Breaking News

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) একটা পরিবার, রক্তের বন্ধনের চেয়েও গভীর এক বাঁধন

এসইউসিআই(সি) শুধুই কোনও দল নয়– মহান চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের নিজের হাতে তিল তিল করে গড়া এক বিশাল পরিবার, যে পরিবার শেখায় কষ্টকে কী ভাবে হাসিমুখে জয় করতে হয়। সে দিনের যাত্রা ছিল সেই শিক্ষারই এক বৃষ্টি ও ঘামে ভেজা জীবন্ত ইতিহাস।

ছোট্ট একটা ১০৭ গাড়ি। তাতে আমরা ৩৫ জন। কোলে চারটে শিশু, তাদের মায়েরা।

এখানে একটা কথা বুকের ভেতর থেকে বলতে হয়। ওই টানা দুক্সঘণ্টা গাড়ির মধ্যে মায়েরা একটু বসবেন, সেটুকু জায়গাও ছিল না। ছোট ছোট শিশুগুলোকে বুকে আঁকডে, ঘামে ভিজতে ভিজতে, একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন তাঁরা। সবাই ঠাসাঠাসি করে গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে চলেছি।

বেলা সাড়ে এগারোটায় রওনা দিলাম। সমাবেশ আর কতদূর? আর কতদূর? অনেকের প্রশ্ন। অবশেষে যখন রানি রাসমণি রোডে পৌঁছলাম, তখন ২ ২৫। এই দু’ঘণ্টা শুধু যাত্রা ছিল না, এ ছিল ভালবাসার পরীক্ষা। আদর্শের প্রতি ভালবাসা না থাকলে এই কষ্ট কেউ হাসিমুখে সহ্য করতে পারে না। তাই তো কারও মুখে একটাও অভিযোগ ছিল না। আমরা তো একই মায়ের সন্তান– কমরেড শিবদাস ঘোষের আদর্শের সন্তান।

বৃষ্টি ভেজা ময়দান যেখানে ভিজে যায় শরীর, ভেজে না মনোবল

ধর্মতলায় পা রাখতেই আকাশ ভেঙে পড়ল। মুষলধারায় বৃষ্টি। যে মায়েরা রোদ দেখে বেরিয়েছিলেন, তাঁরা ছাতা আনেননি। কী করব?

কারও না কারও ছাতার তলায় শিশুদের ও মায়েদের দাঁড় করালাম, কারও মাথায় টেনে ধরলাম গাড়িতে বসার জন্য আনা প্লাস্টিকের চাদরটা।

বৃষ্টি একটু ধরতেই ছুটে গিয়ে বসলাম ময়দানের ভেজা চেয়ারে। যে বাচ্চাগুলো এতক্ষণ গরমে, ভিড়ে কুঁকড়ে ছিল, তারাই বৃষ্টির জল পেয়ে হাততালি দিয়ে হাসছে। ওদের হাসিতে আমাদের সব কষ্ট ধুয়ে গেল।

আবার বৃষ্টি নামল। এ বার আর কোনও আড়াল রইল না। ছাতা, প্লাস্টিক সব ব্যর্থ। আমরা, আমাদের চারপাশের হাজার হাজার মানুষ সবাই ভিজে একাকার। কিন্তু একজনও নড়ছে না। সামনে মঞ্চে কমরেড প্রভাস ঘোষ বলছেন, আর ওই ভেজা জনসমুদ্র একাগ্রচিত্তে। সেই দৃশ্য দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল। এ আবেগ নয়, এ বিশ্বাস।

ফেরার পথে মাতৃত্বের সবচেয়ে বড় ছবি

সমাবেশ শেষ, আবার ঢল নামল বৃষ্টির। আমরা ভিজতে ভিজতে সেই খোলা গাড়িতে উঠলাম। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি উপরে একটা ত্রিপল টাঙিয়ে দিলেন।

ভেতরে তখন এক অন্য পৃথিবী। মায়েরা নিজের ভেজা শাড়ির আঁচল দিয়েই মুছিয়ে দিচ্ছেন সন্তানের গা-হাত-পা। দ্বিতীয় কোনও জামা আনেননি তারা। তাই খালি গায়ে, মায়ের বুকের ওমে লেপ্টে রইল শিশুগুলো। তাকিয়ে দেখলাম সেই মায়েদের মুখের দিকে। দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আসা, তারপর এই অঝোর বৃষ্টিতে ভেজা। কিন্তু কোথায় বিরক্তি? কোথায় ক্লান্তি? কোথাও নেই। আছে শুধু এক অদ্ভুত প্রশান্তি, এক তৃপ্তির হাসি। কষ্টের মধ্যেও কী পরম শান্তিতে হাসছেন সবাই! মনে হচ্ছিল, এটাই তো আমাদের পরিবার! ওই হাসি নিয়েই আমরা বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন যখন ফোনে শুনলাম আমাদের সঙ্গে যাওয়া প্রত্যেক বাচ্চা, প্রত্যেক মা সুস্থ আছে, ভাল আছে, তখন মনে হল এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

– এক সংগঠকের কলমে