ পাওয়ার কী দরকার আছে? আপনারা তো আর একা একা একটা জায়গায় থাকেন না– আপনাদের চারপাশে কোটি কোটি লোক রয়েছে। কাজেই যোগাযোগের কী দরকার আছে? যোগাযোগ পেলে কাজের সুবিধা হয় ঠিকই। কিন্তু যোগাযোগ না পেলে আপনাদের ‘আইসোলেটেড’ (বিচ্ছিন্ন) হয়ে বসে থাকতে হয় এবং যোগাযোগ নেই বলে আপনারা কাজ করতে পারেন না– এ রকম হবে কেন?
তা হলে, তিনটি জিনিস আপনাদের হাতিয়ার করে চলা দরকার। একটা হচ্ছে, ‘ইউ উইল হ্যাভ টু লার্ন অ্যান্ড রি-লার্ন, এডুকেট অ্যান্ড রি-এডুকেট ইয়োরসেলফ’। অর্থাৎ আপনাদের পড়তে হবে এবং বারবার করে পড়তে হবে, বারবার করে শিখতে হবে এবং জানতে হবে একই কথা। কারণ, যতবার পড়বেন, তত উন্নতরূপে, তত ভাল ভাবে, তত গভীরে তার উপলব্ধি আপনাদের মধ্যে ঘটতে থাকবে। অনেকের এ রকম একটা ধারণা আছে যে, একবার একটা জিনিস পড়া হয়ে গেলেই তো সেটা বোঝা হয়ে গেল, আবার দ্বিতীয়বার সেই জিনিসটা পড়ার দরকার নেই। অর্থাৎ তাঁরা ধরে নেন, তাঁরা যখন বিষয়টা একবার পড়েছেন, তখন আর পড়বার দরকার কী? এটা ভুল ধারণা। আমার নিজের অভিজ্ঞতাই আমি বলি। একই সাহিত্য, একই লেনিনের বই, একই মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে-তুং-এর বই নানা সময়ে পড়তে গিয়ে প্রথমে যা বুঝেছি, কয়েক বার পড়ার পর পড়তে গিয়ে তার অর্থ নতুন ভাবে আমার কাছে ধরা পড়েছে। প্রথমের বোঝাটা ভুল হয়েছে, এ কথা বলছি না। কিন্তু কয়েক বার পড়ার পর যে জিনিসটা ধরা পড়েছে, সেটা নিশ্চিতরূপে আগের চাইতে উন্নত উপলব্ধি। ফলে, যত বারবার করে পড়বেন, তত আপনাদের উপলব্ধি ভাল হবে। সাথে সাথে দলের আদর্শ … এবং সাধারণ ভাবে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ বললেও ভারতবর্ষের বিশেষ পরিস্থিতিতে তার বিশেষীকৃত রূপ কী এবং বিপ্লবের মূল রাজনৈতিক লাইন কী, তা আপনাদের বুঝতে হবে। … আর একটা কথাও মনে রাখবেন, তা হচ্ছে নিজের রাজনীতি মানুষ তখনই ভাল বোঝে, যখন অপরের রাজনীতিটাও সে ভাল বোঝে। এ দুটো পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত। অর্থাৎ কথাটা একই– নিজের রাজনীতি খুব ভাল বোঝার মানে অপরের রাজনীতি খুব ভাল বোঝা। আবার, অপরের রাজনীতি তখনই একজন খুব ভাল বোঝেন, যখন নিজের রাজনীতি ভাল বোঝেন। অপরের রাজনীতি ভাল না বুঝলে প্রমাণ হয় যে, নিজের রাজনীতি বোঝার মধ্যেও ফাঁকি আছে। যে যত নিজের রাজনীতি ভাল বোঝে, সে অপরের রাজনীতির ত্রুটি-বিচ্যুতি তত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখতে পায় এবং ভাল বোঝে। অপরের রাজনীতি ভাল না বুঝলে নিজের রাজনীতিও গোলমাল করে বোঝা হয়, ভুল বোঝা হয়। তা হলে, লড়াইয়ের মূল আদর্শ ও রাজনৈতিক লাইন এবং তারই সাথে অন্যান্য দলগুলির সঙ্গে কোথায় পার্থক্য, তা ঠিক করা হচ্ছে আপনাদের প্রথম কর্তব্য।
দ্বিতীয় কর্তব্য আপনাদের হচ্ছে, এই মূল আদর্শ এবং রাজনৈতিক লাইন ঠিক করার সাথে সাথে তার ভিত্তিতে আন্দোলন সংগঠিত করবার জন্য তার পরিপূরক নীতি-নৈতিকতা ও সংস্কৃতির সুরটি গড়ে তোলা। এটা গড়ে তোলবার প্রাথমিক শর্ত হিসাবে আপনাদের দরকার, সমস্ত ‘অডস’-এর (প্রতিকূলতার) বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে সব কিছু দেওয়ার মানসিকতা, এমনকি দরকার হলে প্রাণ দেওয়ারও মানসিক প্রস্তুতি। …
তৃতীয়ত, এর সাথে চাই আপনাদের রাজনৈতিক উদ্যোগ। এই রাজনৈতিক উদ্যোগ এমন হওয়া চাই যে, প্রত্যেকেই আপনারা নিজের পরিকল্পনায় কিছু না কিছু কাজ করছেন, আপন নিয়মে জনসংযোগ করছেন, ছাত্রদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন, অন্তত আর কিছু না পারেন … যেখানে আপনাদের প্রচুর বন্ধু-বান্ধব আছে, যারা আপনাদের সততা ও চরিত্রের মাধুর্যে আপনাদের ভালবাসেন, তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এইটুকুও যদি আপনারা করে রাখেন, মনে রাখবেন, আন্দোলন গড়ার পক্ষে সেটাও অনেক কার্যকরী। আবার, এরই সঙ্গে আর একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাও আপনাদের মনে রাখা দরকার। তা হচ্ছে, কাজ হয়তো আপনারা করলেন, কিন্তু সেটা করলেন আপন নিয়মে– কাজের ধারা কখনওই আপনাদের এ রকম হওয়া উচিত নয়। ‘প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যক্তিগত উদ্যোগ চাই’– এ কথার মানে এ নয় যে, প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত ভাবে যার যার মতো ক্রিয়া করলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে অর্থাৎ এই ব্যক্তিগুলোর ক্রিয়ার মধ্যে কোনও সংযোগ নেই বা ‘সেন্ট্রালিজম’ নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগকে আগে বাড়ানো, কাজকর্মের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করা– এ কথার যথার্থ অর্থ হচ্ছে, একই সঙ্গে ‘সেন্ট্রালিজম’-কে (একেন্দ্রিকতাকে) শক্তিশালী করা। এগুলো সেন্ট্রালিজম-কে ‘কাউন্টারপোজ’ (বিরোধিতা) করার জন্য বা তাকে দুর্বল করার জন্য নয়। বরং সেন্ট্রালিজম-কে ‘মেকানাইজেশন’ (যান্ত্রিকতা) থেকে মুক্ত করার জন্য ‘বুরোক্রেটিক টেনডেন্সি’ (ঝোঁক) থেকে মুক্ত করার জন্য, দলের সমস্ত কর্মীদের কর্মক্ষমতা বাড়াবার জন্য, সমস্ত ‘রিসোর্স’ (শক্তি) যা হাতের মধ্যে রয়েছে তার ‘প্রপার ইউটিলাইজেশন’-এর (যথাযথ ব্যবহারের) জন্যই এটা অত্যন্ত দরকার। এর ‘আলটিমেট’ (আসল) লক্ষ্য হচ্ছে, একদিকে প্রতিটি কর্মীর কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে সামগ্রিক ভাবে দলীয় ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটানো, অপর দিকে বুরোক্রেটিক ঝোঁকের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম পরিচালনা করে সেন্ট্রালিজম-কে শক্তিশালী করতে থাকা। মনে রাখবেন, বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে এটি একটি অন্যতম প্রধান শর্ত। সেই জন্য আপনাদের স্লোগান হবে, ‘স্টাইল অব ওয়ার্ক’ (কাজের পদ্ধতি) উন্নত করতে হবে, ‘স্টিরিওটাইপ ওয়ার্ক’ (গতানুগতিক কাজের পদ্ধতি) পাল্টাতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, অবস্থা অনুযায়ী তৎক্ষণাৎ কাজের পদ্ধতি ‘রিমোল্ড’ করতে (পাল্টাতে) পারেন, এমন ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ (পরিবর্তনশীলতা) আপনাদের গড়ে তুলতে হবে। সাথে সাথে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং কাজকর্মের ‘ডেমোক্রেটিক ফাংশনিং’ (গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার) উপর আপনাদের জোর দিতে হবে। আর, সংগঠিত ভাবে সকলে মিলে শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করতে পারার ক্ষমতা আপনাদের আয়ত্ত করা চাই। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় যে তিনটি কথা বললাম, তার মধ্যেই এটা নিহিত রয়েছে। …
আপনারা মনে রাখবেন, ভারতবর্ষের এই একটি মাত্র দল এসইউসিআই এবং তার গণসংগঠনের উপর মানুষ যথেষ্ট আস্থা স্থাপন করে রেখেছে। আপনারা কী করেন, গভীর আগ্রহের সাথে মানুষ সেটা লক্ষ করছে। তাদের মনের মধ্যে সংশয় রয়েছে যে, আপনারা ছোট, আপনারা পারবেন কি না। আপনাদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখবেন, আমরা ছোট হতে পারি, কিন্তু আমাদের যতটুকু শক্তি আছে, ভারতবর্ষের তুলনায় তা আজকে আর তত ক্ষুদ্র নয়, একটা কাজ শুরু করবার পক্ষে তো নয়ই। ফলে, আপনাদের এই চ্যালেঞ্জ অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। ‘ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলন ও ছাত্রদের কর্তব্য’