গ্রিনল্যান্ডের দৃপ্ত ঘোষণা ‘গ্রিনল্যান্ড ইজ নট ফর সেল’

‘গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীদের’। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী নুক শহর ও তার বাইরে বারবার শোনা যাচ্ছে এই ঘোষণা। এ ধ্বনি গ্রিনল্যান্ডবাসীদের জাতীয়তাবোধের, একই সাথে এ ধ্বনি উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতারও। ভেনেজুয়েলা আক্রমণের আবহের মধ্যেই গ্রিনল্যান্ড দখলের লাগাতার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, প্রত্যেক গ্রিনল্যান্ডবাসীকে মাথাপিছু ১ লক্ষ ডলার দেওয়া হবে। তারা বলছে, রাশিয়া বা চিন যাতে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে না পারে সে জন্যই আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা চায়। বলছে, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থেই নাকি গ্রিনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা। প্রস্তাবে রাজি না হলে সেনা নামানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছে আমেরিকার প্রশাসন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রতি আমেরিকার এত আগ্রহ কেন?

প্রায় তিন শতাব্দী ধরে গ্রিনল্যান্ড ছিল ডেনমার্কের উপনিবেশ। ১৯৭৯-তে স্বায়ত্তশাসন ও ২০০৯-এ বিস্তৃত স্বশাসন চালু হলেও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি কিন্তু এখনও ডেনমার্কেরই হাতে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গ্রিনল্যান্ডকে হস্তগত করার প্রচেষ্টা আজকের নয়। বিগত ১০০ বছর ধরে তারা এই চেষ্টা করে যাচ্ছে। ১৮৬৭ সালে আলাস্কা কেনার পর মার্কিন স্বরাষ্ট্র সচিব উইলিয়াম সিওয়ার্ড গ্রিনল্যান্ড কিনতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব রেখেছিল তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডের ওপর সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছিল যা আজও রয়েছে। আসলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির কাছে গ্রিনল্যান্ড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল। উত্তর আমেরিকা থেকে রাশিয়ার অভিমুখে মিসাইল উৎক্ষেপণের সবচেয়ে কম সময়ে পৌঁছনোর পথ গেছে এই উত্তর মেরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে। তাই মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় গ্রিনল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্য দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রাশিয়া ও চিন উত্তর মেরু অঞ্চলে ঘাঁটি বিস্তার শুরু করেছে। কাজেই যেমন করে হোক এখন আমেরিকার গ্রিনল্যান্ডের উপর দখলদারি চাই। পুরো উত্তর মেরু অঞ্চলে যে কোনও যুদ্ধের রসদ সরবরাহ থেকে এয়ারস্পেস, রাডার, সমুদ্রপথ, নৌ-পরিবহণ ইত্যাদি সবকিছুর ওপরই নিয়ন্ত্রণ রাখার এ এক সাম্রাজ্যবাদী কৌশল। এর মধ্যে গ্রিনল্যান্ডবাসীর অবস্থাটা কেমন? সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কিংবা ঔপনিবেশিক ডেনমার্ক কেউই কি গ্রিনল্যান্ডবাসীর প্রতিদিনের সমস্যা, সংকট, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত? আদৌ তা নয়।

গ্রিনল্যান্ড সাতান্ন হাজার জনসংখ্যার একটি স্বশাসিত দেশ। কিন্তু একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মর্যাদা তার নেই। বরং এই ভূখণ্ডটি ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য দেশের সাম্রাজ্য বিস্তারের কৌশলগত সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে। গ্রিনল্যান্ডবাসীদের বাসস্থানের সমস্যা, জোর করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে তথাকথিত উন্নয়নের ফলে উদ্ভূত নানা ধরনের সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এ সব সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। উপেক্ষিত মেরু অঞ্চলের বাস্তুতন্তে্রর নিরাপত্তা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির অতি মুনাফার লালসায় প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখে। বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে। ফলে মেরুর তুষার স্তূপ ক্রমশ গলছে। জাহাজের জন্য নতুন সমুদ্র পথ খুলে যাচ্ছে। বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ ও বিরল ধরনের খনিজ সম্পদগুলি ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠছে, যার দিকে শকুনের মতো তাকিয়ে আছে আমেরিকা ও অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলি। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা’ ইত্যাদি যে কথাই আমেরিকা মুখে বলুক না কেন, মেরু এলাকার সম্পদ ভাণ্ডার লুঠ করাটাই তার গ্রিনল্যান্ড দখলের মূল উদ্দেশ্য। সমগ্র দক্ষিণ মেরু অঞ্চলকে তীব্র শোষণের অভিঘাতে ছিবড়ে করে সাম্রাজ্যবাদ আজ উত্তর মেরু অঞ্চলের দিকে থাবা বাড়াচ্ছে। আমেরিকার গ্রিনল্যান্ড দখল বা রাশিয়া ও চিনের উত্তর মেরু অঞ্চলে ঘাঁটি বিস্তার, এ সমস্ত কিছুরই উদ্দেশ্য এক।

বহু শতাব্দী ধরে পদদলিত গ্রিনল্যান্ডের বুকে এবার দাবি উঠছে স্বাধীনতার। গ্রিনল্যান্ডের পাঁচ প্রধান পার্টি একযোগে বলেছে ‘আমরা আমেরিকান কিংবা ড্যানিশ নই, আমরা গ্রিনল্যান্ডার’, বলেছে ‘গ্রিনল্যান্ড ইজ নট ফর সেল’– গ্রিনল্যান্ড কেনাবেচার জিনিস নয়। এই ঘোষণাই অন্ধকারে আশার আলো। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী সর্বাত্মক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই একমাত্র গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তার সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটা সম্ভব।