Breaking News

ধর্ষণে শীর্ষে বিজেপি শাসিত রাজ্যঃ অমিত শাহরা দিচ্ছেন নারী সুরক্ষার গ্যারান্টি!

গত ৩ বছরে বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে নিখোঁজ হয়েছেন ২ লাখ ৭০ হাজার মহিলা ও শিশু। প্রতি দিন হারিয়ে যাচ্ছেন গড়ে ১৩০ জন। প্রতিবাদে ২৫ মার্চ গুনায় এসইউসিআই(সি)-র বিক্ষোভ।

সমাজমাধ্যমের আঙিনায় হেঁটে বেড়ালে আজও চোখে পড়ে যাচ্ছে ভাইরাল হওয়া সেই বীভৎস ভিডিও। ক্রন্দনরত এক তরুণীকে পিছন দিক থেকে গলা চেপে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে চলেছে এক যুবক। মেয়েটির জামাকাপড় ছেঁড়া। পিছনের যুবকটি জান্তব উল্লাসে অশালীনভাবে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে মেয়েটির শরীর। এই দুজনকে চারিদিক থেকে ঘিরে রয়েছে আরও বহু মানুষ– নাকি মানুষ নামধারী পশুরা। তারা ভিডিও করছে। তরুণী আক্রমণকারী যুবকের হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসার জন্য ছটফট করছেন, কিন্তু জনতার সোল্লাস চিৎকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তাঁর আর্ত স্বর।

না, এ কোনও মধ্যযুগ থেকে তুলে আনা দৃশ্য নয়। ঘটনাটি ২৬ মার্চের। ঘটেছে বিহারের নালন্দা জেলায়, যেখানে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি-জেডিইউ সরকার। জানা গেছে, আক্রান্ত এই তরুণীর স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক। কাজ করেন মহারাষ্ট্রে। শ্বশুরবাড়িতে থাকেন এই মহিলা। ঘটনার দিন বিকেলে তিনি দোকানে গিয়েছিলেন। সেখানেই দোকানদারের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের অজুহাত তুলে একদল লোক তাঁকে আক্রমণ করে, জামাকাপড় ছিঁড়ে দিয়ে নগ্ন করার চেষ্টা করে এবং যথেচ্ছ ভাবে অশালীন নির্যাতন চালাতে চালাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কোনও মতে তাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন তরুণী। পরদিন তিনি থানায় ডায়েরি করেন। ইতিমধ্যে ওই দুষ্কৃতীরা নির্যাতনের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। জানা গেছে, পুলিশ এ পর্যন্ত মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে। বাকিরা এখনও অধরা।

এই কক্সদিন আগে ২৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রচারে এসেছিলেন কেন্দে্র বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভাষণ দিতে গিয়ে রাজ্যে নারী নিরাপত্তার বেহাল দশার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাকি এই রাজ্যে নারী সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। বলেছিলেন, রাজ্যে তাঁদের সরকার হলে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে পাতাল থেকে হলেও অপরাধীদের খুঁজে এনে শাস্তি দেওয়া হবে। অন্ধ ভক্তদের বিপুল হাততালির স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ যখন গলা ফাটিয়ে নারী সুরক্ষার মহান যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে জাহির করছিলেন, তখন একবারের জন্যেও বিহারের এই অসহায় তরুণীটির মুখ তাঁর মনে পড়েছিল কি? সে রাজ্যে তো ক্ষমতায় রয়েছে তাঁদের দলেরই সরকার। তা হলে কোন সাহসে দীর্ঘ সময় ধরে অসহায় এক নারীর উপর এ ভাবে নির্যাতন চালানোর ভরসা পেয়েছিল দুষ্কৃতীরা? ঘটনার এতদিন পরেও সেখানে সমস্ত অপরাধী গ্রেপ্তার হল না। এই তা হলে বিজেপি সরকারের পাতাল থেকে অপরাধীদের খুঁজে এনে শাস্তি দেওয়ার নমুনা!

শুধু বিহার তো নয়, যেখানেই যে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আছে, দেখা যাচ্ছে সব জায়গাতেই নারী নিরাপত্তা অবিরাম বিপন্ন হয়ে চলেছে। বিহারের সাম্প্রতিক এই ঘটনা প্রসঙ্গে বারবার মণিপুরের নাম উঠে আসছে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা জাতিগত সংঘর্ষের আবহে দুই নারীকে নগ্ন করে ঘোরানোর ঘটনায় শিউরে উঠেছিল গোটা দেশ। যে অমিত শাহ কলকাতায় এসে নারী সুরক্ষার গালভরা কথা বলে গেলেন, সেই তিনি নিজে কিংবা তাঁর দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে গিয়ে বিপন্ন, আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো দূরের কথা, নারী নির্যাতনের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার নিন্দাটুকুও করেননি।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল শাসনে নারী সুরক্ষা তলানিতে এ কথা ঠিক। কিন্তু তাই বলে এ রাজ্যের মানুষ বিজেপি নেতা অমিত শাহের মুখে নারী নির্যাতন বিরোধী বাগাড়ম্বর শুনবেন কেন? ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশ জুড়েই মহিলা নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। কিন্তু তথ্য দেখাচ্ছে, গোটা দেশের মধ্যে ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনায় শীর্ষে আছে যে রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র– সেই চারটি রাজ্যেই সরকারে আছে বিজেপি। গত কয়েক মাস ধরে ওড়িশায় বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকারের মহিমায় নারী ও নাবালিকা ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও খুনের বাড়বাড়ন্ত লক্ষ করছেন সারা দেশের মানুষ। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে অতি সম্প্রতি থানায় অভিযোগ করতে আসা ধর্ষিতা নাবালিকাকে আবারও ধর্ষণ করে খুন করেছে সেখানকার পুলিশ। নারী নিরাপত্তা রক্ষায় অমিত শাহরা যদি সত্যিই আন্তরিক হতেন, এখানে এসে যে বাগাড়ম্বর তিনি করে গেলেন, তার মধ্যে যদি তিলমাত্র সত্য থাকত, তা হলে এমন ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটে চলতে পারত কি?

রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকার শুধু নারীদের নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থ তাই নয়, একের পর এক ঘটনায় সামনে এসে গেছে, তারা ধর্ষক-নির্যাতনকারীদের রীতিমতো পৃষ্ঠপোষকতা করে। মানুষ ভুলে যাননি নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের নিজের রাজ্য গুজরাটে বিলকিস বানুর ধর্ষণকারীদের জেলমুক্তির পর সেখানকার বিজেপি নেতারা কী ভাবে সেইসব দুষ্কৃতীকে ফুল-চন্দন দিয়ে বরণ করে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন। মানুষ ভুলে যেতে পারেন না, কাঠুয়ায় এক নাবালিকা কন্যাকে মন্দিরে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ চালিয়ে হত্যা করেছিল যে নরপিশাচরা, তাদের সমর্থনে মিছিল করেছিল বিজেপি। সেই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিজেপির এক বিধায়ক। হাথরস, উন্নাও– বিজেপির শাসনে কলঙ্কিত অধ্যায়ের কোনও কমতি নেই।

এই অবস্থায় সমস্ত রকম লজ্জা বিসর্জন দিতে না পারলে অমিত শাহ যে পাতাল থেকে নারী নির্যাতনকারীদের খুঁজে এনে শাস্তি দেওয়ার কথা বলতে পারতেন না, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। দেশ জুড়ে আক্রান্ত নারী, ধর্ষিত লাঞ্ছিত নারীর চরম অবমাননার জন্য অমিত শাহদের বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ যেমন নেই, তেমনই নেই অত্যাচারিত নারীদের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও। নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার আর নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করার গালভরা প্রতিশ্রুতি যে শুধুমাত্র ভোটবাক্স ভরানোর লক্ষ্যেই– এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়ার সময় এসে গেছে।