Breaking News

পাঠকের মতামতঃ এ খেলা কল্যাণকর নয়

বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেন এক অদ্ভুত ও সুবিধাবাদী সঙ্গীতাআলেখ্য পরিবেশিত হচ্ছে। যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে, তারাই আজ তসলিমা নাসরিনের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মুক্তচিন্তার প্রবক্তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পিছপা হচ্ছে না। যে উগ্র রাজনীতি সমাজে অহিষুiরতার অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করে, আজ সেই শক্তির হাতেই তথাকথিত ‘মুক্তচিন্তারক্স তোষামোদী ঘৃতাহুতি স্পষ্ট।

শাসক ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী রাজনীতির চরিত্র অত্যন্ত কৌশলী। কোন নীতি এদের মূল চালিকাশক্তি আর কোনটা কেবলই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতার ক্ষুধা মেটানোর টোপ তা উন্মোচিত হওয়া জরুরি। কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের অন্ধতা, কুসংস্কার বা মৌলবাদের সমালোচনা করা আর সেই ধর্মাবলম্বী সমস্ত মানুষকে ঢালাও আক্রমণ করা এক কথা নয়। ঠিক তেমনই উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির মুখোশ উন্মোচন করা মানে কোনও ধর্মকে আক্রমণ করা নয়। কিন্তু বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর দরকষাকষির বাজারে এই নূ্যনতম নীতি ও নৈতিকতার স্থান নেই। সেখানে বিক্রি হয় তোষামোদ, উগ্রতা এবং সংকীর্ণ ভোটব্যাংকের হিসাব-নিকাশ।

এক সময় নীতিহীন রাজনীতির শিকার হয়ে লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ত্যাগ করতে হয়েছিল। আজ তাঁকেই রাজনৈতিক মুনাফা হাসিলের সুবিধার্থে সংবর্ধনার পাত্রী বানানো হচ্ছে। কারণ পুঁজিবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে এখন ধর্মীয়মেরুকরণের বাজারদর তুঙ্গে। অন্য দিকে, এই উগ্র রাজনীতির দ্বিমুখী চরিত্র তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার দোহাই দিয়ে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষ ছড়িয়ে একজন ক্রীড়াবিদ মুস্তাফিজুর রহমানকে বয়কটের রাজনীতি দেখা যায়, আবার রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী একই দেশের তসলিমাকে পরম সমাদরে আসন পেতে দেওয়া হয়।

এই অবস্থান কোনও নৈতিক মূল্যবোধ বা নীতির লড়াই নয়। এটা হল উগ্র মতাদর্শকে তোষণ করে শ্রমজীবী মানুষের মগজে কৃত্রিম ‘শত্রু ও মিত্রক্স তৈরি করার চতুর বুর্জোয়া রাজনীতি। এর একমাত্র লক্ষ্য, দেশের সাধারণ মানুষকে ধর্মভিত্তিক মেরুকরণের নির্দিষ্ট খোঁয়াড়ে পুরে ফেলা, যাতে তাদের জীবনের আসল সমস্যা, রুটি-রুজির আন্দোলন এবং শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইকে বিভক্ত করা যায়।

এদের ভণ্ডামি এখানেই থেমে থাকে না। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য যাকেই এরা ব্যবহার করুক না কেন, একই সমাজে যখন কোনও বিবেকবান ও মুক্তমনা হিন্দু ব্যক্তিত্ব– গৌরী লঙ্কেশ, গোবিন্দ পানসারে কিংবা কালবুর্গীর মতো মানুষেরা এই প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার সামনে আয়না তুলে ধরেন, তখন তাঁদের বুকে বুলেট বসিয়ে চুপ করিয়ে দিতেও এই উগ্র শক্তিসমূহ দ্বিধা করে না! এদের নীতি অত্যন্ত স্পষ্ট, আয়না যতক্ষণ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে, ততক্ষণ ভাল। আর সেই আয়নায় নিজেদের কুৎসিত মুখ ভেসে উঠলেই তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও।

প্রকৃতপক্ষে, ওপার বাংলায় জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মীয় মৌলবাদী দলগুলি যেমন নিজেদের গোটা মুসলিম সমাজের একমাত্র কাণ্ডারী বলে দাবি করে আসলে সংকীর্ণ ধর্মীয় ব্যবসা পরিচালনা করে, এপারে আরএসএস-বিজেপিও একই ভাবে হিন্দুধর্মের স্বঘোষিত ঠিকাদার সেজে সামাজিক বিভাজন তৈরি করছে। মৌলবাদী শক্তি যে ভাবে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ভয় ও আবেগকে মূলধন করে ফায়দা লোটে, একই ভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিও সাধারণ মানুষকে ক্ষমতার দাবা খেলার বোড়ে বানিয়ে রাখছে।

এই খেলা শেষ পর্যন্ত কোনও ধর্মের কল্যাণ বাপ্রগতির নয়। এটি হল শাসক শ্রেণির সেই সূক্ষ্ম চক্রান্তের সুতো, যার মাধ্যমে বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সাধারণ মানুষের চোখ বেঁধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে তাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখছে। এই ভণ্ডামি ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিরুদ্ধে সঠিক বৈজ্ঞানিক ও শ্রেণিভিত্তিক চেতনার বিকাশই হতে পারে সাধারণ মানুষের একমাত্র উত্তর।

মিজানুর রহমান

মুর্শিদাবাদ