Breaking News

এস আই আরঃ নির্বাচন কমিশনারকে এসইউসিআই(সি)-র খোলা চিঠি

এসইউসিআই(সি)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে ৩১ মার্চ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে নিচের খোলা চিঠিটি দেওয়া হয়েছে।

আপনার অজানা থাকার কথা নয় যে, এই রাজ্যে যে ধরনের এসআইআর প্রক্রিয়া আপনি শুরু করেছেন, তা সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত করতে অন্তত এক বছরের বেশি সময় প্রয়োজন। সেই কাজ আপনি মাত্র তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে চেয়েছেন কী উদ্দেশ্যে, তা আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু তার ফলে তড়িঘড়ি কাজ করাতে গিয়ে বিএলওদের উপর আপনারা এমন ফতোয়া জারি করেছিলেন যে, কাজের চাপে বহু বিএলও অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন, কাজের চাপ ও কমিশনের হুমকি সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়েছেন। এই মৃত্যুর দায় তো নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।

এত দিন ভোটার তালিকায় নাম থাকা মানুষদের কোনও ফর্ম পূরণ করতে হত না। আপনার দ্বারা প্রবর্তিত এসআইআরে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করার জন্য কর্মসূত্রে দূর-দূরান্তে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষকে তাদের কাজকর্ম ও জীবিকা ফেলে ছুটে আসতে হয়েছে নিজের বাড়িতে। পরে অবশ্য আপনারা অনলাইনের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তাতে প্রান্তিক মানুষের হয়রানি আদৌ কম হয়নি।

এর পর আপনার কমিশন শুরু করেছিল আরও ভয়ঙ্কর এক প্রক্রিয়া– ১ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষের নির্দয় শুনানি পর্ব। তাতে অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, অ্যাম্বুলেন্সে আসা সংকটগ্রস্ত রোগী, অন্তঃসত্ত্বা মহিলারাও ছাড় না পেয়ে কী ভয়ঙ্কর হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শুনানির চিঠি পাওয়ার পর ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্কে বহু মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ বা আত্মহত্যা করেছেন। এই মৃত্যুর দায়ও তো নির্বাচন কমিশনের। অথচ এ নিয়ে কমিশন নূ্যনতম দুঃখ প্রকাশটুকুও করেনি।

সব কিছু ছাপিয়ে, এ বারের এসআইআর পর্বে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নামক নতুন এক শব্দবন্ধ আপনি আমদানি করেছেন, যা কমিশনের দীর্ঘ ইতিহাসে কখনও শোনা যায়নি। এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি খুঁজতে গিয়ে ভোটার তালিকায় নামের হাস্যকর রকমের ভুল বানান ইত্যাদি কারণে ৬০ লক্ষ মানুষকে ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাইরের রাজ্য থেকে নির্বাচন কমিশনের দ্বারা নিয়োগ করা মাইক্রো অবজার্ভারদের আচরণও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। এ দিকে বিচারাধীনদের নাম থাকা-না থাকার বিচারপর্ব শেষ হওয়ার আগেই আপনি নির্বাচনের তারিখ ও নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন। আর সেই ভোট ঘোষণার দিনেও কী করে বলতে পারলেন যে– ‘কোনও বৈধ নাগরিকের নাম বাদ যাবে না’? এটা কি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা নয়?

আপনার নেতৃত্বে চলা নির্বাচন কমিশনের অপকর্মের শেষ পরিণতি হিসেবে সর্বোচ্চ আদালত বিচারক নিয়োগ করে আপনার কমিশনের অপকর্মে আক্রান্তদের, কমিশনের চাওয়া নথির ভিত্তিতেই অতি দ্রুততার সাথে ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কি না তা ঠিক করতে বলেছে, যা সময়াভাবে বাস্তবে সম্ভব নয়। যে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাচ্ছে, তারা প্রান্তিক মানুষ, বস্তিবাসী, দলিত, মতুয়া, মহিলা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাদের বাধ্য করা হচ্ছে ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হতে। পূর্ব অভিজ্ঞতা তো এটাই বলে যে, এই ধরনের ট্রাইবুনালের বিষয় দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ। এই ট্রাইবুনালে পাঠানো লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে রয়েছেন এসইউসিআই(সি)-র প্রাক্তন সাংসদ ডাঃ তরুণ মণ্ডল, যিনি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অধীন সিজিএইচএস-এর চিফ মেডিকেল অফিসার ছিলেন। এই নাম বাদ যাওয়ার দলে রয়েছেন প্রাক্তন বিচারপতি, উচ্চ সরকারি পদে থাকা নির্বাচনী আধিকারিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট মানুষ। বিচারাধীন রেখে বা ট্রাইবুনালে ঠেলে দিয়ে আপনি যে লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চলেছেন, এ নিয়ে কোনও প্রশ্নের উত্তর আপনি দিচ্ছেন না। দায় এড়িয়ে সুকৌশলে বলছেন, ওটা বিচারাধীন বিষয়। এর দ্বারা, মানুষের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগকে নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সেই অধিকারকেই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যত হরণ করা হচ্ছে।

আমাদের দলের প্রতিনিধিদল গত ২৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের সহকারী চিফ ইলেকশন অফিসারের সাথে দেখা করে কী ভাবে কমিশনের দ্বারা বাদ দেওয়া নামের নাগরিকরা ভোট দিতে পারবেন তা জানতে চাইলে, তিনি কোনও পথ না দেখিয়ে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে বলেছেন। ভোটের আগে ট্রাইবুনালে তার ফয়সালা হবে কি না তিনি তাও বলতে পারেননি। তা হলে, আপনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ‘কোনও বৈধ নাগরিকের নাম বাদ যাবে নাক্স তা আপনিই লঙ্ঘন করতে চলেছেন না কি? প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই যে, আসামে দুই দশক আগে নির্বাচন কমিশন বিদেশিদের নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ভোটার তালিকাতেই ‘ডাউটফুল ভোটার’ সংক্ষেপে ‘ডি-ভোটার’ ছাপ মেরে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব কর্তব্য এমন করেই শেষ করে ডি-ভোটারদের নাম ট্রাইবুনালে ঠেলে দিয়েছিল। তার ফলশ্রুতিতে অনেকের ঠাঁই হয়েছিল সরকারের সীমাহীন নির্মমতার ডিটেনশন ক্যাম্পে এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর অনেকেই যে বৈধ নাগরিক, তা প্রমাণিত হয়েছিল।

গত বছর বিহারে এসআইআর চলাকালে বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’। ও সব কথা বলে নাগরিকদের বে-নাগরিক বলে দেগে দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঠেলে দেওয়ার সেই ষড়যন্তে্র আপনার নির্বাচন কমিশনকে ‘ডিলিট’ নামক কাজটি করার অংশীদার করছে বলে কেউ মনে করলে তা কি খুব ভুল হবে? আশা করি, এ রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে আপনি এর সদুত্তর দেবেন।

পরিশেষে, নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি, যেহেতু বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার এসআইআর-এর মাধ্যমে তৈরি ভোটার তালিকা দ্বারা আপনি নিশ্চিত করতে পারছেন না, তাই মৃত ও ডুপ্লিকেট নাম বাদ দিয়ে, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই ভোট নিতে হবে এবং অবশ্যই ইতিমধ্যে ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করা নতুন ভোটারদেরও তাতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে থেকে আপনার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে আমাদের দেওয়া প্রস্তাবের বৈধতা স্বীকার করে সকল নাগরিকের ভোটাধিকার আপনি সুনিশ্চিত করবেন, এটা আমাদের প্রত্যাশা।