
ভোটের প্রচারে ধর্মের অপপ্রয়োগ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। মন্দিরে পুজো দিয়ে ভোট প্রচার স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী থেকে রাজীব গান্ধী, মনমোহন সিং থেকে রাহুল গান্ধী সহ কংগ্রেসের সব তাবড় নেতারা পুজো অনুষঙ্গেই ভোট প্রচার করেছেন। একই পথে হেঁটেছেন বাজপেয়ী থেকে আডবানি, নরেন্দ্র মোদির মতো বিজেপি নেতারাও। প্রচারের ফাঁকে মন্দিরে যাওয়া, তার খবর সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশ জুড়ে প্রচার করা, নিজেদের অতি ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরে ভোট চাওয়া– এইসব দৃশ্য দেশের মানুষের চিরচেনা। রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসও এই পথের পথিক হয়েছে। সরকারি টাকায় মন্দির নির্মাণ শুধু নয়, ভোট প্রচারে এলাকার নানা মন্দিরে পুজো দেওয়া, মসজিদে যাওয়া ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষঙ্গে কংগ্রেস বিজেপি তৃণমূল আজ এক সারিতে। এ বারের নির্বাচনে এই সারিতে এসে জুটলেন সিপিএমের দুই শীর্ষ প্রার্থীও।
এঁদের একজন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জী। আর একজন যুবনেতা কলতান দাশগুপ্ত। মীনাক্ষী মুখার্জী প্রার্থী হয়েছেন উত্তরপাড়ায়। গত ২২ মার্চ তিনি মারোয়াড়িদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যান এবং সেখানে যে যজ্ঞ চলছিল তাতে ঘৃতাহুতি দেন। আর পানিহাটির সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত এলাকার পরিচিত চৈতন্যদেবের মন্দিরে গিয়ে নমস্কার করেন। ধর্ম সহযোগে ভোট প্রচারে আপত্তি কোথায়? ভারত একটি ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেই ধর্মনিরপেক্ষতার অনেক ক্ষয় সত্তে্বও যতটুকু টিকে আছে, এই ধর্মকেন্দ্রিক ভোট প্রচার তার উপর আরও আঘাত হানছে। অন্য দিকে মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে যে আবেগ আছে, তাকে ব্যবহার করে শাসক দলগুলি তাদের জনবিরোধী রাজনীতিকে ধর্মের মোড়কে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, ধর্মকে ব্যবহার করে তৈরি করা মেরুকরণ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা, বিভেদ ইত্যাদি সামাজিক সম্প্রীতিকে নষ্ট করছে। তৃতীয়ত, ধর্ম-বর্ণ-প্রদেশ নির্বিশেষে শোষিত মানুষের ঐক্য ভেঙে দিয়ে পুঁজিপতিদের শোষণ ও সরকারি বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে দুর্বল করে দিচ্ছে এই ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি। তাই ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি সমাজ অগ্রগতির পথে প্রবল বাধা। ধর্মান্ধতা যেহেতু মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে দেয়, তাই শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে এই রাজনীতি ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। পুঁজিপতিরা তাই ধর্মের এই রাজনীতিকরণকে সব দিক থেকে মদত দেয়। অর্থ দিয়ে, প্রচার দিয়ে তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলে।
বামপন্থীদের অবস্থান ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্ম পালন করা বা না করাকে বামপন্থীরা ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় বলেই মনে করেন। তাই বামপন্থীরা রাজনৈতিক প্রচারে, দলীয় কর্মকাণ্ডে ধর্মকে ব্যবহার করেন না। বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটের প্রচারকালীন সিপিএমের দুই নেতার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যাওয়া নিয়ে।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘মানুষ যেখানে আছেন, আমরাও সেখানে আছি।’ কিন্তু এই একই যুক্তি তুলেই তো কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূলও মন্দিরে মন্দিরে যাচ্ছে। তা হলে এদের থেকে বামেদের পার্থক্য কোথায়? বামপন্থীরা তো কারখানায়, মহল্লায়, শ্রমজীবী মানুষের বসতিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সর্বদাই থাকার গর্ব করেছে। তা হলে সিপিএম কি সেই পরিসর ছেড়ে দিয়েছে বলেই মন্দির-মসজিদে যেতে হচ্ছে মানুষ খুঁজতে?
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই যে বিপজ্জনক উত্থান ঘটছে, এর কারণ কী? ১৯৬৯ সালে মার্ক্সবাদী নেতা এসইউসিআই(সি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছিলেন, ‘‘… জনসংঘের মতো ধর্মীয় রাষ্ট্রীয়তাবাদীরা ওঁত পেতে বসে আছে। তারা সুযোগের অপেক্ষা করছে। বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ আজও রয়েছে তা নষ্ট হয়ে গেলেই তারা আত্মপ্রকাশ করবে।ক্সক্স বামপন্থার নাম নিয়ে সিপিএমের মতো দলগুলি যেভাবে কয়েক দশক গায়ের জোরের রাজনীতি করেছে, যুক্তিহীন অন্ধ মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, অন্য দলের সমালোচনাকে কংগ্রেসী চক্রান্ত বলে দাগিয়ে দিয়ে সমালোচনার মর্মবস্তুকে উড়িয়ে দিয়েছে, তাতে আরএসএস মাথা তুলবার জমি পেয়েছে। কংগ্রেস ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট রাজনীতির যে খেলা খেলছিল, বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে তা আরএসএস-বিজেপি দখল করে নেয়। এখন আরএসএস-বিজেপির শক্তিবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে তৃণমূলের মন্দির রাজনীতি, তাদের নরম হিন্দুত্বের রাজনীতি। সাধারণ মানুষের কাছেও এখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বিজেপিকে আটকানোর মতো কোনও কার্যকর অস্ত্র কংগ্রেস বা তৃণমূলের ভাণ্ডারে নেই। অর্থাৎ আদর্শগত কোনও অস্ত্র তাদের নেই। এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে সত্যিকারের বামপন্থীরা, যাদের লড়াই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে।
এ রাজ্যে সিপিএম-এর শাসনে বামপন্থার নাম নিয়ে প্রকৃ অবাম কার্যকলাপের দ্বারা বামপন্থী ভাবাদর্শ ধাক্কা খেয়েছে। সংসদীয় বামপন্থী দলগুলিতে বামপন্থায় বিশ্বাসী মানুষের কাছে বামপন্থাটা একটা কৌশল-মাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বামপন্থা যে একটা নিছক কৌশল বা স্লোগান নয়, একটা উন্নত আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনা– সেই বোধটাই দুর্বল হয়ে গেছে। এর পুনর্জাগরণ ঘটানো আজ শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের স্বার্থেই জরুরি।
গণশক্তিতে দলীয় নেতারা লিখছেন, বামপন্থাই বিকল্প। কিন্তু এই বিকল্প কি শুধুই কৌশল? রাজনৈতিক আচার-আচরণে, প্রতিদিনকার ব্যবহারে মানুষ যদি সেই বিকল্পের প্রভাব দেখতে না পান, সংগ্রামী চেতনা যদি এতে শক্তিশালী না হয়ে শুধু ভোটে আখের গোছানোর হিসাব দেখতে পান, তবে কর্মী-সমর্থকরাও কোন দিকে সুবিধা বেশি, সেদিকে ছোটার টান এড়াতে পারেন না। এই সুবিধাবাদী রাজনীতি এ দেশে বামপন্থার কত বড় সর্বনাশ করেছে, তা একটু ভাবলে চোখে না পড়ার কথা নয়। বামপন্থার ন্যূনতম চেতনা থাকলে তো চোখে পড়ারই কথা। শুধুমাত্র ভোটের শক্তি দিয়ে বামপন্থার বিচার হয় না, তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। আদর্শহীন স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতির পিছনে সুবিধা ও ক্ষমতা দেখে একদিন হাজার হাজার লোক জমা হতে পারে। কিন্তু আর একদিন সেই দুর্গ যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সিপিএম দলটির দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। আদর্শের শক্ত ভিত না থাকলে জনসমর্থন শেষ পর্যন্ত মানুষের কোনও উপকার করে না।
এসইউসিআই( কমিউনিস্ট ) বাম বিকল্পের পতাকা বহন করে এগিয়ে চলেছে। বিপ্লবী বামপন্থা, সংগ্রামী বামপন্থাকে হাতিয়ার করে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করে চলেছে এসইউসিআই(সি)। বহু ক্ষেত্রে দাবিও আদায় হয়েছে। মনে রাখা জরুরি, যত দিন যাচ্ছে, পুঁজিপতিদের সেবা করতে গিয়ে কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতাশীল সরকারগুলি, তত বেশি অগণতান্ত্রিক এবং জনবিরোধী হয়ে উঠছে। তারা জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলি উপেক্ষা করছে বেশি বেশি করে। এই কারণে আজ যদি সামান্যতম দাবিও সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে হয় তার জন্য ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলন জরুরি।
সাধারণ মানুষের জয় হয় গণআন্দোলনের প্রবাহেই। ধর্মকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতার যে বিপদ ভোটসর্বস্ব রাজনৈতিক দলগুলির মাধ্যমে সমাজ জীবনে সংক্রমিত হচ্ছে, তাকে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের পথেই প্রতিহত করা সম্ভব। এই কারণে নির্বাচনী ময়দানে শ্রমিক-কৃষক মেহনতি শ্রেণির কর্তব্য হল ন্যায়সঙ্গত গণআন্দোলনের শক্তিকেই বিজয়ী করা।