Breaking News

বিজেপি মতাদর্শগত ভাবেই নেতাজির চিন্তা ও কর্মের বিরোধী

এই সেই মাটি যা ভারতের নবজাগরণের সূতিকাগার, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আপসহীন সংগ্রামের রক্তস্নাত প্রাঙ্গণ এবং প্রগতিশীল, বামপন্থী চিন্তা-চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সম্প্রতি এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক আস্ফালনের সাক্ষী থাকছে এই রাজ্য। বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ যেন বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের নেতাদের মাথা এমনভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছে যে, তাঁরা ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করছেন। ক্ষমতার তীব্র অহমিকায় তাঁরা আঘাত হানতে চাইছেন বাংলার সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়, বাংলার ইতিহাস এবং মনীষীদের আত্মপরিচয়ের ওপর। বিশেষত, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আপসহীন ধারার বীর বিপ্লবী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি সংঘ পরিবারের ধারাবাহিক কুৎসা ও অবমাননা প্রমাণ করছে, এদের লক্ষ্য নিছক রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নয়, বরং এই মাটির প্রগতিশীল চেতনাকে, নবজাগরণের ভাবনাকে সমূলে বিনাশ করা।

নেতাজির প্রতি এই অবমাননা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নকশার অংশ। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য যখন ফরওয়ার্ড ব্লকের নাম করে পরোক্ষে নেতাজিকে নিশানা করে গুন্ডামির অভিযোগ তোলেন, তখন তার মর্মার্থ বুঝতে বাংলার মানুষের অসুবিধা হয় না। এরপর শুরু হয় নেতাজিকে অপমানের ধারাবাহিক প্রতিযোগিতা। বীরভূমের রামপুরহাটে বিজেপি বিধায়কের উপস্থিতিতে ‘নেতাজি সুভাষ রোড’-এর নাম বদলে দেওয়া হয় ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড’-এ। নির্লজ্জতার সীমা পার করেন বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ অনন্ত মহারাজ, যিনি নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর প্রশ্নাতীত ভূমিকাকে কালিমালিপ্ত করার ধৃষ্টতা দেখান। কোথাও গায়ের জোরে নেতাজির মূর্তিকে গেরুয়া পতাকায় মুড়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও রাতের অন্ধকারে মূর্তি ভাঙচুর চলছে, আবার বিজেপির আইটি সেল নেতাজির নামে কুরুচিকর মিম ও পোস্ট ছড়াচ্ছে।

যে রাজনৈতিক শক্তি দাবি করে যে তারাই দেশের ‘একমাত্র দেশপ্রেমিক’ এবং বাকিরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের এই আচরণে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এদের আক্রমণ শুধু নেতাজিতেই থেমে নেই, রামমোহন রায় থেকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নবজাগরণের কোনও মনীষীই এদের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রেহাই পাননি। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে অবশ্য দেখা যায়, অতীতে জাতীয় কংগ্রেস এবং তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টিও নেতাজির দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, কিছু ব্যঙ্গাত্মক কার্টুনও আঁকা হয়েছিল। কিন্তু আজকের বিজেপির আক্রমণ তার সমস্ত মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিজেপির রাজনৈতিক আদর্শটাই নবজাগরণ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী। তাদের এই আক্রমণ চরম ইতিহাস বিকৃতি ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের নামান্তর।

দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবোধ আকাশ থেকে পড়ে না। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ ধরেই এই বোধ গড়ে উঠেছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে হিন্দু মহাসভা এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ সচেতন ভাবে শতহস্ত দূরে ছিল। আরএসএস-এর তাত্ত্বিক প্রধান এম এস গোলওয়ালকর তাঁর ‘বাঞ্চ অফ থটস’ গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছিলেন যে, ‘ব্রিটিশ-বিরোধিতা ছিল একটি প্রতিক্রিয়াশীলতা।’

১৯৩০-এর আইন অমান্য আন্দোলন বা ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মতো গণঅভ্যুত্থানে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএস অংশ তো নেয়ইনি, উল্টে এই সংগ্রামকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি লিখেছিলেন, ‘গত তিন মাসের মধ্যে যে সব অর্থহীন উচ্ছৃঙ্খলতা এবং নাশকতামূলক কাজ করা হয়েছে, তার দ্বারা আমাদের দেশের স্বাধীনতালাভে সহায়তা হবে বলে আমি মনে করি না।’ শুধু তাই নয়, বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি অর্থাৎ ব্রিটিশদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করার পক্ষেও সওয়াল করেছিলেন তিনি। হিন্দু মহাসভার আরেক নেতা সাভারকরও বিয়াল্লিশের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় ব্রিটিশদের সহযোগিতা করতে এবং মুসলিমবিরোধী প্রচার তীব্র করতে নির্দেশ দেন। এই সাভারকরই আন্দামানে সেলুলার জেল থেকে ব্রিটিশদের কাছে মুচলেকা দিয়ে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়েছিলেন। তিনি কোনওদিন ব্রিটিশ-বিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত হবেন না বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। এ সব কি তাঁদের দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধের নমুনা!

যাঁদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পরতে পরতে ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি আনুগত্য এবং আপসকামিতার এই ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তারা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল বা সুভাষচন্দ্রকে চিনবে কী করে? দেশসেবার নামে আত্মসেবা এবং দেশবাসীর স্বার্থ রক্ষার আড়ালে কতিপয় ধনিক-পুঁজিপতি শ্রেণির পকেট ভরানোই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, তারা ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম বা নেতাজির আত্মত্যাগের মর্মার্থ বুঝবে না, এটাই তো স্বাভাবিক।

কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেশসেবা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘দেশসেবা কথার কথা নয় দেশসেবা মানবের শ্রেষ্ঠ সাধনা। … যশ, অর্থ, দুঃখ, পাপ, পুণ্য, ভাল, মন্দ সব যে দেশের জন্য বলি দিতে পারবে, দেশসেবা তার দ্বারাই হবে।’ সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে দেশসেবা আক্ষরিক অর্থে এমনই ছিল। আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ হয়েও এক নিশ্চিন্ত, বিলাসবহুল জীবনের মোহ ত্যাগ করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে। তাই আজও তিনি আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে ‘নেতাজি’ হয়েই অধিষ্ঠিত।

নেতাজির প্রতি এই অবমাননায় বাংলার জনমানসে যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তা আঁচ করতে পেরেই তড়িঘড়ি ভাবমূর্তি রক্ষার মরিয়া চেষ্টায় নামেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি। মুখ্যমন্ত্রী কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়ে নেতাজির ছবি বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেন এবং ডিজি ও সাইবার সেলকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। তাঁদের এই চেতনার উন্মেষের জন্য বাংলার মানুষের প্রতিবাদ ঐতিহাসিক মূল্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।

নেতাজির মতো যুগনায়কের অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যদি পুলিশকে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়, তবে স্বাধীন দেশে এই মেরুদণ্ডহীন প্রশাসনের চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! শুধুমাত্র অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ সম্মান কেড়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

সবচেয়ে মর্মান্তিক হল মুখ্যমন্ত্রীর সেই ঘোষণা, যেখানে তিনি বলেছেন প্রতিটি বিধানসভায় ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সেবাকেন্দ্র’ চালু করতে হবে এবং সেখানে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত নেতাজির ছবি রাখলে তবেই কেন্দ্র পরিচালনার জন্য মাসে ৩০,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই ফতোয়ার সঙ্গে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদী চেতনার কোনও সম্পর্ক আছে কি?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি এই ধারাবাহিক অবমাননা বাংলা তথা ভারতবর্ষ মেনে নেয়নি, নেবেও না। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছাত্র, যুব, মহিলা ও সাধারণ মানুষ যেভাবে রাজপথে নেমে মিছিল, সভা ও সোচ্চার প্রতিবাদ করেছেন, তা প্রমাণ করে যে দেশের প্রগতিশীল ও বামপন্থী চেতনা আজও অম্লান।

ক্ষমতার মদমত্ততায় কেউ নেতাজির মূর্তিতে গেরুয়া ঝান্ডা লাগাতে পারে, রাতের অন্ধকারে মূর্তিতে কালি লেপে দিতে পারে, এমনকি মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়েও দিতে পারে। কিন্তু এ সবের দ্বারা নবজাগরণের যুক্তিবাদী চিন্তা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই আপসহীন বিপ্লবী আদর্শের গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটা যাবে না। নেতাজি কোনও জড়মূর্তি নন, তিনি মুক্তিকামী মানুষের অন্তরে এক জীবন্ত আদর্শ। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের আদশগত লড়াইয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেই চলবেন। ১৯৪০ সালে সুভাষচন্দ্র আজকের বিজেপির পূর্বসূরী হিন্দু মহাসভা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘‘সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের হিন্দু মহাসভা ত্রিশূল হাতে ভোটভিক্ষায় পাঠিয়েছে। ত্রিশূল আর গেরুয়া বসন দেখলে হিন্দুমাত্রেই শির নত করে। ধর্মের সুযোগ নিয়ে ধর্মকে কলুষিত করে হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে। এই বিশ্বাসঘাতকদের আপনারা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সরিয়ে দিন। তাঁদের কথা কেউ শুনবেন না …”। এ কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে হবে, নেতাজি চর্চার বিকাশ মতাদর্শগত ভাবেই আরএসএস-বিজেপি চায় না, চাইতে পারে না কেন তাও বুঝতে হবে।

আসুন, সংঘ পরিবারের এই বিকৃত ইতিহাসের বিরুদ্ধে আমরা প্রকৃত ইতিহাস চর্চার প্রসার ঘটাই। নবজাগরণের মনীষী আর বিপ্লবীদের আদর্শকে কেবল ভক্তির মোড়কে না রেখে দৈনন্দিন জীবন ও লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলি।