Breaking News

নাগরিকত্ব নিয়ে নয়া তামাশা

নাগরিকত্ব নিয়ে নাগরিক হেনস্থা বেড়েই চলেছে। সুমন মোল্লা নামে এক ব্যক্তি কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করে জানিয়েছেন, ১৮ জুন তাঁর ভাইকে বেআইনি ভাবে তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ব্যাংকের বই, দাদুর জমির দলিল সহ যাবতীয় কাগজ দেওয়ার পরেও কলকাতা হাইকোর্ট সম্প্রতি এই মামলার বিচার প্রসঙ্গে বলেছে, এগুলি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। হাইকোর্ট পরিষ্কার বলেই দিয়েছে, নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে আটক ব্যক্তিকেই। আদালত বা রাষ্ট্রের এখানে কিছু করার নেই (বর্তমান ৩০ জুলাই, ২০২৬)। উত্তর ২৪ পরগণার স্বরূপনগরের সাহিদা বিবি কিন্তু তাঁর যাবতীয় নথি জমা দিয়েছিলেন রাষ্ট্রের কর্তাদের কাছে। অথচ শুনানিতে তাঁকে ডাকাই হয়নি। ইতিমধ্যে মুম্বাই পুলিশ এবং বিএসএফ তাঁকে আসাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশে। নাগরিক হয়েও, নাগরিকত্বের প্রমাণ হাতে নিয়েও তিনি এখন ভিনদেশে অন্য এক সহৃদয় পরিবারের আশ্রয়ে আবার দেশের মাটিতে ফেরার দিন গুনছেন।

ফলে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, কিসের ভিত্তিতে কেউ প্রমাণ করবেন তিনি ভারতের নাগরিক? এ সংক্রান্ত কোনও দলিল বা কার্ড রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের দিয়েছে?

নাগরিকত্ব নিয়ে ভারতে এক নতুন তামাশা শুরু হয়েছে। এখন এক একটা সরকারের এক এক রকম ফরমানে দেশের মানুষের হাতে হরেক রকমের কার্ড। কিন্তু এর কোনটা যে নাগরিকত্বের নিশ্চিত প্রামাণ্য দলিল– তা কেউই বলছে না। মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি– কারও কোনও বাণী শোনা যাচ্ছে না কোন কার্ডটা নাগরিকত্বের প্রমাণ!

আইন অনুসারে প্যান কার্ড (পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট নাম্বার) করতে পারেন একমাত্র ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স কর্তৃপক্ষ বলছেন, প্যান কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।

রেশন কার্ড? নিয়ম অনুযায়ী কেবল ভারতীয় নাগরিক রেশন সামগ্রী পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু খাদ্য দপ্তর বলছে রেশন কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।

ভোটার কার্ড? জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ অনুযায়ী প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক, যার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর, সে ভোটাধিকারের যোগ্য। কিন্তু ভারতের নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার কার্ড একমাত্র ভোট দেওয়ার সার্টিফিকেট। এটা নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।

আধার কার্ড? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এত ঢাকঢোল পিটিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেশব্যাপী আধার কার্ড অভিযান করলেন। সমস্ত পরিষেবার সঙ্গে এর সংযুক্তিও করানো হল। ব্যাঙ্কিং পরিষেবা থেকে শুরু করে অনলাইন সব কর্মকাণ্ডে এর সংযোগ। এখন সুপ্রিম কোর্ট এবং বিধিবদ্ধ আইন বলছে এটা নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। এটা ব্যক্তির পরিচয় মাত্র।

তাহলে পাসপোর্ট? বিদেশমন্ত্রক বলছে, এটা বিদেশ ভ্রমণের ছাড়পত্র, নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। নিয়মানুযায়ী একমাত্র ভারতীয় নাগরিকরাই পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন। তা হলে দেখা যাচ্ছে যে কার্ডগুলি কেবল ভারতীয় নাগরিকরা পেতে পারেন, সেই কার্ডগুলিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ ধরা হচ্ছে না।

জন্ম সার্টিফিকেট কি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়? এরও উত্তর ধাঁধায় ভরা। আমাদের দেশে ১৯৬৯ সালের আগে জন্ম সার্টিফিকেট দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। জন্ম সার্টিফিকেট ধরলে প্রবীণরা তো প্রথমেই বাদ! তা হলে? কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট? না, ওটা নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। জমির দলিল? না, ওটা সম্পদের মালিকানার সার্টিফিকেট।

তা হলে কেন্দ্রীয় সরকারই স্পষ্ট করে বলুক, কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ? দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজ্যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী সহ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীরা কোন নাগরিকত্বের প্রমাণের ভিত্তিতে ওই চেয়ারে আসীন? কেউ বলতে পারবেন না। স্বাধীনতার আগে দেশনেতারা বলেছিলেন, স্বাধীন ভারতে স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী যে কোনও ব্যক্তি, যিনি অন্য দেশের নাগরিক নন, তাঁকেই নাগরিকের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। অথচ বিজেপি সরকার এই নাগরিকত্ব নিয়েই সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি করে চলেছে। সমস্ত সমস্যা থেকে মানুষের চোখ সরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের জটিলতায় ফেলে চাপে রাখাই তাদের আসল উদ্দেশ্য। প্রশ্ন উঠেছে সরকারের নৈতিকতা নিয়েও। অনুপ্রবেশ আটকানোর ছল করে দেশের নাগরিকদের বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সন্দেহভাজন বলে দাগিয়ে দেওয়া এবং সন্দেহ নিরসনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সেই নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চূড়ান্ত অযৌক্তিক শুধু নয়, চরম স্বৈরাচার। নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়ার দায় নাগরিকের নয়, রাষ্টে্রর। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে কোনও রাষ্ট্র নাগরিককে বাদ দিয়ে চলতে পারে না। নাগরিকদের কল্যাণই তার কর্তব্য, এক সময় বলতেন রাষ্ট্রের কর্তারা। সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের হয়রানি করাই আজ যেন সরকারের প্রধান কাজ হয়ে উঠছে।