Breaking News

 এসআইআরঃ কার বাঁচাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নাকি আইনের?

সমস্ত নাগরিকের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার দাবিতে ১ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনের দফতরে বিক্ষোভে পুলিশ বাধা দিলে ব্যাপক ধস্তাধস্তি হয়। কমরেড তরুণ মণ্ডলের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল সিইও-কে ডেপুটেশন দিতে গেলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করেন।

হঠাৎ যদি কোনও দিন কোনও দুঃস্বপ্নে দেখেন আপনার পায়ের তলায় কোনও মাটি নেই– কী অনুভূতি হবে? আর স্বপ্নটা যদি সত্যিই হয়? যদি আপনি দেখেন আপনার কোনও দেশ নেই, আপনি আছেন অথচ নেই, আপনি ডিলিটেড, ঠিক কী অনুভূতি হতে পারে? যে কোনও মানুষেরই আপাত শান্ত স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ওলটপালট হয়ে যাবে না কি? সেই ক্ষোভ, ভয়, যন্ত্রণার অভিব্যক্তি প্রকাশ করা কি খুব অসঙ্গত? এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মালদহের মোথাবাড়ি সুজাপুর কালিয়াচক ইত্যাদি এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জনবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিয়েছে। আন্দোলনের নামে কারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করল, তাদের উদ্দেশ্য কী, মানুষের মধ্যে জমা ক্ষোভ ফেটে পড়ল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, নাকি কেউ তাকে পরিচালিত করল, কেনই বা প্রশাসন দীর্ঘ সময় ধরে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হল তা নিয়ে তদন্ত চলুক। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি ও রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ পর্ব চলছে। কিন্তু যে বিষয়টা এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বিচার্য হওয়া দরকার, তা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো এই চাপানউতোরে হারিয়ে যাচ্ছে। এই যে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যার মধ্যে বিরাট অংশের মহিলারাও ছিলেন, যাঁরা রাস্তায় এসে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন, ঘেরাও করলেন, পথ অবরোধ করলেন– তাঁদের ক্ষোভের উৎসটা কী? তা কি অমূলক? আসলে এক গভীর অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে পড়ে তাঁদের জীবনে যে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে, তা যে প্রক্রিয়ার ফল, সেই প্রক্রিয়ায় প্রতি তাঁরা অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন। কেন এই অনিশ্চয়তা? এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৩৩ লক্ষ মানুষের অস্তিত্ব বাস্তবে ডিলিটেড। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এক একটি বুথে দেড়শো-দুশো-আড়াইশো মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে নির্বাচনী তালিকা থেকে। প্রাক্তন সাংসদ ডাঃ তরুণ মণ্ডল, যিনি একজন প্রাক্তন সরকারি আধিকারিকও বটে, বাদ গিয়েছে তাঁর নামও। ২০১৪ সাল পরবর্তী পাঁচ বছর যিনি ভারতবর্ষের সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন, ছিলেন সংসদীয় কমিটির সদস্য, তিনি কি ভারতবর্ষের নাগরিকই ছিলেন না! এ দেশের প্রখ্যাত শিল্পী যিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও কন্যাদের নিয়ে ভারতবর্ষের সংবিধানের অলংকরণ করেছিলেন, সেই শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাতি, প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক সুপ্রবুদ্ধ সেনের নামও ডিলিটেড তালিকায়। তিনিও নাকি এ দেশের বৈধ নাগরিক নন! এমন বহু উদাহরণ আছে। বহুবার ভোট দেওয়ার পর নতুন করে নানা নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও এঁরা যে কেন ডিলিটেড তাই এঁরা জানেন না। এখন এঁদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে গেলে সেই ট্রাইবুনালে আবেদন করতে হবে যে ট্রাইবুনাল এখনও তৈরিই হয়নি, কোনও পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। ডিলিটেড তালিকায় চলে গেলেন যাঁরা এ বার সম্ভবত তাঁরা ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তা হলে এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে কি গণতান্ত্রিক বলা যায়? যাঁরা মোথাবাড়ির ঘটনায় গণতন্ত্র আক্রান্ত, বিচারবিভাগ আক্রান্ত ইত্যাদি বলে আসর গরম করতে চাইছেন, তাঁরা কি সত্যি সত্যিই গণতন্ত্র নিয়ে খুব চিন্তিত? যদি তাই হত তবে তো নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, বিচারবিভাগের ভূমিকা, কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতায় থাকা বিজেপি যে ভাবে এই দুটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দলদাসে পরিণত করেছে, তাদের সেই ভূমিকাও একই সঙ্গে আলোচনায় তুলে ধরা দরকার ছিল। বিচারপতিদের অফিস অবরোধকে কেন্দ্র করে যে অপ্রীতিকর অবস্থা দেখা গিয়েছে তা কোনও ভাবেই বাঞ্ছিত ছিল না। তবে এ কথা বুঝতে হবে বিচারবিভাগ বা বিচারপতিদের আক্রমণ করা জনসাধারণের উদ্দেশ্য নয়। এটা প্রচণ্ড ক্ষোভের একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কোনও কায়েমি শক্তি নিজ স্বার্থে তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা যদি করেও থাকে, মানুষের অসহায়তা ও তার থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারে না! গ্রামের গরিব সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা, বিচারপতিদের সমীহ করেই চলেন। প্রশাসন ও বিচারবিভাগের কর্তা ব্যক্তিদের বুঝতে হবে ওই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশটা আসলে সাধারণ মানুষের বিচারপতিদের থেকে ন্যায়বিচার চাওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।

যে মোথাবাড়ি সুজাপুর কালিয়াচকের হাজার হাজার নাম বাদ পড়া মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, সেখানে মানুষের এত ক্ষোভ জমে বারুদ হল কী ভাবে? এসআইআর-এর প্রথম ধাপ শেষ হতে দেখা গিয়েছিল ‘আনম্যাপড’ ভোটারের সংখ্যা এক শতাংশ বা কোথাও কোথাও তারও কম। যেমন সুজাপুরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ০.৫৮ শতাংশ। বাকি সবটাই ছিল ‘ম্যাপড’ ভোটার। অর্থাৎ নিজের বা নিকট আত্মীয়দের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতে ছিল। এ তথ্যে পরিষ্কার এই সব অঞ্চলের বেশিরভাগ ভোটার দেশের বৈধ নাগরিক। তাঁরা কেউ বিজেপির দাবিমতো বহিরাগত বা বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বা ঘুসপেটিয়া নন। অথচ ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হতেই দেখা গেল একেবারে বিপরীত চিত্র। কার়ও নিজের বা বাবার নামের বানান ভুল (যার প্রায় পুরোটাই নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্ত কৃত্রিম মেধা বা এআই-এর কীর্তি), ঠিকানা বা পদবির বদল (আমাদের দেশের মেয়েদের ক্ষেত্রে এটাই সাধারণ রীতি), কারও বাবা-মায়ের ছয় বা তার বেশি সন্তান– এই সব খুব সাধারণ কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ পড়ে গেলেন অ্যাডজুডিকেশনের আওতায়। ওই সুজাপুরে যেখানে ২০০২ সালের তালিকায় আনম্যাপড ভোটারের সংখ্যা ছিল মাত্র ০.৫৮ শতাংশ, সেখানে বিচারাধীনের সংখ্যা দাঁড়াল ৫২ শতাংশেরও বেশি। সারা পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যাটা ষাট লক্ষ। সেই ধাপেই পাঁচ লক্ষেরও বেশি নাম ডিলিটেড। কেন কেউ জানে না, কোনও সদুত্তর নেই, উত্তর দেওয়ার কোনও দায়ও নেই নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনের কোনও তাপ উত্তাপ না থাকতে পারে, কিন্তু যাঁদের নাম অকারণে ডিলিটেড তালিকায় চলে গেল, এই পরিস্থিতিতে তাঁরা আশঙ্কিত, ক্ষুব্ধ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এরপর হইচই শুরু হতে মামলা দায়ের হয় শীর্ষ আদালতে। পুরো প্রক্রিয়াটা চেপে বসে বিচারকদের ঘাড়ে। কিন্তু চাপা পড়ে গেল গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়।

যে কোনও সাধারণ বিচার পদ্ধতিতে অভিযুক্তদেরও বক্তব্য শুনতে হয়। কিন্তু যে নাগরিকদের এমনকি বৈধ কাগজপত্র দেখানো সত্তে্বও অভিযুক্ত হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হল, কই তাদের কোনও কথা শোনার প্রয়োজন তো কেউ বোধ করল না। আরও অদ্ভুত ব্যাপার যে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে বিচার প্রক্রিয়ার ভার নিয়ে নিল আদালত, সেই নির্বাচন কমিশনই ঠিক করে দিল কী পদ্ধতিতে বিচার করতে হবে। আর মহামান্য শীর্ষ আদালত এই ডিলিটেড তালিকায় থাকা নাগরিকদের শুধু একটা চুষিকাঠি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এবার না হয় ভোটটা দিতে পারবেন না, পরে ট্রাইবুনালে আবেদন করবেন। আগুনে ঘি পড়া কি অস্বাভাবিক? একে কি গণতন্ত্র রক্ষা করা বলে? এই যে তড়িঘড়ি যে কোনও প্রকারে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ করতেই হবে, তাতে মানুষ মরুক বা বাঁচুক, বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার থাক বা না থাক– এ কেমনতর বিচার? এত জটিল একটা প্রক্রিয়ায় এত তাড়াহুড়োর কী উদ্দেশ্য? প্রশ্ন ওঠা তো স্বাভাবিক। এসআইআর প্রক্রিয়ায় কাজের চাপে, মানসিক উদ্বেগে, হয়রানির শিকার হয়ে, আচমকা বেনাগরিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই বিএলও সহ দুশো-রও বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। এ অবস্থায় মানুষ যদি বিচলিত হয়, ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে, আইন ভাঙে তবে তাঁদের কি দোষ দেওয়া চলে?

গভীর ভাবে বিচার করা দরকার, কার বাঁচাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কাগুজে আইনের নাকি মানুষের?